শহীদ রুমী ও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
জাহানারা ইমাম ও শরীফ ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী। জন্ম ১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ। একাত্তরের ২৫ মার্চের চারদিন পর পূর্ণ হয়েছিল ২০ বছর। বাংলাদেশের তরুণরা সে সময়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, যুদ্ধ করেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অনন্য কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন রুমী। স্থান হয়েছিল মেধা তালিকায়। বুয়েটে পড়া রুমী ২৫ মার্চের পর থেকেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তার সমবয়সী আরও অনেকেও তখন হানাদারদের সশস্ত্রভাবে মোকাবেলায় ঘর ছাড়ার জন্য ব্যাকুল। মাকে জানালেন নিজের সংকল্প এবং সম্মতি মিলল ১৯ এপ্রিল। যুদ্ধ করতে সামরিক প্রশিক্ষণ চাই এবং এ জন্য যেতে হবে ভারতে। প্রথমবার হানাদার বাহিনীর কড়া নজরদারিতে গন্তব্যে পেঁৗছতে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বার সফলতা, পেঁৗছে গেলেন ত্রিপুরার মেলাঘরে। সেখানে ছিলেন খালেদ মোশাররফ ও এটিএম হায়দার নামের দুই অসাধারণ কমান্ডার, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে যারা মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। ট্রেনিং শেষ করে রুমী যুক্ত হলেন ক্রাক প্লাটুনের সঙ্গে, যাদের ওপর অর্পিত হয়েছিল বাংলাদেশের রাজধানী, কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি ঢাকায় গেরিলা অভিযান পরিচালনা করা। বাবা-মা যে শহরে বসবাস করেন, যেখানে প্রতিদিন পাখির মতো মানুষ মারা হচ্ছে, সেখানেই চলে এলেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা রুমী। সঙ্গে আরও অনেকে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নয়, তার জীবন কাটছে রোমাঞ্চকর সব গেরিলা অভিযানে। তাদের থাকার নিশ্চয়তা নেই, আহার কখনও মিলছে, কখনও-বা অভুক্ত বা অর্ধভুক্ত। থাকতে হয় লুকিয়ে, নিকটজনকেও দেওয়া চলে না পরিচয়। অস্ত্র লুকিয়ে রাখার কাজ তো আরও কঠিন। জনগণ মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা প্রদানে উৎসাহী, কিন্তু তার মধ্যেও চলছে হানাদার বাহিনীর দালালদের তৎপরতা।
২৯ আগস্ট রুমী এলেন বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এবং সে রাতেই ধরা পড়েন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে। বাবাকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তারা। সেনাবাহিনীর হেফাজতে তাদের দু'জনের ওপরই চলে নিষ্ঠুর নির্যাতন। ওই সময়ই আরও ধরা পড়েছিলেন একুশের প্রভাতফেরির অমর গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...'-এর সুরকার, গণসঙ্গীত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, ক্রিকেটার জুয়েল এবং আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। রুমীর বাবাকে এক পর্যায়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু রুমীসহ যেসব মুক্তিযোদ্ধা আটক হয়েছিলেন তাদের কোনো খবর আর মেলেনি। কেবল এটুকুই ধারণা করা যায়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছিল।
রুমীর বাবা শরীফ ইমাম ছিলেন প্রকৌশলী। পুত্রশোক এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কারণে তার জীবনপ্রদীপ অচিরেই নিভে যায়। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের তিন দিন আগে ১৩ ডিসেম্বর সে সময়ের পিজি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সে সময়ে ঢাকায় ছিল কার্ফু। ব্ল্যাক আউটের কারণে সবকিছু ছিল অন্ধকার, যা গ্রাস করেছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামকেও। পুত্র ও স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। কিন্তু তিনি অন্ধকার জয় করেন, উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত করেন আমাদের সবাইকে। 'একাত্তরের দিনগুলি' গ্রন্থ রচনায় নিয়োজিত হন, যাতে ফুটিয়ে তোলা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসের কথা। প্রাণাধিক পুত্রের মাত্র ২০ বছর বয়সের জীবনের কথা যেমন রয়েছে এতে, তেমনি রয়েছে তার সহযোদ্ধাদের কথা। বহুল পঠিত এ বইটি দেশের লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধার কাছে তাকে অভিষিক্ত করেছে শহীদ জননীর মর্যাদায়। এরপর আমরা তার জীবনের অবিস্মরণীয় আরেক অধ্যায়ের মুখোমুখি হই। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলায় নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করেন। যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন এবং ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেখানে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছিল সেখানেই ১৯৯২ সালের ২৫ মার্চ আয়োজন করা হয় একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় প্রধান সহচর গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার। লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ঘোষণা করা হয়, একাত্তরে গোলাম আযমের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডতুল্য। পরে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী সফর করেন এবং একাত্তরের চেতনা ফিরিয়ে আনায় অবদান রাখেন। এভাবেই একাত্তরের শহীদ শফি ইমাম রুমী, তার বাবা শরীফ ইমাম এবং মা জাহানারা ইমাম আমাদের সামনে স্মরণীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেনও।
সূত্র :মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ও ইন্টারনেট
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিএনপির আবালীপনা।


Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।