উলমের বাসগুলোতে নতুন একটা ফিচার যোগ হয়েছে । এখানকার বাসগুলোতে আগে থেকেই সামনে ও পেছনে স্কৃনে দু'টো করে মোট চারটা এলসিডি স্কৃন লাগানো আছে । বাসেরই কোথাও একটা কম্পিউটার থেকে ওগুলোর ছবি আসে । প্রথম যখন এগুলো লাগানো হয় তখন বাদিকে স্কৃনে স্টপেজের নামগুলো আসতো । আর ডানদিকেরটাতে কোন না কোন বিজ্ঞাপন দেখাতো । সম্প্রতি এই বিজ্ঞাপনের সাথে যোগ হয়েছে নিউজ হেডলাইন দেখানো । জনপ্রিয় একটি জার্মান চ্যানেলের খবরের হেডলাইনগুলো দেখানো হয় সেখানে । আইডিয়া উদ্যোগ যেটাই বলি না কেন সেটা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ ।
আজ অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে ওটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম । ওখানে প্রথম হেডলাইনটা ছিলো জার্মান লেখক গুয়েন্টার গ্রাসের আশিতম জন্মদিন নিয়ে । গুয়েন্টার গ্রাসের লেখক জীবন নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই । বিশ্বসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ন স্তম্ভ তিনি । সাহিত্য ছাড়াও জার্মান বাম রাজনীতিতে তিনি যুক্ত । পঞ্চাশের দশকে তার বিখ্যাত উপন্যাস টিন ড্রাম প্রকাশের কিছুদিন পরেই প্রকাশ্য উইলি ব্রান্ডট্-এর এসপিডির (সোশাল ডেমোক্র্যাটদের) সমর্থনে কাজ করতে থাকেন । সেই থেকে গুন্টার গ্রাস জার্মান বাম রাজনীতির একজন ব্রান্ড এ্যাম্বেসেডর ।
শুভ জন্মদিন প্রিয় লেখক গুয়েন্টার গ্রাস ।
জার্মানীতে গত বছর প্রকাশিত হয়েছে গুয়েন্টার গ্রাসের আত্মজীবনি । অগাস্ট মাসে সেটা বের হয় । আমার তিন বছরের জার্মানবাসে হ্যারি পটারের পর এটারেই সবচেয়ে সাড়াজাগানো বই চিহ্নিত করবো । এই সাড়া জাগানোর আরেকটা কারনও ছিলো । বই প্রকাশের কিছুদিন আগে গ্রাস এক সাক্ষাতকারে তার জীবনের এক কালো অধ্যায়ের কথা স্বীকার করেন । তিনি এই স্বীকারোক্তিতে তাঁর আত্মজীবনিতে লিখেছেন বলে সাক্ষাতকারে জানান । সেখানে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভাফেন এসএস (Waffen SS)এর ট্যাংকবাহিনীর গানার ছিলেন । গ্রাসের এই স্বীকারোক্তি জার্মানীসহ পুরো বিশ্বের মুক্তবুদ্ধির চিন্তাভাবনায় একটা ধাক্কার মতো ছিলো । গভীর দুঃখবোধে আমিও আক্রান্ত হই । বিশ্বাসের জায়গাগুলো নড়বড়ে হয়ে গেলে বাকি সবার যেমন হয় । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এধরনের স্বীকারক্তি বা হঠাৎ করে কারো পুরনো ইতিহাস প্রকাশ হয়ে পড়া একেবারে নতুন ঘটনা না । তবে গ্রাসের ব্যাপারটা ভিন্ন ছিলো । গুয়েন্টার গ্রাস এতোশত দার্শনিকের জন্ম দেয়া জার্মানীর “মোরাল অথরিটি বা মোরাল ইনস্টিটিউশন বলা হতো । এরকম একজন ব্যক্তির দীর্ঘ ষাট বছর নিজের এই কলঙ্কিত ইতিহাস লুকিয়ে বেড়ানোটা কেউই সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি ।
সবার মধ্যেই কিছু অমিমাংসিত প্রশ্ন থাকে । এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের সারাজীবনই বিক্ষিপ্ত করতে থাকে । আমার মনেও এরকম একটা অমিমাংসিত প্রশ্ন আছে । প্রশ্নটা হলো একজন ব্যক্তিমানসকে আমরা আসলে কিভাবে বিচার করবো ? ব্যক্তির পুরো জীবনটা এ্যাজ-এ-হোল নাকি তার জীবনের প্রতিটি অর্জন ব্যর্থতা আলাদা আলাদাভাবে বিচার্য্য ? এর একটা সহজ সমাধান আমরা করি । ভালো মন্দের একটা তুলনা করে সেটার ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি একজন ব্যক্তি সম্পর্কে । সমাধানটার খুব শক্ত যৌক্তিক ভিত্তি নেই । কারন এই ধরনের দাড়িপাল্লা পদ্ধতিতে ওজনের কোন নির্দিষ্ট মানদন্ড নেই । সোজা কথায় ব্যক্তির এক একক খারাপ কাজ ইক্যুয়াল টু কত একক খারাপ কাজ এটা নির্ধারণ করার সর্বগ্রাহ্য কোন মানদন্ড নেই । একেকজন একেকভাবে বিষয়টা দেখবে । কেউ হয়তো আইনস্টাইনের সারাজীবনের বৈজ্ঞানিক অবদানকে তাঁর লেখা চারটি চিঠির থেকে বড় করে দেখবে । আবার কেউ হয়তো সে চারটি চিঠির জন্যই আইনস্টাইনকে তুলোধুনো করবে । গুয়েন্টার গ্রাসের স্বীকারোক্তিও আমাকে এই একই প্রশ্নের মুখোমুখি করেছিলো । গুয়েন্টার গ্রাসের সারাজীবনের ইন্টেলেকচুয়াল লিডারশিপ বড় নাকি তার কৈশোরত্তীর্ন বয়সের অপরাধ বড় ?
বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০০৭
আজকে বিডিনিউজ২৪-এ একটা ছোট হেডিঙে চোখ আটকালো । ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রি মহমোহন সিং বুশকে ভারত-আমেরিকা নিউক্লিয়ার ডিল বিষয়ে অভ্যন্তরীন চাপ সম্পর্কে অবহিত করেছেন । এই অভ্যন্তরিন চাপটা এসেছে মূলতঃ ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের অংশিদার পশ্চিমবঙ্গ বাম ফ্রন্টের কাছ থেকে । নন্দিগ্রাম ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ বাম সরকারের ভূমিকায় ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলাম না । এর মধ্যে এই ছোট্ট খবরটা একটু আরাম দিলো ।
আমাদের দেশেও একশ্রেনীর বিজ্ঞানী আমলা রাজনীতিকরা দেশে নিউক্লিয়ার পাওয়ারপ্লান্ট বসানোর তোড়জোড় শুরু করেছেন । দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানী চাহিদা মেটানোর জন্য এটাই নাকি একমাত্র বুদ্ধি । এই নিউক্লিয়ার প্লান্ট বসানোর জন্য আনবিক শক্তি বিষয়ক আন্তর্জাতিক মোড়ল সংস্থার অনুমতিও পাওয়া গেছে । এবং এটার খরচের ৬০ ভাগ সরবরাহের জন্য দক্ষিন কোরিয়ার কাছ থেকে সম্মতিও নাকি পাওয়া গেছে । ২০১৫ সালের মধ্যে এই প্রজেক্ট কাজ শুরু করতে পারবে খবরে বলে জানলাম ।
এই ধরনের প্রজেক্টের নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে । প্রথম সমস্যা স্বাস্থ্যগত । পৃথিবীতে এধরনের পাওয়ার প্লান্টের আশেপাশের এলাকায় অনেক ধরনের ব্যাখ্যাতিত (অথবা ব্যাখ্যাগুলো চেপে যাওয়া হয়) স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা যায় । দ্বিতীয় সমস্যা পারমানবিক বর্জ্য নিস্কাশন । এধরনের বর্জ্য দীর্ঘকাল ধরে তেজস্ক্রিয়তা নির্গমন করে । এটার কোন দিকনির্দেশনা বিশেষজ্ঞমহল বা আমলামহল কারো কাছ থেকেই এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি । তৃতীয়ত, এধরনের নিউক্লিয়ার প্রজেক্টের অন্য সব ধরনের প্রজেক্টের মতোই একটা ওয়োর্স্ট পসিবল ডাউনসাইড পটেনশিয়াল থাকে । সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান ইউক্রেন) চেরনোবিল দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা এরকম একটা ডাউনসাইড পটেনশিয়াল দেখেছি । এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সেটার ক্ষয়ক্ষতি কতোটা মিনিমাইজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে সেটার বিষয়ে নীতিনির্ধারক মহল কি চিন্তা করেছেন সেটা জানার আগ্রহ বোধ করি ।
জার্মানীর বামপন্থি গেরহার্ড শ্রোয়েডারের সরকার নিউক্লিয়ার পাওয়ারপ্লান্টের এসব নেতিবাচক দিক লক্ষ্য করে ২০২০ সালের মধ্যে জার্মানীর সকল নিউক্লিয়ার পাওয়ার জেনারেটর বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো । ডানপন্থি আঙ্গেলা মারকেল সরকারও সেটা স্পস্ট ভাষায় বহাল রাখার সিদ্ধান্ত জারি রেখেছে । রাশিয়ান পাওয়ার সাপ্লায়ারদের খামখেয়ালির মধ্যে তাদের এ সিদ্ধান্ত বেশ সাহসিকতার । অল্টারনেটিভ এনার্জির প্রযুক্তির জোরই হয়তো তাদের এই সাহসের কারন ।
আমাদের দেশের এরকম সাহস নেই । দেশের অনেকটা অংশেই কোন বিদ্যুৎ নেই । যেসব জায়গায় আছে সেখানের জনগন লোডশেডিঙে অতিস্ঠ । প্রায়ই আন্দোলন-ফান্দোলন করে প্রান খোয়াতে হয় আমাদের । বুকে একগাদা স্বপ্ন নিয়ে বাস করি বলে আমাদের অভাগা দেশটা সবসময় শর্টকাট খোঁজে । শর্টকাট কোন পদ্ধিতিতে সব-পেয়েছির-দেশ বানিয়ে ফেলতে চাই আমরা । শর্টকাট পদ্ধতির পাওয়ার জেনারেশনের পরিকল্পনা ওপর কি বিপদ ডেকে আনছে কে জানে !
শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০০৭
আমি আগে থাকতাম উলম নামে একটি ছোট্ট শহরে । উলমের পাশ দিয়ে ডোনাউ (ইংরেজী নাম দানিউব) নদী বয়ে গেছে । এই ডোনাউ নদীর একপাশে বাডেন ঊর্টেমবার্গ প্রদেশ, আরেকপাশে বায়ার্ন (ইংরেজী নাম ব্যাভারিয়া, তিন গোয়েন্দার বোরিস ও রোভার ভ্রাতৃদয়, ও ফুটবল টিম বায়ার্ন ম্যুনশেনের এলাকা এটা) প্রদেশ । নদী পেরোলেই বায়ার্নের যে শহরটা পড়ে সেটাতেই আমি থাকি এখন । শহরের নাম নয়-উলম (ইংরেজীতে নিউ উলম) । এই শহরেরও শেষ প্রান্তে এক আমেরিকান সৈন্যদের পরিত্যক্ত এক ব্যারাকে আমার বাস । বাসে করে পাশের শহরে যেতে ২২ মিনিট লাগে । কাজের জায়গা, ইউনিভার্সিটিতে যেতে দিনের একটা বড় সময় নষ্ট হয় যাতায়াতে ।
পুরো নয়-উলম শহরটাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে । দেখতে বেশ লাগে কিছু জায়গা । মধ্যযুগীয় শহর উলম থেকে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় নেমেছে যেন এরা । ইউরোপের সবচেয়ে ধনী দেশের সবচেয়ে ধনী স্টেট বলে কথা । আর্থিক দিক দিয়ে ধনী হবার পাশাপাশি স্রষ্টাও এদের দুহাত ভরে সম্পদ দিয়েছেন । পাহাড় নদী লেক কোনটারই কমতি নেই এই প্রদেশে ।
তো, এদের এতো কিছু থাকা সত্ত্বেও গোটা জার্মানীতে এরা একটু আলাদা হিসেবে বিবেচিত । বায়েরিশদের (বায়ার্নের অধিবাসী) গোয়ার স্বভাবই এর জন্য দায়ি মনে হয় । হিটলারের সবচেয়ে শক্ত ঘাটি হিসেবে বায়র্নেরই এক শহর ন্যুর্নব্যর্গ (ইংরেজী উচ্চারন নুরেমবার্গ) বিখ্যাত ছিলো । এই বায়ার্নেরই এক ছোট্ট শহর নয়-উলমে আজকে এক বুস হালটেস্টেলেতে (ইংরেজী, বাস স্টপেজ) বড় করে দুইটি স্বস্তিকা আকা দেখলাম । নিও নাৎসিদের কাজ এগুলো । দেখার সাথেই বুঝলাম উলমের রাস্তা ঘাটে রাতে ঘোরা ফেরা করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে । আমি জানি আক্রান্ত হলে পুলিশে খবর দিলে ওরা বিদ্যুৎ গতিতে ব্যবস্থা নেবে । নিওনাৎসিটাইপ কাজকর্ম এরা খুব কঠোরহাতে দমন করে । তবুও ঠিক ভরসা আসে না । নিজের স্বার্থেই গুটিসুটি মেরে থাকতে হবে এখন থেকে । স্বস্তিকাচিহ্ণ নিয়ে আগামী সপ্তায় কম্প্লেইন দেবো ঠিক করেছি । ওরা হয়তো এটা মুছে ফেলবে তারপর । কিন্তু এভাবে চিহ্ণ মুছে এদের দমন করা যাবে না । সাউথে আমরা ভালোই শান্তিতে থাকি । নর্থের অবস্থা ভালোই খারাপ । অনেক এলাকায় ফরেইনারদের জন্য নো গো (No Go) এলাকা । ব্যর্লিনে এই সেদিনও জার্মানীতে কনফারেন্সে আসা এক বাঙ্গালী পিএইচডি ছাত্র নিওনাৎসিদের হুঙ্কার শুনে এসেছেন । তাঁর ভাগ্য ভালো তিনি কোনরকম হামলার শিকার হননি । কিছুদিন আগে এই রেসিজম নিয়ে কে যেন একটা পোস্ট করেছিলেন । আমি বলেছিলাম এর থেকেও খারাপ ঘটনা ঘটে । সেগুলো নিয়ে আরেকদিন হবে । আজ এ পর্যন্তই । শোয়েনেস ভোখেনেন্ডে ।
টিকাঃ
১. ভোখেনব্লাট – ভোখেন মানে সপ্তাহ, ব্লাট মানে পৃষ্ঠা
২. ভাফেন এসএস, ইংরেজী আর্মড এসএস । নাৎসি বাহিনীর এলিট ফোর্স এটি । হিটলারের দেহরক্ষি বাহিনী, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প পরিচালনা এবং নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাপোর্টের জন্য এলিট কমান্ডো ফোর্সের সৈন্য এই ভাফেন এসএস থেকেই আসতো ।
৩. শোয়েনেস ভোখেনেন্ডে উইকেন্ডের জন্য শুভেচ্ছা ।
৪. আমার ইচ্ছা আছে প্রতি উইকএন্ডে এরকম একটা ভোখেনব্লাট দেবার । দেখা যাক কতদুর নিয়ম রক্ষা করে চলা যায় ।
৫. আমেরিকান সেনাবাহিনীর কাছে রক্ষিত গুয়েন্টার গ্রাসের ভাফেন এসএস প্রিজনার অফ ওয়ার রেকর্ড ।
৬. আলোচনাসহ সচলায়তন লিংক
(এ লেখাটি সচলায়তনে প্রকাশিত । ওখানে কিছু মূল্যবান আলোচনা পাবেন মন্তব্য হিসেবে । আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন ।)
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


