ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ও বিজনেস ফ্যাকাল্টির বেশীরভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিসিএস-এর প্রতি কিছুটা এলার্জী লক্ষনীয়। তাদের এই বিসিএস বিদ্বেষের পিছনেও অবশ্য বেশ কিছু যুক্তি রয়েছে। সেগুলো নিয়ে আপাতত গ্যাজালাম না। আমি বিজনেস ফ্যাকাল্টির ছাত্র হলেও, বিসিএস-এর প্রতি আলাদা একটা টান আমার আছে। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার আমার বড়ই শখ যদিও বিসিএস পাশ করার মত ধৈর্য্য বা মানসিকতা কোনোটাই আমার নাই। বেশিরভাগ বাঙ্গালীর সমস্যা হল জমি ভালো মত চাষ না করেই ভালো ফসলের আশায় “হা” করে বসে থাকা। বলাই বাহুল্য আমি সেই দলে পড়ি!
কালকে রাতে এক বন্ধু ফোন করে বলেছিল, আজকে নাকি মারাত্নক ভীড় হবে। আমি যাতে একদম সকাল বেলা ফর্ম জমাদান কেন্দ্রে চলে যাই। কিন্তু চিরাচরিত আলসেমীর কারনে আমার ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল। আমি গন্তব্যস্থানে পৌছলাম সাড়ে আটটার দিকে। গিয়ে দেখি মস্ত বড় একখান লাইন। আমি লাইনের শেষ মাথা খুঁজে বের করার জন্য হাঁটা শুরু করলাম। ১৫ মিনিট হাঁটার পর লাইনের শেষ খুজে পেলাম। পিএসসি অফিস থেকে শুরু করে সেটা শেষ হয়েছে আইডিবি’র পিছনের গলিটাতে। পরে অবশ্য শুনেছি সেই লাইন নাকি সংসদ ভবন পার হয়ে গেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, “কিভাবে পার করব এতটা সময়...ফর্ম জমা দিতে দিতে তো বিকাল হয়ে যাবে”! আর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার মত বিরক্তিকর কাজ আমার মনে হয় এই দুনিয়াতে আর দ্বিতীয়টা নাই। ছেলেদের পাশের লাইনেই ছিল মেয়েদের লাইন। হঠাৎ লক্ষ করলাম আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক অপরুপা রমনী। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আই কন্টাক্ট করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু সুন্দরী প্রথম প্রথম আমাকে পাত্তাই দিচ্ছিল না। আমিও তো এত সহজে হাল ছাড়ার পাব্লিক নই!
আমার একটা সমস্যা হল, আমি মাঝে মধ্যে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাই। আপনারা হয়ত অনেকেই “ধুম”(হিন্দি) মুভিটা দেখে থাকবেন। ওখানে একটা ক্যারেকটার হল “আলী”। আলী যখন কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখে, হঠাৎ কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যায়। কল্পনা করতে থাকে যে ঐ মেয়েটির সাথে তার বিয়ে হয়েছে। বউ সাজে মেয়েটি তার বাইকের পিছনে বসে আছে আর সাথে আছে এক গাদা বাচ্চা-কাচ্চা। আমি যে কখন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আলীর মত সপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছিলাম...আল্লাই জানে! একটা সময় অনুভব করলাম পিছন থেকে কে যেন আমাকে গুতাচ্ছে। গুতাগুতির এক পর্যায়ে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। লাইনে দাঁড়ানো আমার ঠিক পিছনের ছেলেটি বলছে, “ভাইজান সেই কখন গ্রীন সিগ্নাল পড়ছে, পিছন থিকা হর্নের পর হর্ন দিয়া যাইতাছি, আপনার দেখি হুশই নাই!!” ছেলেটির কথা শুনে আশেপাশে হাসির রোল পড়ে গেল। সেই সুন্দরী তো হাসতে হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এমন অবস্থা! আমি হঠাত সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, লাইন বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেছে। মাঝখানে বিশাল ফাকা।......প্রচন্ড লজ্জা লাগছিল ঘটনাটা ঘটার পর।
আমার ঠিক সামনে দাঁড়ানো এক সিনিয়র ভাই দেখি দেশের দূর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এসব নিয়ে জ্ঞানগর্ভ লেকচার দেয়া শুরু করছে তার সামনে থাকা আরো কয়েকজনের সাথে। তাদের পকর পকর শুনে মাথা ব্যাথা করতে লাগল। তাছাড়া সকালে নাস্তা খেয়ে বের হই নাই! আমি সেই বড় ভাইকে বললাম, “বস আমি একটু নাস্তা খাইয়া আসি। আমি কিন্তু আপনার পিছনেই ছিলাম”। বড় ভাই কিছু একটা বলতে গিয়েও আর বলল না।
একটা টঙ্গের দোকানে বসে চা-রুটি খাচ্ছিলাম। হঠাত দেখি কিছু পাবলিক টিন দিয়ে ঘেঁড়া উচু দেয়াল টপকে ভিতরে ঢুকছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ফর্ম জমা দিতে অনেক সময় লাগবে বলে তারা দুই নাম্বারী করে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। আমি ধারনা ছিল মেয়েরা তেমন দূর্ণীতিপরায়ণ না কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম একটা মেয়েও দেয়াল টপকাচ্ছে। অনেক মেয়ে দেয়াল টপকাতে পারবেনা বলে তাদের পরিচিত ছেলে বন্ধুদের কাছে ফর্ম দিয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষন পর দেখি এক বান্দা টিন একটা খুলেই ফেলছে সহজে ভিতরে ঢোকার জন্য। তাদের এসব কর্মকান্ড দেখে হতাশ হয়ে আমি আবার লাইনে ফেরত আসলাম।
এদিকে বড় ভাই দেখি রাগে ফুসছে। আমাকে বলল, “দেখছেন...বিসিএস-এর ফর্ম জমা দিতে আইসাই দূর্ণীতি শুরু করছে। এগুলা প্রশাসনে ঢোকার পর কি করবে বুঝতেছেন......ব্লা ব্লা ব্লা!! বড় ভাইয়ের ক্যাঁচ ক্যাঁচ শুনতে বিরক্ত লাগছিল। কানের মধ্যে হ্যাডফোন গুজে গান শুনতে লাগলাম। একটু পরেই দেখলাম আমার পিছনে থাকা পোংটা ছেলেটা ৩২ পাটি বের করে এডমিট কার্ডটা হাতে নিয়ে বীরবেশে এগিয়ে আসছে। এসেই আমাকে বলল, “ভাই লাইনে না দাঁড়ায় থেকে দেয়াল টপকান বা সামনে গিয়ে সিস্টেম করেন। হুদাই রোদের মধ্যে দাঁড়ায় আছেন। লাইনে দাঁড়ায় থাকলে আজকে আর ফর্ম জমা দিয়া বাসায় যেতে পারবেন না। আমি তো পাঁচ মিনিটে কাজ শেষ করে আসলাম।...আর এই দেশে হল দূর্নীতির জয়। সৎ লোকের এখানে বেইল নাই”। আমি চুপচাপ তার কথা শুনলাম কিছুই বললাম না। সে যাওয়ার সময় বলল, “ভাই একটু দোয়া কইরেন। দেখেন, ফর্ম জমা দিতে গিয়া হাতটা কাইটা ফেলছি। বিসিএস টা এইবার না হইলে দুঃখ থাকব”। আমি মনে মনে বললাম, “ব্যাটা দূর্ণীতিবাজ তোর যাতে জীবনেও বিসিএস না হয় এই বদদোয়া দিলাম”।
বড় ভাই কিন্তু এতক্ষন সেই ছেলের কথাগুলো বেশ মনযোগ দিয়ে শুনছিলেন। আমাকে হঠাৎ বলে বসলেন, “ভাই চলেন সামনে গিয়া দেখি কোনো সিস্টেম করা যায় কিনা! আর দাড়ায় থাকতে ভাল লাগতেছে না!” আমি অবাক হয়ে বললাম, “ভাই আপনিও দূর্নীতি করবেন??” বড় ভাইয়ের মুখটা কাঁচুমাচু হয়ে গেল। কিছু না বলেই সামনে তাকালেন।
এদিকে আমার সমবয়সী এক কাজিনের সাথে দেখা। সেও সিস্টেম করে ফর্ম জমা দিয়ে বীর দর্পে চলে এসেছে। আমাকে দেখে বলল, “তুমি কি বোকা নাকি? লাইনে দাঁড়ায় আছো কেন? আমার কাছে ফর্ম দাও। ৫ মিনিটে এডমিট নিয়া আসতেছি”। আমি যখন এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালাম সে দেখি রাগ করে বির বির করতে করতে চলে গেল। বোধ হয় আমাকে ভোধাই টোদাই বলে গালমন্দ করছিল। তাতে কি?? সৎ লোকদের এদেশের বেশীরভাগ মানুষ বোকাই ভাবে। ভাবুক!!
সিগারেট তৃষ্ণা পেয়েছিল মারাত্নক। ভাবছিলাম বড় ভাইকে বলে সিগারেট খেতে যাবো। কিন্তু হতবাক হলাম বড় ভাইকে না দেখে। তিনি নাকি সিস্টেম করতে চলে গেছেন! দূর্ণীতি যে কত বড় সংক্রামক ব্যাধি বড় ভাইয়ের কান্ড দেখে হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেলাম।
লাইনে দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই লাইন দেখি আর আগায় না। আমার সামনেই কিছু পাব্লিক জড়ো হয়ে হেভী সমলোচনা শুরু করেছে পুরা সিস্টেমের। কেউ কেউ বলছে ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নিয়ে। কেউ বলছে, কেন অনলাইন করা হচ্ছে না! কেউ দোষারোপ করছে-কিছু কিছু পাব্লিক দুই নাম্বারী করে জমা দিচ্ছে বলেই আমাদের এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অবশ্য কিছুক্ষন পরে দেখি এদের মধ্যেও অনেকেই নাই। কই গেছে কে জানে!
আমার সামনে দাঁড়ানো এক ভাই দেখি একটার পর একটা জোক্স বলে আশেপাশের পাব্লিক মাতিয়ে ফেলছে। আমিও প্রান ভরে হাসলাম তার জোক্সগুলা শুনে। আমার এতক্ষনের প্রচন্ড বিরক্তির অবসান হল এই ভাইয়ের সান্নিধ্যে এসে। উনার নাম আজিম। ফর্ম জমা দেয়ার জন্য উনি নাকি আজকে অফিস থেকে ছূটি নিয়েছেন। উনার সাথে আড্ডা দিতে দিতে কখন যে গেইটের কাছে চলে এসেছি টেরও পাইনি। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। যাক আর অল্প কিছুক্ষন!
এর মধ্যে কোথ থেকে এক পাব্লিক এসে আমার আর আজিম ভাইয়ের মাঝখানে ঢুকে পড়ল। আমি কড়া ভাবে বললাম, “আপ্নি হঠাৎ করে কোথ থেকে উদয় হলেন?” সে করুন স্বরে বলল, “ভাই তিন ঘন্টা পরীক্ষা দিয়া এই মাত্র আসলাম। খুব টায়ার্ড ভাই। আমারে একটু কন্সিডার করেন”। আজিম ভাই বললেন-এসব ধানাই পানাই না করে লাইনের শেষ মাথায় দাড়ান। কিন্তু বেচারা মুখটা আরো করুন করে ফেলল। অনেক অনুরোধ করল আমরা যাতে তাকে একটু দয়া করি। পারলে কেঁদেই দেয় এমন অবস্থা। আমি বললাম, “ভাই আমরা ৭ ঘন্টা ধরে লাইনে দাঁড়ায় আছি। আমার সামনের ভাই আজকে অফিস ছুটি নিয়ে ফর্ম জমা দেয়ার জন্য আসছে। কষ্ট আমাদেরও হচ্ছে। আমরাও অনেক টায়ার্ড। এখনো সময় আছে আপনি লাইনের শেষ মাথায় যান”। লোকটি দেখলাম আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে। হয়ত অন্য কারো সাথে ধান্দা করবে। “ধান্দাবাজে দেশটা পুরা ভইরা গেল”--আজিম ভাইয়ের আক্ষেপ!!
সাড়ে সাত ঘন্টা অপেক্ষার পর পেলাম সেই কাঙ্খিত এডমিট কার্ড। মনে হচ্ছিল বিসিএস ক্যাডারই হয়ে গেছি। জানিনা এডমিট কার্ডটা পাওয়ার পর আমি যতটা স্বস্তি পেয়েছিলাম ততটা স্বস্তি সেই পোংটা ছেলেটা, সেই বড় ভাই বা আমার সেই কাজিন’রা পেয়েছিল কিনা??
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১১:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



