somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি লিফলেটে সব গার্মেন্টস্‌ মালিকের বাটপারী ফুটে উঠেছে।

৩১ শে জুলাই, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অধিকার বঞ্চিত সংগ্রামী গার্মেন্টস শ্রমিক ভাই ও বোনেরা, আপনাদের প্রতি রইল আমার সংগ্রামী অভিনন্দন ও রক্তিম শুভেচ্ছা।

প্রিয় ভাই বোনেরা, মালিকদের স্বার্থে প্রতিদিন বায়ারদের কাছে শ্রমিকদের অসংখ্য মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে। যেমন : আমরা প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি পাই, আট ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ করলে দ্বিগুণ মজুরি পাই, সরকার ঘোষিত সকল প্রকার ছুটি সবেতনে পাই, ঘর ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা পাই এবং আমাদের মালিক আইএলও (ILO) স্বীকৃত সকল সুযোগ সুবিধা শ্রমিকদের প্রদান করে। আমাদের এই মিথ্যা বলার পর মালিকরা কাজের অর্ডার পায়। আর এর পুরস্কার হিসেবে ন্যূনতম অধিকারের কথা বললে সন্ত্রাসী মাস্তান লেলিয়ে দিয়ে শ্রমিকদের উপর চালায় নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করে।

সংগ্রামী বন্ধুগণ
গত ২৭ এপ্রিল ২০০৮ বায়ার আসার আগের দিন প্যানডোরা সোয়েটার্সের মালিক জনাব শাহরিয়ার আলম, আমরা সকল অধিকার পাই -- এই মিথ্যা কথাগুলি বলার জন্য শ্রমিকদের এক সভা আহ্বান করে। উক্ত সভায় মালিক পক্ষ থেকে নরমে গরমে শাসানো হয় যাতে এর ব্যতিক্রম না হয়। এই সভায় শ্রমিকদের মধ্যে থেকে আমিসহ আরও কয়েকজন শ্রমিক মালিকের অনুমতি নিয়ে বলি, আপনি যা বলছেন আমরা তো তা বায়ারদের মাসের পর মাস বলেই যাচ্ছি, আপনার কাছে আমরা দুইটি দাবি উত্থাপন করছি যা বাস্তবায়ন করতে আপনার কোনো বাড়তি পয়সা খরচ হবে না। প্রথম দাবি হল, আমরা যারা প্রডাকশনে কাজ করি তাদের জন্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত যে মজুরি প্রচলিত আছে তার সাথে মাস শেষে আমরা যে মজুরি পাই তার অনেক গরমিল হয়। প্রতিদিন আমরা কত প্রডাকশন দিচ্ছি, মাসের শেষে আমাদের প্রডাকশন কত এবং সেই অনুযায়ী আমাদের মজুরি কত হয় তা মাসিক মজুরি প্রদানের আগের দিন নোটিশ বোর্ডে লাগিয়ে দিতে হবে এবং ভুল হলে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দ্বিতীয় দাবি, আট ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ করাতে হলে বর্তমানে মাস্তানদের দিয়ে টিফিন হিসেবে যে পঁচা রুটি-কলা দেয়া হয় তা বন্ধ করে বাজার দর অনুযায়ী ২৫ টাকা করে দিলে শ্রমিকরা তাদের পচ্ছন্দ অনুযায়ী টিফিন কিনে খাবে।
আমাদের এই বক্তব্যের পর কারখানার মালিক শাহরিয়ার আলম সাহেব বলেন, তোমরা আমার জন্য অনেক করেছো, ২০০৯ সালে আমার জন্য আর কোনো মিথ্যা কথা বলতে হবে না। তোমরা যে ভাবে উৎপাদন করছো তা অব্যাহত রাখো। ২০০৯ সালের প্রথম দিকেই আইএলও স্বীকৃত সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান করবো। মালিকের এই আশ্বাস পেয়ে শ্রমিকেরা কারখানার স্থাপিত হওয়ার পর সে বারই সর্বোচ্চ প্রডাকশন দিয়েছে। ২০০৮ সাল শেষ হলো। মালিক রাজশাহী-৬ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ’০৯ কারখানায় আসেন। এসেই এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নিয়ে কারখানায় একটা শোডাউন করলেন। ৫ তারিখে সকাল বেলায় শ্রমিকরা কারখানায় ঢুকতে গিয়ে দেখে অসংখ্য বহিরাগত মাস্তান ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কয়েকজন শ্রমিক ভিতরে প্রবেশ করা মাত্রই তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিল, ভাউচার ও সাদা কাগজে সই রেখে তাদেরকে মারধর করে বের করে দেয়া হয়। এতে বাকি শ্রমিকরা হতভম্ব হয়ে যায় এবং তারা আর কারখানায় প্রবেশ করে না।
মালিকের এই বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আমরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রীকেও অবহিত করি। এ দিকে মালিক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। সন্ত্রাসীদের দিয়ে শ্রমিকদের মেস ও বাসাবাড়িতে হামলা চালানো হয়। এ বিষয়ে বারবার শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পুলিশকে অবহিত করা হয়। মালিকের এ অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং আমাদের সকল কর্মসূচি সম্পর্কে পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেছি। আমাদের এই নিয়মতান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খল কর্মপদ্ধতি দেখে এলাকার সুধী সমাজ এমনকি প্রশাসনও সাধুবাদ জানিয়েছিল। কর্তৃপক্ষ কারখানা বন্ধ করার পর থেকে আমরা প্রতিদিনই কারখানার গেটে কাজের জন্য যাই। কারখানা বন্ধ থাকায় আমরা মাঠে ঘণ্টাখানেক অবস্থান নেই, তারপর যার যার বাড়িতে চলে যাই। বেতন না পাওয়া শ্রমিকদের জন্য এলাকাবাসীর সহযোগিতায় কয়েক দিন লঙ্গরখানাও চালানো হয়।
এ সময় অবস্থায় মালিক কারখানা খোলার আশ্বাস দেয়। গত ৭ মার্চ ’০৯ সকালে কারখানার সামনে গেলেই অসংখ্য সন্ত্রাসী আমাদের উপরে হামলা করে। এ সময়ে সন্ত্রাসীরা আমার মাথা, হাত-পা ও পিঠে প্রচণ্ড আঘাত করে মৃত মনে করে আমাকে ফেলে যায়। বিকাল ৫টার দিকে আমার জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি হাসপাতালে। ডাক্তার-নার্সদের কাছে জিজ্ঞেস করলে তারা জানায় পুলিশ আমাকে এখানে রেখে গেছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি আমার অসংখ্য শ্রমিক ভায়েরা রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছে। ডাক্তাররা বললেন, আপনাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়ে গেছে, এখন আপনারা বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করান। আমরা এখানে এত লেবারের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারবো না। আমি, সোহাগ, আনিস এতই ক্ষত-বিক্ষত ছিলাম যে হাসপাতালের বেড ছেড়ে ওঠার মতো অবস্থা আমাদের ছিল না। রাত ১১টার দিকে বেশ কিছু পুলিশ এসে আমাদের চারজনের বেড ঘিরে ফেলে এবং হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বলে, তোমরা মার্ডার কেসের আসামী। পুলিশদের জিজ্ঞেস করলাম কে মার্ডার হয়েছে, কখন মার্ডার হয়েছে? তখন পুলিশ উত্তর দেয়, কে মার্ডার হয়েছে জানি না। তবে মার্ডার হয়েছে ৩টার দিকে। তখনই ডাক্তার, নার্স, বয়-বেয়ারা সবাই বলে, এই মহিলা ভর্তি হয়েছে সকাল দশটায় আর আপনারা রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে হ্যান্ডকাফ পরাচ্ছেন? এ কথা শুনে তখনই পুলিশের সাথে থাকা মালিকের গুন্ডারা বেডের উপরে রাখা চিকিৎসার কাগজপত্র ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রি খাতায় ভর্তি হবার সমস্ত ডুকুমেন্ট ছিড়ে ফেলে। গ্রেফতার করার ৪ দিন পরে আমাকেসহ ৫ জনকে কোর্টে চালান করে জেলে পাঠানো হয়।

সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা
আমাদের এই সুশৃঙ্খল সংগ্রাম ও শ্রমিক ঐক্যকে বানচাল করার জন্য মালিকপক্ষ একের পর এক চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এই ষড়যন্ত্রের একটা অংশ হচ্ছে সাইফুল হত্যা। সে ২৫/২৬ বছরের যুবক। সে খুন হবার ৫ ঘণ্টা পর তার প্রথম ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সে দেখে যেতে পারেনি নিজের সন্তানের মুখ। কারা এই হত্যাকারী? সাইফুল যেখানে নিহত হয়েছে তা প্যানডোরা গার্মেন্টস থেকে ২ কি.মি. দূরে, ঢাকা-ময়মনসিংহ প্রধান সড়ক থেকে বাম দিকে একটি ভিতরের গলিতে। কারা এই সাইফুলকে হত্যা করেছে? এই হত্যাকাণ্ডের সুযোগ নিয়ে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়েছে? হাজার হাজার শ্রমিককে করছে এলাকাছাড়া? আমি মনে করি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করলে কারা সাইফুলের হত্যাকারী তা বেরিয়ে আসবে।

সম্মানিত এলাকাবাসী
প্যানডোরা সোয়েটার্সের শত শত শ্রমিক আজ মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাদের বাবা-মাকেও হয়রানি করা হচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৪ মাস কারাভোগের পর আমি গত ২৫ জুন এলাকার শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে এবং আইনজীবীদের সহযোগিতায় কারগার থেকে মুক্তি পেয়েছি। বের হয়ে মনে হচ্ছে আমি কারাগারে ছিলাম, ভালই ছিলাম। আমার হাজার হাজার শ্রমিক ভাইদের ঘরবাড়ি লুট হয়েছে, পরনের জামা-কাপড় ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই। আজ সাড়ে ৪ মাস যাবৎ তারা এক কাপড়ে, ঘর-বাড়ি ছাড়া। একদিকে বেতন না পাওয়া, বহু দিনের জমানো সহায়-সম্পদ লুট, দিনের পর দিন চাকুরি বিহীন অবস্থায় এখানে-সেখানে ভেসে বেড়ানো, আর অন্যদিকে মিথ্যা মামলার হয়রানি -- এই হচ্ছে প্যানডোরার শ্রমিকদের অবস্থা।

তাই আমি দাবি জানাচ্ছি -
* অবিলম্বে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল করতে হবে।
* শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করতে হবে।
* সাইফুলের প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে।
* সাইফুলের বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ ও শিক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।
* নির্যাতন হয়রানীর পথ বাদ দিয়ে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

শ্রদ্ধান্তে
রোমানা আক্তার
মেন্ডিং অপারেটর, কার্ড নম্বর - ১২৩
প্যানডোরা সোয়েটার্স
শ্রীপুর, গাজীপুর
তারিখ: ২৯ জুন ২০০৯

১৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×