বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ জেমি সিডন্সের সঙ্গে বিসিবি দ্বিতীয়বারের মতো চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি ছিলেন মূলত ব্যাটিং এক্সপার্ট; যে কারণে দলের বোলিং সাইড দেখার জন্য বোলিং কোচ ইয়ান পন্টকে রাখা হয়েছিল। পন্টের চুক্তি ৩০ এপ্রিল এবং সিডন্সের চুক্তি ৩০ জুন শেষ হবে। ফলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্য এখন ব্যাটিং এবং বোলিং উভয় দিকের জন্য নতুন কোচ প্রয়োজন হবে। বিসিবি কী পদ্ধতিতে কাকে নতুন কোচ নিয়োগ দেবে, তা বিসিবি সবার চেয়ে ভালো বুঝবে বলেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু বিসিবি যেহেতু বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের প্রতিনিধি, তাই সেই ১৫ কোটির একজন হিসেবে আমি একটি পরামর্শ বিসিবিকে দিতে চাই।
আমাদের দলে এ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের গর্ডন গ্রিনিজ থেকে শুরু করে অনেক বিদেশী কোচ কাজ করেছেন। তারা সবাই স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। গ্রিনিজ কোচ হিসেবে যতটা না খ্যাতিমান ছিলেন, তার চেয়ে বেশী ছিলেন একজন সফল ক্রিকেটার হিসেবে। এরপর যারা এসেছেন তাদের খ্যাতি কোচ হিসেবেই বেশি ছিল। তবে তারা যে যে দেশ থেকেই আসুন না কেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন ইংরেজি’তে। বাংলাদেশের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি বা অন্য কোন কিছুর সঙ্গেই তারা জীবনঘনিষ্ঠ ছিলেন না। আমি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ইংরেজি ভাষাজ্ঞানকে মোটেই খাটো করতে চাই না। কিন্তু এটি বলতে চাই, ইংরেজিতে ১০ মিনিট বক্তব্য শুনলে তার শতভাগ সঠিকভাবে বোঝা খানিকটা হলেও সবার জন্য কষ্টকর।কোন কোন খেলোয়াড় কোচের বক্তব্য ভালো ইংরেজি জানা সহখেলোয়াড়ের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছেন, এরকম কথা বাজারে ছড়িয়েছে বহুবার। এছাড়া বিদেশের কোচ বাংলাদেশের মফস্বল থেকে উঠে আসা একজন খেলোয়াড়ের মন মানসিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে তাকে যে নির্দেশনা দেয়, তা ওই খেলোয়াড়ের জন্য যথোপযুক্ত নাও হতে পারে।
আমরা টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছি এক দশকেরও বেশী হতে চললো। অথচ জিম্বাবুয়ে এবং দুর্বল ওয়েস্ট্ ইন্ডিজ ছাড়া কাউকে হারাতে পারিনি। কেন পারিনি, তার ভুরি ভুরি কারণ বের করে তার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সফল হওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে যায়নি, এবং যায়নি বলেই আজো বড় দলগুলো আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করে। তবে দলের কোচের যেহেতু দলের জয় পরাজয়ে একটা বড় ভূমিকা থাকে, তাই আমরা পরবর্তী ২ বছর বা ৪ বছরের জন্য কাকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেবো সেক্ষেত্রে সাবধানী পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
শিরোণামে আমি সৌরভ গাঙ্গুলি’র কথা বলেছি। তবে সেটি নিছক আবেগতাড়িত কোন দাবি নয়। কেন আমি তাকে চাইছি তা সংক্ষেপে বলার জন্য আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। গাঙ্গুলি গাঙ্গুলিই। ক্রিকেট প্রসঙ্গে তার কর্ম ও অবদান নতুন করে জানানোর কোন প্রয়োজন নেই। তারপরও বলছি, তিনি এ যাবতকালের মধ্যে মোঃ আজহারউদ্দিনের পর ভারতের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক। ওয়ানডে ক্রিকেটে তিনি বিশ্বের পঞ্চম শীর্ষস্থানীয় রান সংগ্রহকারী এবং শচিন টেন্ডুলকারের পর দ্বিতীয় ভারতীয় ব্যাটসম্যান যিনি ১০ হাজারের বেশী ওডিআই রান করেছেন। Wisden Cricketers' Almanack তাকে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ৬ষ্ঠতম স্থান দিয়েছে। তার আগের পাঁচজন হলেন ভিভ রিচার্ডস, শচিন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, ডিন জোন্স ও মাইকেল বেভান।
গাঙ্গুলি টেস্টে ৪২.১৭ গড়ে মোট ৭২১২ রান এবং ওডিআই’তে ৪১.০২ গড়ে ১১৩৬৩ রান করেছেন। তিনি শুধু ব্যাটসম্যান নন, একজন সফল অলরাউন্ডারও।টেস্টে তিনি ৩২টি এবং ওডিআইতে ১০০টি উইকেট নিয়েছেন।
আমি আগে বিদেশী কোচের ক্ষেত্রে ভাষা ও সংস্কৃতির যে দুর্বলতা তুলে ধরেছি, সৌরভ গাঙ্গুলির ক্ষেত্রে তা ঠিক উল্টো। গাঙ্গুলি পরিবার ভারত বিভাগের সময় পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিমবঙ্গে গেছে বলে শোনা যায়। রক্তের মধ্যে তার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি মিশে রয়েছে। প্রত্যন্ত পাড়াগাঁয়ের একজন সাধারণ মানুষের মন কি বলে তা তিনি কোলকাতায় বড় হলেও নির্ঘাত বলে দিতে পারবেন। ফলে তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মন বুঝে কখন কীভাবে কি দিক নির্দেশনা দিতে হয় তা যতটা বুঝবেন, বিশ্বের সবচেয়ে দামী কোচের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। আর সৌরভ গাঙ্গুলি যদি বাংলাদেশ দলের কোচ থাকেন, তবে তার নিজের দল ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের খেলা হলে, বাংলাদেশ দলকে তিনি সত্যি সত্যি নিজের দল বলে ভাবতে পারবেন, বাঙ্গালি হওয়ার কারণে।
গাঙ্গুলির ক্ষেত্রে আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, তিনি বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের দলের তামিম ইকবাল, ইমরুল কায়েস, শাহরিয়ার নাফিস ও শাকিব আল হাসানের মতো টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরা বাঁহাতি। ফলে গাঙ্গুলি তাদের সবচেয়ে ভালোভাবে গাইড করতে পারবেন। তিনি দাদা হিসেবে সুপরিচিত। দাদা বাংলার দামাল ছেলেদের মন বুঝে প্রয়োজনে বাংলা ভাষায় যে ধমকটি দিতে পারবেন, সেটি সাদা চামড়ার বিদেশী কেউ দিলে আমাদের খেলোয়াড়দের পক্ষে হজম করা ততটা সহজ হতো না।গাঙ্গুলি আমাদের খেলোয়াড়দের ধমকের সুরে পিট চাপড়ে দিলেও সেটা গায়ে লাগবে না বলেই আমার বিশ্বাস।আমরা সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার বোলার অ্যালান ডোনাল্ডকে বোলিং কোচ হিসেবে নিতে চেয়েছিলাম। তিনি ব্যক্তিগতভাবে রাজী হলেও তার স্ত্রী বাংলাদেশে এসে থাকতে রাজী না হওয়ায় তিনি আসতে পারেননি। শেষমেষ এখন তিনি নিউজিল্যান্ডের বোলিং কোচ। ডোনাল্ডের স্ত্রীর বাংলাদেশে আসতে অসম্মতি থাকলেও ডোনা গাঙ্গুলি মনে হয় না সেরকম আপত্তি করবেন, কারণ তার কাছে কোলকাতা আর ঢাকায় কোন পার্থক্য হওয়ার কথা নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যদি গাঙ্গুলিকে কোচ হিসেবে পেতে চাই, তিনি তাতে রাজী হবেন তো? ৫০-৫০ চান্স। তবে তার ক্যারিয়ারের শেষের দিকে ক্রিকেটীয় রাজনীতির শিকার হয়ে তাকে জাতীয় দল থেকে এবং সর্বশেষ আইপিএল থেকে অনেকটা অপমানজনকভাবে বিদায় করা হয়েছে। কিন্তু তিনি দামী মানুষ। কোলকাতায় দামী রেস্টুরেন্টসহ তার অনেকগুলো ব্যাবসা আছে।তিনি জি বাংলায় দাদাগিরি নামক অনুষ্ঠান করে একজন সেরা টেলিভিশন অ্যাঙ্কর হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া বিশ্বকাপ ক্রিকেটে তিনি ধারাভাষ্য দিয়েছেন। ফলে মাঠ থেকে তাকে জোর করে বিদায় করা হলেও অন্য অনেক ক্ষেত্রে তার সাফল্য চলমান। এরপরও একটি টেস্ট খেলুড়ে দলের কোচিং এর দায়িত্ব আমার মনে হয় তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। তার মধ্যে ভারতীয় ক্রিকেট থেকে অপমানজনক বিদায়ের প্রতিশোধ নেয়ার একটা মানসিকতা কাজ করতে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে একটি উঁচু অবস্থায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব যদি সৌরভ গাঙ্গুলি নিতে চান, তবে অন্য কাউকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়া সমীচিন হবে বলে আমার মনে হয় না। গাঙ্গুলি থাকলে আলাদাভাবে বোলিং কোচ না থাকলেও হয়তো হবে। তিনি বল করেন ডান হাতে।আমাদের অধিকাংশ স্পিনার বাঁহাতি হলেও পেসারদের বেশিরভাগ ডানহাতি। গাঙ্গুলিও মিডিয়াম পেস বল করেন।
তাই সবকিছু বিবেচনা করে ‘দাদা’কে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পরবর্তী কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য বিসিবি’র কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০১১ দুপুর ২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


