প্রচার বিমুখ কবি সামসুল আলম খন্দকারের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্য বেশ কয়েকটি। এর মধ্যে'বর্ধিষ্নু এপিটাফ''স্মৃতির সিম্ফনি'এবং'বনসাই' উল্লেখযোগ্য। তবে একটি চমৎকার কাব্যগ্রন্থ বর্ধিষ্নু এপিটাফ। চল্লিশটি কবিতার মাতৃভূমি এ কাব্যগ্রন্থটি। মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশ এ কাব্যগ্রন্থের প্রধান উপজীব্য। কবি তাঁর শব্দের শৈলী ও শিল্প দিয়ে পরিবেশ বিপর্যায়, এর অনিবার্য পরিণতি সর্ম্পকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এ কাব্যগন্থে। পাশাপাশি আছে দ্রোহ, ব্যঙ্গ মিশ্রিত ইঙ্গিতময় শিষ্ট উচ্চরণ। এর কবিতাগুলি শুধু সু-পাঠ্যই নয়, যেন পাঠক ও প্রকৃতির মধ্যে নিবিড় যোগযোগর মাধ্যম। প্রকৃতি-প্রেমীদের জন্য অবশ্য-পাঠ্য কাব্যগ্রন্থ এটি। সবগুলি কবিতা নিয়ে আলোচনা করা সময়সাপেক্ষ বিষয় কিন্তু একটি কবিতা আমি ব্লগের পাঠকদের না জানিয়ে পারছিনা । কবিতাটির নাম বর্ধিষ্নু এপিটাফ।
অদম্য সুন্দর সুশৃংখল শব্দের বুননে এবং রূপক ও ছন্দের ছন্দপতনে বর্ণিত কবিতাটি। কাব্যগ্রন্থের নামও রাখা হয়েছে বর্ধিষ্নু এপিটাফ এর নামানুসারে। ইংরেজী 'এপিটাফ' 'সমাধিস্তম্ভ বা স্মৃতিস্তম্ভের ওপর খোদিত লিপি।' ইংরেজী 'বর্ধিষ্নু' অর্থ যা ক্রমাগত বাড়ছে বা বর্ধমান বা বৃদ্ধিশীল।
'বর্ধিষ্নু এপিটাফ' কে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে কবি এ কবিতার মাধমে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে,কীভাবে ক্রমবর্ধমান নগর সভ্যতা গ্রাস করে নিচ্ছে প্রকৃতি, প্রেম, সৌম্য, সৌভ্রাত্য ও মানুষের হৃদিক সম্পর্ক এবং স্বাভাবিক প্রকৃতির দীর্ঘচল বাড়ন্ত পটভুমিকে। মানুষ ও প্রকৃতি যেন এক এপিটাফ এর মত আকার ধারণ করেছে। এবং তা যেন ক্রমাগত বাড়ছে অর্থাৎ ক্রমবর্ধমান। আমরা আজ যেখানে বাস করছি সেখানে কত কী ছিল ! নদী, জনপদ, বনভূমি আরও কত কী ! কোথায় গেল এতসব কিছু ! আজ তা কেবল স্মৃতি, এপিটাফ। কবির ভাষায়:
"এখানে শায়িত, চির নিদ্রায়-
কত নদী, জনপদ, বনভূমি-ফসলের মাঠ..."
নদী, জনপদ, বনভূমি-ফসলের মাঠ--প্রকৃতির এ তিনটি অপূর্ব নিদর্শনকে অবলম্বন করে সমগ্র প্রকৃতির দু:সহ রূপান্তর-চিত্র উপাস্থাপন করেছেন মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশ-প্রেমী কবি সামসুল আলম খন্দকার। অবাধ প্রবাহ নদীর স্বাভাবিক রূপ। নগরায়ন ও শিল্পায়নের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে গিয়ে মানুষের অত্যাচারে নদী তার যৌবন, উচ্ছলতা, ঢেউয়ের কলতান, পানির রং ও গন্ধের চিরায়ত স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে আজ যেন পরিণত হয়েছে মৃত কংকালে। কবির ভাষায়:
"নদী-
স্রোতস্বতী, যৌবনবতী নদী!
বক্ষে ধ'রে মানুষের অত্যাচার, অবিমৃষ্য-ভার
ভুলেছে বিধূর প্রেম, সাগর সঙ্গম"
প্রকৃত জনপদ হারিয়ে যাচ্ছে । স্থান করে নিচ্ছে শহর নামের 'জনপদ' যেখানে জন বা মানুষের পদচিহ্ন ফেলার জায়গা থাকছেনা, জায়গা করে নিচ্ছে ইট-পাথরে নির্মিত বিশাল ভবন, শপিং মল, মোটরযান প্রভৃতি। এর নির্মম প্রভাব জনজীবনে ও প্রকৃতির ওপর। সামাজিক বন্ধন আজ হুমকীর মুখে। আমরা শহরে একই ভবনে অনেক পরিবার বাস করি। কেউ কাউকে চিনি না । কী দূর্ভাগ্য আমাদের! নিকট প্রতিবেশী আজ আগন্তুক । সামসুল আলম খন্দকার তাইতো যথার্থই বলেছেন তার কবিতায়:
"জনপদ-
সৌম্য, সৌভ্রাত্র, উছল চাঁদের হাট!
প্রেমশুণ্য... এখন অন্ত্যেষ্টির উপকরণ নিয়েই যার কারবার
বিভক্ত শতধারে 'নিকট পড়শী আগন্তুক'
কোথায় বনভূমি, ফসলের মাঠ, অচেনা উদ্ভিদ, ফসলের আদি বীজ ? প্রকৃত বনভূমি আজ পরিণত হয়েছে রূপান্তরিত বনভূমিতে যেখানে বনের হরিণ, বাঘ, সর্পকুল নেই। ফসলের আদিবীজ আজ হাইব্রীড বীজ এ পরিণত হয়েছে। কবি বলেছেন :
"বনভূমি-ফসলের মাঠ-
আহ! আঁখির আশ্রয়...কত অচেনা উদ্ভিদ
কত বিচিত্র ফসলের মাঠ! ওঁর সন্তান
ব্রতচারী কিষাণ, অসংখ্য ফসলের আদি বীজ
রূপান্তরিত, আপাত সুদৃশ্য কিছু নিরেট পাথর
করুনার আকর, এক একটি বর্ধিষ্নু এপিটাফ..."
খুব পরিচিত, সহজ শব্দের গাঁথুনিতে এবং সহজ সরল উপমায় কবির ভাব প্রকাশিত হয়েছে এ কবিতায়। আর যে ভাব প্রকাশিত হয়েছে তা নিছক আকাশ-কসুম কল্পনা নয় বরং তা মানব সভ্যতা সম্পর্কে নির্মম সত্যের উপলব্ধি। রচনা শেলীর দিক থেকেও কবিতাটি আমার কাছে সুন্দর ও সুপাঠ্য মনে হয়েছে। শুধু বর্ধিষ্নু এপিটাফ কবিতাটি নয়, কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই আলাদাভাবে কবিতার শৈলী ও শিল্পের বিচারে সুন্দর ও সুপাঠ্য।
কবি পরিচিতি: সামসুল আলম খন্দকার সাভারে অবস্থিত লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মরত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

