এই অনিন্দ্যসুন্দরী প্রস্টিটিউট নগরীতে,ঝাঁ চকচকে পিতলরঙা লু হাওয়া বিকেলে,আজ আমার মন খারাপ। নীলচে রঙা খারাপ না,হলদে রঙা অসুস্থ রকমের খারাপ। সেটা মাত্র ১ দিন বেশি ছুটি কাটানোর অপরাধে আজ সকালে চাকরি চলে যাওয়া অফিস এক্সিকিউটিভ ছেলেটার জন্যেও হতে পারে,যদিও সেটাতে আমার কোন কিছু করার নেই,যার গেছে তারও পিতৃদত্ত সম্পদের অভাব নেই,কিন্তু নিজে পরাজিত মানুষ বলেই কারো অপমান,কারো হেরে যাওয়া ঠিক হজম হয়না,কেমন যেন খচমচ করে ভেতরে। কিংবা নিজের একমাত্র অবলম্বন চাকরিটাও যে কোন মুহূর্তে চলে যাবার শংকাতেও হতে পারে,হতে পারে টানা ৩টা ইন্টারভিউতে পরে যোগাযোগ করবো বলে ফিরিয়ে দেবার গ্লানিতেও,যদিও এখানে স্মর্তব্য যে অনেকদিন ধরেই আমাকে সবাই ফিরিয়েই দিচ্ছে সবকিছু থেকেই,মনখারাপ সেক্ষেত্রে একটা দুঃখবিলাস বলেই গন্য হবে। রাস্তায় আড়াআড়ি পড়ে থাকা নির্বাক ক্রাচওয়ালা লোকটা,যার ঠিক ভিক্ষা চাইবার মত সামর্থ্যও ছিল বলে মনে হয়না দাবদাহ বা খিদের অত্যাচারে,যাকে আমার চোখদু'টো আবিষ্কার করেছে রিকশা খোঁজার সময় কিন্তু মনটা এগিয়ে যায়নি সাহায্য করতে,সেই লোকটাও মনখারাপের ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করতে পারে,ভেবে দেখলে।
কিন্তু যাই ঘটুক না কেন,আমার মন খারাপ। এতটাই খারাপ যে,প্রেসক্লাবের মোড়ে দাঁড়িয়ে রিকশাতে দ্রুত চলে যাওয়া দারুণ সুন্দরী হলেও হতে পারতো মডেল মেয়েটার হাসি হাসি চোখে চোখ পড়ার পরেও দারুণ বিরক্তির একটা চাহনি দিয়ে দিই। এতটাই খারাপ যে প্রেসক্লাব থেকে এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে যাবার রাস্তার দিকে মাথা নিচু করে হাঁটা ধরে অল্পের জন্য রিকশাচাপা থেকে বেঁচে গিয়ে রিকশাওয়ালার গরগরানিটাও কানে যায়না। এমন মন খারাপের বেলায় কনে দেখা
আলোকেও ডাইনির রক্তচোখ মনে হয়,এমন মন খারাপের বিকেলে সবুজ গাছের ধুসর ডালগুলোকেও ভাবতে হয় শকুনের থাবা। এমন বিষন্ন বিকেলে রিকশাভাড়া নিয়ে দরাদরি করতে ইচ্ছে করে না,রাস্তার দামী গাড়িগুলো দেখে ঈর্ষা করতেও ভাল লাগে না। পাশ থেকে কোন এক হাহাকার করা গানের সুর ভেসে আসে,মেরে দেয়া সুরটা,যেমন হয় আরকি,হয়তো এনিগমা থেকে,কিন্তু বারবার এমন কোন সুর শুনতে মন আনচান করে ওঠে। অন্যদিন বাসায় ফেরার সময় দু'পাশে অন্ধকারে ডুবে থাকা লোডশেডিং নগরীর অন্ধত্ব দেখে মাথায় একটা বিদ্রোহ জেগে ওঠে,কিন্তু এমন একঘেয়ে সন্ধ্যায় শুধু উটের মত মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে। একটানা অন্ধকারে ছুটে চলা বাহনে অনন্তকাল বসে বুক দুমড়ানো সুরটা শুনতে ইচ্ছে করে,অধরা কোন অতৃপ্তিকে সাথে করে।
আজ আমি রামগড়ুরের মতই গোমড়াথেরিয়াম। ঘাড় শক্ত করে চোখ সামনে মেলে রিকশাতে করে বাসায় চলে এসেছি,কাল বিকালে দেখেছিলাম মৌচাক মোড়ে নতুন একটা বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং টানানো হয়েছে,বেশ চিকমিকে চেহারার দু'টো ছেলেমেয়ে ছিল যেন সেটায়,বিজ্ঞাপনটা কি মোবাইলের নাকি কোল্ড ড্রিংকসের সেটা নিশ্চিত হব আজ ভেবে রেখেছিলাম,দেখা হল না আজকে। ঘুম ঘুম ভাবনা নিয়ে বাসায় ঢুকে আজকে লোডশেডিংয়ের উপর রাগ করে ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলতেও ভুলে গেছি,এই বালের দেশের কিসু হইবো না বলে মুখ খারাপ করতেও আজ আলসেমি করেছি। চালের বাজারদর নিয়ে আজকে মাথার ঘাম ফেলিনি,দেশের মসীহা দুর্দিনের স্বঘোষিত কাণ্ডারি ফখরুদ্দিন তাঁর ভাষণে কি বললেন সেটা জানারো দরকার মনে করিনি এই গুমোট রাতে। একুশে টিভির খবর বন্ধ হবার গরম খবরও আজ আমাকে স্পর্শ করে না,আজ শুধুই আমার মনখারাপের দিন,মানবচিন্তার চেয়ে আজ আমার মত স্বার্থপরের ব্যক্তিচিন্তাই বড়। পাশের বাড়ির ছাদে অনবরত ডিজুস প্রেম চালিয়ে যাওয়া ছেলেছোকরাগুলোকে আজ দেখার সময়
পাইনি,নিচতলার নেশাড়ু ছোকরার রাতবিরাতের গান শুনেও ভুরু কুঁচকাইনি। অন্ধকারে প্যানপ্যান করা মশার কামড়ে মেয়রের ১৪ গুষ্ঠী উদ্ধার করার সুযোগও হয়নি। আগামীকাল নিয়ে ভাবিনি,গতকালটাকে ফিরিয়ে আনিনি। পায়ের লম্বা নখ উলটে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করিনি,সাতদিনের গজানো দাড়িটাও চুলকাইনি একবারো। কারো সাথে ঝগড়া ছাড়া পার করে দিলাম একটা দিন,হাসি ছাড়া পার করে দিলাম একটা রাত। দেশটা রসাতলে যাবে কিনা অথবা আমি আগামীকাল বেঁচে থাকব কিনা,কিংবা চারপাশের অসংখ্য জিনিয়াসের ভিড়ে আমি একাই
মিডিওকোর কিনা, এমন ফাঁকা দার্শনিক চিন্তা ছাড়াও প্রেসার কুকারে ঢোকানো একটা বিকেল কাটিয়ে দিলাম।
আজ আমার মন ভালো না,আজ আমি কোথাও যাবো না,আজ আমি কাউকে কোন অনুযোগ করবো না।,আজ আমি আর কিছু ভাববো না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

