ঘটনার শুরু বেশ আগে। সেই আশির দশকের মাঝামাঝিতে। আমি তখন পড়ি জগন্নাথ কলেজে। মাঝে মধ্যে আড্ডা দিতে যাই টিএসসি বা হাকিম চত্বরে। একজন দু'জন করে অনেকের সাথেই সেখানে পরিচয় আর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। একদিন এরকম এক ছেলের সাথে পরিচয় হলো চুপচাপ, চোখে চশমা। থাকে মহসিন হলে। নাম মুকুল। কথা খূবই কম বলতো।
একদিন এরকম বসে আড্ডা দিচ্ছি হাকিম চত্বরে। কেমন জানি দুলতে দুলতে মুকুল এসে হাজির। এসেই আমার কাছে দশ টাকা চাইলো। আমি একটু অবাক হলেও টাকা বের করে ওর হাতে দিলাম। পাশে বসা মুকুলের রুমমেট ওকে একটা ধমক দিয়ে বললো তুই রিফাত কে কয়দিন ধরে চিনিস যে টাকা চাইলি। আমি বললাম থাকনা, দশ টাকাই তো। মুকুল সেইরকম দুলতে দুলতে টাকা নিয়ে চলে গেল। তখন ওর রুমমেট বললো ছেলেটা প্যাথিডিন নেয় রেগুলার। যত দিন যাচ্ছে তত বাড়ছে নেশা। আগে টাকা শর্ট পড়লে চেনা পরিচিতদের কাছে চাইতো, এখন স্বল্প পরিচিতদের কাছেও চায়। শুনে খারাপ লাগলো। কিন্তু করার কিছু ছিল না।
এরপরের কাহিনী আরো করুণ। ১০ মাইল দূর থেকে মুকুলকে সেইরকম দুলতে দুলতে আসতে দেখলে সবাই কেটে পড়তো। মুকুল আর টাকা চাইতো না, এসে সোজা পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিত। আর যা পেতো সব নিয়ে যেত। একদিন হাকিম চত্বরে এসে দেখি চুপ করে বসে আছে, হাতে ব্যান্ডেজ। কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই আরেক বন্ধু রাগত স্বরে জবাব দিল - কি আর হবে। জানই তো সব। হারামজাদা সুই নিতে নিতে হাতে ঘা বানিয়ে ফেলেছে।
এরপর। এরপর অনেকদিন পার হয়ে গেছে। একেকজন একেক দিকে। মুকুল আর কোন খবর পাইনি। মাদকাসক্তের খবর কেইবা রাখে বলুন। বছর তিনেক আগে প্রবাসী এক বন্ধু ঢাকায় এসে সবার সাথে যোগাযোগ শুরু করলো। ১লা বৈশাখে সবাই এক হলাম আবার সেই হাকিম চত্বরে। বেশির ভাগই ফ্যামিলি নিয়ে এসেছে। জমজমাট আড্ডা। হঠাৎ সুবেশী এক ভদ্রলোক এসে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো কেমন আছো। খূবই চেনা, অথচ অচেনা লাগছে কেন ? আমি হাত ধরে হাসতে হাসতে বললাম নামটা বলো তো। পাশ থেকে একজন বললো আরে এইটা মুকুল। চিন নাই ? মুকুল ওর বৌ আর মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। আমি একফাঁকে বললাম - আমি খূব অবাক হয়েছি, মুকুল তোমাকে দেখে। মুকুল বুঝলো। হাসলো একটু। পাশে ওর বৌ ও হাসলো, সেও মনে হয় বুঝেছে। তবে এটা নিয়ে আর কোন কথা হল না।
একফাঁকে মুকুলের প্রাক্তন সেই রুমমেটকে একা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। সে এক অসাধারণ কাহিনী বললো। পাশ করার পর মুকুলের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল। প্যাথিডিন নেয়ার ডোজ আর ফ্রিকোয়েন্সি দু'টোই বেড়ে গিয়েছিল। উপায়ন্তর না দেখে ওর পরিবার ওকে নিয়ে যায় ঢাকা থেকে। সেখানেও বিপত্তি। শিকল দিয়েও বেঁধে রাখা যায় না। আটকে রাখলে অবস্থা এত খারাপ হয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিতে হয়। এইরকম অবস্থায় কেউ একজন পরামর্শ দিল মুকুলকে বিয়ে করানোর। তাতে যদি সুমতি ফেরে ছেলেটার। কেউ কেউ বললেন মুকুল তো শেষ, এর সাথে আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার চিন্তা কেন।
শেষ পর্যন্ত মুকুলের বিয়ে হলো। গ্রামের মেয়ে। বিয়ের আগে মুকুলের মাদকাসক্তির কথা মেয়েটা জানতো কিনা জানি না। তবে ধারণা করি মেয়ে কেন, মেয়ের পরিবারকে এসব কিছুই জানান হয়নি। বিয়ের পরই মেয়েটা বুঝে গেল কার হাতে পড়েছে সে। কেঁদে বুক ভাসায়নি কিন্তু। এক আত্বীয়কে ধরে মুকুলের জন্য একটা চাকরি জোগাড় করলো এক এনজিও তে। খূলনার এক অজপাঁড়া গাঁয়ে গিয়ে মুকুল কে নিয়ে সংসার পাতলো। মুকুলকে বললো যা খুশি তাই করতে পার, তবে শর্ত একটা সব করতে হবে আমার সামনে। আসলে সেটা ছিল মেয়েটার একটা যুদ্ধ। মুকুলের প্যাথিডিনের ষ্টক থাকতো ওর বৌ এর কাছে। নিতে হলে বৌ এর সামনেই নিতে হতো। একটু একটু করে কন্ট্রোল করা শুরু করলো প্যাথিডিন নেয়াটা। ডোজ আর ফ্রিকোয়েন্সী - দু'টোই কমা শুরু হলো। কতদিন পার হয়ে গেল এভাবে আমার জানা নেই। শুধূ শুনলাম মুকুল যখন প্যাথিডিন নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে থাকতো, মেয়েটা পাশে বসে বুঝাত বা প্যাথিডিন নিয়ে যখন নেশায় বুঁদ, চুপচাপ হাত ধরে বসে নির্ঘুম কাটিয়ে দিতো রাতটা।
একসময় ... ওয়েল, সেটা মনে হয় আগেই বলে ফেলেছি আপনাদের।
স্যালুট ইউ লেডি ...
{আজ প্রথম আলো পত্রিকার একটা হেডিং ছিলো - মাদকাসক্তকে বিয়ে না করার শপথ। হেডিং পড়ে আমার নাম না জানা এই মহীয়সী মহিলার কথাটা মনে পড়ে গেল। সেটাই শেয়ার করলাম আপনাদের সাথে।}
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



