মহিলার নাম সাথী। বর্তমান বয়স ৪৫ বছর। প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ুয়া মেয়ে আর সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে থাকেন স্বামীর সাথে দক্ষিণ বাড্ডার এক বাসায়। স্বামীর সাথে একই বাড়ীতে থাকেন তবে একই রুমে না। দু'জনের আলাদা রুম। মূখ দেখাদেখিও বন্ধ বলা যায়। স্বামী ইচ্ছা হলে সংসারের খরচ দেন, না হলে দেন না। মহিলাটিকে তাই টিউশনি করে, ভাই-বোনের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে সংসার চালাতে হয়। আর মাথার উপর আছে বিরাট এক ঋণের বোঝা। অথচ এই লোক তাকে পছন্দ করেই বিয়ে করেছিল। প্রথমে প্রেমে রাজি ছিল না বলে সাথীকে পাওয়ার জন্য কত রকমের চেষ্টাই না করেছে। অথচ আজ !!!
ঘটনার শুরু ১৯৮০ সালের দিকে যখন সাথী উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। পাশের বাসায় টিভি দেখতে যাওয়ার সুবাদে দু'জনের দেখা। সাথীদের প্রতিবেশী ভদ্রলোকের কাজিন ছিল এই লোক। সেই লোক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। সাথীকে দেখার পর সে চিঠির মাধ্যমে প্রেম নিবেদন করে। সাথী সেটা প্রত্যাখান করে। এরপর নানা ভাবে সে সাথীর সাথে প্রেম করার চেষ্টা করে, এমনকি সাথীর মুরুব্বী স্থানীয় এক কাজিনের মাধ্যমেও চেষ্টা করে। সাথী সব কথাই তার মা'কে জানাতো। তার মা'ও এব্যাপারে আপত্তি জানান তার প্রতিবেশীর কাছে।
সাথী একসময় উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে এগিয়ে আসে সেই লোক। সাথী ভর্তি হয় বাংলায়। ক্লাস শুরুর পর দেখে সেই লোকও তখন তার সাথে ক্লাসে। ঘটনা কি জানতে চাইলে সে জানায় সাথীর চিন্তায় তার পড়াশোনা লাটে উঠেছে, তাই এবছর সে সাথীর সাথেই আবার ভর্তি হয়েছে। সাথী এরপর অনেকটাই নরম হয় তার প্রতি। কিন্তু এই সময় সেই লোক একটা কান্ড করে বসে। হলে সিট পাওয়ার আবেদনে সই লাগবে বলে সে একটা ফর্মে সাথীর সই নেয়। সাথীও সরল বিশ্বাসে কোন কিছু না দেখেই সই করে। তখন পাশে দাড়ানো এক বন্ধু তাকে ভাবী সম্বোধন করে বলে কিসে সই করলেন। তখন জানা যায় সেটা ছিল আসলে কাবিননামা। সাথী এরপর খূব রাগ করে বাসায় চলে আসে এবং তার মা'কে সব ঘটনা বলে। সাথীর পরিবার থেকে এরপর প্রচন্ড চাপ দেয়া হয় সেই কাবিননামা ফেরত দেয়ার জন্য। সেই লোক তখন সেই কাগজ ফেরত দেয় এবং সাথীর কাছে ক্ষমাও চায়। সে জানায় সাথীকে সে হারাতে চায় না বলেই এমনটা করেছিল। এরপর সেই লোক তার নিজের পরিবারের মাধ্যমে সাথীর বড় বোন দুলাভাইকে প্রস্তাব পাঠায়। সেই লোকের পরিবার প্রথমে রাজী ছিল না ছেলেকে ছাত্রাবস্তায় বিয়ে করানোর, কিন্তু ছেলের কাছে হার মানেন তারা। প্রস্তাব পেয়ে সাথীর মা প্রথমে খূব আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু এবার তিনি হার মানেন সাথীর চোখের জলের কাছে। একসময় বিয়ে (আকদ) হয়ে গেল।
এভাবেই চলে গেল কয়েকটি বছর। দু'জনেই অনার্স পাশ করলেন। এরমধ্যে সাথীর কোল আলো করে এসেছে এক মেয়ে। দু'জনেই টিউশনি করে, আত্মীয়স্বজনদের সহযোগীতায় চলতেন সে সময়। মেয়ে হওয়ার পর তারা আলাদা বাসা ভাড়া করেন। সাথী এসময় একটা সরকারী চাকরি পায়। পোষ্টিং মুন্সীগঞ্জ। ঢাকা থেকে যাতায়াত করতেন প্রতিদিন। এরপর ছিল টিউশনি। স্বামী তখনও বেকার। নামকাওয়াস্তে এক মাদ্রাসায় চাকরি করতেন, কিন্তু সেটার বেতন ডাও পেতেন তা পূরাটাই সাথীর শ্বশুর কিভাবে যেন নিয়ে নিতেন। এভাবেই চলছিল জীবন। ৪/৫ বছর এভাবে যাওয়ার পর স্বামী চাকরি পেলেন এক কুরিয়ার সার্ভিসে। বেশ হ্যান্ডসাম, ব্যবহার ভাল ইত্যাদি গুণের কারণে খূব দ্রুতই উন্নতি করতে থাকলেন তিনি। এই সময় তিনি চাইলেন স্ত্রী যেন চাকরি ছেড়ে দেয়। কারণ হিসেবে বললেন তার স্ত্রী তো এতোদিন অনেক কষ্ট করেছে আর কত। তাছাড়া দু'জনেই চাকরি করলে মেয়ে মানুষ করবে কে ইত্যাদি। স্বামীর ইচ্ছার কাছেই হার মানলেন সাথী। সরকারী চাকরিটা তিনি ছেড়ে দিলেন। এসময় এক ছেলে সন্তান ঘরে আসে তাদের।
ভালই চলছিল তাদের। স্বামী এসময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। সেখানেও উন্নতি করতে থাকেন। এসময়ই গন্ডগোলটা বাঁধে। সাথীর এক মামা শ্বশুর থাকতেন আমেরিকায়। তিনি বেশ বয়স্ক ছিলেন, তবে তার স্ত্রী ছিলেন বেশ কম বয়সী। এমনকি তিনি সাথীর থেকেও কম বয়েসী এবং সুন্দরী ছিলেন। তিনি তার দুই ছেলেকে নিয়ে দেশের বাড়ীতেই থাকতেন। তবে প্রতি মাসেই ঢাকা আসতেন ভিসার খোজ খবর করার অজুহাতে এবং এসে উঠতেন সাথীর বাসাতেই। সাথী ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করেন নাই তার স্বামী তার মামীর সাথেই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়বেন। সাথী যখন বুঝলেন তখন জল অনেক দূর গড়িয়েছে। এক সময় কথাটা তার শ্বশুর বাড়ীর লোকজনও জানলো। কিন্তু সবাই সাথীকে সহ্য করার পরামর্শ দিল এই বলে যে আর কয়টা দিন তো মাত্র। সেই মহিলা তো কিছুদিন পর আমেরিকা চলেই যাবে।
সাথী একসময় বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু পারেনা ছেলে-মেয়ে দু'টোর কথা চিন্তা করে। সেই মহিলাকে একদিন বাসা থেকে বের করে দিতে চাইলে মহিলা জানায় সাথীর স্বামী তার কাছ থেকে অনেক টাকা ধার করেছে এবং সেই ধার শোধ করতে হবে। সাথী তার নিজের সংসারের কথা চিন্তা করে স্বামীকে না জানিয়েই তার গয়না বিক্রি করে টাকা দেয় মহিলাকে। কিন্তু এরপরও তাদের পরকীয়া প্রেম চলতেই থাকে। সাথীর মা যখন মৃত্যু শয্যায় তখন তার স্বামী এই মহিলাকে বিয়ে করে, যেটা সাথী জানতে পারে অনেক পরে। এরমধ্যে সাথী তার মামা শ্বশুরকে জানাতে চায় সবকিছু কিন্তু সরাসরি কিছু বলতে পারে না। একসময় সেই মামীর ভিসা হয়ে যায় এবং মামা দেশে আসেন স্ত্রী-সন্তানদের নিতে। এই সময় সেই মহিলা সাথীর স্বামীকে চাপ দেন সাথীকে ডিভোর্স করে তাকে নিয়ে মামার সমস্ত টাকা পয়সা, গয়নাগাটি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু বিধি বাম ! আমেরিকা যাওয়ার আগের রাত্রেই দু'জন ধরা পড়ে যান মামার কাছে। মামা তার ভাগ্নেকে বাসা থেকে বের করে দেন আর স্ত্রীকে দেন পিটুনি। তিনি প্রথমে তার স্ত্রীকে আমেরিকা নিয়ে যাবেন না বলে ঘোষণা দেন, কিন্তু আত্মীয়স্বজনদের চাপে শেষ পযর্ন্ত সপরিবারেই রওনা দেন।
এরপর সাথীর স্বামী সাথীকে বিয়ের কথা সহ সব খূলে বলে ক্ষমা চান। সাথী তখন তার স্বামীকে তার গয়নার কথাটা বলেন। স্বামীও জানান তিনিও তার ব্যবসা থেকে টাকা দিয়েছেন। সেই মহিলার পিছনে ঘুরে তার টাকা পয়সা সব শেষ। এরপর সাথী তার ভাগে পাওয়া বাবার সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা তুলে দেন স্বামীর হাতে। স্বামী আবারও ব্যবসা শুরু করেন।
আবারও ব্যবসার উন্নতি হতে থাকে। ভালই চলতে থাকে জীবন। যদিও সুর একবার কেটে গেলে যা হয় আর কি। ছন্দহীন জীবন। বছর কয়েক এভাবে চলার পর সাথী আবারও টের পান তার স্বামী নতুন কোন সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এবারের মেয়েটিও সাথীর শ্বশুরের দেশের লোক এবং ঢাকায় কোন এক হাসপাতালে কর্মরত। এসব নিয়ে কথা উঠলে স্বামী ছেলে-মেয়েদের উপর অত্যাচার করেন। সাথীকে বলেন চলে যেতে। সবদিক ভেবে এবং ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সাথী কোথাও যেতে পারেন না। আসলে তার যাওয়ার কোন জায়গাই আর নেই।
অডিও ফাইল সময় ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট
সাথীর নিজের মূখেই শুনুন তার কাহিনী (AMR ফাইল ৪.৫ মেগাবাইট)
[এটা আসলে কোন গল্প না। এফএম রেডিও ষ্টেশন রেডিও আমার এ প্রতি বৃহস্পতিবার রাত ১১ টার দিকে একটা প্রোগ্রাম হয়। সেটাতে রাত সাড়ে ১১টার দিকে লাভগুরু একজন শ্রোতাকে নিয়ে আসেন, যিনি তার ভালবাসার কাহিনী শোনান। গত প্রায় ৩ মাস ধরে অনুষ্ঠান টা শুনছি। এর মধ্যে থেকে দু'টো কাহিনী আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। আজ দিলাম তার প্রথমটি।]
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


