অনেক ঝামেলা করে, অনেক কাটখড় পুড়ে শেষ পর্যন্ত সাক্ষাতকারটা নিতে হলো। যদিও আমি চাচ্ছিলাম না, কিন্ত পত্রিকা অফিস থেকে আমাকেই জোর করে পাঠানো হল।পাঠকদের সুবিধার্তে পুরোটাই প্রকাশ করব।
---------------------------------------------------------
আমি ওনার বাসায় পৌছুলাম বিকেলের দিকে। ঠিক বুঝতে পারলাম না কিভাবে বর্ননা দেব মানুষটার। ক্ষমতার দ্যুতি ছিটকে আসছে তার শরীর থেকে। কিন্ত গায়ের চকচকে ভাবটার সাথে চোখের যেন কোন সম্পর্ক নেই।কি বলব চোখের ভাষাটাকে, মলিন নাকি শীতল?
''বসুন '', বললেন তিনি। আমি টেপ রেকর্ডারটা আস্তে করে টিপে দিয়ে বসে পড়লাম। বললাম, "শুরু করব?"
উনি সামান্য মাথা দোলালেন।
আমিঃ কেমন আছেন?
মানুষটাঃ "ভালই আছি।অন্য দশ জনের চেয়ে অনেক ভাল।বয়সটা আটকে আছে এক জায়গায়। জীবনটাকে উপভোগ করছি। বুঝলেন না, ক্ষমতাটা আছে দেখেই বেচে আছি। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া কি আর ভাল থাকতে পারি?"
আমিঃ "ঠিক কি ধরনের সহযোগিতার কথা বলছেন?"
মানুষটাঃ (একটু যেন অবাক হলেন) "ও'মা, কি বলেন, আমরা কিভাবে চলি আপনি জানেন না? ২০১১ বলেন, ৯০, ৭১, ৫২ই বলেন, সবইতো একই কথা। যুগে যুগে আপনাদের সাপর্টইত আমাদের পথ তৈরি করে দেয়। গনতন্ত্র বলে কথা, দেশের মানুষের ভালবাসা না পেলে কি আমরা চলতে পারি?"
আমি ওনার কথা ঠিক অস্বিকার করতে পারলাম না।
আমিঃ "দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট টা আপনার দৃষ্টিতে একটু ব্যখ্যা করবেন?"
মানুষটাঃ "খুবই ভাল। রাজনীতির দিকে তাকান, দলগুলো কেমন কামড়াকামড়ি করে, এমনটা না হলে আমরা সুযোগ পাই কি করে? প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে মদদ ত আমরাই দিচ্ছি। যেই মারা পড়ুক, লাভ আমাদেরই।ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবেনা?"
আমিঃ "তাই বলে দেশের সাথে? যাই হোক অর্থনীতি নিয়ে কিছু বলুন।''
মানুষটাঃ "অর্থনীতির অবস্থাও বেশ ভাল।মানে আমাদের জন্য আরকি। মুদ্রাস্ফিতি, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা এগুলা আমাদের তৈরি।মনুষের লসে কি যায় আসে। শেয়ার ব্যবসায় ধস তো আমার কি, আমি কি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারি নাকি? দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি, বাজার অস্থির। জানেন না,বাজারটাই তো আমাদের। স্টক তো আমরাই করি। মরলে না খেয়ে মরুক ছোটলোকগুলা, যত্তসব চাষাভূষা। ট্রাফিক জ্যাম, আমার কি, আমি কি অফিসে যাই, অফিসিতো আমার কাছে আসে।
আমিঃ "এত সরাসরি বলছেন,ভয় লাগছে না?"
মানুষটাঃ (একটু ঝুকে)"কাকে ভয় পাব, আপনাকে? হা হা।" আমি একটু মিইয়ে গেলাম, ক্ষমতাবান মানুষ বলে কথা।
উনি আমাকে একটু ভাল করে লক্ষ করে ব্যঙ্গের হাসি দিয়ে বললেন, "অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একদিন দুইদিন না, কয়েকশ বছরের অভিজ্ঞতা।ভয়টা পাব কাকে বলেন, দেশের মানুষকে? তাদের মেরুদন্ড আগেই ভেংগে দিয়েছি না? তারা নিজেরা একবেলা খাওয়ার জন্যই অস্থির। আমাকে নিয়ে চিন্তা করবে কি? জানালা দিয়ে বাহিরে তাকান, ওই টিনের ঘরটা দেখছেন? ওই যে, ওই টা, খুপরির মত। আর ওই পঙ্গু লোকটা কে জানেন? একজন মুক্তিযোদ্ধা। ৭১ এর চল্লিশ বছর পর কি দিল দেশ তাকে এই টিনের ঘরটা ছাড়া? আমকে দেখুন, ভাল আছিনা অনেক?"
আমি কিছুখন চুপ করে থেকে বললাম "আপনার কি ধর্ম ভয়ও নাই?"
মানুষটাঃ "হাসালেন মশাই, ধর্মটাই যে আমাদের সবচেয়ে বড়
ঢাল তা খেয়াল করেন নি? আমরাই ফতোয়া দেই, আমরাই ধর্মের দোহাই দিয়ে থামাই। দেশের মানুষ কে একটু হুজুগে রাখতে হয় না? শিবির , রাজাকার বলেন আর জঙ্গি জামায়াত বলেন, সবি ত আমরা। আমরা জামায়াত কে কখনই ক্ষমতায় আসতে দিবনা, আমরাই তাদেরকে শেষও করবনা।পলিটিক্স টা বুঝলেন না? আওয়ামি-বিএনপি কে ছোয়াছুয়ি খেলায় কে রাখল? এরশাদকে ক্ষমতায় আনল কে? বংগবন্ধু-জিয়াকে হত্যা করল কারা? মুজিবকে দিয়ে বাকশাল গঠন করানর বুদ্ধিটা কার? আমাদের।আরে এগুলতো অনেক পরের কথা। ৪৭ থেকেই ত ধর্মের দাগটা কেটে ভেজালটা বাধিয়ে রাখলাম আমরা। অবাক হচ্ছেন? তাতো হবেনই। এখনো বুঝেননি-আমরাই পাকিস্তানি, আম্রাই বৃটিশ। আরো আগে যাব? আমরাই ত বংগভঙ্গ করলাম।আমাদের শিকড় কোথায় কোন ধারনা আছে আপনার?
পলাশীর কথা মনে পরে? জানেন না মীরজাফর-মীরকাশীম সবি আমাদের লোক।দু'চারজন সিরাজুদ্দৌলা,নেতাজী,ভাসানী,মুজিব,জিয়া দিয়ে আমাদের মুছা জাবে? মনে নাই ৬৯ এ আমরা আসাদকে কিভাবে মারলাম? ৭১এ লাখ লাখ মানুষ, ৯০ এর আন্দোলনে কি করেছি আমরা ভুলে গেলেন? মনে নাই নুর হসেনের লাশ? সৈরাচার কি আসলেই নিপাত গেছে? হাসিনা-খালেদা কি সৈরাচারি না? দেখতে থাকুন, আরও কত মানুষ কে আমরা মারি। কিছুই করতে পারবেন না আপনারা।"
আমি নিশ্চুপ, অসহায়। নিজেকে বুঝ দিলাম, আমি একজন সাধারন মানুষ।কিইবা করতে পারি আমি? ওরা কত ওপরতলার।
প্রসংগ ঘুরানর জন্য বললাম,
"মিডিয়াকে ভয় করেন না? এখন ত বাক স্বাধীনতার যুগ।"
মানুষটাঃ (এবার যেন একটু বিরক্ত হলেন) "মিডিয়ার কথা বলবো? মাস-মিডিয়ার মালিকগুলর দিকে একবার চোখ বুলান , কাদের দেখতে পাচ্ছেন? যে দেশের মানুষ ভাত কাপড় পায় না, সে দেশে ৩০টা টিভি চানেল থাকে কিভাবে? মানুষের ইনকাম দারিদ্রসীমার এত নিচে, ১০০ খবরের কাগজ থাকে কিভাবে? dominating power বুঝেন? কিভাবে বুঝবেন? যেখানে শিখানর কথা সেই বিশ্যবিদ্যালয় গুলার শিক্ষক তো নিয়োগ দেই আমরা।যারা নিয়ন্ত্রনের বাইরে তাদের ধরে জেলে পুরে দেই।পৃথিবির কোথাও ছাত্র-শিক্ষককে একসাথে জেলে পুরার ঘটনা দেখছেন আগে? বায়তুল মোকাররমের খতিব পর্্যন্ত আমরা নিয়োগ দেই।আপনাদের উপর তো এভাবেই প্রভাব বিস্তার করছি। বাংলা ব্লগ গুলাতে যে ছাগুদের আমরাই বসিয়ে রেখেছি দেখেন না? তারপরও বাক স্বাধীনতার কথা শুনলে হাসি পায়।"
নিরুপায় হয়ে বলে বসলাম, মৃত্যুকে ভয় পাওয়া উচিত আপনার।"
মানুষটাঃ "স্বর্গে জায়গা কিনে রেখেছি।এতগুল প্রাইভেট ইউনির স্টুডেন্টদের পরাশুনা করার ব্যবস্থা করে দেয়ায় সয়াবটুকু পাবনা? যদিও ব্যবসাটা মুল, সয়াবটা উপরি পাওনা।"
আমিঃ "তাহলে কি আপনারা অমর?"
মানুষটাঃ যেদিন আপনারা বুঝবেন,একটা দেশ মানে সেই দেশের মানুষ,একজন নারীকে ধর্ষন করা মানে দেশটাকেই রেপ করা,দেশটা মাথা উচু করে দাড়ান মানে দেশের মানুষগুল মাথা উচু করে দাড়ান- সেদিন আর আমার অস্তিত্ত থাকবেনা।"
সেটা ভেবেই হয়ত মানুষ্টার মাথা একটু নিচু হয়ে গেল মনে হয়।
আমি টেপ রেকর্ডারটা বন্ধ করে উঠে দাড়ালাম,অর্থহীন মনে হচ্ছে রেকর্ডারটাকে।কেমন যেনো বুকের কাছটায় ব্যাথা জমাট বেধে আছে। একবার মনে হল এ ব্যাথা, কান্না আসলে একজন বাংগালীর না, এ দাবী একজন বাংলাদেশীর না, এ দাবি আমার পুরো দেশের, আমার বাংলাদেশের।
কিন্ত আমি ত একজন সাধারন মানুষ,আমি কিইবা করতে পারি, বলুন।
------------------------------------------------
আবারো পোস্ট উৎসর্গ হাসান মাহবুব ভাই।কারন ওনার গল্প পড়েই আমার মাঝে গল্প লেখার ইচ্ছা যাগে।
নষ্ট কবি, ইনিও আমার প্রিয় একজন ব্লগার।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১২ দুপুর ১২:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


