শুনতে দারুন অবাক লাগবে। বাংলাদেশের মত সমপ্রদায়িক সমপ্রতির দেশেও ধর্মীয় কারণে মানুষ নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। পালিয়ে বেড়াচ্ছে নিজ বাড়ীঘর ও পরিবার ছেড়ে। এ রকম ঘটনা বহু থাকলেও আমি মাত্র একটি ঘটনা উল্লেখ করে প্রাসকিঙ্গ কিছু কথা বলব। ছেলেটির বর্তমান নাম আব্দুস সালাম ত্রিপুরা। ইসলামপূর্ব নাম ছিল বির্ণজয় ত্রিপুরা। পিতার নাম সুকুমার ত্রিপুরা। বান্দরবান জেলার রুমা থানার কিস্তপাড়া গ্রামে তাদের বাড়ী। পরিবারের সকলে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। সে গ্রহণ করেছে ইসলাম ধর্ম। অন্য সকলের খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করাটা যদি আইনের দৃষ্টিতে অন্যায় না হয়, তবে তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করাটা কোন অন্যায় নয় বলেই ধরতে হবে। দু বছর পূর্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর সে পরিবার থেকে বিতারিত হয়। চলে আসে ঢাকাতে। অসচ্ছল এক হৃদয়বান ব্যক্তি তার লেখা পড়া ও থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করছেন কোন রকমে। গত বছর এস, এস, সি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছে। পাশ করার পর সে দ্বিতীয় বারের জন্য পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে দেখা করার জন্য বান্দরবানে যায় গত অক্টোবর০৮ মাসে। সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বলে পরিবারের প্রতি তার টান আরো বেড়ে গিয়েছিল। যে প্রবাসে থাকে তার অভিজ্ঞতা আছে যে, রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে বা বিপদে পড়লে কিভাবে ও কতভাবে যে আপনজনকে মনে পড়ে। মন ছটফট করে তাদের কাছে যাওয়ার জন্য। এর আগেও একবার যেয়ে ধাওয়া খেয়ে এসেছে। এবার মনে করেছে আমি অসুস্থ, আবার পরীক্ষায় পাশ করেছি একথা শুনলে তার পরিবার ও সমাজের লোকেরা তার প্রতি সহানুভুতিশীল আচরণ করবে। এ সব সাত পাচ ভেবে সে সাহস করে বাবা, মা, ভাই, বোনের কাছে গেল।
দু এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে আসার কথা থাকলেও ঢাকাতে ফিরছে না। দু মাস পর ডিসেম্বরের শুরুতে ফিরে আসল। এসে বর্ণনা দিল যে ঘটনা, তা একশভাগ বর্বর নাহলেও সভ্য সমাজে অমার্জনীয়। এক রবিবার গ্রামের সকলে গির্জায় গিয়েছে, সে যায়নি। প্রশ্নই উঠে না। কারণ সে মুসলিম। সেখানে এক একটি খৃষ্টান মিশনের অধীনে একাধিক প্রচারক থাকেন। এ প্রচারকদের জওয়াদিহি করতে হয় মিশনের পাদ্রীর কাছে । রবিবারে কে কে চার্চে আসেনি সে রিপোর্ট পাদ্রীর কাছে প্রচারকদের দিতেই হয় । যারা গির্জায় যায়নি তাদের তলব করা হয়। জিজ্ঞাসা করা হয় গির্জায় অনুপস্থিতির কারণ। আবদুস সালামের কাছে গির্জার লোকেরা এসে জিজ্ঞেস করল, কেন সে রবিবারে গির্জায় অনুপস্থিত ছিল? আব্দুস সালামের কথা হল তারা সকলেই যখন জানে আমি মুসলমান, তখন গির্জায় না যাওয়ার কারণ জানতে চাওয়ায় তাদের বদ মতলব আছে। সে উত্তর দিল, আমি অসুস্থ ছিলাম। অসুস্থতার কারণেই মা-বাপের কাছে এসেছি।
তারা বলল, আমরা জানি তুমি মুসলমান হয়ে গেছ। কিন্তু মুসলমান কেন হলে? মুসলমান হয়ে কি পেয়েছো?
আব্দুস সালাম তার সামান্য জ্ঞান অনুসারে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। ইসলাম গ্রহণের পক্ষে সকল যুক্তি তুলে ধরছিল তাকে ঘেরাও করা খৃষ্টানদের কাছে কম্পিত হৃদয়ে ও শান্তভাবে। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে আব্দুস সালাম বলল আমি পরকালীন মুক্তির জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি। তারা বলল, তাহলে খৃষ্টানরা কি পরকালে মুক্তি পাবে না? স্বর্গে যাবে না? সে বলল, ইসলামপূর্ব যুগের খৃষ্টানরা স্বর্গে যাবে, ইসলাম আসার পরের খৃষ্টানরা যাবে না।’ ব্যস! আর যায় কোথা! তারা অজুহাত পেয়ে গেল তাকে ঘায়েল করার। বলল, তুমি মুসলিম হয়ে আমাদের এখানে হিংসা ছড়াতে এসেছ। তুমি বললে খৃষ্টানরা নরকে যাবে।’
তারা সালাম-কে পাদ্রীর কাছে হাজির করল। থানছি থানার শান্তিরাজ ধর্ম পল্লীর পাদ্রী গাব্রিয়েল। পাদ্রী তাকে বলল, তুমি কেন মুসলমান হলে? মুসলমানরা তোমাকে কি দেবে? মুসলমানেরা তো কথা রাখে না। তোমাকে কিছু দেয়ার কথা বলে থাকলেও তা দেবে না। আর তুমি মুসলমান হয়ে তোমার পরিবারকে বিপদে ফেলেছো। আমরা যদি তোমার পরিবারের লোকদের অনুদান বন্ধ করে দেই তাহলে তোমার পরিবারের লোকেরা কিভাবে বাচবে? ইত্যাদি বিব্রতকর প্রশ্ন, আর ভয়ানক দুর্যোগময় ভবিষ্যতের হুমকি। পাদ্রী যখন দেখল, সে ধর্মে অটল, তাকে টলানো যাচ্ছে না, তখন তারা সেনা ক্যাম্পে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিল যে, সে বিভিন্ন বাজে কথা বলে এ সমাজে শান্তি বিনষ্ট করছে ও হিংসা ছড়াচ্ছে। গ্রামে বিভেদ সৃষ্টি করছে।
সেনা ক্যাম্পে তাকে তলব করা হল। জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। সেনা সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদ করার পর বুঝতে পারলো সমস্যা কোথায়। তারা পাদ্রী ও তার লোকজনকে বললো, খৃষ্টানেরা স্বর্গে যাবে না একথা সে নিজ ইচ্ছায় বলেনি, তার দ্বারা বলানো হয়েছে। তাকে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করা হয়েছে।’ তারা আব্দুস সালামকে বলল, আসলে তুমি এখানে নিরাপদ নও। তোমার এখানে থাকা উচিত নয়।’ আব্দুস সালাম বলল, আমিতো যেতেই চাই। কিন্তু যেতে পারছি না টাকা পয়সা নেই। পরিবারের কাছে এসেছিলাম টাকা পয়সার জন্য। আমার পিতা আমাকে কোন টাকা দেবে না। সে পাদ্রী ও মিশনকে ভয় পায়। পিতার কাছে টাকা চেয়েছি। সে বলল, মিশনের লোকেরা বলেছে, তোমাকে টাকা দিলে আমাদের বিপদ আছে। আমার মনে চায়, কিন্তু পারব না। তাদের কঠোর নিষেধ আছে। বরং তোমার লাগানো গাছ বিক্রি করে তুমি টাকার ব্যবস্থা করতে পারো নিজ উদ্যোগে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে।’
সালাম বলল, গাছ বিক্রি করতেও তো আমার এখানে কয়েকদিন থাকা দরকার। কিন্তু থাকতে পারছি না।
পরে সেনা ক্যাম্পের লোকেরা চাদা তুলে মানবিক সাহায্য হিসাবে আব্দুস সালামকে এক হাজার টাকা দিল। তা নিয়ে সে ঢাকাতে চলে আসে। শুরু করে আবার যাযাবর জীবন। কিন্তু এ ঝামেলায় দেরী করে আসায় সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হারায় তার কাংখিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
সম্মানিত পাঠক! ঘটনাটি পড়ে আপনাদের কার কি প্রতিক্রিয়া আমি জানি না। কিন্তু আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। বিক্ষুদ্ধ হয়েছি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট একটি দেশে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কারণে অন্য ধর্মের লোক দ্বারা এমনভাবে নির্যাতিত হতে হয়। সেই অমুসলিম বন্ধুদের শিকড় কত শক্ত হলে এমন কাজ করতে পারে। চার্চে না আসার কারণে গ্রামের লোকদের কারণ দর্শনো, হয়রানি করা, একজন মুসলিমকে তাড়ানোর জন্য সেনা ক্যাম্পে নালিশ, তাকে টাকা না দিতে তার খৃষ্টান পরিবারকে হুমকি প্রদান, খুটা কত মজবুত হলে এসব কর্ম কান্ড করা যায় তা সকলকে ভেবে দেখতে হবে।
আমাদের দেশের মিডিয়া ও প্রশাসন সর্বত্র আতশী কাচ দিয়ে জঙ্গি খোজেন। ফতোয়াবাজ খোজেন। ধরাও পড়ে প্রচুর। কিন্তু তাদের আতশী কাচ এত উন্নত প্রযুক্তির যে, তাতে ইসলামি ছাড়া অন্য কোন কিছুই ধরা পড়ে না। নির্যাতিত মানবতার পক্ষ থেকে তাদের জন্য ধিক্কার আর অভিশাপ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



