মা বকা দিয়েছে। যেজন্য দিয়েছে সেটা এত তুচ্ছ যে মনে করতে পারছি না, আমি নিশ্চিত মায়েরও মনে নেই কিন্তু দিয়েছে সেটাই বড় কথা আর সেজন্যই আমি গোমড়া মুখে সোফায় আড়কাত হয়ে মানিক রচনাবলীর পয়লা খণ্ডে ঘাড় গুঁজে আছি। ঈদের ছুটিতে মানিক পড়া কোন কাজের কথা না,মানিক বড় বেশি নিষ্ঠুর,একদম আঁতে ঘা লাগানো নিষ্ঠুর। এসময় উচিত ছিল কোন একটা ঈদসংখ্যার বস্তাপচা ফরমাইশি হালকা উপন্যাসগুলোতে চোখ বুলানো আর তার চেয়েও বস্তাপচা ঈদের নাটক নইলে তারকাদের রংঢং দেখা। সেই আয়োজনের অভাবও নেই,পাশের ঘরেই বোন-দুলাভাই-খালা-মামা মিলে আসর বসিয়ে কোন এক লাক্সসুন্দরী অথবা বান্দরী অভিনীত নাটকের ব্যবচ্ছেদে মশগুল,আর দু'হাত দূরে পড়ে আছে 'অন্যদিন' ঈদসংখ্যা। পড়ে পাওয়া হাওয়াই মিঠাইয়ের দিকে হাত বাড়াইনি তা না, মায়ের কাছে ঝাড়া খাওয়ার পরে থলথলে ঈদসংখ্যাটা হাতে নিয়ে রঙচঙে নায়িকার দিকে মনোযোগ দেবার ইচ্ছা নিয়েই থমথমে মুখে টিভির সামনে বসেছিলাম। কিন্তু আমার
মেজাজের দোষেও হতে পারে,চার-পাঁচটা চ্যানেলের মডেলবাজি দেখে সপ্রমাণ সিদ্ধান্তে চলে এলাম যে লাক্সসুন্দরী হবার মূল শর্ত হলো সৌন্দর্যের বালাই না থাকা আর নাটকে অভিনয়ের যোগ্যতা হলো অভিনয়ের 'অ'-ও না জেনে মডেল হয়ে যাওয়া আর দর্শক হবার চাবিকাঠি হলো নিজের রুচি হিন্দি সিরিয়াল দেখার পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
এমন যুগান্তকারী হাইপোথিসিস সগর্বে ঘোষণা করার পরে আর জনসমক্ষে থাকা চলে না,কাজেই পাশের ঘরে গিয়ে অন্যদিনে মন দেবার চেষ্টা করি। কপালের ফের বা বুদ্ধির দোষ যেকোনটা হতে পারে,হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসটাই আগে ধরে বিতৃষ্ণার ষোলকলা পূর্ণ হলো। কয়েকপাতা কষ্ট করে পড়ে লেখক না প্রকাশক কাকে জুতাপেটা করা উচিত সেটা ভাবতে ভাবতে বইটা ছুঁড়ে ফেলে টেবিল থেকে মানিকের গোবদা বইটা তুলে নিই,ঐতিহ্য প্রকাশনীর ঝকঝকে বাঁধাইও যেটাকে
গত সাতদিনে আমার হাতে ওঠাতে পারেনি।
ছুটির মাঝে মানিক হাতে নেয়া যে ঠিক না সেটা 'জননী' উপন্যাসটায় নাক ডুবানোর একটু পরেই টের পেলাম। একটা সময় এক বন্ধুর কাছে অনুযোগ
করেছিলাম যে আধুনিক সাহিত্যিকদের হ্যাপি এন্ডিং বা হ্যাপি ইনসিডেন্টের ব্যাপারে এত অনাগ্রহ কেন,আর কেনই বা খালি দুঃখ দুঃখ রুক্ষ্ম ভাব নিয়ে লেখে তারা। তো সেই বন্ধুর জবাব ছিল যে ভাই জীবনটাই তো আনহ্যাপি,আর সিন্ডারেলার যুগ শেষ হয়ে গেছে,আধুনিক সাহিত্য আর ছেলেভুলানো রূপকথা শোনাতে
চায় না বরং জীবনটাকেই সামনে টেনে আনতে চায়। আর বাস্তবে যদিও মাঝে মাঝে খুশির ঝিলিক দেখা যায় কিন্তু সেটা এতই স্বল্পস্থায়ী ওটাকে টেনে এনে মরীচিকা দেখিয়ে লাভ নেই। তর্ক সেখানে থামেনি,বাস্তবেও অখুশি তাই বলে গল্পেও অসুখী থাকাই লাগবে কিনা সেটা নিয়ে ঘাড় বাঁকা করে অনেকক্ষণ তর্ক করেছিলাম,সবাই জানে আমার সময়ের অভাব নেই,কিন্তু তাতে মানিকের কিছু যায়-আসে না কারণ ভদ্রলোক বাস্তবটা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হলেও দেখিয়ে ছাড়বেন বলে প্রতিজ্ঞা করে মনে হয় কলম নিয়ে বসতেন।
যাই হোক,মানিক আলোচনা করার জন্য লিখছি না,পড়ছিলাম জননী,অথবা পড়ছিলাম না,শুধু মনটা ঘোরাবার চেষ্টা করছিলাম,মাঝ থেকে সেটার মাঝে ঢুকে গেলাম। কষ্ট ব্যাপারটার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে,নিজের সাথে জড়িয়ে নেয় খুব সহজে,আনন্দ তো সবার জোটে না তাই হয়তো আনন্দের সাথে একাত্ম হতে সময় লেগে যায়,বা হয়েও ওঠে না। শ্যামা নামের মেয়েটা যখন মানিকের উপন্যাসে আস্তে আস্তে উঠে আসতে থাকে তখন তাকে বুঝে উঠতে আমার খুব বেশি সময় লাগে না,তার দুঃখ,তার ছোট ছোট সংসারকেন্দ্রিক ভাবনা,একটা একটা করে পয়সা জমিয়ে সন্তানের দুধের খরচ যোগানো আর দু'টো একটা করে টাকা জমিয়ে নিজের একটা দোতলা বাড়ির স্বপ্ন,আমার মায়ের স্বপ্ন আর সাধনাগুলোও কি এরচেয়ে খুব আলাদা ছিল? অবিমিশ্র কোন নায়কোচিত চরিত্র
না,মানিকের আর সব চরিত্রের মতই দোষে-গুণে মিশিয়ে আমাদের একজন,কিন্তু তার দোষগুলো কেন গায়ে লাগে না আমার? হয়তো মনে হয় নিজের সন্তানের চিন্তাই একজন মা সবার আগে করবে আর তার জন্য সবকিছু বিসর্জন দেয়া একজন মায়ের জন্য খুব স্বাভাবিক ব্যাপার? হবেও বা!
গল্প এগোয়,আমিও ডুবতে থাকি। শ্যামার ছেলে বিধান বড় হয়,সাথে আমিও। কমবেশি গল্প তো একই। হয়তো শ্যামা আশ্রয় নিয়েছিল আত্মীয় বাড়ি,হয়তো আমার মা কে নিতে হয়নি,কিন্তু রাজরাণীর মত গর্বিতা মাকে ঠিক কতটা আনন্দ বিসর্জন দিতে হয়েছিল অভাবের সংসারে ছেলেকে মানুষ করতে? ঠিক কতগুলো বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়েছিল ছেলের পাশে রাত জেগে? মনে হয় বিধানের মত এত বড় হতে পারিনি,সে তো তার মা কে উদ্ধার করেছিল অন্যের সংসার
থেকে,আমার মা এখনো অপেক্ষায় থাকে তার ছেলে কবে বিশাল কিছু করে ফেলবে,না,রোজগার করবার জন্য নয়,ছেলে আমার বড় হয়েছে তাই বলবার জন্য। আর কবে বড় হবো নাদের আলী,সময় তো কাটে না!
আরো ডুবতে থাকি আর ভাসতে থাকি। ঘুমের মাঝে মা একবার যেন বলছিল বিরিশিরি ঘুরে একদিনে মুখটা কালো হয়ে গেছে(আমি কালো ছিলাম না
কবে?),কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পরে একবারের জন্যও আমার গোমড়া মুখের কারণ জানতে চায়নি,মহিলা শক্ত প্রতিপক্ষ,ভাঙবে না এভাবে। এইটুকুতে হবে না,হুঁ হুঁ মাইজী আমিও তোমার ছেলে,কথা বলছি না এত সহজে,পেয়েছো কি? আগে মানিকের ভল্যুমটা শেষ করি বরং,জননী কখন যেন শেষ হয়ে গেছে,দিবারাত্রির কাব্যে ঢুকে দেখি। পছন্দ হলো না বেশি,বড় বেশি কচমচ আর উপদেশ,আরে ব্যাটা এত দর্শন শুনতে চেয়েছে কে,আমি তো উপন্যাস
পড়তে বসেছি,নাকি? এভাবে পড়া ঝামেলা, আরেকটু চেপে বসতে হবে, আরেকটা বালিশ মাথার নিচে দিয়ে,টিভি চ্যানেলের অশ্লীল হইহুল্লোড়ের মাঝে মন দেয়াও মুশকিল,ব্যাধিই সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়,প্রমথ চৌধুরী ভুক্তভোগী নিশ্চিত।
পড়তে পড়তে সময় যায়,দিবারাত্রির দার্শনিকতা থেকে অতসী মামীর মানবিকতায় অথবা ২-১টা শরচ্চন্দর মার্কা নেকী গল্পে,মেজাজটা খারাপ হতে না হতেই 'সর্পিল' পড়ে শিউরে উঠি,এও তো মানিকেরই সৃষ্টি, লোকটা মানুষের মনের কত কোণের খবরই না রাখতো।ঝড়ে পড়া কড়িকাঠের সাথেই কৌতুহলটাকে চাপা দিয়ে মাঝে উঠে মুখ গোমড়া করে খেয়ে আসি মায়ের ডাকে,পেট কি আর রাগ মানে,খাওয়াবে আর কে? ফিরে আসি,মুখ গুঁজি,বইয়ের সাথে বিকাল
যায়,সন্ধ্যা যায়,শতবর্ষী মানিক হারিয়ে দেয় নবযৌবনাসাথী ফারুকীদের ফালতুমি আর ফাতরামিকে,গম্ভীর বচনের সাথে ঝিঁঝিঁপোকা রাত নামে মফস্বল শহরের আলোর মাঝে,টিউবলাইটের রোশনীর মাঝেও বিভ্রান্ত হই পদ্মানদীর টিমটিমে প্রদীপে।বই শেষ হয়,আবার ঘুরে আসি জননীর শেষ পৃষ্ঠায়,যেখানে প্রায় অপ্রকৃতস্থ শ্যামার কোলে স্পন্দিত হয় নতুন এক প্রাণ,ধুকপুকে বুকে আরেকবার মনে করিয়ে দেয় জগজ্জননীর প্রবল শক্তি।
নাহ্,সকালে উঠেই মায়ের সাথে খাতির করে ফেলতে হবে,প্রবল প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধবিগ্রহে ক্ষতির পাল্লাই ভারি,সন্ধি করলে আখেরে কিছু লাভ হতেও পারে।
শালার মানিক,তলোয়ার দিয়ে ইমোশনের দরজায় গুঁতোগুতি করে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

