ভাইসব,বোনসকল,আমি কোন বক্তৃতা দিতে আসিনি। তবে কিনা,নির্বাচন সামনেই চলে এসেছে,এহেন অবস্থায় বাঙ্গালি আবারো তার গোল্ডফিশসুলভ স্মৃতিশক্তির পরিচয় দিয়ে অতীত ভুলে নয়া জোশে নৌকা আর ধানের শীষ নিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে, এমন সময়ে ২-৪ টা গরম কথা বলা,কি ২-৪ কলম লেখা, নিদেনপক্ষে কীবোর্ডে দুইটা থাবড়া দেয়া বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে পবিত্র কর্তব্য বলেই বোধ করি। যদিও এই গরম লেখা লিখতে গিয়ে আমার কীবোর্ডের ধোঁয়া বের হয়ে যাচ্ছে,কিন্তু বাঙালির পশ্চাদ্দেশের মতই আমার কীবোর্ডটাও থাবড়া খেয়ে অভ্যস্ত,কাজেই অন্য কাজে ফাঁকি দিয়ে হলেও লিখতে নেমে পড়তে কোন সমস্যাও দেখি না,পরোয়ারদিগার ভরসা।
কয়েক বছর আগেও বাজারে একটা কথা চালু ছিল যে বাংলাদেশের আমজনতার স্মৃতিশক্তির মেয়াদ মাত্র ৫ বছর,৫ বছর আগের সবকিছুই তার মন থেকে ধুয়েমুছে যায়। গদ্দিনশীন সরকার কি কি কুকাণ্ড করেছে শুধুমাত্র সেটুকুই তার মাথায় থাকে আর তার পূর্বে যে সরকার গদীতে জাঁকিয়ে বসেছিলেন তার কীর্তি এমনই ঝাপসা হয় যে ক্ষমতায় অলটারনেট করে যেটে আমাদের ধান্দাব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের কোন সমস্যাই হয় না। চোরে চোরে মাসতুতো ভাই সেটা পুরানো খবর,রাজনীতিবিদেরা যে আপন ভাইয়েরও বাড়া সেটার প্রমাণ দুর্লভ নয়,সাকা চৌধুরীর সোনার চালানও যেমন সাবের চৌধুরী ছাড়িয়ে দেন তেমনি ওয়াজেদ মিয়ার সোনা নিয়ে টানাটানি করার পরেও ছেলের বিয়ের দাওয়াত দিতে হাসিনার বাসভবনে ঢুকে হাসিমুখ দেখাতে সাকা চৌধুরীর কোন সমস্যা হয়না। নারীনেতৃত্ব হারাম বলার পরেও যুদ্ধাপরাধী নিজামীর কোলে বসতে ম্যাডাম খালেদার আপত্তি নেই,এদিকে স্বৈরাচার নিপাত যাক বলে রাজপথ কাঁপানোর পরে এরশাদের ছোট বোন হতে হাসিনা আপাকেও তেমন একটা নারাজ হতে দেখা যায় না। বাংলা সিনেমার স্বনামধন্য ভিলেন রাজীব বেঁচে থাকলে তাঁর সেই সিনেমাটিক স্টাইলে হুংকার দিতেন--"ক্ষমতা রেএএএএএ,ক্ষমতা!"
তা যাই হোক,আমরা আমজনতা,আমাদের কাজ সময় সময় বাঁদরনাচ নাচা আর ভোট দিয়ে হুজুরে আলা দের সামনে আমাদের পশ্চাদ্দেশখানা পেতে দেয়া বাঁশ ঢোকানোর জন্য। আমাদের জানার কথা নয় কয় ব্যাগ টাকার বিনিময়ে এয়ারপোর্টের কাছে হোটেল বানানোর অনুমতি দান করেন জাতির ভগ্নী অথবা কোকোর ফেরারী আর বিএমডব্লু কেনার টাকাই বা কোন গুপ্তধন থেকে আসে। জনতা এটাও জানতে চায় না যে জনতার পয়সায় অতি দেশপ্রেমিক নেত্রীর পুত্রধন জয় সেক্যুলার বাংলাদেশ নিয়ে যখন লম্বা প্রবন্ধ ফাঁদে তখন নেত্রী কেন তসবীহ আর ঘোমটা নিয়ে সিলেটের মাজারে ধর্ণা দেন আর রাজপুত্তুর তারেক যখন মদ আর নারীতে ভেসে যায় তখন তার মাতা কেন তার নিষ্পাপ পুত্রের সাফাই গেয়ে "এনশাল্লাহ" বিজয়ী হবার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অবশ্য জনতা বেশি কথা বললে বিপদ আছে,দৈনিক সংগ্রামের পেপার কাটিংয়ে জ্বলজ্বল করা দেশদ্রোহের প্রমাণ থাকার পরেও যখন জামাতীরা নিজামী আর গোলাম আজমকে আদালতে প্রমাণিত নয় সে অজুহাতে নির্দোষ দাবী করতে পারে,তখন এই ২ রাজবংশের বংশধররা পেছন দরজা দিয়ে সকল মামলায় জামিন পাবার পরে কার ঘাড়ে ক'টা মাথা তাদের মাসুমিয়াত নিয়ে প্রশ্ন তোলে?
প্রশ্ন তোলার প্রশ্ন অবশ্য তখনই আসবে যখন স্মৃতিশক্তি কাজ করবে আর অন্ধভক্তির বদলে যুক্তি কাজ করবে। আমাদের স্মৃতি যতদূর মনে হয় এখন ১ বছরও কাজ করে না,কাজেই হাসিনার সোনার ছেলেদের কীর্তি তো ধুয়েমুছে গেছেই,তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১ বছর না যেতেই তারেক রহমানের দিকেও আমজনতার সহানুভূতি দেখা গেছে আর এখন তো তারেক ভাই ত্যাগী নেতার পর্যায়েই চলে গেছেন। দুই দলই মোটামুটিভাবে ত্যাগী নেতা গড়ে তোলার বা উৎসাহিত করার বদলে অতীত সন্ত্রাসী বা পয়সাওয়ালা হঠাৎ নেতাদের মনোনয়ন দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে দিচ্ছে। কামাল মজুনদার বা পিন্টু যখন মনোনয়ন পেয়ে যায়,তখন বোঝাই যায় বড় দুই দলেরই নীতি হলো ছলে-বলে-কৌশলে,মেরে কেটে যেভাবেই হোক ক্ষমতা আনো,পরে উসুল করে নিও,জনতা তো আছেই মরিচবাটা হবার জন্য।
এক্ষণে,জনতার কথাও বলা লাগে কিন্ঞ্চিৎ। মানে,কেন এই আমজনতা-ই বারবার জামভর্তা হয়,সেইটার এখটা হালকা কার্যানুসন্ধান করা যাক। এইটা কি রাজনীতিবিদদের দোষ? কেন তারেক জিয়া বীর হিসাবে জেল থেকে বের হয়,কেনই বা সজীব ওয়াজেদের আমেরিকাপ্রীতি নিয়েকথা ওঠে না,কেনই বা ২ বছর ধরে জেলে পোরা চোর-ডাকাতরা একে একে সব মামলায় জামিন পায়,এ নিয়ে জনতার আসলেই কি কোন আক্ষেপ আছে? কেন,কিভাবে নিজামীর মত যুদ্ধাপরাধী নির্বাচনে উৎরে যায়,কাদের ভোটে,সেটা নিয়ে জনতা কি ভাবিত? ঠিক কি কারণে যুদ্ধাপরাধী ইস্যু শুধু ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় আর ক্ষমতায় গেলেই ধামাচাপা পড়ে,কেনই বা নিজামীর সাথে হাত মেলাতে হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যানার লাগানো দলের,কিভাবে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন ছিনতাই হয়,জনতা কি তার জবাব চায়? ম্যাডাম খালেদার সমর্থকদেরও কেন মুখ লুকাতে হয় তার পাশের চেয়ারে নিজামীকে দেখে,আর বুবু হাসিনার সমর্থকের কেন মাথা নিচু হয় তাদের নেত্রীর বেয়াই রাজাকার বলে? সমস্যা হলো,জনতা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। কারণ জনতার মন্ত্র হলো--"বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ,দাদা আমার পেছন মারার বাম্বুখানা কই?"
কাজে কাজেই জনতা বাম্বু খাবে। বাম্বু খাবে আর নাচবে,নাচবে আর নেতা-নেত্রীদের গুন গাইবে। সক্কল জনতাই যে আমজনতা তা নয়,এদের মাঝে কিছু কাঁঠাল জনতাও গজাবে,অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খেয়ে তারা একদিন মগডালেও উঠবে সন্দেহ নেই। এই কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল বলেই মনে হয় কাঁঠালভাঙ্গা সংস্কৃতিতেই আমরা বেশি আগ্রহী,সোজা রাস্তায় খাবার চেয়ে চুরি-ঘুষ-দুর্নীতি করে খাওয়াটাই ভাল মনে হয়। নইলে আক্ষেপ করে এই কথা বলতে হতো না যে রাজনৈতিক সরকার না এলে দেশে কাজকর্ম হবে না। বলি কাজকর্ম বন্ধ রেখেছে কে? ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যারা দাম বাড়ায় তারা তো আর নেতা নয়,এই জনতারই অংশ তারা। সমস্যা হলো,তারা আমাদেরই চরিত্র ধারণ করে,ফুড চেইনের উপরে উঠেই নির্বিচারে নিচেরগুলোকে খেয়ে সাফ করে ফেলা শুরু করে। তো এদিকে নেতারাও ফুলের মালা নিয়ে বীরের বেশে বের হওয়া শুরু করেছেন,অচিরেই কমিশন খাওয়া শুরু হয়ে যাবে। জনতার মনে জোশ এসে গেছে,ভোট নিয়ে বাজার গরম,কার প্রার্থী কম খারাপ সেই হিসাবে ভোট ভাগ করাও শুরু হয়ে গেছে। রাজতন্ত্র আগে ছিল ২ পরিবারে,এবার দেখা যাচ্ছে নেতারাও তাদের পুত্রকন্যাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন নির্বাচনে,খাবই যখন সবাই মিলেই খাই। জনতা বড়ই খুশি,আহা রাজার পরে রাজপুত্র,এবারে পাওয়া যাচ্ছে মন্ত্রীপুত্র কোটাল কন্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। কবে যে নেতার বাড়ির কুকুরগুলোও নির্বাচনে দাঁড় হয়ে যাবে কে জানে,অবশ্য সংবিধানের একটা ধারাও না জানা মূর্খ সন্ত্রাসী সংসদে যাবার বদলে কুকুরটা গেলেও খারাপ হয়না,সে ব্যাটা ঘেউ ঘেউ করতে পারে,তা সে সাংসদরাও করে,কিন্তু অন্তত চুরিডাকাতি করবে না।
কাজেই ভাইয়েরা এবং বোনেরা,আসুন আমরা আনন্দ করি। আমরা যা,আমরা তা-ই পাচ্ছি,আমরা তা-ই পাবো। আমাদের ভাগ্যের কোন বদল হবেনা,সে প্রতিশ্রুতি অবশ্য এবার মহারাজারা দিচ্ছেনও না। আমরা ৫০ টাকা কেজি চাল খাবো,তেনারা গুলশানে বুফে সাঁটাবেন। আমরা বাসে বাঁদুড়ঝোলা হয়ে যাবো,তাঁহারা বিএমডব্লু চালাবেন। আমাদের সন্তানরা খুপড়ি ঘরে আলুসেদ্ধ হয়ে স্বরে অ স্বরে আ শিখবে,আর আমাদের পয়সা চুরি করে উনাদের দুধ-ঘি খাওয়া তুলতুলে ছানারা ঠাণ্ডা ঘরে বসে ড্যাম কুল ইংলিশ মাড়াবে। তাহারা স্বর্গ থেকে দেশটার ইজারা নিয়ে এসেছে,আমরা তাদের স্বর্গোদ্যানের দিকে তাকিয়ে খালি বলতেই পারবো বাআআপরে,কত্ত উঁচা!
জনতার এইরকমই হবে,কারণ যারা আমাদের মত বেকুব তাদেরই সাংবিধানিক নাম জনতা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

