আমি এক আলেম পরিবারের সন্তান। সাধারণত তারা নিজেদের সন্তানদের মাদরাসায় পড়িয়ে থাকেন। আমার সকল ভাইবোনই মাদরাসা পড়ুয়া। শুরুতে আমার বিষয়টি একটু ব্যতিক্রম ছিল। আমরা অসচ্ছল ছিলাম না। প্রচুর কৃষি জমি ছিল। এ দিয়ে আমাদের ষোল সদস্যের পরিবারটি ঠিকঠাক মত চলত। আব্বা মাদরাসায় শিক্ষকতা করলেও বেতন নিতেন না। সকলেই যখন মাদরাসায় পড়ে তখন আমার ব্যাপারে পরিবারের সকলে সিদ্ধান্ত নিল, আমাকে জেনারেল লাইনে পড়াশুনা করাবে। জমা-জমিগুলো বুঝে খাওয়ার মত একজন লোকতো দরকার। সবাই হুজুর হলে দুনিয়া চলে না। আর ইসলাম সকলকে হুজুর হতে বলেও না। তাই সকলে একমত হল যে, আমাকে স্কুল কলেজেই পড়াবে। স্কুলে ভর্তি করা হল প্রথম শ্রেণীতে। তখন ১৯৭৬ সাল। প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম রোল নম্বর হল ৩৫। দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠলাম যখন তখন রোল নম্বর ১১। তৃতীয় শ্রেণীতে উঠলাম রোল নম্বর হল -১। ক্লাস ফোরেও তাই। স্কুলের সারদের সকলের দৃষ্টি কাড়লাম। সারেরা আমাকে নিয়ে সপ্ন দেখতে শুরু করল। চতুর্থ শ্রেণীতে যখন পড়ছি তখন আয়শার সাথে কঠিন প্রতিযোগিতা। সারেরা সকলে আয়শা-কে উসকানী দিল। বলল, এবার যদি ওকে হারাতে না পারিস তবে আর পারবি না। হারাতে পারলে তোকে পুরস্কার। আয়েশা খুব পরিশ্রম করত। কখনো দ্বিতীয় হত, কখনো তৃতীয়। চতুর্থ শ্র্রেণীতে ষান্মাষিক পরীক্ষা দিলাম। তুমুল প্রতিযোগিতার পর আয়শা মাত্র দু নম্বরের জন্য আমাকে ধরতে পারল না। সমস্যাটা ছিল ধর্ম নিয়ে। ধর্ম পরীক্ষায় একটি প্রশ্ন ছিল, বিশ্বের মুসলমানেরা কোন দিকে ফিরে নামাজ পড়ে? আমি লিখলাম, কাবার দিকে ফিরে নামাজ পড়ে। আয়শা লিখল পশ্চিম দিকে ফিরে . .। আমার উত্তর সঠিক হল। দু নম্বরে এগিয়ে গেলাম। পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করে আমাদের স্নেহময়ী সারেরা আমারও প্রশংসা করলেন, আয়েশাকে আদর করলেন। দুর্ভাগ্য, এ পরীক্ষার পর আমি আর স্কুলে যেতে পারিনি।
ঘটনাটা হল, একদিন স্কুল থেকে বাসায় গেলাম। আম্মা বকুনি শুরু করে দিলেন। বললেন, নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলি। আমরা সকলে তোর বাপকে বুঝিয়ে রাজী করিয়েছিলাম তোকে মাদরাসায় দেব না। স্কুলে পড়াবো। কিন্তু এখন যা করেছো তাতে . .। আমি বললাম কী হয়েছে? আম্মা বললেন, আজ নাকি একটা মেয়ের হাত ধরে রাস্তায় হেটেছিস? মেয়ে তো মেয়ে। সে আবার এক সিনেমার মালিকের মেয়ে। হাত ধরে হাটবি ভাল কথা, মেয়ে আর খুজে পাও নাই। আমি বললাম, আম্মা ও তো আমাদের ক্লাসে পড়ে। ওর নাম কাজল। স্কুল ছুটি হলে সকলে যায় উত্তরে, কিন্তু ওদের বাসা আর আমাদের বাসা দক্ষিণে। তাই প্রতিদিন এক সাথে আমরা হেটে আসি। আমি বাসায় আসি ও ওদের বাড়ীতে যায়। আম্মা বললেন, ভাল কথা, তবে হাতটা ধরার দরকার কি ছিল? যাক, তোর বাপের হুকুম আগামী কাল থেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ। তিন দিন পর মাদরাসা খুলবে। সোজা হিফজ খানায় ভর্তি হবি। আত্নীয় স্বজন, স্কুলের সারেরা আব্বাকে বুঝাল, কিন্তু টলাতে পারল না। আমি কান্না জুড়ে দিলাম। সারেরা কত আদর করে! ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে কত ভালবাসে! কিভাবে ছাড়বো আমি এ জগত? আম্মা আব্বাকে বুঝালেন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য। আব্বার এক কথা, না, ওকে আর স্কুলে যেতে দেয়া হবে না। আজ এক মেয়ের হাত ধরে রাস্তায় হেটে বাসায় এসেছে। কালকেও হয়ত এ হাত ধরবে, কিন্তু আর বাসায় আসবে না। আমি বাপ হয়ে ওর চরিত্র নষ্ট হতে দিতে পারি না। ও পড়াশুনায় ভাল বলে ওকে মাদরাসায় দেব না তা কি করে হয়? আল্লাহর জন্য কুরবানী দিলে উত্তম জিনিসই দিতে হয়।
আমি স্কুল থেকে চলে আসলাম। চলে আসা বলা যায় না, বলা যায় ধরে আনা। এরপর থেকে কাজল স্কুলে আসা বন্ধ করে দিল। সে তার মা বাপকে বলেছে সে এ স্কুলে আর পড়বে না। তার ভাল লাগে না এত দুরে। বাড়ীর কাছের স্কুলে ভর্তি হল। এরপর থেকে তাকে দেখেনি কোন দিন। শুধু একদিন সুগন্ধ্যা নদীর ফেরীতে দেখেছিলাম। আমাকে হয়ত চিনতে পারেনি, কারণ মাদরাসার পোশাকে ছিলাম।। সেটা এ ঘটনার আট বছর পরে। একটি কথা তাকে বলা হয়নি। হবেও না হয়ত কোন দিন। তোমার অভিশপ্ত হাত ধরার কারণে আমি পথ হারিয়েছি। তুমি কি তা শুনতে পেয়েছো?
ওর প্রতি আমার দুর্বলতার কিছু কারণ ছিল:
এক. তখন ক্লাস থ্রীতে। আলম সারের ভুগোল ক্লাস। আগের দিন স্কুলে আসিনি। সার ক্লাসে ঢুকে বললেন, পাচটি মহাসাগরের নাম লিখ। আমাদের লিখতে দিয়ে তিনি বের হয়ে গেলেন। কাজল তার বেঞ্চি ছেড়ে দৌড়ে আমার কাছে এসে বলল, তুমি তো লেখতে পারবে না। পিটা খাবে। কাল যে স্কুলে আসনি! তাড়াতাড়ি লেখ, প্রশান্ত, আটলান্টিক, ভারত . . । আমার লেখা শেষ। এর মধ্যে ক্লাসে সার ঢুকে গেলেন। খাতা জমা নেয়া শুরু হল। আমিই ক্যাপ্টেন হিসাবে খাতা জমা নিলাম। ওর খাতাটা টেনে নিতে মন চায়নি, তবু যে নিতে হয়। অনেকে বেতের বারি খেল, কাজলও রেহাই পেল না। তার খাতা খালি ছিল। লেখা ছিল শুধু প্রশান্ত। আমাকে বাচাতে গিয়ে তার সময় শেষ হয়ে গেল। আমি বাচলাম ঠিকই, বাচল না সে। বেচারী নিজেকে বাচানোর সময় পেল কই? সকলে মিটি মিটি করে হাসল। এরপর থেকে আমি ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। সারাদিন ওকে নিয়ে শিশু মনে কত কিছু যে ভাবতাম, তা ভুলে গেছি এ বয়সে এসে।
দুই. তখন আমাদের স্কুলে বই কিনে পড়তে হতো। আব্বা সব বই কিনে দিতে রাজী। কিন্তু তিনি ইংরজী বই কিনে দেবেন না। কারণ তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে দিল্লীতে বসে সামনাসামনি যুদ্ধ করেছেন। এক বৃটিশ সেনাকে সাইকেলে যাওয়ার পথে ইটা মেরে রক্তাক্ত করে মাটিতে ফেলে দিয়েছেন। আর এ জন্য এক বছর দিল্লীর জেলেও ছিলেন। তিনি কিভাবে সহ্য করবেন তার সন্তানেরা তাদের ভাষা চর্চা করবে তার ঘরে বসেই? অসম্ভব! তার ঘরে ইংরেজী পড়া নিষিদ্ধ হল। বই নেই। পড়াও যাবে না। কি করি। ইংরজী ক্লাসে একদিন মার খেলাম সারের। কাজল বলল, তোমার কী হয়েছে? তুমি তো কোন প্রিয়ডে মার খাওনা, কিন্তু ইংরেজী ক্লাসে পড়া পার না কেন? আমি তাকে বললাম বই না থাকার ঘটনা। শুনে বলল, আরে ব-ল-দ! আমাকে বললেই তো আমি তোকে একটা বই যোগার করে দিতাম। নে, আজকে আমার বই নিয়ে যা। আমি কালকে ল্যাইজারে পড়ে নেব। আমি বললাম, না, তা হবে না। আব্বা দেখলে তোর বইও যাবে আছে আবার মার খাওয়ার সম্ভাবনাও। তার চেয়ে তুই আমাকে প্রতিদিন ল্যাইজারে বইটি একটু দিবি আমি পড়া ঠিক করে নেব। ও সানন্দে রাজী হল। ওর বই থেকে পড়তে থাকলাম। ফলাফল হল, আমি এখন ক্লাসে ইংরেজীতে সবচেয়ে বেশী নম্বর পাই। কম হলেও ৯৮। একটা কথা আছে, যা থেকে মানুষকে বাধা দেয়া হয়, তার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। ইংরেজীর প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে গেল।
তিন. একদিন কোন একজন বা দুজন, ছাত্র বা ছাত্রী, ঠিক মনে নেই, ক্লাসে বাদাম খেল সকলকে নিয়ে। বাদাম খেয়ে অনেকেই ক্লাস নোংড়া করে ফেলল। সার এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কে বাদাম খেয়েছে। সকলেই বলল, আমরা সকলে খেয়েছি। সার বলল, আচ্ছা বাদাম কিনেছে কে? স্বীকার পেলনা কেউ। সার বলল, তোমরা স্বীকার না পেলে আমি সকলকে শাস্তি দেব। দুটো করে বেতের পিটা। তারপরও কেহ স্বীকার পেল না কে বাদাম কিনেছে। সার শুরু করলেন তার শাস্তি। ৩৫ জন ছাত্র-ছাত্রী। এমনভাবে শুরু করলেন যে সিরিয়ালে আমি সকলের শেষে পিটা খাবো। সকলকেই পিটানো শেষে এখন আমার পালা। সার যখন আমার কাছে আসলেন, তখন কাজল বলল, সার আমার একটু কথা শুনেন। সার বলল, কি হয়েছে? কাজল বলল, সার ওকে না পিটিয়ে আপনি আমাদের আরো একটি করে পিটা দেন। সার বলল, কেন? কাজল বলল, ওতো আমাদের ক্যাপ্টেন। তাই . .। আরো কিছু বলতে চেয়েছিল। লজ্জা টাকে আটকে দিল। সার ব্যাপারটা মোটেই বুঝতে চাইলেন না। কিন্তু ইতিমধ্যে সকল ছাত্র-ছাত্রীর একই কথা, ওকে না পিটিয়ে আমাদের আরো একটি . . । সার আবেগ প্রবণ হয়ে পড়লেন। বললেন, তোমরা যদি এটি শুরুতে বলতে তাহলে আমি কাউকে পিটাতাম না। যাক তোদের পিটান আমি ফিরিয়ে নিলাম।
স্কুল আসা বন্ধ হয়ে গেল। একদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হাকীম সার আমাকে ডাকলেন। স্কুলে গেলাম। সারেরা আর আমার ক্লাসের সকলে কাদল। আরবী পড়ার সাথে সাথে বাংলা ইংরেজী পড়ার উপদেশ দিলেন স্নেহময়ী প্রান-প্রিয় সারেরা। সে কি আদর-যত্ন আর অকৃত্রিম ভালোবাসা! বিদায় চাইলাম না মুখে, তবুও সহপাঠিরা কেদে-কেটে বিদায় দিল। সকলকে দেখলাম ঠিক-ঠাক আছে, শুধু দেখলাম না কাজলকে। সে কি এক বেদনা! বিদায় বেলাও যে তোমাকে বলতে পারলাম না! রবীন্দ্রনাথের কবিতাটা তখনই পড়া হয়নি, যদি পড়া থাকতো তখন হয়ত আবৃত্তি করতাম:
এ অনন্ত চরাচরে সর্গমর্ত ছেয়ে
সবচেয়ে পুরাতন কথা সবচেয়ে,
গভীর ক্রন্দন যেতে নাহি দিব। হায়,
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।
চলিতেছে এমনি অনাদিকাল হতে।
বুঝাতে পারব না এ ব্যাথা কোনদিন কাউকে। কাউকে বলতেও পারি না। মাঝে মাঝে স্ত্রীকে এ কাহিনীগুলো বললে সে হাসে, আর বলে, ভালোই হয়েছে। অন্যায় প্রেমের শাস্তি এমনি হয়। স্কুলে যায় মানুষ পড়াশুনা করার জন্য। প্রেম করার জন্য নয়। দু:খ লাগে সে আমার এ বেদনা অনুভব করতে চায় না মোটেই। বরং কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিয়ে তৃপ্তি খোজে।
এক সাগর ব্যাথা কয়েক পাহাড় বিরহ আর বুক ভাসা চোখের জল নিয়ে মাদরাসায় ভর্তি হলাম।
আজ এ পর্যন্তই থাক। অনেক বড় হয়ে গেছে। বাকীগুলো পরবর্তী পর্বে . . ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



