পুনর্মুদ্রন ..।// লেখাটা দয়া কইরা পড়েন
২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৮:০২
সংস্কৃতি সতত, সর্বত্র সমাজ-মানুষের জনক-জন্য
ওয়াহিদুল হক
***************************************
ইংরেজি কালচার শব্দটা বহুমাত্রিক। একটা শব্দের একটাই মানে থাকতে হবে, তার কোন মানে নেই। ভাষার শক্তি সমৃদ্ধি তার বাহুল্যে, শব্দের বহুবিস্মৃত সন্নিহিতিতে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি মেধামননের বিস্ফোরণের কালে তারা কালচার বোঝাতে প্রায়শ কৃষ্টি শব্দটা ব্যবহার করতেন। শব্দটি রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন না সম্ভবত তাতে কালচারের চাইতে কাল্টিভেশনের-কষণার-ভাব বেশি ফোটে বলে। বিধুশেখর শাস্ত্রীই রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আড়াই হাজার বছরের পুরনো ঐতরেয় ব্রাহ্মণের একটি শেস্নাকের প্রতি। ঋগেðদের প্রধান ভাষ্যগ্রন্থ ইতরাপুত্র মহীদাসের রচিত এই ব্রাহ্মণগ্রন্থ, গ্রন্থকারের মায়ের গৌরবার্থে নাম তার ঐতরেয়। সেখানে চৌষট্টিকলার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে প্রথমেই বলা হয় : আতসংস্কৃতির্বাব শিল্পানি। ছন্দোময়ংবা এতৈর্যাজমান আতানং সংস্কুরুতে। রবীন্দ্রনাথ তার পছন্দমতো শব্দটি পেয়ে গেলেন সংস্কৃতি। এই ইতিহাস লিখেছেন পণ্ডিতপ্রবর নীহাররঞ্জন রায়।
এখন কৃষ্টি শব্দ হারিয়ে গিয়ে সংস্কৃতি শব্দই ষোলআনা ক্ষেত্রে কালচার বোঝাতে বাংলায় ব্যবহৃত। মারাঠিতে নাকি এই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে বাংলারও আগে। সেই যাই হোক, ওই শতবর্ষ পুরনো রবীন্দ্রপক্ষপাতধন্য শব্দটির তো শত প্রকার সংজ্ঞা ইংরেজি বাংলা নির্বিশেষে মানব ভাষায় দাঁড়িয়ে গেছে। সেই সমþত সংজ্ঞা মিলে যে একটা বিরাট এলাকা দাঁড়িয়েছে তার চৌহদ্দি টানা সহজ কাজ নয়। এবং তা না করেও এবং অনেকানেক সংজ্ঞার সন্ধান না জেনেও আমরা সংস্কৃতি শব্দ খুব বেশি অপপ্রযুক্ত হতে দেখি না। সকলেই যেন কেমন করে একরকম বুঝে নিই, ব্যবহার করি, সেই শব্দের ব্যাপ্তি বাড়াই। তবে অর্থসঙ্কোচও হয় যখন নৃত্যগীত অভিনয় মূকাভিনয় ম্যাজিক শো ভাঁড়ামি সংবলিত কোন মঞ্চায়োজনকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নাম দিই এবং যে ধরনের অনুষ্ঠান প্রায় রুচি এবং শীলনের পরিচয়াভাবে নিতাìতই অসাংস্কৃতিক ঘটনায় পর্যবসিত হয়। লিট্রেচর শব্দে যেমন ইংরেজিতে কেবলই সাহিত্য বোঝায়নি, যে কোন এক বিষয়ের বিশেষীকৃত ছাপা কাগজপত্র বোঝায়; যেমন মেডিকেল কিংবা ফার্মাসিউটিক্যাল লিট্রেচর, কালচার বলতে ইংরেজিতে নিতাìতই স্পুটাম কালচারও (নিষ্ঠীবন গাঁজানো, নিরীক্ষণোদ্দেশ্যে) বেঝাতে পারে। বাংলাতে ঐ ব্যাপ্তিগুলোকে আমরা নিই না।
হ্যাঁ, রুচি এবং শীলনের যৌগ বলা হয়ে গেল সংস্কৃতিকে। উৎকর্ষের অভিমুখে যাত্রা যার শীলনে শীলনে, তা সংস্কৃতির প্রাণ। যত কলা, যত শিল্প আর্টস ও ক্র্যাফ্টস সকলি তো সংস্কৃতি কর্ম আতাকে মাজাঘষার কর্ম, যেমনটা ঐতরেয়তে বলছেন। কিন্তু এ যেন একটা নির্যাসকে বোঝালো, সমগ্র ফুলটাকে নয়। শব্দটাকে মানব প্রপঞ্চের সবটা-জোড়া ব্যাপ্তি দেয় নৃতত্ত্বের লোকেরা, যাদের কাছ থেকে সমাজবিজ্ঞানীরা সবকিছু ধার করবার সময় এই সংস্কৃতি মূলধনটিকেও ধার করেছেন। ঐ ব্যাপকতর যার চাইতে ব্যাপক খুব কিছু নেই অর্থটির এখন প্রায় সর্বজনীন ব্যবহার, পৃথিবীজুড়ে।
অ্যারিস্টটল মানুষকে পালকহীন দ্বিপদ বলেছিলেন। হয়তো ঠাট্টা করে। কিন্তু খাটে তা বেশ। যেমন নৃতাত্ত্বিক ডেসমন্ড মরিস আধুনিককালে মানুষকে বলেছেন ‘নেকেড অ্যাইপ অ্যাইপ’, তার গায়ে বাঁদর, শিম্পাঞ্জি, গোরিলা, ওরাংওটানের রোমশ আচ্ছাদনীটি নেই বলে। কিন্তু সক্রেটিসের ওই পৌত্র-দার্শনিক তো এও বলেছিলেন যে, অ্যানিম্যালিটি র্যাশনালিটির সংযোগে মানব উৎপন্ন করে। মানবের আধুনিক সংজ্ঞা এটা হতেই পারে যে সে পশুত্ব এবং সংস্কৃতির যৌগ। তার জৈব সত্তা, ক্ষণজীবী তবু যেমন একটা অনি:শেষ জন্মাìতরের মালায় গাঁথা, অন্য সকল জীবনের মতোই, স্বতন্ত্র একটা চেতনা-প্রবাহমধ্যে ভাসমান তা, যা সকল অতীত মানবের চেতনাসৃষ্ট। মানব চেতনা সেই প্রবাহে জন্ম নেয়, তাতে যোগ করে প্রভাবিত করে এবং বিলীন হয়। এই চেতনাপ্রবাহকেই রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন সংস্কৃতি বলে। কিন্তু মানুষ মাত্রে সংস্কৃতির জনক ও জন্য হলেও সব মানুষের এক সংস্কৃতি নয়। সংস্কৃতি যেন জাতীয়তা-স্পেসিফিক। রবীন্দ্রনাথ থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেওয়া যাক :
“কখনো কখনো শোনা গেছে, বনের জন্তু মানুষের শিশুকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে পালন করেছে। কিছুকাল পরে লোকালয়ে যখন তাকে ফিরে পাওয়া তখন দেখা গেছে জন্তুর মতোই তার ব্যবহার। অথচ সিংহের বাচ্চাকে জন্মকাল থেকে মানুষের কাছে রেখে পুষলে সে নরসিংহ হয় না। এর মানে, মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মানবসìতান মানুষই হয় না, অথচ তখন তার জন্তু হতে বাধা নেই। এর কারণ বহু যুগের বহু কোটি লোকের দেহ-মন মিলিয়ে মানুষের সত্তা [সংস্কৃতি পড়তে পারেন পাঠক এখানে]। সেই বৃহৎ সত্তার সঙ্গে যে পরিমাণে সামঞ্জস্য ঘটে, ব্যক্তিগত মানুষ সেই পরিমাণে যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠে।
এই বৃহৎ সত্তার মধ্যে একটা অপেক্ষাকৃত ছোটো বিভাগ আছে, তাকে বলা যেতে পারে জাতিক সত্তা। ধারাবাহিক বহু কোটি লোক পুরুষ পরম্পরায় মিলে এক-একটা সীমানায় বাঁধা পড়ে। এদের চেহারার একটা বিশেষত্ব আছে। এদের মনের গড়নটাও কিছু বিশেষ ধরনের। এই বিশেষত্বের লক্ষণ অনুসারে দলের লোক পরস্পরকে বিশেষ আতীয় বলে অনুভব করে। মানুষ আপনাকে সত্য বলে পায় এই আতীয়তার সূত্রে গাঁথা বহুদূরব্যাপী বৃহৎ ঐক্যজালে। মানুষকে মানুষ করে তুলবার ভার এই জাতিক সত্তার উপরে। সেই জন্যে মানুষের সবচেয়ে বড় আতরক্ষা এই জাতিক সত্তাকে রক্ষা করা। এই তার বৃহৎ দেহ, এই তার বৃহৎ আতা। এই আতিক ঐক্যবোধ যাদের মধ্যে দুর্বল, সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবার শক্তি তাদের ক্ষীণ। বিশিস্নষ্ট মানুষ পদে পদে পরাভূত হয়, কেননা তারা সম্পূর্ণ মানুষ নয়।”
অনুচ্ছেদ দুটি বিচারপতি গোলাম রাব্বানী সদ্যই উদ্ধার করেছেন তার এক কলাম রচনার আরম্ভে রবীন্দ্রনাথের বাংলা ভাষা-পরিচয় বই থেকে। বিশ্বমানব সংস্কৃতি দিয়ে অন্য সকল জীব থেকে স্বতন্ত্র। আবার এই মনুষ্যত্ব সংরক্ষক বিকাশমুখ সংস্কৃতি জাতিক সত্তার সীমা দিয়ে বাঁধা। এক থেকে আরেক ভিন্ন। মানুষ কেন দুর্বল হয়, পরাভূত হয় বারে বারে ফিরে ফিরে, তার রবীন্দ্র-ব্যাখ্যার চাইতে যুক্তিযুক্ত সুন্দর ব্যাখ্যা আমি আর পাইনি। ন্যাশনালিজমের প্রতি বিরূপ রবীন্দ্রনাথ এখানে মানুষের জন্য ন্যাশন তথা জাতিক সত্তার অপরিহার্যতা, মানুষের পূর্ণতা সাধনার মাধ্যমটি যে জাতীয় সংস্কৃতির সীমায় বাঁধা তা অকাট্যরূপে তুলে ধরেছেন। সত্যের এই অসাধারণ উন্মোচনটিতে আমরা আবার ফিরব।
সংস্কৃতি ব্যাখ্যায় এমনও পড়েছিলাম যে মানুষ, তার নিজের কোনই স্বার্থের বশে নয়, বাড়ির গাছের ডালে পাখি খাবে বলে একটা জলের পাত্র বেঁধে তাতে নিয়মিত জল রাখে, এ তার সংস্কৃতির পরিচয় যা অন্য কোন প্রাণীর পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমাদের আপন ঘরের মোতাহার হোসেন চৌধুরীও কত সুন্দর করে সংস্কৃতি-কথা ব্যাখ্যা করেছিলেন। সর্বত্রই মানুষী ধারায়ই আপন মাপকে ছাড়িয়ে যাবার কথা মানুষের।
আবার বিপরীত দিকেও সংস্কৃতির প্রসার দেখি। এদেশে নলকূপের প্রসারপূর্বে পদ্মাপারের বিরল বসতি থেকে মেয়েরা দল বেঁধে নদীতে যেত স্নানাদি সেরে ঘরের জল নিয়ে আসতে, বহুদূর পদ্মায় ষাট সত্তর বছর আগেও দারুণ কুমিরের উৎপাত ছিল। গল্প শুনেছি কোন মেয়ে একা পড়ে গেছিল ভালো করে স্নান করবার আনন্দে। কুমিরে দিয়েছে কামড়, কিন্তু শাড়িটায়। মেয়ে পারে উঠে পড়ে। দেখে সর্বাঙ্গে একটা সুতো নেই। চারদিক তাকিয়ে দেখে, কেউ নেই। ঊর্ধ্বকাশে তাকিয়ে দেখে, কেউ নেই পাখিও না। কিন্তু আছে তো কেউ নিশ্চয়ই। মেয়ে ধীর পায়ে জলে ফিরে চলে। কুমিরের মুখে। আকাশেও কেউ ছিল না হয়তো, ছিল তার মনে। তার নাম রুচিভেদে সংস্কার হতে পারে। আমি বলি সংস্কৃতি।
কালাহারি মরুভূমির বুশম্যান কিংবা সুমেরু সংলগ্ন কানাডায় সাইবেরিয়ায় এসকিমোরা যাযাবর। খাদ্য ফুরালে নড়তে হয়, সরতে হয়। উভয় জাতিতে বার্ধক্যে উপনীত মানুষ দলের কাছে মিনতি করে, তোরা আমাকে দেবতার কাছে দিচ্ছিস না কেন? চলতে না-পারা সে বোঝাকে একদিন ছেড়ে যেতেই হয়, যৎকিঞ্চিৎ খাবার দিয়ে, বিছানায় শুইয়ে। যথাসময়ে দেবতা আসেন। মেরুতুহিনে, মরুবালুকায় দেবতার একইরূপ। নেকড়ে বাঘ। তার জন্যে রাখা প্রসাদ সে হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করে। কে বলে বুড়োর ওটা ত্যাগ, ওটা ধর্ম? ওটা সংস্কৃতি, সবসময় সরতে থাকা মানুষের সংস্কৃতি। দল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে। সেই সংস্কৃতি। ক্যাপটেন ওট্স্ সেই সংস্কৃতি-ঋদ্ধ মানুষ ছিলেন। ক্যাপটেন স্কটের অভিযাত্রী দল দক্ষিণমেরু বিন্দুতে পৌঁছে দেখলেন নরওয়ের পতাকা উড়ছে তুন্দ্রা বাতাসে পতপত করে। পেলেন রেখে পাওয়া পত্র রোয়াল্ড আমুন্ডসেনের, দু:খিত বন্ধু, আমরা ক’দিন আগে পৌঁছে গেলাম। ভগ্নহৃদয় অভিযাত্রীরা সাগরের পথ ধরলেন, সেখানে সত্তর মাইল মাত্র দূরে তাদের জন্য জাহাজ দাঁড়িয়ে। সেই সত্তর মাইল না ফুরাতেই কুকুর সব মরল, সঙ্গীরাও মরে মরে চারজন শুধু রইল বাকি। খাবার রয়েছে বাকি চারদিনের জন্যে, চারজনের।
একটু বাইরে থেকে আসি বলে ওট্স্ তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে গেলেন মেরু রাত্রির বিস্নজার্ডে। তিনজনের সকলে বুঝলেন, কেউ কিছু বললেন না। কিছুই বলবার উপায় ছিল না। ওট্স্ও কিন্তু বুশম্যান এসকিমোদের দেবতার কাছেই গেলেন। সকল ক্ষেত্রে সে দেবতার নাম সংস্কৃতি। অসাধারণ দেবতা নয় মোটে। বাংলাদেশে, সুনীতির দুর্ভিক্ষে পড়া বাংলাদেশেও এ দেবতার দেখা মেলে থেকে থেকে। কিশোরী বোনকে উত্ত্যক্ত করছে মþতানের দল। নবযুবক ভাই সহ্য করতে পারছে না। মৃত্যু অবধারিত জেনেও বাধা দেয়, খুন হয়। জীবধর্ম পরাজিত হয় সংস্কৃতি-দেবতার কাছে। কিতাবি ধর্মের প্রসার হলে সংস্কৃতি দেবতার ভোগগুলি মানুষ কিতাবের দেবতার বলে দাবি করে। কেতাবিরা খুব কমই পারে জৈবধর্মকে লপঘন করে মানুষী ধর্মকে প্রসার করতে। সর্বত্র তাই শাìিতর ধর্ম প্রচারকদের আগ্রাসী ভূমিকা সকল কিতাবি ধর্মে। বৌদ্ধধর্ম প্রচারে মঙ্গোল চিঙ্গিজ একই পন্থা ধরেছিলেন। চীন জয় করে ফরমান জারি করলেন, প্রিয় চীনদেশবাসী, অবিলম্বে তথাগত বুদ্ধের অহিংসা ধর্মের শরণ লও। নতুবা দেহ হইতে মুণ্ডু খসিয়া পড়িবে মঙ্গেলি তরবারি আঘাতে।
বৌদ্ধদের ত্রিপিটক থাকলেও, তারা কিতাবি নয়, তাদের ধর্মমূলে কোন ঐশী প্রত্যাদিষ্ট বাণীর দাবি নেই। মানব বুদ্ধের কথার সংগ্রহ ওই তিন পিটকে। তাই বুঝি তখনকার ঙ্গো দিন দিয়েমের সায়গন ভিয়েতনামে একের পর এক ভিক্ষু, আমেরিকা ও দিন দিয়েমকে প্রত্যাখ্যান জানাবার জন্যে রাজপথে আতাহুতি দেয়, আক্ষরিকভাবেই দেহে আগুন লাগিয়ে। আমি ধন্য, আমি দেখেছি এক ধ্যানমগ্ন ভিক্ষু পদ্মাসনে স্খির বসে, বৈশ্বানর গ্রাস করেছে তার সকল বহি:চর্মাবরণ। তিনি অìতরের দেবতার ডাকে সাড়া দিচ্ছেন, কোন আকাশচারী স্বর্গনরকের মূলা ও মুদ্গরধারী দেবতার নয়।
মানুষের বিকাশ অনুকূল সমস্ত কিছু সংস্কৃতি। মননবচন কমকীর্তি। এক জাতির সকল কালের সকল অìতর্গত ও বহির্গত শুভসাধনা মিলে মিলে জাতীয় সংস্কৃতি, বাঙালি সংস্কৃতি যেমন। মানুষের বিকাশের পথকে ধরে রাখবার জন্যে সেই আতাহুতির ভিক্ষুরা আতঘাতী বোমারু হয়ে যেন ইরাকে পুনর্জন্ম গ্রহণ করেছে। তারা সাড়া দিচ্ছে হুব্বুল ওয়তনের ডাকে। আরব সংস্কৃতির ডাকে। আমরা জানতাম ইরাক হবে আমেরিকার দ্বিতীয় ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম থেকে তারা কতদিনে পালিয়েছিল। ইরাক থেকে তার অনেক আগেই গোটাতে চাইছে।
হারবে আমেরিকা সশস্ত্র যুদ্ধেই, কিন্তু অস্ত্রের কাছে নয়। সংস্কৃতির কাছে। ভিয়েতনামেও তাই ঘটেছিল। পাকিþতান ইসলামের ধ্বনি দিয়ে বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যে বাঙালির অধিকাংশ মুসলমান এবং পাঞ্জাবি জেনারেলদের মতো মতলবি মুসলমান নয়। দুনিয়ার ভয়াবহতম অস্ত্রে সজ্জিত পাক হারমাদরা নিরস্ত্র বাঙালির অস্ত্রের কাছে হেরে ধুলোয় মাথা লুটিয়েছে। বাঙালির অস্ত্র কোথায়, বাহিনী কোথায়, সেনাই-বা কোথায়? সব কৃষক-সìতান ছাত্রযুবা। হেরেছে পাকিþতান বাঙালির সংস্কৃতির কাছে। বাঙালি জিতেছিল ভাষার লড়াইয়ে, রবীন্দ্রনাথের লড়াইয়েও জিতেছিল, এবারে জিতল বাঙালি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে।
মুক্তিযুদ্ধের একটাই কথা বাঙালি বাঙালি হবে বলে এই যুদ্ধ, বলেছেন বন্ধু বিচারপতি গোলাম রাব্বানী। বাঙালি হওয়াটা সম্পূর্ণ একটা সাংস্কৃতিক ঘটনা। রবীন্দ্রনাথের কথা অনুযায়ী : মানুষের সবচেয়ে বড় আতরক্ষা এই জাতিক সত্তাকে রক্ষা করা। এই তার বৃহৎ দেহ, এই তার বৃহৎ আতা। এই আতিক ঐক্যবোধ যাদের মধ্যে দুর্বল, সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবার শক্তি তাদের ক্ষীণ। মোলস্না, সর্বধরনের ধর্মব্যবসায়ী, মতলববাজ ধর্মোন্মাদরা সকলে দুর্বল অসম্পূর্ণ মানুষ। তারা গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন বিশিস্নষ্ট হয়ে আছে পরাভবের পথে। হারবে তারা, আমেরিকানদের মতোই, সংস্কৃতি পক্ষের গণমানুষের কাছে হারবে। সরকার তাদের যত সুরক্ষা দিক।
এদেশে ধর্ম দিয়ে সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার গণশত্রুতা চলছে বহুদিন প্রায় শতাব্দীকাল ধরে। তার বিষফসল ছিল পাকিþতান। বাঙালি মুসলমান হঠাৎ বাঙালিত্ব ফেলে একটা নিরালম্ব বিশ্বাসবাণ্ডিল হতে চাইল, শুধুই মুসলমান আর কিছু নয় আপন সংস্কৃতিবিহীন, ভাষাহীন, ইতিহাসহীন, রবীন্দ্রনাথের ওই জাতিক সত্তা হারানো কবন্ধ বিশেষ। কারা যেন তাদেরকে একটা কনফিডেন্স ট্রিক খেলল, বেচেই দিল আইফেল টাওয়ারখানা। চাষী তাঁতী বাঙালি মুসলমানকে বোঝানো সম্ভব হয়েছিল যে, ধর্ম সাম্প্রদায়িকতাই তার সংস্কৃতি, বাঙালিত্ব মানে হিন্দুয়ানি। একবার মুসলিম লীগের বাক্সে ভোট দিয়ে পাকিþতান বানিয়ে ফেললে সে রাতারাতি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত হয়ে যাবে সব শিক্ষিত, সুবিধায় অবস্খানকারী হিন্দুকে ধাক্কা দিয়ে পিছনে ফেলে।
তেইশটা বছর এই ভুল, এই রীতিমতো আতহত্যার পথে চলার মাশুল সে দিল, গড়ে দিল হাজার মাইল দূরে বিভূঁয়ে করাচি, রাওয়ালপিন্ডি, ইসলামাবাদ পরপর তিন রাজধানী। শোষণে ছিবড়ে হয়ে যাওয়ার বিনিময়ে সে পেয়েছিল নিজভূমে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, পরবাসীরও অধম অমর্যাদা। তেইশ বছর ধরে যে উদ্ভট কিóভূত নাৎসিবাদী মাস্টার রেইসের অতি নিকট সম্পর্কের দ্বি-জাতিতত্ত্বের তলায় চাপা পড়ে রইল, থ্রি-কোয়ার্টার মুসলমান জিন্নাহ কিন্তু পাকিþতান চালু হবার প্রথম দিনেই তার মুণ্ডুপাত করেছিলেন নিজে। আজ থেকে কেউ এদেশে মুসলমান হিন্দু নেই, বাঙালি পাঞ্জাবি নেই আছে শুধু পাকিþতানি, বলেছিলেন তিনি। একটু বেশি বলেছিলেন তিনি। থাকল সবাই পাঞ্জাবি, পাঠান, সিন্ধি, বালোচি, মুহাজির সব মুসলমান ভাই। পাকিþতান শব্দটার মধ্যে যেমন বাংলা বাঙালি ছিল না, তেমনি বাþতবের পাকিþতানেও বাংলা বাঙালি ছিল না, হিন্দু খৃস্টান বৌদ্ধ ছিল না। পাকিþতান পতাকায় বাঁশ ঢোকাবার জায়গাটাকে সাদা রেখে বলল এটা হিন্দুর জন্যে। বাঙালি মুসলমানদের কাঁধে পড়লো শুধুই মুসলমান হবার দায়িত্ব। এবং আরম্ভের দিন থেকে তারা আমাদের বাঙালিত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে মুসলমান বানাবার পুণ্যকর্মে নিযুক্ত হল।
তেইশ বছর ধরে বাঙালি এই ভুলকে জানলো এবং জাগলো শেষে খাঁটি বাঙালি, মুসলিম কৃষক সìতানের নেতৃত্বে। তেইশটা বছর ধরে বাঙালি লড়ল তাকে দ্বিতীয়বার মুসলমান বানাবার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে, তাকে সংস্কৃতিবিহীন পাকিþতানি বানাবার বিরুদ্ধে। সেই তেইশ বছর সংস্কৃতি বনাম ধর্ম, জাতীয়তা বনাম ধর্ম তর্কগুলি, মনে করা হয়েছিল নি:শেষে শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই তর্ক, ধর্ম পক্ষের পাকিþতানি তর্ক আবার আরম্ভ করেছে তারা, যারা রক্তপিচ্ছিল পথে ফিরে আসছে সেই পাকিþতানবাদী বাঙালিকে বিকানোর দল। সে পুরনো তর্ক সার্বভৌম বাংলাদেশে নিতাìত অবাìতর। বাঙালি প্রাগৈতিহাসের কালে নিশ্চয়ই প্রকৃতিপূজক ছিল। বৃহত্তর বঙ্গে জন্মালেন মহাবীর এবং গৌতম বুদ্ধ। বাঙালি তাঁদের শিক্ষায় হল জৈন হল বৌদ্ধ। ধর্মাìতরে তার বাঙালিত্ব ঘুচবে কেন, তা যে তার শরীর থেকে পৃথক হবার নয়, শত বৎসর বিদেশবাসের পরেও, এমনকি ভাষা ভুলে যাবার পরেও। সর্বশেষে তার বড় এক অংশ নিয়েছে বিজেতা তুর্কি পাঠান মোগল যুদ্ধব্যবসায়ীর ধর্ম। কিন্তু বাঙালিরা সকলে তা নিল না, নেয়নি। তাতে বাঙালিত্বের ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু ঘটবার ছিল না, বাঙালিত্বে বিভাজন ঢুকবার কোন কথা ছিল না। বাঙালি মুসলমান, বাঙালি হিন্দু এরপর কী হবে তারা কি জানে। উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালির মধ্যে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কমবার কারণেই বাংলাদেশে সম্ভব হয়েছে রণক্ষেত্রে সকল ধর্মের বাঙালির রক্ত মিশেছে।
ধর্ম একটা সাংস্কৃতিক ঘটনা বটে, বিশেষত আদিতে। কিন্তু ধর্ম সংস্কৃতিকে ধারণ করে না বহিরাগত হলে। ইসলাম আরবের ধর্ম। আরবের পাঁচ হাজার বছরের সংস্কৃতি সাধনার উজ্জ্বল ফসল তা। ইসলাম নামে যা কিছু মতবিশ্বাস আছে, তা গ্রহণ করতে হলে, তার অনুযায়ে জীবন গড়বার চেষ্টা করতে চাইলে আরবীয় সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে, নিজেরটি বিসর্জন দিয়ে তা কোথাও ঘটেনি এই নবীন ধর্মের মাত্রই দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে। সমগ্র উত্তর আফিন্সকা আরবের ধর্ম শুধু নয়, ভাষা পর্যìত নিয়েছে, তবু মিছরি তো মিছরি, মূর তো মূর। অìতরঙ্গ জীবনে তারা তাদের প্রাচীন সংস্কৃতির খুব কমই ছেড়েছে, হারিয়েছে। সংস্কৃতি তো অìতরঙ্গ জীবনসাধনারই ব্যাপার এ দিয়ে রাষ্ট্রগঠন হয় না, হিটলার করলেও এ দিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ হয় না। সংস্কৃতি জন্ম দেয় সমাজের, সুনীতির।
ইসলামে সঙ্গীত সত্যিই নিষিদ্ধ, খাজা মুইনউদ্দীন চিশতীর সাধনপথের ভিন্নতা বলা যাবে ভারত-সংস্কৃতির আশেস্নষে ইসলামের ওই উদারতার রূপ। কিন্তু ‘ওয়াহাবি’ সউদি আরবে মসনদে বসবার আগে নতুন আমিরকে সকল সমাজ প্রধানের সঙ্গে একসঙ্গে তরবারিনৃত্য করতেই হবে, দফ বাজনার তালে তালে। খোদ ইসলামী রিচুঅলের অধিকাংশ পৌত্তলিক আরবদেরই অনুষ্ঠান, বয়ে চলে এসেছে সংস্কৃতির স্বাভাবিক স্রোতধারায়, আলস্নার রসুল তাতে বাধা দেননি। হাদিস, যতই সহিহ্ হোক, ভর্তি এইসব সাংস্কৃতিক বহমানতাকে বইতে দেওয়া নিয়ে। কমপিস্নট কোড অব লাইফের বাজে কথাটির লাইফটি আরবের, ফিউডাল যাযাবর তেজারতি ইকনমি-নির্ভর-রাষ্ট্রব্যবস্খাপূর্ব আরব ট্রাইবাল আরবের। তাদের তাআ’মুম করবার, এþেতঞ্জা করবার নিয়মকানুনাদি জলপূর্ণ বঙ্গভূমে ধর্ম বলে শিরোধার্য করানোটা ধর্মের গৌরব বাড়ায় না। কুলুপ নেবার আগে চলিস্নশ কদম হাঁটবে, জেনার প্রমাণস্বরূপ লাগবে চার পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ইসলামের মাহাত্য, গৌরব এসব নিয়ে, শরিয়া আইন নিয়ে নয়। এক দেশের সংস্কৃতি আরেক দেশে চলে না, চলবে না। মিশ্রণ হবে বড়জোর।
বাঙালির বিশিষ্ট এবং প্রাচীন সংস্কৃতিকে দাবিয়ে অন্যকিছু চাপালে জাতিসত্তার ক্ষয় হবে। সেটা জাতি নেবে না, নিতে পারবে না। মোলস্নারা কেবল মসজিদে মাদ্রাসায় থাকতে চাইছেন না, মন্ত্রী মিনিস্টার হবার, সরকার গঠন করবার স্বপ্ন দেখে রাজনৈতিক ফেরেববাজি করছেন। ঈশ্বরের পথ, সেরাতল মুþতাকিম তারা ভুলেছেন। হাশীশিন নামে খুনি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক-মুখতারের পথ ধরেছেন তারা। খুন অìতর্ঘাতের পথ ইসলামের নবীর পথ নয়, জিহাদ যদি করতে করুন আপনাদের নিজেদের অজ্ঞতা-মূর্খতা অমানুষিকতার বিরুদ্ধে করুন। নিতাìতই নির্বোধ বলে মৌলভিরা ভাবতে পারছে ঘড়ির কাঁটা পেছনেও ঘোরানো যায়। কোয়ান্টামের জগৎছাড়া সর্বত্র একমুখী, অনাগতের অনিশ্চয়তার অভিমুখে ছোটে তার তীর।
মানবকৃতির শ্রেষ্ঠ এবং মহত্তম ফসল সংস্কৃতি। বলতে গেলে এর বাইরে মানবের বিশেষ কিছুই নেই। এবং মাথাগুনতি অনুযায়ী প্রবর্তিত প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যপ্রাচ্যমূল ধর্মগুলি বিশ্বের অধিকাংশ মানুষকে আপন সাংস্কৃতিক অঞ্চলতলে রেখেছে এ কালে। নিরীশ্বর বৌদ্ধ এবং বহুত্ববাদী হিন্দু ভারতবর্ষ-মূলীয় এবং তাদের প্রভাবও কম কিছু নয়, ঐ মাথাগুনতি অনুযায়ী। এ সকলই মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতি সাধনার অংশ, বড় অংশ। সমস্যাটা হচ্ছে ধর্মের এই ক্রসকালচারাল হওয়াটা। প্রধানত সাম্রাজ্য ও আধিপত্য বিþতারের সূত্রে মধ্যপ্রাচ্যীয় ধর্মগুলির বিশ্বভ্রমণ। অমধ্যপ্রাচ্যীয় সংস্কৃতিসমূহের সঙ্গে ক্যাথলিক প্রোটেস্টান্ট উভয় ধরনে খৃস্টানরা এক ধরনের রফা করে চলছে, অনেককাল। কবে, তাদের মতো করে, বাঙালিও বাংলায় কোরান পড়বে, জানবে, মানবে। মুদ্রিত একখানি গ্রন্থকে পূজা করা, তাতে বিধৃত ভাষাউচ্চারণের ভিতর ঈশ্বরের অংশ কল্পনা করা শির্কের বাড়া এই ধর্মবুদ্ধি কবে আসবে মোল্লাদের!
কানা বাবা বলেছেন:
পোর্তেই আইচিলাম, মাগার পোল্লামনা।
ছক্কাপাঞ্জা কতা হুইন্যা আবার মাইন্ডুস খায়োনা ছক্কামিয়া। আসলে গত দুই দিন ধইরাই হেইরমের দাঁতের ব্যতা আচিলো, আইজ ইট্টুস কোমচে... ইটা পোর্তে গ্যালে আবার নি ব্যতায় কাতরানি লাগে, তাই...
সাবধানের মাইর নাই, বুজলা নিহি?
ছক্কা হাজী বলেছেন:
পুতুল আর কানা বাবা , ভাল্লাগলো ।ঐ মনিষীর কথাগুলান কুব দরকারি সমাজের লাইগা।
দুইজন পড়লেও আমি কুশি।
নাস্তিকের ধর্মকথা বলেছেন:
চমতকার লেখাটির জন্য ছক্কা হাজীকে এবং এই লেখাটির সন্ধান দেয়ার জন্য পুতুলকে অনেক ধন্যবাদ।
অবশ্যই +
এবং প্রিয়তে,....
সন্ধ্যাপ্রদীপ বলেছেন:
ভাল লাগল হাজী সা'ব । ধন্যবাদ ।
ছক্কা হাজী বলেছেন:
হকলরে ধন্যবাদ দিলাম



















ঘুম আসছিল না। ভাবছিলাম একটা পোষ্ট দিয়ে এই ব্লগ মোল্লাদের কাছে ছেড়ে দেব। আপনার লেখায় নেহায়েত শ্রদ্ধেয় ওয়াহেদুল হক স্যারের নামটা দেখে ক্লিক করলাম।
পড়তে পড়তে উদৃত অংশ পর্যন্ত পড়লাম। পড়ে ভাবলাম:
তাইতো! মোল্লাদের এই ধর্মবুদ্ধি আসলে তো মোল্লারা আর মোল্লা থাকত না, মানুষ হয়ে যেত।
ফন্টের যাতাকলে কিছু শব্দ আন্দাজ করে নিতে হয়েছে। খুব ভাল লাগল আপনার প্রয়াসটি। আন্তত ওয়াহেদুল হক স্যার তাই বলতেন। আমি বলব আমার নিশি জাগরব বৃথা যায়নি।