আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। ভূক্তভোগি মাত্রই জানেন সে কথা। আর এই সব ভূক্তভোগি কারা ? হাতেগোনা গুটিকয়েক বাদ দিলে বলা যায় দেশের আপাময় জনসাধারণ। মানুষ যেহেতু, রোগ-শোক আছেই। আর সেটা নিয়ে মাঝে-মধ্যেই দৌড়াতে হয় ডাক্তারের কাছে। ছোট-খাট ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আজকাল আর মাথা ঘামাই না। জানি কোন লাভ নাই। সেসব ধরতে গেলে নিজেরই বিপদ।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা দিন দিন খারাপই হচ্ছে। জৌলুস বেড়েছে বাইরের, কিন্তু ভিতরটা ফাঁপা একেবারেই। গত কয়েকদিন আগে আম্মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে সত্যটা নতুন করে আবার জানলাম।
১৯৮৩ সালে ষ্ট্রোক হওয়ার পর আম্মা ২৫ বছর ধরে পারশিয়ালি প্যারালাইজড। সাথে আছে ডায়াবেটিস। সেদিন হঠাৎ করেই বমি বমি ভাব আর দূর্বল বোধ করায় ব্লাড সুগার টেষ্ট করা হলো। মারাত্মক বেশী - ২৮ । দ্বিতীয়বার পাওয়া গেল ৩০। বাসার কাছের এক ডাক্তারকে নিয়ে আসলে উনি তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিতে বললেন। সন্দেহ করলেন কোন এক ধরণের ইনফেকশন হয়েছে, যেটা রক্তে ছড়িয়ে পড়েছে। নিয়ে গেলাম উত্তরা আধূনিক মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে, যেটা বাংলাদেশ মেডিকেল নামেই পরিচিত। ভর্তি হলেন এক মহিলা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে। অত্যন্ত অমায়িক এই মহিলাটির কারণে আম্মা এখন অনেকটাই সুস্থ হয়ে বাসায় এসেছেন। রোগীর এটেন্ড্যান্টদের সাথে ইন্টারাকশন খূবই চমৎকার। যখন যেটা জানতে চেয়েছি, বুঝতে চেয়েছি হাসি মূখেই সেটা বুঝিয়েছেন। চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি বেশ কিছু টেষ্ট করতে দিলেন। তার মধ্যে একটি হলো আল্ট্রাসনোগ্রাম। আম্মা যেহেতু অনেক পূরানা ডায়াবেটিস রোগী, তার অন্যান্য অর্গানের কি অবস্থা সেটাই জানা উদ্দেশ্য। লিখে দিলেন হোল এবডোমেন পরীক্ষা করতে হবে। যথারীতি পরীক্ষা হলো, রিপোর্টও পেলাম বিকালে। কিডনির কিছু সমস্যার কথা কথা বলা হয়েছে। ছোট ভাই ডিউটি ডাক্তারকে প্রশ্ন করেছিল সমস্যাটা আসলে কি। ডাক্তার সাহেব আড়ালে ডেকে নিয়ে কথা বললেন। আমি আর আপা বসে রইলাম চুপচাপ। কতক্ষণ পর ছোট ভাই আসলো মূখ কালো করে। জানালো কিডনির অবস্থা ভয়াবহ। মেডিসিন দিয়ে যতটুকু ঠিক রাখা যায়। ট্রান্সপ্লান্ট করলেও নাকি খূব একটা ভাল হয় না। এসবই ডিউটি ডাক্তারের বক্তব্য। আপা কতটুকু কি বুঝলো জানি না, আমার বুক ধরফর করা শুরু হলো। আম্মা কত কষ্ট করে গত ২৫টা বছর টিকে আছে, তার দুনিয়া চার দেয়ালের সেই ঘরটা। এখন যদি আবার কিডনির সমস্যা যোগ হয় ... । আপা আর ছোট ভাই মাথা নিচু করে বসে আছে। বেডে আমাদের আম্মা তখন ঘুমিয়ে। ট্রান্সপ্লান্ট ??? সেটা তো করে পূরো কিডনি অকার্যকর হয়ে গেলে। ছোট ভাইকে বললাম সেই কথা, ও আবার মেডিসিন কোম্পানিতে চাকরি করে। আমার কথা শুনে ও দেখলাম একটু গা ঝাড়া দিয়ে বসলো। আপাও বললো ওর ননাসের জামাই, মানে আমাদের মিজান দূলাভাই এর কথা। হাতে পায়ে পানি আসে, ডায়ালিসিস করতে হয় আরো কত কি। ছোট ভাই হঠাৎ রিপোর্টটা আমার হাতে দিয়ে বললো এটুকু পড়েন। পড়লাম এবং বেকুব বনে গেলাম। আমরা ঠিক করলাম এটা নিয়ে আর কথা বলবো না। পরের দিন মহিলা ডাক্তার আসলে তাকে যা বলার বলবো।
পরদিন যথারীতি ডাক্তার এসে রিপোর্ট দেখলেন। কিডনিতে কিছু সমস্যা পাওয়া গেছে সেটা বললেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কতটুকু গুরুতর। ডাক্তার বললেন নিয়ম মেনে চলতে হবে, বিশেষ করে খাবার, প্রোটিনটা মেপে খেতে হবে। আর নিয়মিত মেডিসিন। আমি তখন গতকালকের ডিউটি ডাক্তারের কথা বললাম। শুনে খূব রাগ করলেন। পরে বললেন আমার আম্মার যা বয়স, ঠিকমতো চললে কোন সমস্যা নাই।
এবার আসলাম আসল কথায়। বললাম আপা রাগ না করলে এই পরীক্ষাটা আমি অন্য কোথাও থেকে করাতে চাই। কেন ? দেখিয়ে দিলাম আগের দিন ছোট ভাই এর দেখিয়ে দেয়া অংশটুকু। সেখানে লেখা আছে ...
Gall Bladder is normal in size and shape. Wall thikness is normal. Lumen is clear.
পড়ার পর ডাক্তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললাম - আম্মার পিত্তথলি ১৯৭৪ সালে পাথর হওয়ার কারণে অপারেশন করে ফেলে দেয়া হয়েছে। আমার কথা শুনে ডাক্তার পুরা বাক্যহারা। তারপর তার সিও'কে বললেন কে করেছে এটা ? সিএ বললেন ডা. মোঃ ফারহান মতিন। ডাক্তার আপা কাগজে লিখলেন কিছু, সিস্টার আর সিএ'কে বললেন আজকেই যেন এটা রিভিউ করা হয়। আর তিনি বোর্ড মিটিং এ তুলবেন ব্যাপারটা। আর আমাকে বললেন ভয়ের কিছু নেই। নেক্সট টাইম যখন পরীক্ষাটা করাতে হবে আমার ইচ্ছামতো যে কোন জায়গায় করাতে পারি।
আমি শুধূ বললাম এই রিপোর্ট যদি ভূল হয়, আপনার চিকিৎসাও ভূল হতে বাধ্য। যাইহোক সেদিনই আবার পরীক্ষাটা হয়েছিল। রিপোর্টে শুধূ গলব্লাডার এর অংশটুকু পরিবর্তিত হয়েছে মাত্র। বাকি সব একই আছে।
সেই বিশিষ্ট ডাক্তার এর নাম
ডা. মোঃ ফারহান মতিন
এমবিবিএস, এমফিল
জুনিয়র কনসাল্টটেন্ট
ডিপার্টমেন্ট অফ রেডিওলোজি এন্ড ইমেজিং
উত্তরা আধূনিক মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

