somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প : নীল সাইকেল

২৭ শে আগস্ট, ২০১১ সকাল ৯:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দীপনের নতুন নীল রংয়ের সাইকেলটা নিয়ে দীপনের বন্ধুদের আলোচনার কোন শেষ নেই। সবাই হিংসা করছে, ‘আমার বাবাও যদি দীপনের বাবার মত এত ভাল হত’। ক্লাস সিক্সের ফাইনালে ফার্স্ট হলে কিনে দেবার কথা ছিল একটা সাধারণ সাইকেল। কিন্তু দীপনের বাবা খুব সুন্দর একটা গীয়ারঅলা সাইকেল কিনে দিয়েছেন। সাথে একটা পাম্পার আর একটা সুন্দর টি-শার্ট। টি-শার্টে একটা সাইকেলের ছবির নীচে লেখা “আই লাভ টু রাইড”। সারারাত দীপন ঘুমাতে পারেনি উত্তেজনায়। ঘুমালেই খালি স্বপ্ন দেখে সাইকেলের ক্যারিয়ারে অর্পিতাকে বসিয়ে দীপন দেশ বিদেশ ঘুরে বেরাচ্ছে। গীয়ারে অনেক স্পীড তুলে দীপন নায়কদের মত ঝড়ের বেগে সাইকেল চালাচ্ছে আর অর্পিতা নায়িকার মত বারবার দীপনকে জড়িয়ে ধরছে ভয়ে। জড়িয়ে ধরে বলছে আস্তে চালাতে আর দীপন অর্পিতাকে বারবার অভয় দিচ্ছে। ঘুমের মধ্যে এসব স্বপ্ন দেখলে লজ্জায় কি আর ঘুম থাকে চোখে। তাই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অর্পিতাকে নিয়ে আকাশকুসুম চিন্তা করতে থাকে দীপন। আজ শুক্রবার বলে স্কুলের মাঠে সবাই ক্রিকেট খেলবে। দীপন তার নতুন সাইকেল চালিয়ে মাঠে এসেছে। আসার সময় বারবার মা বলে দিয়েছেন সাইকেলটা সাবধানে দেখে রাখতে। শহরে চোরের অনেক উৎপাত। আপাতত খেলা বন্ধ। দীপনের নতুন সাইকেলটাই দেখছে সবাই। দীপন একটু দুরে শিশিরের সাথে কথা বলছে। শিশির তার সবচেয়ে ভাল বন্ধু স্কুলে। এতদিন শিশিরকে কিছু বলেনি। আজকে বলা দরকার। বুদ্ধি নিতে হবে।
- শিশির, তোকে একটা কথা বলব। কাউকে বলবি না তো?
- বলব না।
- কসম?
- যা, কসম কাটলাম।
- আমি না অর্পিতাকে ভালবাসা করি।
- কোন অর্পিতা? সেদিন যে ফাংশানে গান গাইল?
- হুমম।
- কি বলিস? ওই মেয়েটাতো সুন্দর না। কালো।
- (রেগে) কি বললি? অর্পিতা কালো? আর কখনো বলবিনা, খবরদার।
- তো কালোকে কালো বলব না?
- না বলবিনা।
- একশবার বলব। কালো কালো কালো...
ক্ষেপা জন্তুর মত দীপন ঝাপিয়ে পড়ে শিশিরের উপর। এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি মারতে শুরু করে। শিশিরও পাল্টা মারতে শুরু করে দীপনকে। অন্যরা দৌড়ে আসে দীপন আর শিশিরকে ছাড়ানোর জন্য।
ডাক্তারের কাছে ভাঙা নাকে ব্যান্ডেজ করে বাসায় ফিরে মায়ের কাছে আরেক দফা মার খায় দীপন। কারণ ঘটনা ততক্ষণে বাসায় জানাজানি হয়ে গেছে। ক্লাস সেভেনে পড়া এতটুকু ছেলে প্রেমের জন্য বন্ধুর সাথে মারপিট করেছে শুনে বাসায় সবাই প্রচন্ড রেগে গেছে। দীপনের অবশ্য তেমন মন খারাপ হয়না। সিনেমাতে তো দেখে নায়করা ভালবাসার জন্য কত মার খায়। নিজেকেও নায়ক ভাবতে শুরু করে দীপন। বারান্দায় সাইকেলের উপর বসে আকাশ-পাতাল চিন্তা করতে থাকে অর্পিতাকে নিয়ে। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে শেষমেষ একটা চিঠি লিখে ফেলে। পাশের বাসার তমাল ভাইকে দেখে আপুকে মাঝে মাঝে চিঠি দিতে। আগে একটা চকলেটের বদলে দীপনই নিয়ে আসত চিঠি। একদিন কৌতুহলের বশে চিঠি খুলে পড়ে লজ্জায় লাল হয়ে যায় দীপন। ছিহ, বড়রা এত খারাপ। কি সব লেখে চিঠিতে। আর আপুও কেমন যেন। চিঠি পেয়েই সব কিছু ভুলে বিছানায় শুয়ে আদর করে চিঠি পড়ে আর খালি হাসে। নাহ, অর্পিতাকে এসব লেখা যাবেনা। কিন্তু কি লিখবে ভেবে পায়না। শেষমেষ একটা সুন্দর কাগজে লিখল,

প্রিয় অর্পিতা,
আমি দীপন। বয়েজ স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমি এবার বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছি। সেদিন ফাংশানে তোমার গান আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি তোমাকে অনেক ভালবাসা করি। তুমি কি আমাকে ভালবাসা করবে? শুক্রবার বিকালে আমি তোমাদের বাসার নীচে একটা নীল সাইকেল নিয়ে দাড়িয়ে থাকবো। তুমি আমাকে ভালবাসা করলে জানালা দিয়ে হাত নাড়া দিয়ো।
ইতি
তোমার দীপন।


চিঠি লিখার পর বিছানায় বালিশের নীচে চিঠি রেখে ঘুমাতে গেল দীপন। পরদিন সকাল ১১ টায় স্কুল ছুটি হলে বাসায় এসে জামা-কাপড় পাল্টিয়ে চিঠিটা পকেটে নিয়েই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল দীপন। অর্পিতা রিক্সা দিয়ে এক বান্ধবীর সাথে স্কুলে যায় ১২ টার সময়। রিক্সাতেই চিঠিটা দিতে হবে।
মোড়ের সামনে দাড়িয়ে থেকে দীপন অপেক্ষা করে কখন অর্পিতার রিক্সা আসবে তার জন্য। রিক্সা দেখামাত্রই পেছন পেছন সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে দীপন। আস্তে আস্তে রিক্সাটা ক্রস করে সামনে গিয়ে চিঠিটা ছুড়ে মারে অর্পিতার দিকে, তারপর সাইকেলটা মুহুর্তের মধ্যে ঘুরিয়ে ফেলে। অর্পিতা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, কিছুটা ভয়ও পায়। তারপর পিছনে তাকিয়ে দেখে ঝাকড়া চুলের একটা ছেলে নীল রংয়ের সাইকেল চালিয়ে সাই সাই করে চলে যাচ্ছে। কাপা হাতে চিঠিটা খোলে অর্পিতা।
পরদিন বুধবার একুশে ফেব্রুয়ারি, তাই স্কুল বন্ধ। আবীরের সাথে সাইকেলের রেস লাগার কথা ছিল। স্কুলের মাঠ থেকে রেস শুরু হবে, শেষ হবে বড় রাস্তার মোড়ে। রেস শুরু হল। দীপনের সাইকেলে গীয়ার থাকায় অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই আবীরকে পেছনে ফেলে দিল দীপন। একটু সামনে গিয়ে পেছনে ফিরে আবীরকে ভেঙিয়ে হঠাৎ সামনে তাকিয়েই দেখল একটা রিক্সা। ছোট রাস্তা। রিক্সাটার বাম দিক দিয়ে যাওয়া যাবে না, তাই ডান দিক দিয়ে ওভারটেক করতে গেল। ঠিক এমন সময় অপরদিক থেকে একটা মাইক্রোবাস ছুটে এল। মুহুর্তের মধ্যে দীপনের সাইকেলের উপর দিয়ে মাইক্রোবাসটা চলে গেল। রাস্তায় পড়ে রইল দীপনের রক্তমাখা নিথর দেহ আর দোমরানো নীল সাইকেলটা।

বেশ কয়েক বছর পর
অর্পিতা অনেক বড় হয়ে গেছে। ভার্সিটিতে পড়ে। মাঝে মাঝে বন্ধে বাসায় আসে। এলেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। একটা নীল সাইকেলের উপর বসা ঝাকড়া চুলের ছেলেকে পাগলের মত খুজে বেরায় তার টানা টানা চোখ দুটো।


==================================
পাগল টাইপের প্রাণোচ্ছল কোন ছেলেকে কল্পনা করলেই আমার চোখে ভেসে উঠে আমার অনেক ভাল বন্ধু দীপনের কথা। গল্পটা তাকেই উৎসর্গ করলাম।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:৪৬
৪২টি মন্তব্য ৪২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×