বাংলা চর্চায় বর্তমান আজিজ বাজার
শহীদুল্লাহ্ সিরাজী
**************************************************
১
জানতে যত না চায়, জানাতে তার অধিক পছন্দ করেÑ এর সংখ্যা অনেকেই। আর বাংলা সাহিত্যে তার সংখ্যা একেবারেই কম নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে সাহিত্য চর্চা করে নিজের নামটা কাগজে ছাপ মেরে প্রকাশ্যে লোক দেখানো ভূমিকাও সামান্য নয়।
সারা বছর যা কিছু করুক ফেব্রুয়ারির বইমেলাকে লক্ষ্য করে ডিসেম্বর থেকে পদচারণা শুরু হয়। শাহবাগ কিংবা আজিজ মার্কেট হচ্ছে কবিতার রাজধানী। বইমেলাকে লক্ষ্য করে নিজেকে জানান দেয়ার সূচনা শুরু হয় নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে। আর আসতে শুরু করে এ সব অকবি-অসাহিত্যিকরা শাহবাগ কেন্দ্র করে।
যেখানে সারা বছর যাদের পদচারণায় মুখরিত থাকে সেই শাহবাগে আসে অসংখ্য ধনবান-ঘুষখোর-জোচ্চর ও আমলারা। পেছনের কুকর্মকে ঢেকে নিজেকে সতেজ লোক দেখানোর জন্য ভিড় জমায়। অনাহূত অর্থ ব্যয় করে জাহেরি করে নিজের নাম। কলুষিত করতে থাকে সাহিত্য ভুবন আর একদল ধামা ধরারও তাদের বাহবা দেয়ার জন্য বহুবিধ হাততালি দেয়।
আজিজ মার্কেটে প্রকাশক কেন্দ্রিক আড্ডাটা সারা বছর যাই থাকুক, ফেব্রুয়ারির বই মেলার প্রারম্ভে যে আয়োজন শুরু হয় তাতে জায়গা করে নেয়ার জন্য আসতে শুরু করে এমন অসংখ্য নাম জাহেরি আমলা ও অসাহিত্যিকরা।
বলাবাহুল্য, অভাবগ্রস্ত ভুঁইফোড় প্রকাশক ও অনাহারি সাহিত্যিকরা সহজেই ব্যবহার হয় সে সব সুবিধাবাদী সাহিত্যিকের, যাদের সব অপকর্ম ঢাকার প্রচেষ্টায় গাঁটের কড়ি ঢালতে থাকে এবং জোগান অর্থ দিয়ে ছাপ মারেন মনোহারি একখানা গ্রন্থ। অবশ্যই তারা ভোলেন না নামকরা প্রচ্ছদ শিল্পীর কথা। দৈনিক কাগজে বাহারি বিজ্ঞাপন দিতেও তারা বিন্দুমাত্র অনীহা করেন না।
আর অসাহিত্যিকের সংখ্যা যখন বাড়তে থাকেÑ তখন অনেকে সুসাহিত্যিকও তাদের প্রকৃত সাহিত্য সৃষ্টিতে বাধাপ্রাপ্ত হন। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। কথা হচ্ছে এ সব আমলা ও সুবিধাবাদী অসাহিত্যিকদের মদদদাতার যেমন অভাব নেই, তেমনি কম্পিউটার সেন্টার ও রাতারাতি প্রকাশক হয়ে উঠতে সমস্যা হয় না। আইএসবিএন নম্বর সর্বস্ব প্রকাশকের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। প্রকাশক হয়ে ওঠেন খুব দ্রুত। রাতারাতি নিজের নাম জাহেরিতে বাংলা সাহিত্যের প্রধান ভূমিকায় তাদের অবস্থান (মুরা ও গলাবাজি) প্রচার করতে থাকেন।
কম্পিউটার সেন্টার, স্ক্রিন প্রিন্ট ধান্দাবাজ ও ভবঘুরে প্রকাশকদের তোড়ে সৃজনশীল সাহিত্যিক ও প্রকাশকরা যেন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। অথচ এই শাহবাগ তথা আজিজ বই বাজার ছিল সৃজনশীল প্রকাশক ও লেখকদের পূর্ণভূম। যদিও প্রকাশনা ক্ষেত্রে শত বছরের পরিচিত বাংলাবাজার। বাংলাবাজারের প্রকাশনার ক্ষেত্রে কোনো যাচাই-বাছাই নেই। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ থেকে শুরু করে সবচেয়ে ঘৃণ্য গ্রন্থটিও প্রকাশিত হয়। কিন্তু আজিজ বই বাজার বলে পরিচিত আজিজ মার্কেটের বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণই আলাদা। সে তারুণ্যে উদ্ভাসিত একেকটি হীরের খ-ও ওই শাহবাগ আড্ডা কেন্দ্র থেকে উন্মোচিত হয়েছে। বেড়ালের ঘণ্টা বাঁধা কিংবা কানে পানি দেয়ার মতো অথৈ যাচাইয়ের মধ্যে আটকে পড়েছে আমাদের সুন্দর দিন, আমাদের সুফলা বীজ।
এ সব অপচেষ্টাকে প্রচ- প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াতে হবে। আর ছ–ড়ে ফেলে দিতে হবে সে সব বর্জ্য। কম করে হলেও জাগিয়ে তুলতে হবে প্রকৃত সাহিত্যকে, যা মঙ্গলকর যা সুন্দর ও সুস্থ।
২
‘উদার আকাশ যার ঘর আর কবিতা যেখানে সকল দরজা’Ñ সেই লিটল ম্যাগাজিন নিয়েও রকমারি ফাঁদ পেতে ব্যবসার পথ সুগম করছেন কতিপয় ধান্দাবাজ।
সম্প্রতি শেষ হলো কথিত লিটল ম্যাগাজিন মেলা। লিটল ম্যাগাজিন বলতে যদি ছোট আকারের কাগজ বোঝায় তাহলে তাদের মূর্খতা নিয়ে কোনো কথা নেই। মনোরম ব্যানার পোস্টার ও দাওয়াতপত্র দিয়ে জাহির করা আন্তর্জাতিক লিটল ম্যাগাজিন মেলায় কি পেলাম? দলীয়করণ। গুটিকয়েক তথাকথিত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক মিলে একটি এনজিও’র টাকায় প্রবর্তন করা হলো মেলা এবং মঞ্চে মন খুশি বক্তৃতা। পাঠক বা দর্শক কি পেল?
যোগফল শূন্য! যা কেউ খায় না তেমন কিছু ভারিক্কি বক্তৃতার মধ্যে তিন দিনব্যাপী আজিজ মার্কেটে গাড়ি স্পেসে খাপছাড়া খাপছাড়া এক মেলার আয়োজন করল কি না তারাই। এই আয়োজকদের অন্যতম দুজনের একজন নিজেকে আশি দশকের কবি বলে পরিচয় দেন এবং একটি পত্রিকা করেন (অধুনালুপ্ত প্রায় তার কাগজ), অন্য সরকারি কাজ সারেন এবং নিজের খ্যাতি তৈরি করার জন্য একটি কাগজ করেন যার পুরোটাই ধান্দাকেন্দ্রিক।
একজন আশি দশকের অন্যজন নব্বই দশকের। কী মনোহারি ব্যবসা! আশি দশকের কবি সাব নির্মলেন্দু গুণের সমসাময়িক। নিজেকে তরুণ সাজিয়ে ঢোল পেটাতেও তিনি কি তেমন? তিনি কলেজে পড়ান ও পত্রিকা বানান। একদা শিল্প-সাহিত্যের বৈরী সময় ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে যা কিছু অর্জন করেছিলেন এখনো তার সুফল বিভিন্ন সভা-সমিতিতে গলাবাজি করেন। এবং বছর অন্তে একটি ঢাউস সাহিত্য পত্রিকা (যাতে সব ধামাধরা ও অসাহিত্য নিয়ে ব্যবসা) সহজভাবে ব্যবসা পত্রিকা করেন।
বয়স হলে মানুষের জ্ঞানচক্ষু দৃঢ় হয়! বয়স হয়েছে, চুলে পাক ধরেছে দীর্ঘদিন, লম্বা চওড়া মাশাল্লাহ্ কম নয় অথচ শুরুতে (আশি দশকের কবি) ভীমরতি তার গেল। কি পড়ান তিনিÑ কখনোই কি সুশিক্ষা দেবেন না? অনুজদেরই বা কি শেখাচ্ছেন? তার চরম দর্শন হলো তথাকথিত লিটিল ম্যাগাজিন মেলার সভাপতি সাজা।
অন্যজন যিনি এই আয়োজনে? তিনি সরকারি কর্ম ফাঁকি দিয়ে যা যা করেন তার ঢোল দেবার জন্য যেন কাকের চরিত্র দেখালেন। সম্পাদনায় তার নাম থাকলেও বরাবরই তিনি গোপনে ও প্রকাশ্যে অন্যদের দিয়ে কাজ সারেন। শোনা যায় সম্পাদকীয়টি লেখেন, নামধারী দৈনিক কাগজের সাহিত্য সম্পাদক ও সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। কি করেন এ সকল কর্ম প্রচেষ্টায় কথিত নব্বই দশকের কবি? তার ব্যাখ্যার আগে, তার পত্রিকার দু’চারটি কথা বলা বাঞ্ছনীয়। প্রথমত, কাগজটি ভারতীয় পত্রিকার নামে নাম। (অনেকে বলে বাংলাদেশি সংস্করণ) এবং নিজের দেশের অনেক যশধর বরেণ্য কবিদের উপেক্ষা করে ভারতীয় কবিকে নিয়ে লাফালাফি মাতামাতিতে ব্যস্ত থাকেন? এ কথা অনেকের, বাংলাদেশে কি অভাব? আমাদের অনেক অচেনা সাহিত্যিককে সমুন্নত করতে পারতেন এই সরকারি কাজ ফাঁকি দেয়া লোকটি। এ দেশেই এমন ব্যক্তিত্ব এখনো অজানা রয়েছে, যাদের তিনি সামনে আনতে পারতেন। তাতে সরকারি কাজ ফাঁকি দেয়ার দুর্নাম অন্তত ঘুচতো। আর তা প্রমাণও আছে আরজ আলী মাতুব্বর, প্রাণেশ ম-ল ও কানাই শীলÑ তাদের কর্মকা- লুপ্ত ছিল। আজ সবার কাছে না হলেও অনেকের কাছে এসব পরিচিত নাম। এক আরজ আলী মাতুব্বর সারা বাংলাদেশ কাঁপিয়ে দিয়েছেন, তার জ্ঞানগর্ভ চেতনা দিয়ে।
অথচ কিনা কথিত কবি ও সম্পাদক সাহেব কাজ করেন ভিনদেশি নিয়ে। জোর করে পরিচিত করানোর জন্য ঢাউস পত্রিকা করে নিজেকে জাহেরে-বাতেনে ঢোল দিতে থাকেন। অমুক-তমুক করেছিÑ বোতামুখ থোতা করেছি।
সব দৈনিক কাগজের সাহিত্য সম্পাদকদের লেখা (যারা সাহিত্য সম্পাদক হওয়ার সুবিধায় লেখক হন) ও ভিন্ন দেশি ব্যক্তিত্বদের লেখা জীবন কাহন ছাপার পরও জায়গা মতো তিনি বসতে পারলেন না। যেন তখনই কথিত ব্যক্তির ইচ্ছা হলো কেন তাকে মিডিয়াতে দেখানো হচ্ছে। কেন বাহবায় ভেঙে পড়ছে না বাংলা সাহিত্য? আর কি হাস্যকরের মতোই আয়োজন করে বসলেন ঠিক বিদেশি পয়সার বলহারীতে এই মেলা। তাকে মিডিয়ায় দেখালো, মনোবাঞ্ছা পূরণ হলো। একটি ব্যক্তি ইচ্ছায় কি সহজে লিটল ম্যাগাজিন খুন হলো!
অথচ জানেনই না লিটল ম্যাগ অথবা লিটল ম্যাগাজিনের বস্তুত আদর্শ। ছোট আকারের কাগজ মানেই লিটল ম্যাগাজিন নয়। বোঝানো বা পরামর্শ দেয়ার ইচ্ছা নেই। যে অনুষ্ঠানের আয়োজকদের মধ্যে রয়েছে অসীম দূরত্ব তারাই কি না দাবি করেন সাহিত্যের আত্মীয়তা। যাচাই কি পাঠকের মধ্যে নেই! আছে ব্যাপকভাবে আর নিজস্ব ক্ষুদ্র গ-ির মধ্যে ‘আমরাই প্রথম’ বলে যে বিশাল আকাশের মতো বিষয়টি সমাধি রচনা করেছেন। তাদেরকে অবশ্য, প্রকৃত লিটল ম্যাগ প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও ভুলেও মূল ‘লিটল ম্যাগ’দের ডাকেননি। পাছে থলের বিড়াল বেড়িয়ে যায়!
---------দৈনিক ডেসটিনি , ৩০ জানু্যারি ২০০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


