১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম ইন্টারনেট আসে। প্রথম থেকেই অনলাইন চ্যাটিং বিষয়টা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ফেসবুকে নিজের কথা, আবেগ, ছবি, মতামত সব কিছুই অন্যকে জানানো যাচ্ছে। পাশাপাশি চ্যাটও করা যায়। ফেসবুক মাটির পৃথিবীর বাইরে সাইবার দুনিয়ার সর্ববৃহৎ নেটওয়ার্ক। সামাজিক যোগাযোগ সাইট অনলাইন দুনিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
মোবাইল ফোনের ইন্টারনেটসহ বর্তমানে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় কয়েক কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটের ফলপ্রসূ ব্যবহারের পাশাপাশি ক্ষতিকারক ব্যবহারও বাড়ছে। অনেক সময় ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তাদের শারীরিক, মানসিক, এমনকি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অশানি- বয়ে আনছে। অন্য দিকে শহরের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এবং তাদের আত্মীয়-পরিজনের মধ্যেও দিন দিন একটি দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রধান কারণ যন্ত্রনির্ভর যোগাযোগ। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ৮০ কোটির বেশি। প্রত্যেক ব্যবহারকারীর গড় বন্ধু ১৩০ জন। ফেসবুক সামাজিকতার নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। দেশের তরুণরাও ফেসবুক ব্যবহার করছে। ২১ লাখ ১০ হাজারের বেশি ব্যবহারকারী নিয়ে ফেসবুক ব্যবহারের তালিকায় ৫৬তম স'ানে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশে এখনো ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অর্ধেকের বয়সই ১৮ থেকে ২৪ বছর। নিজেদের প্রকাশ করার জন্য তাদের কাছে সেরা মাধ্যম ফেসবুক। ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের উপসি'তি ৩০ শতাংশ। উন্নত বিশ্বে একাকিত্বেও কারণে ৩৫-এর বেশি বয়সীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে ফেসবুকে। মানুষের ভেতরের আসল মানুষটা ফেসবুকে বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। যা কিনা সব সময় রাগী ও গম্ভীর প্রকৃতির, যার ভাবনার গণ্ডি খুব ভাবগম্ভীর বিষয়ে, তার ফেসবুকে স্ট্যাটাসেই দেখা যায় আধুনিক বাংলা গানের চরণগুলো। এভাবেই ফেসবুকে সবার ‘আমার আমি’ বেরিয়ে আসে। আবার কেউ হয়তো সামনাসামনি কখনওই তার মেয়ে বন্ধুর হাতটি ধরতে পারেনি, কিন' ফেসবুক চ্যাটে অবলীলায় লিখে দেয় মনের ইচ্ছার কথা। রীতিমতো না বলা কথা বলার জায়গা হয়ে উঠেছে ভার্চুয়াল জগৎ। কারো কাছে ভার্চুয়াল সম্পর্ক কখনও একাকিত্ব দূর করার সহায়ক মাধ্যম বা কখনও নির্মল এক বন্ধুত্বের জায়গা।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা : ইন্টারনেট একটি মুক্ত জায়গা। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট, ব্লগ, অনলাইন ফোরামগুলো পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করার পথটি আরো সহজ করে দিয়েছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই সেবাগুলো বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। তাই ব্যবহারকারীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এসব সাইটে অনেকেই খুঁজে পান পুরনো দিনের বন্ধুদের, সেই সাথে নতুন নতুন বন্ধু পাওয়ার সুযোগ তো আছেই। তবে সহজ যোগাযোগের কারণে বর্তমানে বিপদও ঘটছে অনেক। ইন্টারনেটে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে প্রাসঙ্গিকভাবে ব্যবহারকারীরা তাদের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে থাকেন। তবে আপনার বন্ধুর তালিকায় নতুন কারা যুক্ত হচ্ছেন লক্ষ রাখতে হবে। সেই সাথে আপনার প্রোফাইলের কোন অংশটি কাদের জন্য উন্মুক্ত করবেন সেটিও সঠিকভাবে নির্ধারণ করে দিলে আপনি কিছুটা হলেও নিরাপদ থাকতে পারবেন। আপনার পারিবারিক ছবিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করা থেকে বিরত থাকুন। বর্তমানে ছবি আদান-প্রদানের জন্য ফ্লিকার এবং পিকাসা বেশ জনপ্রিয় ছবি শেয়ারিং সাইট। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে আপনার ছবিটি ডাউনলোড করতে পারবে কি না, সেটিও নির্ধারণ করে দিতে পারেন।
সক্রিয় সাইবার অপরাধীরা : তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাইবার অপরাধ পৃথিবীর সব দেশেই আলোচিত ঘটনা। অনলাইনে ক্রেডিট কার্ড চুরি, ওয়েবসাইটে আক্রমণ, হ্যাকিং, ই-মেইলে হুমকি, অনলাইনে অন্য কারো ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও প্রভৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছে অপরাধীরা। দেশেও সাইবার অপরাধের হার বাড়ছে। বর্তমানে মেয়েদের ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে, বিয়ে করতে না পেরে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সম্পর্ক থাকার সময় ধারণ করা ছবি বা ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন ২০০৬ অনুযায়ী সেই ছবি ইন্টারনেটে বা অন্য কোনো মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ছবি ছড়ানোর ব্যাপারে যার ভূমিকা থাকবে সে অপরাধী। ৫৭ (২) ধারায় বলা হয়েছে ‘কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক দশ বৎসর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন’। যেহেতু সাইবার অপরাধ প্রযুক্তিনির্ভর, তাই বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল হলে সাইবার অপরাধের বিচার আরো সহজ হয় বলে আইনবিদেরা মনে করেন। তাদের মতে, প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিচার বিভাগের সাধারণ আদালতের পক্ষে বোঝা একটু দুষ্কর।
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী : ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি তুলে পরে ব্ল্যাকমেইল করা বা সেই ছবি ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনা বর্তমানে অহরহ ঘটছে। তবে এ ক্ষেত্রে পুরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেয়েরাই। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে কারোরই ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে পড়তে পারে। ছড়িয়ে পড়ছেও। কিন' বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরা ভিকটিম হওয়ায় যত দ্রুত সম্ভব সামাজিক কারণে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া হয়। ইন্টারনেটের ওয়েবসাইট থেকে ছবি হয়তো অপসারণ করা যায় দ্রুতই, কিন' মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে অসংখ্য কম্পিউটার, মোবাইল ফোনে ছড়িয়ে পড়ে ওয়াইফাই ব্লুটুথের মতো প্রযুক্তির কল্যাণে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তোলা ছবি যখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়, তখন সেটি অপরাধ। আইন তা-ই বলে। অনেক সময় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও এসব ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এমন সব ঘটনারই আইনি তদন- হওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এ ক্ষেত্রে সামাজিক, পেশাগত ও মানসিকভাবে বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। অপরাধটি যেখানে স্বচ্ছ, তাই পরবর্তী পদক্ষেপ তদন-সাপেক্ষে অপরাধীর গ্রেফতার এবং শাসি- নিশ্চিত করা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ভবিষ্যতে অসংখ্য মেয়ের কথা ভেবে এই অপরাধের দৃষ্টান-মূলক শাসি- হওয়া উচিত।
আইনের কঠোর প্রয়োগে প্রয়োজন : বাংলাদেশ পুলিশে সাইবার অপরাধ দেখার জন্য আলাদা শাখা রয়েছে। ই-মেইল প্রতারণা, ই-মেইল হুমকি, মানহানিকর লেখা বা ছবি ইন্টারনেটে প্রচার করা প্রভৃতি বিষয়ে তদন- করে পুলিশ। তবে সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশ বিভাগে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বা বিশেষজ্ঞ নেই। সাইবার অপরাধ দমন বা তদনে- বাইরের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। অন্য দিকে এ ক্ষেত্রে শাসি-র নজির তুলনামূলক কম হওয়ায় পরবর্তী সময়ে আরেকজন একই কাজ করে কোনো মেয়ের সর্বনাশ করেই চলছে।
সুত্রঃ
অনলাইন দুনিয়ার খোঁজ খবর নিয়ে লিখেছেন আহমেদ ইফতেখার
http://www.dailynayadiganta.com/details/15507
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১১ দুপুর ১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


