somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ষাট বছরে ভারত

১৩ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ সম্প্রতি CNN-IBN চ্যানেলের হয়ে স্বাধীন ভারতের দশটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরেছেন, যেগুলোকে স্বাধীন ভারতের যাত্রাপথে বিভিন্ন মোড় বলে ভাবা যেতে পারে। কোনো ঘটনা ভাল প্রভাব এনেছে তো কোনোটি খারাপ। তবে ভারতীয় জনমানসে এই ঘটনাগুলোর স্মৃতি বা পরিণতি বহুকাল থাকবে। ঘটনাগুলোর মধ্যে আটটি রাজনৈতিক ও বাকিদুটোকে অরাজনৈতিক বলা চলে।

প্রথমটি শুরু হয় কাশ্মীরের ভারত সংযুক্তি নিয়ে। পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করলে, স্বাধীন জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা ভারতের সাথে প্রতিরক্ষার বিনিময়ে ‘Treaty of Accession’-এ সই করেন। চুক্তিমত ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে। এক শান্তিপূর্ণ গণভোটের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জাতিসংঘ যুদ্ধ থামালেও পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান কেউই গণভোটে কোনোরকম আগ্রহ না দেখিয়ে কাশ্মীর নিয়ে বারবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অপরদিকে, কাশ্মীরের জনগণ তাদের বলপূর্বক ভারতভুক্তির প্রতিবাদে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। কাশ্মীর ছাড়াও আরো কিছু রাজতন্ত্রের বলপূর্বক ভারতভুক্তি নিয়ে আজও প্রশ্নচিহ্ণ থেকে গেছে।

দ্বিতীয়টি হল ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারক সংবিধান রচনা। ১৯৪৯ সালে রচিত এই সংবিধান ১৯৫০ সালে কার্যকর হয়। সংবিধানের সাহায্যে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের পথ চলা শুরু হলেও পরবর্তীকালে বারবার সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে স্বাধীন ভারতে।

তৃতীয় ঘটনা হল ১৯৫২ সালের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। নির্বাচন চলাকালে লোকজনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল তা আজো দেখা যায় না। ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, কিন্তু ভোটের অঘোষিত নায়ক ছিলেন সুকুমার সেন, ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার। তিনি ভোট পরিচালনায় বহু অদ্ভূত পন্থা অবলম্বন করেছিলেন যা সমসাময়িক বিশ্বে নজিরবিহীন। তবে তখনকার মত এখনো ভোটপ্রক্রিয়ায় জনগণের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ণ রয়েই গেছে। তবে, শুরু থেকেই ভোটে সব ভারতীয়র ভোটাধিকার ছিল, যা তৎকালীন বিশ্বে হাতে গোনা কয়েকটি দেশে পাওয়া যেত, ছিলনা আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডেও।
(আমি এবিষয়ে খুঁজে দেখলাম ভারতেও যৌন প্রতিবন্ধীদের(হিজড়ে) ভোটাধিকার দেওয়া হয় নব্বই-এর দশকে - সুতরাং সবার ভোটাধিকার ছিল না। বর্তমানে লোকসভায় একজন প্রতিনিধিও এই গোষ্ঠিভুক্ত।)

চতুর্থ হল পঞ্চাশের দশকের ভাষাভিত্তিক রাজ্য-পুনর্গঠন। ১৯৫২ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী পট্টি শ্রীরামালু তেলেগুভাষী অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য ৫৮ দিন অনশনের পরে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু এক আন্দোলনের সুচনা করে যার ফলশ্রুতিতে গঠিত হয় সহায়তা কমিশন। কমিশনের বক্তব্য অনুসারে গঠিত হয় কেরল, অন্ধ্র ও কর্নাটক। পরে বাকি রাজ্যগুলোও পুনর্বিন্যস্ত হয় একই প্রক্রিয়ায়। ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের সাথে সাথে সব রাজ্যকে নিজস্ব ভাষায় রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার ফলে আজও হিন্দিকে জাতীয় বা সরকারি ভাষা হিসাবে কেন্দ্র চাপিয়ে দিতে পারেনি।

পঞ্চম ঘটনা হল পোখরাণের পরমাণু বোমা পরীক্ষা। এর মধ্যে নেহেরুর জায়গায় এসে গেছেন ইন্দিরা, নেহেরুর সুযোগ্য কন্যা। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ অবধি গবেষণার ফল হিসাবে ভারত ষষ্ঠ দেশ হিসাবে পরমাণু শক্তিধর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। রামচন্দ্র গুহর মতে, এই ঘটনার পর থেকে গান্ধীবাদী শান্তিকামী বিদেশনীতি ভারত ধীরে ধীরে বর্জন করে আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদী বিদেশনীতি গ্রহণ করে।

ষষ্ঠ হল ১৯৭৪-এর কুখ্যাত জরুরী অবস্থা। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে যখন ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ১৯ মাসের এই জরুরী অবস্থায় এই সময়ে সংবিধান ও লোকসভা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইন্দিরা গান্ধী স্বৈরাচারী শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সারাদেশে কংগ্রেস জনপ্রিয়তা হারায় ও ফলশ্রুতিতে ১৯৭৭-এর নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন মোরারজি দেশাই। ইন্দিরা গান্ধী নিজে দুটি নির্বাচন কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়ে দুটিতেই পঞ্চাশ হাজারেরও বেশী ভোটে পরাজিত হন। দেশে কংগ্রেস কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে।

সপ্তম হল ১৯৮৯ এর মন্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা। প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংহ এই আইন পাশ করিয়ে নিম্নবর্গীয় জাতিদের জন্য অতিরিক্ত ২৭% সংরক্ষণ চালু করেন। এই ঘটনা ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত যা আজও বিভিন্ন আকারে আত্মপ্রকাশ করে আসছে। সম্প্রতি আই-আই-টি সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই সংরক্ষণ কার্যকর করার সময় একই বিতর্ক উঠে আসে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে সংরক্ষণের মাধ্যমে সত্যি কতটা উন্নতি হয় – সেই প্রশ্ন। আর আছে অর্থনৈতিক মাত্রার পরিবর্তে সামাজিক মাত্রায় সংরক্ষণে সমাজের সুস্থিতি নষ্ট হবার সম্ভাবনা।

অষ্টমে আসে ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা। এর ফলশ্রুতিতে ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নেহেরু যে ‘হিন্দু পাকিস্তান’ বর্জন করতে চেয়েছিলেন, ঘুরেফিরে তাই যেন হাতছানি দেয় পরবর্তী নির্বাচনে। এখন অবস্থার উন্নতি হলেও ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এরপরে অরাজনৈতিক ঘটনাদুটো চলে আসে। আসে ১৯৮৩ সালের ক্রিকেট বিশকাপ জয়। এই জয় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গণে ভারতের প্রথম বিশ্বজয়। তার থেকেও বড় কথা, এর ফলে ক্রিকেট ভারতের নবতম ফ্যাশনে পরিণত হয়। উঠে আসেন একের পর এক ক্রিকেট আইকন – কপিল দেব, গাভাসকার ও শচিন তেন্ডুলকর। ভারতে আয়োজিত পরবর্তী বিশ্বকাপের সময় সেই উন্মাদনা আরো গভীরে প্রোথিত হয়।

সবশেষে আসে ভারতের অর্থনৈতিক সংষ্কার। ১৯৯১ সালে বেকায়দায় পড়ে সরকার যে উদারীকরণের পথে চলা শুরু করেছিল, তা আজকে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির শুরু বলে পরিগণিত হয়। একদা সমাজতান্ত্রিক অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহ যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিলেন, তার ফলে ভারতের অর্থনীতি যেমন একদিকে বার্ষিক ৬% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, ভারতীয় কোম্পানিরা যেমন শূন্য থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বাজারে স্থান করে নিয়েছে, তেমনই ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন গেছে বেড়েই চলেছে। তৈরী হয়ছে পুঁজিহীন বনাম পুঁজিবাদীদের এক অদৃশ্য লড়াই। মোটের ওপর আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক সংষ্কারের ফলাফল ভাল বলে মনে হলেও আরো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে এর সঠিক মূল্যায়নের জন্য।

এছাড়াও আলোচনায় আসে ষাটের দশকে আই-আই-টির পত্তন, একাত্তরের ভারত-পাক যুদ্ধ, পরিবেশবাদী চিপকো আন্দোলন, ইনফোসিসের ন্যাসড্যাকে যোগদান ও টাটার কোরাস কিনে নেবার ঘটনাও।

আমি অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্যের সাথে সহমত হলেও ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জয়ের পরিবর্তে চিপকো আন্দোলনকে আগে রাখবো। কারণ ভারতের মত গরিব দেশে যে পরিবেশ রক্ষায় গণ-আন্দোলন হতে পারে, সেটাই প্রমাণ করে দেয় সত্তরের দশকের এই আন্দোলন। পরে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাছাড়া, বর্তমান শিল্পায়নের যুগে পরিবেশ-রক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

তবে একটা ব্যাপার অনস্বীকার্য যে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা দিবসে কেউ হলফ করে বলতে পারেনি যে এই দেশ ষাট বছর অটুট থাকবে। পশ্চিমের রাজনীতিবিদরা মনে করেছিলেন বহুভাষা-ধর্মের দেশে অচিরেই ফাটল ধরবে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেছিলেন ব্রিটিশ পুঁজির প্রস্থান ও প্রযুক্তির অভাবে শিল্পায়ন হবে না। কিন্তু সব সত্ত্বেও ভারতের ষাট বছর পূরণ হল। রামচন্দ্র গুহর মতে এর জন্য সর্বাধিক কৃতিত্ব প্রাপ্য হল ভারতীয় সংবিধানের, তাই শ্রেষ্ঠর শিরোপা যায় সংবিধান প্রণয়নের - স্বাধীন ভারতে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

অনুষ্ঠানের ভিডিওটি পাবেন এখানে
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শরৎ বন্দনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯


শরৎ এলেই আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা
দিনমণি আর মেঘমালার লুকোচুরি খেলা।

রুম ঝুমঝুম নূপুর পায়ে ছুটছে নদীর ঢেউ
ভাটিয়ালি গাইছে গান অচিন সুরে কেউ।

বিলে ঝিলে শাপলা পদ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×