রূপম ফোন করে জানালো,অনির্বান বিয়ে করে ফেলেছে। খবরটা শুনেও তেমন প্রতিক্রিয়া হল না,কারণ এর আগেও ৩-৪ বার তার বিয়ের গুজব এসেছে,কোনবারই সত্যি হয়নি। জিজ্ঞেস করলাম,কে বললো? জানালো, অনির্বান নিজেই। নিশ্চিত করলাম,তাহলে এটা মিথ্যা কথা কারণ অনির্বান ১০০টার মাঝে ৯৯টা কথাই ফাজলামি করে বলে। আচ্ছা ভুল হোক আর ঠিক হোক,চল ঘুরে আসি হল থেকে,জ্বালাতন করি,অনেকদিন যাই না। গাইগুঁই করি,আগের রাতেও ঘুমাইনি,আজকে আরাম করে ঘুমানোর ইচ্ছা,কিন্তু রূপমের চাপাচাপিতে রাজি হয়ে যাই,কি আছে জীবনে!
এতসব তর্কাতর্কির পরে বাসা থেকে যখন বের হলাম তখন রাত ১১টা ৩০। বাস পেতে সমস্যা নেই কিন্তু কালো মামা আর ঠোলা মামাদের টহলদারি দেখে শংকিত হই,কিছুদিন আগেও হাতে ১টা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড ছিল,এখন আমি নামপরিচয়হীন,ধরলে সোজা গারদে পাঠিয়ে দিতে পারে,নিজের চেহারা-সুরত আজকাল নিজের কাছেই সন্দেহজনক লাগে। বাস থেকে নেমে রিকশা,আস্তে আস্তে ঢুকে যাই নিজের অনেকদিনের চেনা ক্যাম্পাস হয়ে হলের মাঝে। সেখান থেকে অনির্বানের রুমে। গল্প করছিল ২ বন্ধু,হইহই করে ঢুকে পড়ি,জুনিয়রগুলো বিরক্ত হয়,পাত্তা দিই না,নিজের বনে সবাই বাঘ। অবধারিত প্রথম প্রশ্ন,কি করিস
আজকাল? আমার বাঁধা জবাব,কিছুই করি না। আমার পাল্টা প্রশ্ন,রূপম কি করিস? জবাব,কিছুই না। অনির্বান? এই তো এইবার পাশ করমু দোস্ত,আর বিয়া করলাম।
এইবারে সিরিয়াস হওয়া লাগে একটু,যদিও ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।
-কবে করলি?
-এই ২ সপ্তাহ।
-খবর দিলি না ক্যান?
-রূপমরে দিসিলাম,বিশ্বাস করে নাই,আর তর ফোন বন্ধ।
-চাপা কম পিটা,আমার ফোন বন্ধ থাকে না।
-চালাও তো বালের সিটিসেল,ঐটা বাই ডিফল্ট বন্ধ।
-তুই বিয়া করসস,কাগজপত্র কই?
-কাগজপত্র লাগে না,রূপম রে জিগা।
রূপমের দিকে তাকাই,সায় দেয়।
-তোর সাক্ষী কারা?
-সাক্ষীও লাগে না,অগ্নিসাক্ষী।
-ফাজলামি করো হারামজাদা,ধর্ম জানি না দেইখা যা খুশি চালায়া দিবা? সাক্ষী ছাড়া বিয়া হয়?
-তুই এর আগে বিয়া করসস যে তুই নিয়ম কানুন জাইনা বইসা আসস? রূপমরে জিগা।
রূপম মাথা নাড়ে,জানায়,সে-ও বিয়ে করেনি কাজেই এই সম্পর্কে ধারণা নেই।
আপাতত মানতে বাধ্য হই,জিজ্ঞেস করি,বউরে খাওয়াবি কি? বলে,বাপের বাড়ি আছে,আমিও পাশ করি,সে-ও করুক,তারপর দু'জন মিলে ভাবা যাবে। দাবী জানাই,খাওয়া কিছু,বিয়ের খাওয়া নাই দিলি,চা-টা স্পনসর কর। রাজি হয়। ৩ জন হাঁটা ধরি রুম থেকে বের হয়ে। রূপম মনে করায়,এইভাবে হাঁটতে বের হয়ে এর আগে মোবাইলটা গেছে। ভাবের আলাপ শোনাই,আরে ব্যাটা জানের দাম নাই তো মোবাইল,মইরা গেলে সবই শেষ,মোবাইল চাইলে দিয়া দিমু। সে জানায়,আমারটা ফকিরা হলেও তার মোবাইলটার দাম আপাতত তার জানের চেয়ে বেশি,শখের জিনিস।
হইচই করে হাঁটা,অর্থহীন আলাপ,মানিকের ফুটপাথের চায়ের দোকান। ভিড় মন্দ না রাত ১টার পরেও। লেবু চা-টা ভালো হয়েছে,শুনে খুশি হয়
মানিক,আমাদেরও সমাজ-রাজনীতি-ক্যারিয়ার-প্রেম নিয়ে দার্শনিক আলোচনা শুরু হয়। তন্দুরি গরমে ঘামতে ঘামতে সমস্ত জন্ঞ্জাল সাফ করে ফেলি এক তুড়িতে। দু'টো বেনসনের ধোঁয়াশার ফাঁকে অধূমপায়ী আমি ছোট ছোট পায়ে বুয়েটের শহীদ মিনারের গোড়ায়,আধো আঁধারে ঘোরের দরজা খুলে বসি। উঁচু গলার কথায় দারোয়ান বিরক্ত হয় হয়তো,বলার থাকে না কিছু। নিজেই গলাটা নামিয়ে নিই একটু,অন্য ২ জনও নামায়,হয়তো নাগরিক ভদ্রতা কিছু অবশিষ্ট রয়ে গেছে বলেই।
-ঐ অনির্বান,ফোন লাগা।
-কারে?
-তোর কাছে তো নম্বরের অভাব নাই,দে একটা কথা কই।
-ক্যান তোর কাছে নাই?
-এখন নাই।
-নে,কল কর।
-নাম কি? ফোন ধরবো তো?
-রুমু,ধরবো।
-ক্যামনে পাইসিলি?
-জানার দরকার কি? তোর কাজ তুই কর।
রূপম ডায়াল করে,নোকিয়া ৩১১০ এর সবুজ আলো মুখে পড়ে কেমন ভূতুড়ে দেখায় ওকে। লাউডস্পিকারে রিং এর আওয়াজ পাই।
-হ্যালো,কে?
-কেমন আছো রুমু?
-কে বলছেন?
-নাম পরেই জানলা,আমি বলছি,এক বন্ধু।
-আমি অপরিচিতের সাথে কথা বলি না। আর নাম্বার পেলেন কোথায়?
-পরিচিত হবো,সমস্যা কোথায়? নাম্বার তো কতভাবেই পাওয়া যায়।
-না আগে নাম বলেন,নাইলে কথা বলবো না,ফোন রেখে দিব।
-আচ্ছা বলবো তো,শোনো তোমার গলাটা দারুণ মিষ্টি।
-সেটা পরে শুনবো,আগে আপনার নাম বলেন।
-শোনো বারান্দায় এসো,দেখো আকাশে কত মেঘ।
-নাম না বললে আসবো না,কক্ষনো না কক্ষনো না কক্ষনো না।
-বাইরে এসে দেখই না আকাশে কত তারা!
-আচ্ছা আসছি,এইবার নাম বলেন।
ঘাড় ফেরাই আমি,মনোযোগ নষ্ট হয়,অনির্বানকে ফিসফিস করে বলি,শালা এত মেঘের মাঝে তারা দেখলো ক্যামনে রে? হাত ঝেড়ে উড়িয়ে দেয়,জানায়,দরকার হলে রাতের বেলায় সূর্যও দেখবে,তুই নিজের কাজ কর। তাই করি,চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখি,মেঘ দেখি,মশার গান শুনি,আবার মেঘ দেখি। একটা কয়েল আনলে ভাল হত,ভাবি মনে মনে,মশার অত্যাচারে ভাব ছুটে যাচ্ছে। চক্রাকারে রূপম আর রুমুর আলাপ চলে,নামসংকট মনে হয় এই রাতে আর সমাধান হবে না। ফোন বাড়ায় অনির্বান,বলবি নাকি? মাথা নাড়ি,এভাবে কথা বলা সম্ভব না,হেসে ফেলবো একটু পরেই। অনির্বান বিড়বিড় করে,তর অবশ্য কথা না কওয়াই ভাল,যে গলা,মাইয়া ভাবব শেষরাইতে ডাকাত পড়সে। অসন্তুষ্ট হলেও মেনে নিই,বলি, তো কিভাবে কথা বলা লাগে? এবার অনির্বানের ফোন দেয়ার পালা,শেষরাতের কোন অচেনা তরুনী তার মিষ্টি সুরের কবিতা শুনে আল্লাদী হয়ে ওঠে,একটু পরে ফোন রেখে বিজয়ীর চোখে তাকায় বন্ধুবর,মাথা নেড়ে তাকে ওস্তাদ মেনে নিই,সে জানায়,এখন আর করি না,বিবাহিত মানুষ,বউ খুন করে ফেলবে।
রূপমের কথা শেষ হয়েছে,তাকে জানানো হয়,তার উচ্চারণ খারাপ,নইলে পারফরম্যান্স ভালই ছিল। শুদ্ধ কথার উপর অশুদ্ধ ভাষায় কিছুক্ষণ লেকচার দিই,কিছুক্ষণ পরে থেমে যাই মশার গুনগুনের সাথে নিজের আওয়াজের মিল পেয়ে। কালো মামাদের গাড়ি ঘুরে যায় সামনে দিয়ে,গাড়ির পেছনে বাঁশগুলো কি জন্যে আলোচনা করে ৩ জনেই একমত হই,ওগুলো আমাদের পশ্চাদ্দেশে ঢোকানোর জন্যই। হেসে উঠি এবার এলোমেলো,আবার থেমে যাই নীরব রাতে বেখাপ্পা প্রতিধ্বনি শুনে।আকাশ দেখি,মেঘ দেখি,মেঘে ঢাকা কয়েকটা তারা দেখি। বাতি নিভে গেছে,আঁধারে ভূতের মত,নাকি ভূতগ্রস্থের মত বসে থাকি ৩টা মানুষ,অথবা ৩ টা হারিয়ে যাওয়া দিন। টুকটুক গল্প হয়,কে কোথায় জানা হয়,বেনসনের টানে আবারো ২ চক্কর হাঁটা হয়,বেনসনের ধোঁয়াতে মুখ বিকৃত করে সঙ্গীদের দিকে ২-৪ টা গালিও বর্ষিত হয়।
আস্তে আস্তে রাত ভোর হয়,আযানের শব্দ শোনা হয়,মর্নিং ওয়াকে বের হওয়া মানুষগুলোকে দেখা হয়। নরম আলোয় শান্ত হয়ে আসি,খুব বেশি পবিত্র ভোরে গাছ হয়ে কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় বাকিটা জীবন,প্রতিদিন এমন শান্ত রাত আর ভোর দেখার আশায়। সামনে দিয়ে ছাতা হাতে মর্নিং ওয়াকরত সাবেক ভিসিকে দেখে উঠে পড়ি,একটু পরেই মানুষজন আসা শুরু করবে। ঠিক করি,একদিন ঢাকেশ্বরীতে যাওয়া লাগবে,অনির্বানের বিবাহত্ত্ব যাচাই করতে। অনির্বান রাজি হয়।
কোথাও খাবারের সন্ধানে বের হই আবার,এত ভোরেও কেউ কেউ হোটেল খুলে বসে ঢাকেশ্বরীর কাছেই। গরম ধোঁয়া,টুংটাং,চায়ের কাপ,মামা পরোটা,ডিম মামলেট,পাটোয়ারী, আর ধোঁয়ার গন্ধ। কতদিনের চেনা? আবারো ফিরে এসেছি চক্রের মাঝে,একদিনের জন্য। চলন্ত সিনেমার মত চোখের সামনে আরো একবার দেখছি ফেলে আসা বছরগুলো,একদিনের জন্য।
শুধুই কি একদিনের জন্য? নাকি পড়ন্ত বৃষ্টির শব্দের মতই ছন্নছাড়া রাত আর ভোরগুলো মাথার ট্র্যাশ ক্যান থেকে বারবারই ছুটে এসে সিনেমা দেখিয়ে যাবে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

