গত ১১ই মে-২০০৯ সোমবারের দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার চতুর্থ পৃষ্ঠার পঞ্চম কলামের পাত্র-পাত্রী শিরোনামের ৩ নং বিজ্ঞাপনটি আমি বেছে নিলাম। অবশ্য পরের দিনও বিজ্ঞাপনটি এসেছিল। যোগাযোগ করার জন্য ফোন b¤^i দেয়া হল : ০১৬৭৪৮৭০৯৮৭। ফোন করলাম। বলল, আমার নাম কাওসার। অফিস উত্তর যাত্রাবাড়ী।’ আমার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য নিল। এরপর বলল, ম্যাডাম আসলে আপনার মত পাত্রই খুজছেন। আপনি চলে আসুন।’ আমি বললাম, আপনার ঠিকানা দেন। কিভাবে আসব? আসতে হলে আমার কি করতে হবে? সে বলল, আপনাকে প্রথম ৬৫০ টাকা দিয়ে সদস্য হতে হবে। ছবি নিয়ে আসবেন এক কপি।’ আমরা পাত্রী দেখাবো। যদি পছন্দ হয় তাহলে আপনাকে আরো ২৫০০ টাকা দিতে হবে। আপনি যাত্রাবাড়ী এসে ফোন করবেন। আমি আপনাকে অফিসে নিয়ে আসব।’
কথা শুনে আমার মনে সন্দেহ জাগল। নিজের অফিসের নাম দিতে চায় না। অফিসের ঠিকানা দিতে চায় না। কিছু দু b¤^ix আছে সন্দেহ নেই। মনে করলাম আর যোগাযোগ করব না।
দুদিন পর সে নিজেই ফোন করল। কি আপনি যে আসলেন না। কবে আসবেন? বলেন। ম্যাডাম বলেছে আপনার সাথে ফাইনাল কথা না বলে সে অন্য কারো সাথে কথা বলবে না।’ আমি কথা দিলাম শুক্রবার বিকালে আসব। কিন্তু শুক্রবারও আমার মত পরিবর্তন হল। কিভাবে যে না বলে দেই, ভাবতে থাকি। কিন্তু লোকটি শুক্রবার বিকাল হওয়ার আগেই ফোন করল। বলল, কখন আসছেন? আমি বললাম, আমাদের এখানে এখন ঝড়-বৃষ্টি, আসা সম্ভব নয়।’ সে বলল, আমি এখন আপার বাসায় আছি। সে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনি তার সাথে একটু কথা বলবেন? আমি বললাম, সাক্ষাতে বলা যাবে, এখন নয়। সে বলল, তাহলে আগামী কাল সকাল দশটায় আসেন।’ আমি সম্মতি দিলাম। মনে মনে নিয়ত করে নিলাম, একটি জগত সম্পর্কে কিছুটা অভিজ্ঞতা যদি হয়, মন্দ কি? রথ দেখতে যেয়ে কলা বিক্রি হয়ে গেলে দোষেরই বা কী? বিবাহ না হলেও জানা যাবে এ জগত সম্পর্কে অনেক কিছু। আমি এ প্রকল্পের জন্য একটি বাজেটও ঠিক করি। কোন ভাবে সে বাজেট অতিক্রম করব না বলে প্রত্যয় নিলাম। শনিবার ১৬ ই মে যাত্রাবাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। বাসে বসে সে কি কল্পনা! আমার পাত্রীটি যদি একেবারে বৃদ্ধা হয়, তাহলে কি বলব? আবার বৃদ্ধা না হয়ে যদি কুৎসিত হয় তাহলে কি বলব? বাসে কোন মেয়ে দেখলে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। ভয়ও লাগে নতুন আইনে আবার ধরা খেয়ে যাই কিনা। আর ভাবি, আমার পাত্রীটা যদি এ মেয়েটির মত হত। আবার আরেক জনের দিকে তাকাই। বলি, যদি আমার পাত্রীটি এমন না হত। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে বাস গিয়ে পৌছল যাত্রাবাড়ী। ফোন করলাম কাওসার-কে। কি মুধুর তার কথা! বলল, ওভার ব্রিজ পার হয়ে উত্তর পাশে এসে একটা রিকসা নিয়ে আপনি ধলপুর কমিউনিটি সেন্টারের গেটে আসুন। ওখান থেকে আপনাকে অফিসে নিয়ে আসব।’ মনে শংকা জাগল, আবার আমি পনবন্দি হয়ে যাবো না তো? যদি আমাকে আটক করে আত্নীয় সজনকে খবর দেয়, টাকা পয়সা দাবী করে বসে, তাহলে তো আমার মান ইজ্জতও যাবে, যাবে ছালাও। স্ত্রী হয়ত দ্বিতীয় বিবাহ করতে যাওয়ার অন্যায়টি ক্ষমা করে দিয়ে তৃপ্তি পাবে। কিন্তু অন্যরা কি বলবে? রিকসা একটা নিলাম। কিছুক্ষণ পর এসে নামলাম ধলপুর কমিউনিটি সেন্টারের গেটে। পাশেই গোলাপবাগ মাঠ। দাড়িয়ে থাকলাম এক ঘন্টার মত। যতবার ফোন করি ততবারই সে বলে পাচ মিনিটের মধ্যে আপনাকে নিয়ে আসছি। দেখলাম, কিছুক্ষণ পর একটা লোক গেটে এসে মোবাইল করছে। বুঝলাম সে আমাকেই খুজছে। কিন্তু দেখলাম, পাশে অপেক্ষমান পঞ্চাশোর্ধ দু জনের এক জনের মোবাইলে রিং হল। লোকটি তাদের বলল, চলেন।’ দুজনকে নিয়ে চলে গেল। আমার বুঝতে বাকী রইল না যে, এরা আমার অগ্রজ। সিরিয়ালে আমার আগে। তাদের নিয়ে যাওয়ার পর যখন ত্রিশ মিনিট পূর্ণ হল, তখন আমি ফোন করে বললাম, আমি আজকে আপনার সাথে দেখা করতে পারব না। সময় নেই। আরেকদিন আসব। আমি চললাম।’ সে বলল, না, না এক্ষুনি আপনাকে নিয়ে আসব। এই তো লোক যাচ্ছে।’ কিছুক্ষণ পর সেই লোকটিই আসল, মোবাইলে রিং দিল, আমার মোবাইল বেজে উঠতেই সে আমাকে সনাক্ত করল। বলল, চলেন।’ আমি চললাম। কমিউনিটি সেন্টারের দক্ষিণ পাশে ছয় তলা দালান। গেটে লেখা জয়া বিউটি পার্লার।’ উঠে গেলাম চার তলায়। সেখানে একটি রুমে বসানো হল আমাকে। তারা দু জন লোক। কাওসার হল বস, অন্যজন তার সহকারী। কিন্তু তাদের চোখে মুখে একটা ভীতু ভীতু অপরাধী ভাব লক্ষ করলাম। কোন সাইন বোর্ড নেই। কাগজপত্র নেই। আছে টেবিল চেয়ার আর সোফা। বলল, আপনি বসেন। আরো দুজন লোক আছে তাদের বিদায় করে আপনার সাথে একান্তে কথা বলব। খুশী হলাম। পনবন্দি হওয়ার আশঙ্কা কেটে গেল অনেকটা। কিছুক্ষণ পর ওই দুজনকে আমার রূমে বসিয়ে আমাকে নিয়ে গেল কাওসারের রূমে। একটা বড় টেবিল। কম্পিউটার ও আর কিছু ফাইল পত্র। দেয়ালে কুরআন ও হাদীসের বাণী লটকানো। কাওসার আমাকে বলল, আপা যে রকম পাত্র চেয়েছে আপনি ঠিক তার মনের মত। আপনাকে দেখলে এক চান্সে ইয়েস’ বলবে। আর ইয়েস বললে আপনাকে আরো ২৫০০ টাকা দিতে হবে। আমরা কাজ শুরু করে দেব। আর বিয়ের পর আপা আপনাকে পাচ লক্ষ টাকা দেবে। আপনি সেখান থেকে আমাকে একটি বড় অংক বখশীশ হিসাবে দেবেন।’
এরপর একটা কাগজে আমার নাম ঠিকানা লিখল। দাবী মত সদস্য ফি ৬৫০ টাকা দিলাম। বলল, আরো কিছু দেন চা খেতে। আরো পঞ্চাশ টাকা দিলাম। মোট ৭০০ টাকা খসে গেল। মনে মনে বললাম, যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছি এর চেয়ে তোমরা আমাকে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। টাকা নেয়ার পর বলল, আপনার আশে পাশে কোন কাজ আছে? থাকলে সেরে আসুন। আমি বললাম, আমার আশে পাশে কোন কাজ নেই।’ যদি কাজ না থাকে তাহলে একটু বাহির থেকে ঘুরে আসুন, আমি আপনাকে কল করে ডাকব’ বলল কাওসার। আমি বললাম, আপনি আমাকে কখন ছাড়বেন।’ সে বলল, এখন সময় পৌনে এগারটা আপনাকে সারে এগারটার মধ্যে বিদায় দেব। পাত্রীর সাথে আপনাকে দেখা করার পর আজকে আর কোন কাজ নেই।’ পাত্রীর সাথে সাক্ষাত কি তার বাসায় হবে, না আপনার এখানে’ জিজ্ঞেস করলাম। বলল, না, না, তার বাসায় সাক্ষাত হবে।
আমি বের হয়ে এদিক সেদিক ঘুরলাম। পৌনে বারোটা বেজে যায় তখনো আমার ডাক আসে না। মনে মনে ভাবলাম, হয়ত এখন বলবে আজকে পাত্রী সাক্ষাত দিতে প্রস্তত নয়।
আমি ফোন লাগালাম, কাওসার বলল, আরে আসুন, আসুন। আপনাকে খোজ করছি। আপা এখানে আসতেছে। প্রোগ্রাম ছিল তার বাসায় মিট হবে। কিন্তু তার বাসায় অনেক গেষ্ট। তাই তিনি আপনাকে দেখার জন্য এখানেই আসবেন।’ আমি অফিসে ঢুকলাম। সে একটা কল করল, আপা পাত্র এসে গেছে। আপনি কোথায়? মোবাইল রেখে আমাকে বলল, উনি রাস্তায় আছেন। এক্ষুনি এসে পড়বেন। একটু পরেই কলিং বেলের আওয়ায। আমাকে বলল, আপা এসে গেছেন। আমি বললাম, আপা কি আপনার অফিসে এই প্রথম আসলেন, না আরো এসেছেন।’ বলল, না, এই প্রথম।
আমাকে বলা হল, আপার কাছে আসেন। কথা বলেন।’ আমি কক্ষে ঢুকলাম। আমরা এখন শুধুই দুজন। আপা আমাকে সালাম দিলেন। ও মা! এ তো দেখী ইরানী হুর পরী। চেয়ে থাকলাম অনেকটা সময় তার মুখের দিকে। চোখ কি নামানো যায়! সে নীচের দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকায়। সে কি লাজুক দৃষ্টি, যেন কোন পুরুষ জীবনে তাকে স্পর্ষ করেনি। কথা-বার্তায় কোন চাঞ্চল্য ভাব নেই। একে বারে সাদাসিধে। মুখের ভাষা ততটা আকর্ষণীয় নয়। এত সুন্দর চেহারার পাত্রী দেখার জন্য আমি মোটেই প্রস্তত ছিলাম না। কত সুন্দর তার চেহারা। এমনভাবে বোরকা পরা যে সুন্দর কপালটাওও ঢাকা পড়ে গেছে পাতলা কলো কাপড়ের আড়ালে। শুধু দেখা যায়, গাল দুটো, ঠোট, নাক ও চোখ। সুন্দর মেয়েরা কালো কাপড়ের বোরকা পড়ে চেহারাটা খোলা রাখলে দেখতে যেমন আকর্ষণীয় লাগে। চশমায় তাকে আরো সুন্দর মানিয়েছে। চেষ্টা করেও চোখ ফেরানো যায় না। যা কিছু জানার ছিল সবই ভুলে গেলাম। কি দেখতে আসছি আর কি দেখছি! বোরকাটা এত সুন্দর যে, যদি শুধু বোরকাটিকে আমার কাছে বিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়, তাহলেও আমি রাজী হয়ে যাই। আমার মুখে কোন কথা আসছিল না। সেই শুরু করল :
পাত্রী : আপনি যে বিবাহ করবেন আপনার স্ত্রী কি তা মেনে নেবে?
আমি: আমার স্ত্রীই তো আমাকে এ পথে নামিয়েছে।
পাত্রী: আপনি কি কাজ করেন?
আমি: বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংস্থার ওয়েব মাস্টার হিসাবে কাজ করি। বাংলা, আরবী ও ইংরেজী ভাষায় কাজ করতে হয়।
পাত্রী: আপনি ঢাকা থাকেন, না দেশের বাড়ীতে?
আমি: ঢাকাতে থাকি। তিন দিনের জন্য মাসে একবার দেশের বাড়ীতে যাই ছেলে দুটো আর ওদের মা-কে দেখতে।
আমি: আচ্ছ, আপনার বয়স কত হবে?
পাত্রী: বিজ্ঞাপনে যা লেখা আছে তা-ই।
আমি: না, তা হবে না। তাতে লেখা আছে ৪৩-৪৫ অথচ আপনার বয়স অনেক কম।
পাত্রী: আচ্ছা আপনি বলেনতো আমার বয়স কত হতে পারে?
আমি: আপনার বয়স ৩০-৩৫ হবে।
পাত্রী: আমার বয়স ৩২ বছর।
আমি: তাহলে আপনি বয়স বেশী বলে বিজ্ঞাপন দিলেন কেন?
পাত্রী: বয়স কম দিলে অনেকেই আসে না। অনেক বয়স্ক লোক মনে করে এত অল্প বয়সী মেয়ে নিলে ঝামেলা।
আমি: আপনার ¯^vgxi কি হয়েছে?
পাত্রী: আমার ¯^vgx সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সে সরকারী চাকুরী করত।
আমি: আপনার ভাই বোন কত জন?
পাত্রী: আমরা শুধু দু বোন।
আমি: আপনি বড়?
পাত্রী: না আমি ছোট। মা ও বাবা আমার সাথে থাকে।
আমি: আপনার সংসার চলে কিভাবে?
পাত্রী: আমিই তো সংসার চালাই। আমাদের বাসার নীচে ফ্যাক্টরী। এই তো এখন আপনাকে দেখার জন্য ফ্যাক্টরীর কাজ রেখে আসলাম।
আমি: আচ্ছা, কাওসার বলল, আপনি নাকি আমাকে পাচ লক্ষ ঠাকা দেবেন। কেন দেবেন? যৌতুক? আপনি জানেন, আমি মাদরাসায় পড়াশুনা করেছি। যারা মাদরাসায় পড়ে তারা বিবাহে যৌতুক-কে চরমভাবে ঘৃণা করে।
পাত্রী: না, মানে আমি যাকে বিয়ে করব তার যদি কোন ঋণ থাকে, তা পরিশোধ করার জন্য আমি টাকা দিতে চেয়েছি। আচ্ছা হজ করার ব্যাপারে কি আপনার আপত্তি আছে। আমি যদি আপনাকে হজ করাই?
আমি: হজ করা ভাল, তবে স্ত্রীর টাকায় হজ করব কেন?
আমি: আচ্ছার আপনার সন্তানাদি কেন হয়নি?
পাত্রী: সেটা আমি বলব কিভাবে? আল¬াহ পাকই ভাল জানেন।
কথা-বার্তায় যখন কিছুটা বিরতি হল, তখন আমাকে বলল, কাওসারকে একটু ডাকেন। আমি তাকে অন্য রূম থেকে ডেকে আনলাম। সে এসে বলল, কি আপা! আপনি তার সাথে ফ্রী হয়ে কথা বলুন। বোরকাটা খুলুন। আরো সময় ধরে বলুন। লজ্জা করেন কেন?
পাত্রী : না কথা-বার্তা আর নেই। কাজ হয়ে গেছে। আমি ভালমত তাকে চিনেছি।
কাওসার: -পাত্রীকে লক্ষ করে- ওনাকে তাহলে আপনার পছন্দ হয়েছে?
পাত্রী: আমি যা আশা করেছি তার চেয়ে বেশী পেয়েছি ওনার মধ্যে। আমি এক পায়ে রাজী। আমার কোন আপত্তি নেই।
কাওসার এবার আমাকে প্রশ্ন করল, আপনার মত কি? পাত্রী কি পছন্দ হয়েছে আপনার? আমি বললাম, আমি মতামত পরে দেবো।’ এ কথা বলে আমি উঠে গেলাম।
কাওসার আমাকে বলল, আপাকে সেলামী দিয়েছেন? আমি বললাম, না দেব না? পরে দেখা যাবে।’ সে তার সহকারীকে বলল, আপাকে যেতে বলো।’
আমাকে বলল, আপনাকে অবশ্যই ইয়েস’ অথবা নো’ বলতে হবে। যদি ইয়েস’ বলেন তবে কাজ শুরু হবে। ২৫০০ টাকা দেবেন। আর যদি নো বলেন, কোন সমস্যা নেই। আমি বললাম, কোনটাই বলব না। পাত্রীর ফোন b¤^i দেন। আলাপ করে আপনাকে জানাবো। কাওসার বলল, অবশ্যই ফোন b¤^i দেব। আপনি একদিন নয়, এক সপ্তাহ ধরে আলাপ করবেন। তারপর আমাকে জানাবেন। কিন্তু আপনি তো এখন বলতে পারেন, প্রাথমিকভাবে আমার পছন্দ হয়েছে। বাকীটা আলোচনা ¯^v‡c‡|Õ আমি বললাম, হ্যা, তা বলতে পারি।’
কাওসার: তাহলে আমরা একজন মুরুব্বী পাঠাবো মেয়ের বাড়ীতে সেখানে মিষ্টি ইত্যাদি নিতে হবে। কিছু টাকা দেন।
আমি: এখন টাকা দিতে পারব না। প্রস্তুতি নিয়ে আসি নাই।
কাওসার: দু তিন শত টাকাও কি সাথে নেই?
আমি: অবশ্য তা দেয়ার মত নয়।
কাওসার পাত্রীর ফোন b¤^i দিল। নিয়ে চলে আসলাম।
আমাকে কিছুক্ষণ অফিসের বাহিরে রাখা, পাত্রীর কাছ থেকে টাকা না নেয়া, আমার কাছ থেকে আরো টাকা দাবী করা, ঘোষিত বয়সের সাথে অমিল। বয়স বেশী লেখার কারণ বর্ণনা, পাত্রী প্রথমবার অফিসে আসল আর নিজেই চিনে ফেলল ইত্যাদি বিষয়গুলো ভাবতে থাকি। আমাকে আরো অবাক করেছে সামান্য তথ্য নিয়েই আমাকে পছন্দ করে ফেলার বিষয়টি। পাত্রী দেখার আগে আমি কয়েকবার আয়নার সামনে দাড়িয়ে ছিলাম। নিজেকে আকর্ষণীয় মনে হয়নি নিজেরই কাছে। কেন হবে? আটত্রিশ বছর ধরে এ পৃথিবীর প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করে টিকে আছি। ঝড়-তুফান তো কম যায়নি। পাত্রীর কাছে যাওয়ার পর আমার এত রূপ আসল কোথা থেকে?
আর ভাবছি এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল এক হাজার টাকা। এখন সাত শত টাকায় কাজ সেরেছি। মন্দ কি! আমার পাত্রী খোজা প্রকল্পটি বাজেট ফেল করেনি।
আরো ভাবি, কত সুন্দর তাদের শিল্প। একজন মানুষ যদি ৮০% ভাগ অনাস্থা নিয়ে তাদের কাছে যায়, তারা তাদের সাথে এমন আচরণ করে যে, তাদের আস্থাই তৈরী হয়ে যায় আশি ভাগ।
আমার পূর্বের পার্টিকেও তারা এ পাত্রীটিকে দেখিয়েছে। আর এ জন্যই আমাকে কিছুক্ষণ অফিসের বাইরে রাখা।
তাদের টার্গেট ছিল আজই তারা আমার কাছ থেকে সদস্য ফি, চা খরচ, সেলামী, মুরব্বী ফি, মিষ্টি খরচ সব মিলিয়ে পাচ হাজার টাকা খসাবে।
আরো আশ্চর্য হয়েছি মানুষকে প্রতারণা করার জন্য, সামান্য স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ধর্মের ব্যবহার দেখে। আমরা ছাড়া অন্য কোন ধর্মের লোকেরা ধর্মকে এভাবে ঘৃণ্য কাজে ব্যবহার করে বলে আমি জানি না। প্রতারণা করার জন্য কুরআন ও হাদীসের বাণী লটকানো, বোরকার ব্যবহার, হজ করানোর লোভ দেখানো, কথা-বার্তায় আল্লাহ পাক উচ্চারণ ইত্যাদি বলে সহায় খুজতে আসা অসহায় মানুষকে বিবাহের লোভ দেখিয়ে তাদের আরো সহায় সম্বলহীন করে তারা টাকা উপার্জন করে। কত ভাবে যে তারা ইসলামকে অবমাননা করতে পারে তার হিসাব কে রাখে। যে ইসলাম বলেছে হাসি কৌতুকাচ্ছলেও মিথ্যা বলা যাবে না, সেই ইসলামের নাম নিয়ে আমরা মিথ্যা বলে যাচ্ছি। যে ইসলাম বলেছে, যে প্রতারণা করে ধোকা দেয় সে মুসলিম নয়। সেই ইসলামের নামে আমরা অন্যকে ধোকা দিচ্ছি। ইসলামের অনুসারী হয়েও আমরা চারিত্রিক দিক দিয়ে অন্যের চেয়ে কত নীচে নেমে গেছি! আল্লাহ এত সত্বেও মুসলমান আর ইসলামের অস্তিত্ব যে টিকিয়ে রেখেছেন এটাতো তার বিশাল অনুগ্রহ।
পাত্রীর নম্বরে মোবাইল করলে আর রিসিভ করে না। মোবাইল বন্ধ থাকে। আপনাদের আমি পাত্রীর নম্বর দেব না। আবার কোন বিপদে পড়ে যাই। কোট কাচারীর অবস্থা ভাল না। ঘটকের নম্বর দিয়েই দিলাম। যদি কেহ অল্প টাকায় সুন্দরী পাত্রী দেখতে চান তাহলে ঐ নম্বরে যোগাযোগ করুন, পত্রিকার বিজ্ঞাপনের সুত্র উল্লেখ করে। তবে আপনি যে তার নাম জানেন তা তাকে জানতে দেবেন না।
আর কোন সাহসী ব্যক্তি যদি এ প্রতারণা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে চান, তাহলে পথ খোলাই আছে। দিয়ে দিলাম পুরো ঠিকানা। অবশ্য দেখার কেউ নেই।
আরো আশ্চর্য লাগল, আমি যখন পাত্রীর নম্বর মোবাইলে সেভ করতে গেলাম তখন মোবাইল আমাকে বলল, এ নামে একটি কণ্ট্রাকট আছে আপনি কি তা বাদ দিতে চান? আমি আতকে উঠলাম। কিভাবে আমি তাকে মুছে ফেলি? মোবাইল থেকেই তাকে মুছে ফেলা যাচ্ছে না। হৃদয় থেকে কিভাবে? আমার স্ত্রীর নাম আর এই পাত্রীর নাম কাকতালীয়ভাবে এক হয়ে গেছে। পরে আমি পাত্রীর নামটি লিখে সামনে দু নম্বর লাগিয়ে দিলাম। সেভ হয়ে গেল।
আমি রাতে আমার স্ত্রীকে ফোন করলাম। সালাম বিনিময়ের পর বললাম, কি সালমা, কেমন আছো তুমি? আমার স্ত্রীতো অবাক। একটু পরেই স্ববাক হয়ে বলল, তোমার কী হয়েছে, এমন ভাবে কথাতো সেই ছোটকালে বলেছো, আর বিগত ৭/৮ বছরে তো একবারও এমন করে বলোনি। আমি ফোন করলে তুমি কোন কিছু না বলেই জিজ্ঞেস করো কোন জরুরী খবর আছে? এর উত্তরে আমি যখন জিজ্ঞেস করি, তুমি কেমন আছো? তখনই তুমি লাইনটা কেটে দাও। পরে আর ফোন করতে সাহস পাই না। দিনগুলোতো এভাবেই যাচ্ছে। আজকে তুমি অনেক দিনের পুরোনো ভাষায় জিজ্ঞেস করলে। কি যে ভাল লাগল! আসলে কিছু একটা ঘটেছে। নইলে তুমি এমনভাবে জিজ্ঞেস করতে না। বল, কি করেছো। আমি বললাম, তোমার বয়সী সালমা নামের মেয়েরা আমাকে কি পেয়েছে? তারা আমার পিছু কেন ছাড়ছে না? এখন আমার তাদের পরিচয়ে লিখতে হয় সালমা-১ সালমা-২ । মোবাইল সেটগুলোও বিরক্তি প্রকাশ করে। কারণ ওরাও নতুন কিছু চায়। এরপর পুরো ঘটনাটি তাকে শুনালাম। শুনে বলল, মেয়েটি যখন তোমার পছন্দ হয়েছে তখন কিভাবে আনা যায় সে চিন্তা একটু করতে পারো? আমি বললাম, ‘কিভাবে পারব বলো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস মেয়েটির স্বামী টামী সবই আছে। হয়ত ঘটকটি তারই স্বামী, হয়ত নীচের বিউটি পার্লারে কাজও করে। এভাবে পাত্র দেখে সেলামী পায়। একটা অংশ সে নেয়। এভাবে চলে জীবন জীবনের সাথে প্রতারণা করে ব্যবসা। সে কিভাবে তোমার স্বামীকে বিয়ে করবে?’ এরপর বলল, ‘পাত্রীর খোজ করতে থাকো। কোন ভাল পাত্রীর খোজ পেলে আমাকে খবর দিও। আমি তোমার সাথে পাত্রী দেখতে যাবো। তুমি সহজ সরল মানুষ। আজকালকার মেয়েরা বড় চালু। তোমাকে কি বুঝ-টুজ দিয়ে বিয়ে করে পরে তোমাকে নিয়ে উধাও হয়ে যাবে। আমেরিকা বা লন্ডনে নিয়ে যেয়ে তোমাকে দিয়ে হোটেলের হাড়ি-পাতিল ধোয়ার কাজ করাবে।’
আমি হেসে বললাম, ‘তাতে তোমার সমস্যা কি? কত লোক লাখ লাখ টাকা খরচ করে এ কাজের জন্য বিদেশে যায়। আর কোন মেয়ে যদি আমাকে ফ্রী নিয়ে চাকুরী দেয় তাতে তো আমার ভালই। আমি কি তোমার নামে টাকা পাঠাবো না? সে বলল, না তুমি ঐ কাজ কিভাবে করবে? তুমি তো এক গ্লাস পানি জগ থেকে ঢেলে খেতে পারো না। পানি না খেয়ে থাকবে তবু ঢেলে খাবে না। না তুমি আমাকে না নিয়ে আর কোন পাত্রী দেখতে যাবে না।
তারপর বলল, ‘একটা কাজ করেছি কিন্তু তোমাকে বলা হয়নি। আগে কথা দাও রাগ করবে না।’ বললাম, ‘আগে তুমি বলো কি করেছো তারপর দেখা যাবে।’ বলল, ‘আমাদের বাসার পাশের স্কুলের এক ম্যাডামকে ঠিক করেছি। ম্যাডাম হিন্দু মানুষ। তার কাছে দিনে দু ঘন্টা করে পড়ব। আব্বা শুনে বলেছে, খরচ যা লাগবে আমি দেব। জামাইর কাছ থেকে কোন খরচ নিবি না। আমি প্রথমে বাংলাটা ভালো করে শিখব, তারপর ইংরেজী। বাচ্চারা তো এখন বড় হয়ে গেছে ওদের আগের মত সময় দিতে হয় না। আর তুমিতো কাছেই থাকতে চাওনা, তিন দিনের ছুটি নিয়ে আসলে একদিন থেকেই চলে যাও। জিজ্ঞেস করলে বল, ভাল লাগে না। তাই সময়ের অভাব হবে না।
আমি বললাম, ‘আগে ইংরেজীটার প্রতি জোর দিতে পারো না? কারণ বাচ্চাদের কম্পিউটার শেখাবে তুমি।’ সে বলল, না আগে বাংলা শেখব। তোমার কি মনে আছে বিয়ের তিন চার মাস পর একদিন তুমি আমার শরীর, চেহারা ও ভালবাসা নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলে বাংলায়। আমার কাছে দিয়ে বলেছিলে, তোমার জন্য এই কবিতা লিখেছি, তুমি একটু পড়ো। আমি সে দিন ভাল করে পড়তে পারি নাই। দেখলাম, তুমি রাগে, দু:খে লাল হয়ে যাচ্ছো। আমার হাত থেকে কবিতাটা নিয়ে ছিড়ে ফেলেছো। আর পুরো একদিন আমার সাথে তুমি কোন কথা বলোনি। আমি ভুলি নাই সে কথা। বাংলায় তুমি নাকি কত কিছু লেখো। মানুষে বলে। তারা পড়েও। কিন্তু আমি পড়তে পারি না। পড়লে বুঝি না।
বাংলা শেখা হলে, ইংরেজী শেখব। আর আমার ভাই মাসুম কম্পিউটার ট্রেনিং নিচ্ছে। তার ট্রেনিং শেষ হলে আমি তার কাছ থেকেই কম্পিউটার শিখে নেব বাসার কম্পিউটার দিয়ে। তোমাকে কষ্ট করতে হবে না আমাকে শেখানোর জন্য। তোমারতো অনেক দাম!
তবে পাত্রী দেখতে থাকো কিন্তু। আমি শিক্ষিত হলেও তোমার শিক্ষিতা বউয়ের অভাবতো পুরণ হবে না। তুমি বলবে, আমি তো মুর্খ বউ হিসাবেই তোমাকে পেয়েছি। তোমাকে বিয়ে না করানো পর্যন্ত আমি মনে শান্তি পাবো না। আমি চাই তোমাকে একটা বিয়ে করাবোই। তারপর তুমি দেখবে শিক্ষিতা বউ কাহাকে বলে, উহা কত প্রকার, কি কি ও খেতে কত মজা? আরেকটি বিয়ে না করা পর্যন্ত তুমি আমাকে চেনবে না। আমি তা ভাল করে বুঝে নিয়েছি। কথাগুলো বলে কেদেই ফেলল আমার নিবন্ধিত পাত্রীটি।
আমি বললাম, শান্ত হও। তোমার একটা দোষ হলো আমি যদি কখনো তোমার কোন কিছুকে অপছন্দ করি বা বিরক্তি প্রকাশ করি তখন তুমি তা সাপোর্ট করে যাও। নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করে নাও। আমার কাছে নত হয়ে যাও। এটা ঠিক নয়। তুমি নিজেকে সাপোর্ট করবে। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখবে। আমাকে ধৈর্য ধারণ করতে বলবে। আশ্বস্ত করবে। শান্তনা দেবে। তুমি কেন বলতে পারো না, আমার মধ্যে দুর্বলতা বা ত্রুটি আছে ঠিকই কিন্তু তার চেয়ে ইতিবাচক দিক আছে অনেক বেশী?
তুমি সেদিন আমাকে বলেছো ‘আমি তোমার জীবনটাকে নষ্ট করে দিলাম।’ আমি ভাবলাম, সত্যিইতো! কেন বললে তুমি এ ধরনের নেতিবাচক কথা? তুমি তো বলতে পারতে আমার ভাল সময়টা তোমার জন্য ব্যয় করেছি। আদর-যত্ন আর ভালভাসা, কি দেয়নি আমি তোমাকে? যে দিনগুলো কেটেছে আমাদের তা কি একে বারেই গেছে? কিছু কি বাকী নেই? এত চোখের জল কখনো কি হতে পারে না শুভ্র সমুজ্জল? দেখা যাক বা না যাক, রাতের সব তারাই তো আছে দিনের আলোর গভীরে।
তার সাথে কথা বলার পরের দিন দুপুরে সেই সালমা-২ আমাকে ফোন করল। সাদাসিধে তার ভাষা -‘কই কাল যে গেলেন, আর তো খোজ খবর নিলেন না। ফোনও করলেন না।’ আমি বললাম, ‘কয়েকবার ফোন করার চেষ্টা করেছি। একবার রিং হয়েছিল। পরে আর রিং হয়নি। বলল, ‘মেহমান নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বলুন এখন আপনি কি করবেন?’ আমি বললাম, ‘এখন অফিসে কাজ করছি। কথা বলতে পারবো না।’ সন্ধ্যার আগে আমার পক্ষে কথা বলা সম্ভব নয়। বলল, ‘সন্ধার পর তাহলে কথা বলব।’
আমি তাকে কিভাবে বলি ‘মিস সালমা-২! আপনি একজন প্রতারক। আমার কাছে এক নম্বর খাটি সালমা আছে। আপনার দরকার নেই আমার জীবনে।’ ভয় লাগে যদি সে সত্যিই আমার মত একজন স্বামী খুজে থাকে? তাহলে কথাটা তার স্বার্থে কত বড় অন্যায় হয়ে যাবে! যদি অন্যায় হয়েই যায় তবে আল্লাহ কি ক্ষমা করবেন আমাকে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



