somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দিনলিপি ৮: ইলশেগুঁড়িতে ৫০০ টাকার পথিক

২৭ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকালবেলা বেহায়া মোবাইলটা ঠিক ৫ মিনিট পরে পরে আবার সংকেত বাজায়,ছুঁড়ে ফেলার ইচ্ছাটা দমন করি,সেটটার দাম রিমসহ ১২০০ টাকা হলেও এইটুকুই সম্বল। এক চোখ খুলে দেখি,৯টা ২৫। হিসাব মেলেনা,এই সময়ে এত আবছা অন্ধকার ?কারণটা বুঝে মেজাজটা আরো বিগড়ে যায়,বাইরে গতকালের মতই মেঘলা মেঘলা বৃষ্টি।এই ঠাণ্ডা হাওয়াতে কোথায় কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমাবো তা না,এখন ছাতা বাগিয়ে ধান্দায় বেরোতে হবে। এমন দিনে খিচুড়ি দিয়ে ইলিশ না খাই,মানে কিনা ইলিশের যা দাম তাতে জিনিসটা আকাশে ওড়ে নাকি মাটিতে হাঁটে সেটা বুঝাই মুশকিল হয়ে গেছে,অন্তত ডেস্কটপে একটা ইলিশের ছবি ঝুলিয়ে ডালভাত খেলেও তো শান্তি,তা না এখন বাসে লাইনে ষাঁড়ের মত গুঁতাগুতি করো,মানবজন্ম শুধুই আফসোসের গল্প।

বেশি ভাবের কথা ভেবে লাভ নেই,উঠতেই হয়। নাস্তা করতে করতেই দেখি বৃষ্টির তোড় বেড়েছে,বাসস্ট্যান্ডে যেতে যেতেই ভিজে যাবো। ছাতা একটা চরম অপছন্দের জিনিস,দেখলেই মনে হয় এটা দিয়ে ষাঁড় খেপানো যাবে,তাও নিতে হয়। বাস কাউন্টারে গিয়ে মেজাজ আরো খারাপ হয়,বাস আসতেই মানুষ হুড়মুড় করে উঠে যাচ্ছে,মারামারিতে জুত করতে পারছি না ছাতাটা হাতে থাকায়।ফাল্গুনের বাসটা আসতে দেখে তাড়াতাড়ি টাকা দিয়ে টিকিট নিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়ি,পিছন থেকে টিকিটওয়ালা হইহই করে ওঠে,যতদূর মালুম হয় এক বাসের টিকিটম্যানকে টাকা দিয়ে আরেক বাসের টিকিট নিয়ে ফেলেছি। নেমে যাবার প্রশ্নই আসেনা,ও ব্যাটা মিটমাট করুক,এত ভদ্রলোক এখনো হইনি। ভিতরে বেশি ভিড় নেই,বসার জায়গা পেয়ে যাই,এতক্ষণে বাইরে দেখার সুযোগ হয়,আহ,বৃষ্টি,বৃষ্টি,বৃষ্টি,সুখ না থাকলে কি আর দেখা হয়?

অফিসে ঢুকতে গিয়ে ভাবছি আজকে কি অজুহাত দেব দেরি করার,রুমে ঢুকে বেশ একটা ফুর্তি এসে গেল,সব ফাঁকা,খালি এক সিনিয়র বসে আছে। বস নেই,সাথে যে ২টা কাজ করে ঐ ২টাও নেই,দুবাইয়ের ভিসা তুলতে গেছে। সিনিয়র সোয়েটার গায়ে দিয়েও শীতে কাবু,ভাগ্য ভালো টিশার্টের উপর শার্ট পরে গেছি,তাও মনে হচ্ছে জমে যাবো। সাথের ২টা নেই,সুযোগ পেয়ে নেটে বসি,টুকটাক কাজ করি,আবার নেট,আবার কাজ। সময় কাটে,৫টা বাজে,ছটফট করি,শেষে বের হয়েই যাই। খিলক্ষেত এসে বাসে উঠতে গিয়েই মনে পড়ে,পকেটে একটা ৫০০ টাকার নোট, সকালে ভাংতি পাইনি বাসায়। বাস কাউন্টারে কয়েক টাকা ভাড়ার জন্য ৫০০ টাকার নোট দিলে নিশ্চিৎ ঝাড়ি খাবো,তাই একটা উপায় হাতড়াই মনে মনে। একটা ১০ নম্বর সিটিং সার্ভিস আসতে উপরওয়ালার নাম নিয়ে উঠে পড়ি। কন্ডাকটর ভাড়া চাইতে কাচুমাচু মউখে বলি,৫০০ টাকার নোট। বলে ভাংতি নাই। মধ্যবাড্ডা কত? ৭ টাকা।ভাংতি তো আছে ৬ টাকা! ক্যাচাল করে না,এখনো এরা কর্পোরেট হয়ে ওঠেনি যে মৃতপ্রায় রোগীর কাছ থেকে টাকা নেয়ার আগে অপারেশনে হাত দেবেনা,নিয়ে নেয় ৬ টাকাই। স্বস্তির শ্বাস ফেলে আবার জাঁকিয়ে বসি ভাঙা সিটে।

মধ্যবাড্ডা,মধ্যবাড্ডা,শুনে চমক ভাঙে। নেমে যাই, রিকশাতে করে বাকিটা যেতে হবে,বাসায় গিয়ে ভাড়া দেব। একজন দয়া করে রাজি হয়ে যায়,১৫ টাকা। তাই সই। তবে আজকে কপালে কিছু দুর্ভোগ লেখা ছিল,ব্রিজটা পার হবার সময়েই মহিলা আরোহীধারী তরুণ এক রিকশাওয়ালা মহা আনন্দে সামনে দিয়ে একটা ইউটার্ন নিল,বাঁচাতে গিয়ে আমারটার চাকা টাল। লাও এইবার সামলাও। সমাধান অবশ্য বের হয়,আরেক রিকশাওয়ালার কাছ থেকেই ১০ টাকা নিয়ে ভাড়া মেটাই,এবার সোজা বাসার সামনে এক মোবাইলের দোকান থেকে ৫০ টাকার কার্ড কিনে ভাঙতি টাকা। না,হবে না,এইবার রিকশাওয়ালার কাছে ৫০ টাকার ভাঙতি নেই। বৃষ্টির খেতা পুড়ি,শালার রবীন্দ্রনাথকে কোনদিন অফিস কাচারী করতে হয়নি বলেই অত মধুর মধুর গান বের হয়,এইরকম ২ দিন বৃষ্টির মাঝে ঢাকার জ্যাম ঠেঙালে হেভি মেটাল গান লিখতো বুড়ো,কোন সন্দেহ নেই। এসি গাড়িতে বসে থাকলে আমিও কি বৃষ্টিতে ২-১টা প্রেমের কবিতা লিখতাম না?

বুড়োকে গালি দেয়াটা কোন সমাধান না,দিলেও বুড়ো শুনবে না,কাজেই এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে টাকা ভাঙাতে হয়। হিসাব করে দেখি,১৬ টাকার বদলে খরচ করতে হলো ৮৯ টাকা,নিট লস ৭৩ টাকা,৫০০ টাকার ধাক আছে,স্বীকার করতে হয়। বাসায় ঢুকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়েই পড়ি। আধো ঘুম ধরে আসার সময় মনে পড়ে,৪ দিন টিউশনি থেকে উধাও, যেতে হবে। আমি কেন জমিদার হইলাম না,ভাবতে ভাবতে এক লাথিতে কাঁথা সরিয়ে বের হই,ছাতাটাকে বগলে নিয়েই,আকাশ হুমকি দিয়ে চলেছে কিন্তু মেটালিক এই শহরে নীপবনের আর কি দাম?

ছাত্রকে পড়িয়ে বের হই,বলা ভালো,চাপাবাজি করে বের হই। শহর যেন একটু থমকানো,বৃষ্টির কারণে যতটা না,হিম বাতাসে তার চেয়েও বেশি,মৌচাক মোড়টার নিস্তব্ধতা কানে বাজে। ১টা ১০ নম্বরে ঠেলাগুতা দিয়ে উঠে পড়ি,আজকে আর ভিড়টা খারাপ লাগেনা,হিমের দিনে মানুষের চেয়ে আরামদায়ক উষ্ঞতা আর কে দেবে,হলোই বা একটু ঠাসাঠাসি। স্বস্তিটা অবশ্য উবে যায় কন্ডাকটরের হুংকারে,আমার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকা চেংড়া টাইপ এক ছোকরাকে শাসাচ্ছে,পরের স্টপেই নামবি,নাইলে পিটায়া লাশ বানামু,পকেট মারলে অন্যখানে মার। বলে কি ব্যাটা? তাড়াতাড়ি সবেধন সম্বল মোবাইলটা চেপে ধরি পকেটে,যদিও ১২০০ টাকা কিন্তু তাই বা কোন ব্যাটা দেয়? ছোকরা বুঝানোর চেষ্টা করছে সে অতিশয় ভালো মানুষ,কিন্তু কন্ডাকটর নিঃসন্দেহ,ঝানু লোক,লাইনের সব চোর পকেটমার তার চেনা বলেই দাবী করে,এদিকে আমি আরেকটু সরে দাঁড়াই। ছোকরা নেমে যায় পরের স্টপেজেই,নামি আমরাও তার পরের স্টপে,বাড়িতে সবারই ফেরা লাগে,হোম,সুইট হোম,যেই বলে থাকুক,বড় সত্যি কথা,সব বাড়িই অস্থায়ী,তাও আমরা শুধুই ফিরতে চাই।

বাস থেকে নেমে কুঁকড়ে যাই,বাপরে বাপ,আজকে শীতই পড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকি,আবার শুরু হয়ে যায় টিপটিপ। একটু জিভে ছোঁয়াতে ইচ্ছে করে বৃষ্টির পানিটা,দেখতে ইচ্ছে করে আসলেই আকাশের টকটক গন্ধটাকে বৃষ্টিটা মিষ্টি করে দিতে পারলো কিনা। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি চাখার ইচ্ছাটাকে আর বাড়তে দিতে ইচ্ছা করে না,সুকুমার রায় থাকলে হয়তো পারতেন,আবোলতাবোল বকে গিয়ে ভেতরের শিশুটাকে বের করে আনতে। অনেক বেশি বড় হয়ে গেছি,পাগলা হাওয়ার বাদল দিন আর পাগল করে না,গা এলিয়ে ভেজার চেয়ে ফাইল আর ব্যাগ বাঁচাতেই বেশি ব্যস্ত হই,ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে কাবু হয়ে ঘরের কোণে কুনোব্যাং হয়ে শুয়ে পড়ি।

রিকশার হুড খুলে দিয়ে স্কুলবালক আর চিৎকার করে না,কিশোরীর হাতে কদমফুলও আমার চোখে আর রঙ লাগায় না,কাচের জানালার ওপাশে ইটের শরীর নিয়ে শুধুই বসে থাকি একশ' গ্রীষ্মের তৃষ্ঞা নিয়ে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:১৪
৪৩টি মন্তব্য ৪৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×