বেশ কয়েকদিন ধরে সামুতে খালি দেখছি “ফেসবুক থেকে টাকা ইনকাম করুন” শিরোনামের অনেক পোষ্ট। আমি সচরাচর এসব লিংকে যাইনা। কিন্তু এখন সিচুয়েশন আলাদা। এখন সেমিস্টার ফাইনাল চলছে। আর পরীক্ষার সময়টাতেই কেন জানি অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে মুনচায়্। ২০ তারিখ মাইক্রোপ্রসেসর পরীক্ষা। গতকাল (১৭) দুপুরে একটু জিনিসটা পরীক্ষা করতে মন চাইল। সুতরাং একটা লিংক থেকে ঢুকে গেলাম। করলাম রেজিষ্ট্রেশন। তারপর দেখি উপর-নীচ-আগে-পিছ সব জায়গায় খালি টাকার হাতছানি। ৫ জন কে আমার লিংক দিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করালে ২০ পয়েন্ট মানে ১০০ টাকা। জিবে জল চলে আসল। ফেসবুকে স্কুলের কয়েকজন ফ্রেন্ডকে ভুং-চুং বুঝিয়ে রেজিস্ট্রেশন করালাম। এক জুনিয়রকে লিংক দিয়ে পড়লাম বিপদে। অই পোলা খালি কয়, “না ভাই, এগুলাতে টাকা পাওয়া যায়না। পুরাই ভোগাস।” কি করব বুঝতে না পেরে তাকে ফাপর দিয়ে বললাম, “আমি ২০০টাকা পাইসি। তুইও কর। তুই বেটা আমার ক্লোস ছোটভাই, এজন্য দিলাম।” সে রেজিস্ট্রশন করল। ফ্ল্যাটের কাউকে না জানিয়ে ৫ জনকে রেজিস্ট্রশন করিয়ে ফেললাম। বিকালের দিকে জুনিয়র কয়, “ভাই, থ্যাংকস। আমি ৫০ টাকা পাইসি।” আমি হতভম্ব। আসলেই তাহলে পাওয়া যায়? খাইসি তোরে এম্বিপে, তোর সব টাকা খাইসি। কাঙ্খিত পয়েন্ট হওয়ার পর পড়লাম আরেক বিপদে। টাকা কেমনে তোলে জানিনা। জুনিয়ররে আবার ফাপর-টাপর মেরে বললাম, আমি অনেক আগে তুলসিতো ভুলে গেসি। তুই একটা স্ক্রীনশট পাঠা। ও পাঠাল এবং আমি মোবাইলে ৫০০০ পয়সা আই-টপ পেয়ে গেলাম। নাচতে নাচতে ফ্ল্যাটের বাকী কয়েকজনকে বললাম। এরাতো পুরাই মারামারি লেগে গেল। একজনের নেট শেষ। সে আরেকজনের মডেম দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করল। আরেকজন আমার পিসি থেকে রেজিস্ট্রেশন করল। আর আমি আমাদের ৭ তালা বিল্ডিং এর প্রতি তলায় গিয়ে লিংক দিয়ে আসলাম। এখন শুরু হল রেফারেলের যুদ্ধ। আমার রুমমেটকে আমি বলি, ‘দোস্ত, তুই না আমার রুমমেট। আমার ভাই না তুই? আমার লিংকে যা। ভায়ে ভায়ে এত স্নেহ, কোথাও খুজে পাবি নাকো।(সুরে সুরে)’। আরেকজন আমার রুমমেটকে বলে, “আয় দোস্ত, আমার কোলে আয়। আমি নিজে তোরে রেজিস্ট্রেশন করায়া দিমু। সিগারেট খাওয়ামু”। আরেকজন তাকে বলে, “সুদীপ্ত আমার রুমমেটের রেজিস্ট্রেশন করাইসো। তোমার রুমমেট আমার(নাউজুবিল্লাহ)। আমার বুকে আয় দোস্ত।” সবাই একেকটা ডায়লগ দেয় আর শুনে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যায়। আমার রুমমেট বলল, “যে আমারে ৫০ টাকা দেবে আমি তার লিংকে যাব”। ৩ জন একবাক্যে বলে উঠি, “দুরো, হালার হালা। দুরে গিয়া মর।” ৩ জন একসাথে ফেসবুকে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে শুরু করলাম। এক ফ্রেন্ড বলল, “এত কষ্ট না করে সবাইরে বল, তোর ক্যান্সার হইসে”। - আইডিয়া কাজে লাগালাম। আমাদের ক্লাসের গ্রুপে গিয়ে পোষ্ট করলাম, “একজন ক্যান্সারপীড়িত রোগীর জীবন বাচাতে এই লিংকে একটা রেজিস্ট্রেশন করুন।” সিনিয়র জুনিয়র নির্বিশেষে চলল প্রচারণা পরীক্ষার চিন্তা বাদ। কে কত কামাইতে পারে এটাই দেখার বিষয়। এক সিনিয়র আপুকে চ্যাটে বললাম, “আপু, একজন ক্যান্সারপীড়িত রোগীর জীবন বাচাতে এই লিংকে একটা রেজিস্ট্রেশন করেন। ” আপু বলল, “ফাইজলামীর জায়গা পাস না? আন্টির নাম্বার দে। কথা বলি।” আমি তাড়াতাড়ি অফলাইনে গেলাম। রাত ১০-১১ টার দিকে আমার বন্ধুরা ৫০টাকা করে ফ্লেক্সি পাওয়ার পর খালি উত্তেজনা আর উত্তেজনা। আমার তখন রেফারেল ২০ জন আর ওদের ৮-১০ জন। আমি খালি বিদ্রুপের হাসি দেই। যখনি ওরা বলে অমুকরে লিংক পাঠাচ্ছি, আমি বলি, “ও তো অলরেডি রেজিস্টার্ড। আমিই করাইসি।”- বলার পর গালি খাই আর হাসতে হাসতে লিংক পাঠাইয়া দেই তাকে। আমি খালি ধান্দায় আসি কখন ৭৫ পয়েন্ট হবে আর ৪০০টাকা পাব। সেই অনুপাতে রেজিস্ট্রেশন করানোর পরও দেখি পয়েন্ট আর বাড়েনা। পড়লাম ফাপরে। এদিকে অনেক ফ্রেন্ডকেই রেজিস্ট্রেশন করানোর জন্য বলসি যে আমি ২০০-৩০০ টাকা পাইসি। তোরাও কর। এরাও খালি জিগায়, আর তো পাইনা। তুই কেমনে পাইসস? অত্যাচার থেকে বাচতে ফেসবুকে অফলাইন হলাম। অনেকে আবার গাধার মত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে লিংক পাওয়ার পর। কেমনে করে? করলে কি হয়? ওদের কি লাভ? ম্যাক্সিমাম কত পাওয়া যায়?- আরে ভাই, তোরে লিংক দিসি, রেজিস্ট্রেশন কর। এত কথা জিগাস কেন? মেজাজ পুরাই গরম। এদিকে বন্ধু-বান্ধবরা গার্লফ্রেন্ডের আইডি দিয়েও রেজিস্ট্রশন করছে সমানে। আমার গার্লফ্রেন্ডও নাই, একস্ট্রা আইডিও নাই। কি আর করি? নিলাম ছলনার আশ্রয়। এক ফ্রেন্ড সবার ওয়ালে ওর লিংক পোষ্ট করছে আর আমি সবগুলার কমেন্টে দিলাম, “দিস ইজ দা রিয়েল লিংক। নো স্প্যামিং। তারপর আমার লিংক।” এক ঘন্টা পর ফ্রেন্ড খেয়াল করল বিষয়টা। তার মাইর থেকে বাচার জন্য রুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকলেও তার গালির একটাও কানের আশপাশ দিয়ে যায়নি। তারে বুঝ দেই, “আরে সবই তো মজা। ৫০-১০০ টাকার জন্য মিয়া এমন কর? যাও সিগারেট খাউয়ামু।” বলদ মেনে নেয়। একটা কথা বলে রাখি, গালাগালি, মারামারি সবই কিন্তু মজা নিয়ে করা হয়েছিল। বিষয়টা কেউ তেমন সিরিয়াসলি নেয়নি। সুস্থ প্রতিযোগিতা। চ্যাটে বড়ভাইদেরকে ব্ল্যাকমেল করে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে ভালই ইনকাম হল। বাট অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও সেই টাকা মোবাইল পর্যন্ত আনতে পারলাম না। এদিকে পুরা ফ্ল্যাট পড়াশোনা বাদ দিয়ে খালি রেফার করায় ব্যস্ত। সবাই মিলে নাম দিলাম ভার্চুয়াল ডেসটিনি। একে একে সবাই ৫০ এর পর আর টাকা না পেয়ে হতাশ হয়ে গেল। সবাই পুরা রাতটা না পড়ে এভাবে নষ্ট করার জন্য ব্যাপক অফসুস করা শুরু করলাম। আমি টাকা না পেয়ে হতাশ হয়ে ৪ টার দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম, “পরীক্ষার হলে গেছি। এক সাধু আমাকে অভিশাপ দিল, তুই আর পরীক্ষা দিতে পারবিনা। তোর কলম থেকে কালির বদলে টাকা বের হবে। পরীক্ষার হলে দেখি লেখতে গেলে কালির বদলে টাকা বের হয়। মাগার আমি তো আর আতেল না যে কান্নাকাটি শুরু করব। আমি টাকা-পয়সা সব বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দৌড় দিলাম। কিন্তু মাঝপথে রযব আমাকে পেয়ে টাকাগুলা সব নিয়ে গিয়ে নারীপাচার মামলায় ফাসিয়ে দিয়ে গুলি করছে।”- আতংকিত হয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। দেখি ৯টা বাজে। কসম খেলাম, আজকে সারাদিন পরব। নো ফেসবুক, নো টাকা, নো এম্বিপে। কিন্তু সামলাতে না পেরে ২টার দিকে আবার ঢুকলাম। কিন্তু টাকা তুলতে পারলাম না। এ দুস্ক কুতায় রাকি? সব দুস্ক এখন ঢালতে বসলাম বই নিয়ে। হীরক রাজাই ঠিক ছিল, “আধপেটে নাহি খেদ। বেশি খেলে জমে মেদ।” দু:খে মনের মধ্যে কয়েক মণ মেদ জমে গেছে। পড়ায় মন বসে না। আফসুস
সবাই একটু দোয়া কইরেন যাতে পড়তে পারি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

