খোলস বেরিয়ে পড়েছে জামাত রক্ষাকারী দল বিএনপির। তারা সরাসরি এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করছে।বলে দিয়েছে এই ট্রাইব্যুনাল বাতিল করতে হবে।একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত মার্কিন অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ স্টিফেন র্যাপের সুপারিশসমুহ বাস্তবায়ন ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি করেছে বিএনপি।
আর এটেই বুঝা গেছে স্টিফেন র্যাপ কার স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশে গিয়েছিলেন।
এদিকে, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ও মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, এমপি বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইবুনালের কার্যক্রম বন্ধের দাবির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের আসল পৃষ্ঠপোষক তাদের মুখে এই ধরনের দাবি শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একটু দেরিতে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের আসল পৃষ্ঠপোষক কারা তা দেশবাসীর কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আরও বলেন, মওদুদের এই দাবি সভ্য সমাজের কেই সমর্থন করতে পারে না। ’৭১ সালে যারা নিরপরাধ বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা ও ধর্ষণ করেছে, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছে তারা শাস্তি পাবে নাÑ এই দাবি যারা করেন তারা মানবতার শত্রু, সভ্যতার শত্রু।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের চেয়ারম্যান এবং পরিকল্পনামন্ত্রী একে খন্দকার বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে বিএনপি সব নীতি-নৈতিকতা শিকেয় তুলে খোলামেলা মাঠে নেমেছে। এতে আশ্বার্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এই বিএনপিই নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করার পরও স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আব্দুল আজিজকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছে। বেশ কয়েকজন স্বাধীনতাবিরোধীর গাড়িতে ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত পবিত্র লালসবুজের পতাকা তুলে দিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে দেশের যুব সমাজকে দীর্ঘসময় বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে রেখেছে। তারা তো যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চাইবেই। এতে আশ্চর্য বা শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, প্রথমত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখন জাতীয় দাবি। সরকারও এই জাতীয় দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে ইতোমধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। দ্বিতীয়ত, সেক্টর কামান্ডার্স ফোরাম শেষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবে না। বাংলার মাটিতে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই।
গেল শনিবার দুপুরে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ব্যারিস্টার মওদুদ তার লিখিত বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারবহির্ভূত পন্থায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আপত্তি জানানোর আহবান জানান। সেই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও বিধিমালা বাংলাদেশের স্বাক্ষরের মাধ্যমে দেয়া অঙ্গীকারগুলো পালনে সরকারকে চাপ প্রয়োগেরও আহবান রাখেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার বিভিন্ন রকম টালবাহানা করে এই ট্রাইব্যুনালকে অভ্যন্তরীণ আদালত হিসেবে অভিহিত করছে। কিন্তু অভিযুক্তকে সম-অধিকার দেয়ার নিশ্চয়তা দেয় এমন অভ্যন্তরীণ আইনগুলোকে স্থগিত করেছে। তারা বিচার শুরুর আগেই অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। তাদের এসব কার্যক্রম লোক দেখানো বিচার সম্পাদন ও ফরমায়েশি সাজা দেয়ারই নামান্তর।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ লিখিত বক্তব্যের শুরুতে বলেন, বেগম খালেদা জিয়া বহুবার বলেছেন, আমরাও সত্যিকারের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। সে বিচার হতে হবে দেশের প্রচলিত আইনে। এই বিচার হতে হবে সার্বজনীন মৌলিক অধিকার সমুন্নত রেখে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে, যাতে জনমনে কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত মার্কিন অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ স্টিফেন র্যাপ এই ট্রাইব্যুনাল ও এর বিশেষ আইনগুলো পর্যালোচনার জন্য সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, এই ট্রাইব্যুনালকে ন্যায়পরায়ণ এবং স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে তার দেয়া অনেক সুপারিশই সরকার ও ট্রাইব্যুনাল উপেক্ষা করেছে। স্টিফেন র্যাপ ৬টি সুপারিশ করেছিলেন। সেগুলো হলো, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলতে কী বুঝায় তা সংজ্ঞায়িত করতে হবে, অভিযুক্তরা যেন একই পরিমাণ সময় এবং সামর্থ্যরে যোগান পায় তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য, চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য অভিযুক্তরা যেন একই পরিমাণ সময় ও সামর্থ্যরে যোগান পায়, যেমনটি অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা পেয়ে থাকে, বিচারিক কার্যক্রম যেন টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচার করা হয়, বিদেশী কৌঁসুলি বা আইনজীবীদের যেন বিচার প্রক্রিয়ায় পরামর্শক হিসেবে সম্পৃক্ত হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়, অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত বাংলাদেশী নাগরিকরা যেসব অধিকার পেয়ে থাকেন সেসব অধিকারের নিশ্চয়তা যেন এই ট্রাইব্যুনালের অভিযুক্তরাও পান।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, মার্কিন বিশেষ রাষ্ট্রদূতের সুপারিশগুলোর জবাবে সরকার বলার চেষ্টা করেছে যে, এই ট্রাইব্যুনালটি অভ্যন্তরীণ। তিনি সরকারের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, এই ট্রাইব্যুনাল অভ্যন্তরীণ আদালতই যদি হবে তবে সরকার কেন র্যাপকে পরামর্শ দেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। যদি অভ্যন্তরীণ আদলতই হবে তবে রোম বিধিমালা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছিলেন কেন? ওই স্বাক্ষর করার পর তা আবার জাতীয় সংসদে ভূতাপেক্ষ অনুমোদনই বা করলেন কেন? যদি এই ট্রাইব্যুনাল অভ্যন্তরীণ আদালতই হবে তাহলে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ আইন ফৌজদারী পেনাল কোড এবং সাক্ষ্য আইনের প্রয়োগ করছে না কেন?
ব্যারিস্টার মওদুদ স্টিফেন র্যাপের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, তার সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা ছাড়া ট্রাইব্যুনাল মোটেও ন্যায়পরায়ণ, স্বাধীন এবং স্বচ্ছ হতে পারে না। বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে এই ট্রাইব্যুনালটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ৯:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



