আমার প্রিয় পোস্ট

অভিজিৎ এর "মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান" শীর্ষক প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায়- ২

১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৪৩

শেয়ার করুন:                   Facebook

অভিজিৎবাবু তার এই আলোচনায় মার্ক্সিজম সম্পর্কে যেসব মতামত রেখেছেন কিংবা মার্ক্সিজমকে বিভিন্ন সেময় যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেগুলো পড়তে গিয়ে বারবারই মনে হয়েছে তিনি পরের মুখে ঝাল খেয়ে ঝাল! ঝাল! বলে চিৎকার করেছেন। যেমন: তিনি তার লেখারশুরুর দিকে মার্ক্সিজমকে অবৈজ্ঞানিক প্রমাণ করতে গিয়ে বলেছেন:
“মার্ক্সের প্রতিটি কথাই কিন্তু অভ্রান্ত নয়। এক সময় তার তত্ত্বের অনুরাগীরা কিন্তু সেভাবেই মার্ক্সকে দেখতেন।তারা ভাবতেন, এই মতবাদ এমন এক ‘সত্যের’ উপর প্রতিষ্ঠিত যা থেকে পদস্খলন কখনোই সম্ভব নয়। ঢালাওভাবে তাঁর সমস্ত বানীকে 'বৈজ্ঞানিক' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো।.....”

অভিজিৎ সাহেব, আপনি মার্কসের কোন কোন এবং কেমন অনুসারীর লেখা বা বক্তব্য থেকে এমন সিদ্ধান্তে আসলেন? আপনি কি মার্কসের ইন্টারপ্রিটেশান সম্পর্কে লেনিনের লেখা পড়ে তারপর এই কথাগুলো বলছেন নাকি আপনার অন্য আরও সিদ্ধান্তের মত এ সিদ্ধান্তটিও আপনি টানছেন লুইস ফয়ের, উইলিয়াম ষ্ট্যানলি, কার্ল মেঞ্জার, বার্টান্ড রাসেল, গিবন এমন কোন বিখ্যাত ব্যাক্তির লেখা পড়ে? যুক্তি যদি বা নাই দিলেন, সূত্র তো দিতে পারতেন!

লেনিন বা অন্য মার্কসবাদীদের কথা বাদই দিলাম, আচ্ছা, আপনি কি, যার বাণীর ভ্রান্ততা/অভ্রান্ততা নিয়ে কথা তুলেছেন, সেই মার্কস তার নিজের এ বিষয়ে মতামত কি সে বিষয়ে একটু খোঁজ খবর করে দেখেছিলেন?দেখেননি, তাহলে সহজেই দেখতে পেতেন কমিউনিষ্ট মেনিফেস্টো প্রকাশের ২৫ বছর পর কার্ল মার্কস ১৮৭২ সালে প্রকাশিত সংস্করণের মুখবন্ধে বলেছেন::

The practical application of the principles will depend, as the Manifesto states, everywhere and at all times, on the historical conditions... for that reason, no special stress is laid on the revolutionary measures proposed at the end of section two. That passage would, in many respects, be very differently worded today. In view of the gigantic strides of Modern Industry in the last twenty five years, and of the accompanying improved and extended party organisation of the working class, in view of the practical experience gained, first in the February Revolution, and then, still more, in the Paris Commune, where the proletariat for the first time held political power for two whole months, this programme has in some details become antiquated. One thing especially was proved by the Commune, viz., that ‘the working class cannot simply lay hold
of the ready-made State machinery, and wield it for its own purposes’.
Quoted by Dr Raj Sehgal, Philosophy Department, Roehampton University

সবচেয়ে বড় কথা, আপনাকে কে বলেছে কিংবা কোন মার্কসবাদীর লেখায় পেয়েছেন যে মার্ক্সিজম কতগুলো "অভ্রান্ত বাণী সমষ্টি" যার কোন একটি 'ভ্রান্ত' প্রামাণিত হলে পুরো মার্ক্সিজমই ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়ে যায়?

অভিজিত সাহেব মার্কসের কল্পিত 'ভবিষ্যত বাণী'র কথা এবং সেই ভবিষ্যত বাণীর ব্যর্থতার কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন:
" পুঁজিবাদী শোষণের কারণে 'দেয়ালে পিঠ' ঠেকে গেলে যদি বিপ্লব হয়ে যেত, তাহলে বিগত শতকের ত্রিশের দশকে সারা দুনিয়া জুরে অর্থনৈতিক মন্দার ঢেউ নেমে এসেছিল তখন কেন পশ্চিমে কোন বিপ্লব হল না সে ব্যাপারটি মোটেই বোধগম্য নয়। এরকম উদাহরণ আছে বহু। মার্ক্স তার তত্ত্বে আদর্শবাদী দৃষ্টিকোন থেকে পুঁজিবাদী সমাজের ধংসের ভবিষদ্বানী করেছিলেন, কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে পুঁজিবাদি ব্যবস্থা ধ্বংস না হয়ে যে টিকে গেছে – সেই টিকে থাকার পেছনে 'অন্তর্নিহিত বিবর্তন'টি গোনায় ধরেন নি, কিংবা ধরতে চাননি।"

'ভবিষ্যত বাণী' কথাটি বোধ হয় ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যবহৃত যেন মার্কসকে সহজে ধর্ম নেতা বা নবী রাসূলের সাথে তুলনা করা যায়। মার্কস যেটা করেছিলেন সেটা হলো প্রেডিকশান, কোন দিনক্ষণ ঠিক করে গণকের মত ভবিষ্যত বাণী নয় । তাও আবার মোটেই কোন আদর্শ বাদী দৃষ্টি ভঙ্গিতে নয়, যেমনটি অভিজিত দাবী করেছেন। আর সে প্রেডিকশান এর শর্ত যে কেবল শোষণের ঠেলায় শ্রমিকের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নয়.... মার্কসের মনোযোগী পাঠক মাত্রই তা জানেন।
মার্কস তার সময়ে পুজিঁবাদকে যেভাবে এবং যে মাত্রায় বিকশিত হতে দেখেছেন এবং সে বেড়ে উঠার মাঝে যেসব অর্ন্তদ্বন্দ্ব দেখেছেন তার বিশ্লেষণের মাধ্যমেই পুজিঁবাদের বিনাশের একটি প্রেডিকশান করেছিলেন।
কিন্তু তা মোটেই শর্তহীন কোন বেদবাক্য ছিলনা কিংবা তার ভিত্তি কেবল দেয়ালে পিঠ ঠেকা নয় ।তিনি পুজিঁবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বজাত কতগুলো প্রবণতা চিহ্ণিত করেছিলেন সেগুলো হলো:
১)ক্রমশ হ্রাসমান মুনাফার হার
২)পুজিঁর ক্রমাগত কেন্দ্রীভবন
২) সর্বহারার সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি
মার্কসের দৃষ্টিতে এই প্রবণতার ফলে পুজিঁবাদ প্রতিনিয়ত সংকটের জন্ম দিতে থাকে।এই সংকটের অনেক গুলো প্রকাশের একটা হলো শ্রমিকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া । এই সংকটগুলো পুজিঁবাদ বিনাশের অবজেক্টিভ সম্ভাবনা তৈরী করে কেবল, নিজে থেকেই বিনাশ করে দেয় না। এরজন্য প্রয়োজনীয় সাবজেক্টিভ প্রিপারেশানগুলো সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন ক্যাপিটালের ভলিঅম ১, অধ্যায় ৩২ এ Historical Tendency of Capitalist Accumulation অংশটিতে।তাছাড়া তিনি The Civil War in France লেখাটিতে পারি কমিউনের শিক্ষা নিয়ে বলেন:

The working class did not expect miracles from the Commune. They have no ready-made utopias to introduce par decret du peuple. They know that in order to work out their own emancipation, and along with it that higher form to which present society is irresistably tending by its own economical agencies, they will have to pass through long struggles, through a series of historic processes, transforming circumstances and men.

সুতরাং অবজেক্টিভ কন্ডিশান এবং সাবজেক্টিভ প্রিপারেশান যথোপযুক্ত না হলে তা সে যতই সংকট বা মন্দার জন্ম দিক না কেন পুজিঁবাদ বহাল তবিয়তেই থাকবে।
আবার মার্কসের জীবদ্দশায় ঘটা পুজিঁবাদের কোন্ অন্তর্নিহিত পরিবর্তনকে মার্কস 'গোনায় ধরেন নি, কিংবা ধরতে চাননি' বলে অভিযোগ করেছেন অভিজিত সে বিষয়টি পরিস্কার নয়। নাকি তাঁর জীবদ্দশার পরবর্তীতে পুজিঁবাদের সাম্রাজ্যবাদের স্তরে রুপান্তর এবং তার ফলশ্রুতিতে বিশ্ব পুজিঁবাদের নব অবস্থানের প্রেক্ষিতে কেন মার্কস এর 'ভবিষ্যত বাণী' সফল হলো না সে জন্য তার এই ক্ষোভ!
ক্ষুব্ধ হওয়ার কিছু নেই অভিজিত, মৃত মার্কস ধ্বংস না হয়ে টিকে থাকা পুজিঁবাদের টিকে থাকার অন্তর্নিহিত বিবর্তনটি গোনায় না ধরলেও মার্কসের একজন উত্তরসূরী লেলিন তার Imperialism, the Highest Stage of Capitalism গ্রন্থে এবিষয়টি আলোচনা করেছেন। আসুন দেখি আপনার ব্যাবহৃত Wikipedia এর লেনিনিজম বিষয়ক ভূক্তিটি এ বিষয়ে কি বলছে:

Lenin developed a theory of imperialism aimed to improve and update Marx's work by explaining a phenomenon which Marx predicted: the shift of capitalism towards becoming a global system (hence the slogan "Workers of the world, unite!"). At the core of this theory of imperialism lies the idea that advanced capitalist industrial nations increasingly come to export capital to captive colonial countries. They then exploit those colonies for their resources and investment opportunities.This superexploitation of poorer countries allows the advanced capitalist industrial nations to keep at least some of their own workers content, by providing them with slightly higher living standards.

For these reasons, Lenin argued that a proletarian revolution could not occur in the developed capitalist countries as long as the global system of imperialism remained intact. Thus, he believed that a lesser-developed country would have to be the location of the first proletarian revolution. This was an open revision of Marx's thesis that such a revolution could only occur in a developed capitalist country. A particularly good candidate, in his view, was Russia - which Lenin considered to be the "weakest link" in global capitalism at the time. At the time, Russia's economy was primarily agrarian (outside of the large cities of St. Petersburg and Moscow), still driven by peasant manual and animal labor, and very underdeveloped compared to the industrialized economies of western Europe and North America.(emphasis মন্তব্যকারীর)

এখন দেখুন আপনার উল্লেখিত ধর্মপ্রচারক মার্কস সাহেবের একজন প্রধান সাহাবা কেমন করে তার মূল বাণীকে improve and update করছে এমনকি উল্টো কথাও বলছে!!

(চলবে)

 

 

  • ১৩ টি মন্তব্য
  • ৩১৪ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৮ জনের ভাল লেগেছে, ১ জনের ভাল লাগেনি
১. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৪৫
comment by: দিনমজুর বলেছেন: অভিজিৎ এর জবাবঃ

উইকি খুঁজবার আগে মার্ক্সের তত্ত্বটার নির্যাস যদি আয়ত্ব করা যেত, তবে আর এই সমস্যা হত না। মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বানী নিয়ে একটা সুন্দর উদাহরণ দেই। মার্ক্স তার তত্ত্ব দেখিয়েছিলেন, সমাজতান্ত্রিক বিল্পব এডভান্সড পুঁজিবাদি রাষ্ট্রগুলোতে আগে হবে। কিভাবে এই উপসংহারে মার্ক্স পৌঁছিয়েছিলেন বলুন তো? কারণ, মার্ক্স তার তত্ত্বে 'প্রফিট'কে দেখেছিলেন 'ভ্যারিয়েবল ক্যাপিটাল এবং লেবার এক্সপ্লোইটেশন'-এর ভিত্তিতে। প্রফিট ছাড়া ক্যাপিটালিজম বেঁচে থাকতে পারে না। আর প্রফিট অর্জিত হয় শ্রমিককে নায্যমূল্য না দেয়ার ফলে যে 'সারপ্লাস ভ্যালু' তৈরি হয় তা থেকে। যেহেতু ফিক্সট ক্যাপিট্যাল থেকে কোন মুনাফা অর্জিত হয় না, অর্জিত হয় কেবলমাত্র ভ্যারিয়েবল ক্যাপিটাল থেকে। কাজেই অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো অধিকহারে শ্রমিকদের কায়িক শ্রমে বাধ্য করবে। আবার অন্যদিকে নতুন নতুন মেশিন এবং নতুন টেকনোলজি ব্যবহারের ফলে বহু শ্রমিক ক্রমাগত চাকরী হারাবে, কারণ শ্রমিকের কায়িক শ্রমকে সুলভে মেশিনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হবে। ঠিক একইভাবে ছোট খাট পুঁজির ব্যাবসাপ্রিষ্ঠান গুলো যেহেতু পুঁজির অভাবে ওই সমস্ত নতুন নতুন মেশিন বা টেকনোলজি ব্যবহার করতে পারবে না, সেহেতু তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধ্বংস হয়ে যাবে আর সে সমস্ত ব্যবাসাপ্রতিষ্ঠানের নিঃস্ব মালিকেরা প্রলেতারিয়েতদের খাতায় নাম লেখাবে। কাজেই পুরো সমাজব্যবস্থা 'Shrinking capitalist class' এবং 'massive Proletariat'-এ বিভক্ত হয়ে যাবে। প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর দুঃখ দুর্দশা অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকবে এবং ক্রাইসিস পয়েন্টে যখন এও অবস্থা একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠবে, তখন আসবে সতঃস্ফুর্ত বিপ্লব। এই হল মার্ক্সের বিপ্লব-তত্ত্বের মোদ্দাকথা। এখন নিঃসন্দেহে এই ক্লাস পোলারাইজেশন পশ্চিমের এডভান্সড পুঁজিবাদী সমাজেই প্রবলভাবে দৃশ্যমান হবে, কাজেই সেখানেই বিপ্লব হবে আগে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। শুধু এটি নয়, আমি বার বার উল্লেখ করেছি - কার্ল পপার, David Prytchitko, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা সহ অনেকেই তাদের বইয়ে দেখিয়েছেন যে, মার্ক্সের অনেক ভবিষ্যদ্বানীই ভুল প্রামণিত হয়েছে। কেন? কারণ মার্ক্স যেভাবে তত্ত্ব সাজিয়ে বিপ্লবের প্রস্তাবণা করেছিলেন তার ভিতরেই ত্রুটি ছিলো, ছিলো অসম্পুর্ণতা। এ প্রসঙ্গে পপার লেখেন –

‘It has been predicted revolution would happen first in the technically highest developed countries, and it is predicted that the technical evolution of the ‘means of production’ would lead to social, political, and ideological movements, rather than other way round… But (so-called) socialist revolutions came first in one of the backward countries.’।

এমনকি রাশিয়ায় যখন বিপ্লব হয়েছিলো, তখন রাশিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়ালি ডেভেলপ্ট ছিলো না মোটেই। তাদের ইন্ডাস্ট্রির উন্নতি হয়েছে বিপ্লব-পরবর্তী যুগে। সমাজতন্ত্রের পতনের পর ব্যাপারটা আরো বেশি দৃশ্যমান। সমাজতন্ত্রে আঁকড়ে পড়ে থাকা তার্কিকেরা 'সমাজতন্ত্রের পুনরুত্থানের' নিদর্শন হিসবে যে দেশ গুলোর - নেপাল, ভেনিজুয়ালা প্রভৃতি দেশের উদাহরণ হাজির করেন সেগুলো কোনটিই কিন্তু 'শীর্ষ পুঁজিবাদী' দেশ নয়। আসলে আমি বার বারই বলেছি আমার প্রবন্ধে 'বাস্তবতা' হচ্ছে কট্টর পুঁজিবাদী দেশগুলোতে বিপ্লব হচ্ছে না -হবেও না। কারণ সেখানে পুজ়িবাদী সমাজের বিবর্তন হয়েছে। ধণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিশীলিত রূপ গ্রহণ করার ফলে শ্রমশক্তির এক উল্লেখযোগ্য অংশ কায়িক শ্রম দানের পরিবর্তে বুদ্ধিজনিত শ্রমদান (মেন্টাল লেবার) করছে এবং তারাই মধ্যবিত্তসূলভ জীবন জাপন করছে। তাদের ক্রয় ক্ষমতা ও দৈনন্দিন জীবনের মান উন্নত থেকে উন্নততর হয়েছে এবং এটা সত্য সত্যই বলা চলে যে, সর্বোপরি মালিক এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে মধ্যবর্তী শ্রেণীভুক্ত মানুষের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। 'চাইল্ড লেবার' নিন্দিত হয়ে বাতিল হয়েছে অনেক আগেই। শ্রমিকেরা আট ঘন্টার কাজের অধিকার এবং সাপ্তাহিক ২ দিন ছুটি-ছাটা আদায় তো করেছেই, তারা কোম্পানির স্টক কিনতে পারছে, এডভান্সড বেনিফিট পাচ্ছে, কোম্পানির কো-ওনার হতে পারছে। কাজেই পশ্চিমে শ্রমিকদের 'সাম্যবাদী' বিপ্লবের সম্ভাবনা এখন সুদূর পরাহতই বলা চলে।

যখন দেখা গেল পৃথিবীর গতি-প্রকৃতি মার্ক্সের দেখানো পথে যাচ্ছে না, তখন সেই তত্ত্বকে বাতিল না করে নানা ধরনের 'এড-হক' হাইপোথিসস হাজির করে এর একটা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হল। এটাই মুলতঃ বিজ্ঞান-মনস্কতা পরিপন্থি। লেলিনিজম, ট্রটস্কিজম, মাওইজম- এগুলো হচ্ছে সম্যক উদাহরণ। এগুলো মার্ক্সের মূল বাণীকে improve and updateকরেনি বরং এক ধরনের গোঁজামিল দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা ছিল। যেমন মাও কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত কৃষকদের নিয়ে বিপ্লবের কথা বলেছেন, কারন চীনে কারখানার শ্রমিক নিতান্তই কম। এখন মুশকিল হল, এই ধরণের 'মাওবাদী' বিপ্লব মার্ক্সের অরিজিনাল ক্ল্যাসিকাল থিসিসের বিরোধী - কারণ এখানে শ্রমিকেরা কিভাবে চাকরী হারিয়ে, কিংবা ক্ষুদ্রপুঁজির ব্যবসায়ীরা কিভাবে ব্যাবসা হারিয়ে প্রলেতারিয়েতদের খাতায় নাম লিখিয়ে বিপ্লবে যাবে - তা 'মাওয়ের বিপ্লবের' বিরোধি। কাজেই এই সমস্ত 'এড হক' হাইপোথিসিসগুলো মার্ক্সিজমকে বাঁচানোর ছদ্ম-প্রচেষ্টা ছাড়া কিছু ছিলো না । এ ধরনের বিপ্লব হতে পেরেছে মার্ক্সিজমের সাফল্যের জন্য নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই কিছু 'কাল্ট ফিগার' দের কারিশমায় । দুর্ভাগ্যক্রমে , রোমান্টিক মার্ক্সবাদীরা তা বুঝেও বুঝতে চাইছেন না। ধর্মের অনুসারীদের মতই মার্ক্সিজমকে ডিফেন্ড করতে নেমেছেন ।

অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।
১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৪৫

লেখক বলেছেন: এই কমেন্ট এর জবাব-১ (কল্লোল কর্তৃক)
আপনিও যদি কার্ল পপার, David Prytchitko, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা পড়ার পাশাপাশি মার্কসবাদের নির্যাসটুকু সঠিক ভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন তাহলে হয়তো আপনি একদিকে একবার মার্কসবাদকে ধর্মগ্রন্থের মতো অপরিবর্তনীয় বলে দাবী করতেন না আবার অন্যদিকে যখন মার্কসবাদীরা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবাতায়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মার্কসবাদকে improve and update করেছে তখন আবার সেটাকে 'জোড়াতালি' 'এডহক হাইপোথিসিস' ইত্যাদি বলে বাতিল করতে চাইতনে না।
আপনি বোধহয় মার্কসবাদের মতো সামাজিক সামাজিক বিজ্ঞানকে প্রকৃতি বিজ্ঞানের সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন যেকারনে বিভিন্ন অবজেক্টিভ কন্ডিশানে এবং বিভিন্ন সাবজেক্টিভ প্রিপারেশানে যে ভিন্ন ধরনের ফলাফল হতে পারে সে বিষয়টি বুঝতে চাইছেননা। "মার্ক্সের অরিজিনাল ক্ল্যাসিকাল থিসিস" আসলে কি? মার্কসের বাক্য বাণীর সমষ্টি নাকি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট কৈাশল? মার্কসের বাক্যবাণী যদি শুনতে চান তাহলে চলুন দেখি রাশিয়ার মত পশ্চাতপদ দেশে বিপ্লব(যেটাকে মার্কসের ত্বত্তের বিপরীত উদাহরণ মনে করেছেন) এর সম্ভাবনা নিয়ে মার্কস কি বলেছেন:

"Theoretically speaking, then, the Russian “rural commune” can preserve itself by developing its basis, the common ownership of land, and by eliminating the principle of private property which it also implies; it can become a direct point of departure for the economic system towards which modern society tends; it can turn over a new leaf without beginning by committing suicide; it can gain possession of the fruits with which capitalist production has enriched mankind, without passing through the capitalist regime, a regime which, considered solely from the point of view of its possible duration hardly counts in the life of society."(1881 letter to Vera Zasulich)

দেখেন মার্কস কিভাবে নিজেই নিজের ত্বত্তকে জোড়াতালি দিচ্ছে!!!!!!! আপনার দেখানো "সুন্দর উদাহরণের" "পশ্চিমের এডভান্সড পুঁজিবাদী সমাজেই প্রবলভাবে দৃশ্যমান হবে, কাজেই সেখানেই বিপ্লব হবে আগে" এইটার বিপরীতে একেবারে পুঁজিবাদে না গিয়েও রাশিয়ার সমাজতন্ত্রে ধাবিত হওয়ার কথা(it can gain possession of the fruits with which capitalist production has enriched mankind, without passing through the capitalist regime) বলেছেন!!!!!!

২. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৪৬
comment by: দিনমজুর বলেছেন: অভিজিৎ এর কমেন্ট এর জবাব-২ (শান্ত কর্তৃক)

পোস্ট লেখকের এই কমেন্ট পড়ে অভিভূত হতে হয় বৈকি!

উইকি না পড়ে মার্ক্সের তত্ত্বের নির্যাস আয়ত্ব করার উপদেশ (!) দিয়ে (না-কি মার্ক্সের তত্তের নির্যাস আয়ত্ব না করে শুধু উইকি পড়ার সমস্যা?) শুরু করা বক্তব্যে এটাই পরিষ্কার হয় যে পোস্ট লেখক অন্তত মার্ক্সের তত্তের নির্যাস ধরতে পেরেছেন! স্বভাবতই আশায় থাকি- আমরা যারা সেই নির্যাস আয়ত্ত করতে পারিনি- তারা হয়তো ওনার কাছ থেকে এ ব্যাপারে সহযোগীতা পাবো। অপেক্ষা করতে থাকি, একসময় অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটে, কেননা তিনি আমাদের সেই জ্ঞান দিয়ে বাধিত করেন। পোস্ট লেখকের আলোচনায় ফুটে মার্ক্সের বিপ্লব তত্তের মোদ্দা কথা। আমরা অভিভূত হই, মুগ্ধ হই। - কৃতজ্ঞও হতে চাই- কিন্তু পারি না। তার মানে আবার এই না যে, আমরা অকৃতজ্ঞ। ঘটনা যে অন্যখানে----

ওনার দেখানো মার্ক্সের বিপ্লব তত্ত কয়েকবার পড়ি, বারবার পড়ি, খুটে খুটে পড়ি। ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। মার্ক্সের তত্ত্বের নির্যাস কি এই? দেখি পোস্ট লেখক মার্ক্সের বিপ্লব তত্তের মোদ্দা কথা (এটাই কি মার্ক্সের তত্তের নির্যাস??) বলতে কি বুঝিয়েছেন? পোস্ট লেখকের ভাষায়ঃ "---------------- কাজেই পুরো সমাজব্যবস্থা 'Shrinking capitalist class' এবং 'massive Proletariat'-এ বিভক্ত হয়ে যাবে। প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর দুঃখ দুর্দশা অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকবে এবং ক্রাইসিস পয়েন্টে যখন এও অবস্থা একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠবে, তখন আসবে সতঃস্ফুর্ত বিপ্লব। এই হল মার্ক্সের বিপ্লব-তত্ত্বের মোদ্দাকথা। এখন নিঃসন্দেহে এই ক্লাস পোলারাইজেশন পশ্চিমের এডভান্সড পুঁজিবাদী সমাজেই প্রবলভাবে দৃশ্যমান হবে, কাজেই সেখানেই বিপ্লব হবে আগে।"
এই যে সতঃস্ফূর্ত বিপ্লবের কথা, ক্রাইসিস পয়েন্টে অবস্থা যখন অসহনীয় হয়ে উঠবে তখন সতঃস্ফূর্ত বিপ্লব করবে শ্রমিক শ্রেণী (দেয়ালে পিঠ ঠেকার আলোচনা আগেই করেছিলেন!!), - এটা মার্ক্সের বিপ্লব তত্তের মোদ্দা কথা? !!!! আসলেই কি তাই??

অবাক হতেই হয়! অভিভূত ও মুগ্ধ না হয়েই যায় না, জাকির নায়েক গোষ্ঠীদের এই পদ্ধতি সম্পর্কে আগে থেকেই জানা ছিল বলে বিমূঢ় হইনি। জাকির নায়েকরা কোরআন-হাদীসকে নিজের মত ব্যাখ্যা এমনকি বিকৃতও করে, ইসলামকে বিজ্ঞানময় প্রমাণ করার জন্য, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য। আর পণ্ডিত অভিজিৎ মার্ক্সের কথাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করছেন, মার্ক্সবাদের ভ্রান্তি আবিষ্কার করার জন্য। এই যা পার্থক্য!! তাছাড়া উভয়ের কাজের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যাহোক, এই পণ্ডিতের বাগাড়ম্বর তো পোস্ট পড়তে গিয়েই বুঝেছি, এটা নতুন নয়, কমেন্টেও তার ধারাবাহিকতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক! আমি দুটো বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিঃ

মার্ক্সবাদের তত্ত্ব আসলে কোনটি? তত্ত্ব আর তত্ত্ব অনুযায়ী কোন প্রেডিকশন - দুটোর পার্থক্য কি? তত্ত্ব সঠিক না বেঠিক এটা কি প্রেডিকশন ঠিক হলো না ভুল হলো তা দ্বারা নিরূপিত হয়?

মার্ক্সের দ্বন্দমূলক বস্তুবাদ, লেবার থিওরি অব ভ্যালু, থিওরি অব সার্প্লাস ভ্যালু, ওনার ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, ওনার পুঁজি সংক্রান্ত আলোচনা - এসমস্তের কোথায় কি ভুল একটু ধরিয়ে দিবেন কি? (হ্যা, আপনি একজায়গায় বলেছেন- মার্জিনাল ইউটিলিটি থিওরি লেবার থিওরিকে প্রতিস্থাপন করেছে- সে প্রসঙ্গে আলোচনা পরে করা যাবে!!)। সেটা না করে মার্ক্সের প্রেডিকশন (আপনার ভাষায় ভবিষ্যদ্বানী) ভুল হয়েছে, সেটা বলার মাধ্যমে কি প্রমাণ করতে চাচ্ছেন? উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে পুঁজিবাদী দুনিয়ার হাল হকিকত দেখে মার্ক্স-এঙ্গেলস ৪টি শিল্পোন্নত দেশে আগেভাগে বা অল্প সময়ের মধ্যেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হওয়ার যে সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন- সে ব্যাপারেই পরবর্তীতে এঙ্গেলসকে ভিন্নসুর অবলম্বন করতে দেখা যায়। আরো পরে লেনিন এসে অনুন্নত রাশিয়ায় বিপ্লব করেন। লেনিন মার্ক্সবাদের তত্ত্বকে কাজে লাগিয়েই রাশিয়ায় বিপ্লব করেন, শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কাজ করেন। মার্ক্সবাদ বা মার্ক্সের তত্ত মানে যদি আপনার দেখানো প্রেডিকশনকেই বুঝে থাকি- তবে সেই প্রেডিকশন তত্ত দিয়ে কি করে লেনিনের বিপ্লব সাধিত হয়?

কোন একটি সূত্র বা তত্ব জানা থাকলে, সেটি দিয়ে প্রকৃতির বা বস্তুজগতের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়, তেমনি ভবিষ্যতের অনেক কিছুও প্রেডিক্ট করা যায়। সেটাকে কি ভবিষ্যদ্বানী বলা যায়? ধরেন এ মুহুর্তে একটি নির্দিষ্ট গতিবেগে চলমান কোন বস্তু নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌছতে পারবে কত সময়ে পরে সেটা এখনই কেউ যদি হিসাব করে বলে দেয়, সেটাকে কি ভবিষ্যদ্বানী বলবেন? মহাকাশযান পাঠানোর পরে কবে কোথায় কখন পৌছবে সেটাও হিসাব করে বলে দেয়া হচ্ছে, এই যে ভবিষ্যতের কথা আগে থেকেই হিসাব করে বের করে দেয়া- সেটা কি ভবিষ্যদ্বানী? আবহাওয়ার পূর্বাভাস কি ভবিষ্যদ্বানী? না-কি, সূত্র/তত্তের প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্যাক্টর হিসাব করে করা প্রেডিকশন? ঘুর্ণিঝড় নার্গিসের ব্যাপারে প্রথমে বলা হচ্ছিল এটি বাংলাদেশের উপর দিয়ে যাবে, কিন্তু পরে দেখা গেল সেটার গতিমুখ পরিবর্তন হয়ে বার্মায় আঘাত হানে। প্রথমে পুর্বাভাস খাটেনি জন্য শুরুর অবস্থায় যে হিসাবাদি করা হয়েছে যেসব সূত্রগুলো দিয়ে সেগুলো কি ভুল বলা যাবে? নাকি বলতে হবে, আরেকটি বিশেষ অবস্থা তৈরী হয়ে ঝড়টির গতিমুখ পরিবর্তিত হওয়ায় এমন টি হয়েছে- যে বিশেষ অবস্থাটি পূর্বে উপস্থিত ছিল না।

মার্ক্স-এঙ্গেলস পুঁজিবাদকে ধরে ধরে বিশ্লেষণ করে, এর অভ্যন্তরীন বিবর্তনকে দেখেই- সমস্ত কিছু দাঁড় করিয়েছেন, সেকারণে পুঁজির বিকাশটি তাঁরা সফলভাবে দেখিয়েছেন, মনোপলি পর্যন্ত ব্যাখ্যা করে গিয়েছেন- এমনকি সাম্রাজ্যবাদের দিকে এর টার্ণের সম্ভাবনার কথাও বলে গিয়েছেন, যে সম্পর্কে পরবর্তীতে লেনিন বিস্তারিত ব্যাখ্যা দাঁড় করেন। এটাকে কি ডেভলোপমেন্ট বলে না? কোথায় পেলেন গোঁজামিল? সায়েন্সের ইতিহাস, মানব সমাজের ইতিহাস তো এই ধারাবাহিক ক্রমান্বয়তার। সেটা গোঁজামিল হবে কেন? কোথায় গোঁজামিল পেলেন? মাও এর উদাহরণটিও হাস্যকর! মার্কস কোথায় বলেছেন, এমন একটি আধা সামন্তীয়- আধা উপনিবেশ রাষ্ট্রে বিপ্লব করা যাবে না- কৃষকদের বিপ্লবে অংশ নেয়া যাবে না- কেবল কারখানার শ্রমিকদেরই বিপ্লবে অংশ নিতে হবে?? আর, এই প্রায়োগিক জায়গাটি তত্ত হতে যাবে কেন? সেটি মার্ক্সের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, লেবার থিওরি অব ভ্যালু বা সারপ্লাস থিওরি অব ভ্যালুর কোন জায়গায় বিপরীত? এসব গালগল্পের অভিযোগ কোথায় পেলেন?

মার্ক্সের আগে থেকে সকলেই জানে- আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবে কৃষক শ্রেণীর ভূমিকা কতখানি। পশ্চাদপদ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে কৃষকশ্রেণীর সংগ্রামের ভূমিকা কতখানি, এবং মার্কস কখনো বলেননি যে, সামন্তীয় সিস্টেম উৎখাতের জন্যও কারখানার (কায়িক) শ্রমিকদের ছাড়া চলবে না!!!! আশ্চর্য সব আলোচনা!! এই লোক বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করেন, বিজ্ঞানকে ভালোবাসেন, এটা বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে!!!
৩. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৪৬
comment by: অন্যমনস্ক শরৎ বলেছেন: ভালো কাজ।
৪. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৫৩
comment by: দিনমজুর বলেছেন: জবাব-২ এর প্রেক্ষিতে অভিজিৎ এর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াঃ

এই কমেন্টে ব্যক্তি-আক্রমনের প্রাবাল্য এতই প্রবল যে এর যথার্থ উত্তর দেওয়াই সঙ্গীন। পুরো লেখায় বিশেষণের ছড়াছড়ি। অনাবশ্যকভাবে 'জাকির নায়েক' প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছেন, লেখাও শেষ করেছেন, 'এই লোক বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করেন, বিজ্ঞানকে ভালোবাসেন, এটা বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে'। এগুলো বললেই যদি তর্কে যেতা যেত, তবে আর লজিকে 'Argumentum ad hominem' বলে কিছু আর থাকত না। সমাজে আসলেই কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হওয়ার কোন কমতি নেই। ব্যক্তিআক্রমনাত্মক এবং খিস্তি খেউর করার পরও তারা শ্রমিক-দরদী হন, সমাজের ভালর জন্য উচাটন হন। গালাগালির ঘুর্নীঝড় সৈকত প্লাবিত করলেও তাদের নাম হয় 'অনুপম' কিংবা 'শান্ত'!

ভদ্রলোক আমার নামটি জানবার পরও আমাকে সম্বোধন করেন 'এই লোক' বলে। মার্ক্সিস্ট বলে না কথা। তিনি মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বানীর সাথে বিজ্ঞানের ভবিষ্যদ্বানী কিভাবে মিলিয়েছেন তার নমুনা দেখুন -

"কোন একটি সূত্র বা তত্ব জানা থাকলে, সেটি দিয়ে প্রকৃতির বা বস্তুজগতের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়, তেমনি ভবিষ্যতের অনেক কিছুও প্রেডিক্ট করা যায়। সেটাকে কি ভবিষ্যদ্বানী বলা যায়? ধরেন এ মুহুর্তে একটি নির্দিষ্ট গতিবেগে চলমান কোন বস্তু নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌছতে পারবে কত সময়ে পরে সেটা এখনই কেউ যদি হিসাব করে বলে দেয়, সেটাকে কি ভবিষ্যদ্বানী বলবেন? মহাকাশযান পাঠানোর পরে কবে কোথায় কখন পৌছবে সেটাও হিসাব করে বলে দেয়া হচ্ছে, এই যে ভবিষ্যতের কথা আগে থেকেই হিসাব করে বের করে দেয়া- সেটা কি ভবিষ্যদ্বানী? আবহাওয়ার পূর্বাভাস কি ভবিষ্যদ্বানী? না-কি, সূত্র/তত্তের প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্যাক্টর হিসাব করে করা প্রেডিকশন?"

অনুপম সাহেব বুঝছেনই না যে, পদার্থবিজ্ঞানএর মূল নীতির উপর নির্ভর করে তত্ত্বের যে ভবিষ্যদ্বানি করা হয়, তার সাথে মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বানীর পার্থক্য আসলেই আকাশ-পাতাল। বিজ্ঞান 'দ্বান্দ্বিকতা' নিয়ে কাজ করে না, কাজ করে cause and effect নিয়ে। আর বিজ্ঞানের তত্ত্বের সাহায্যে যে ভবিষ্যদ্বানী করা হয় তা শুধু নিঁখুত ফলাফলই দেয় না, তার শুদ্ধতা অশুদ্ধতা একদম নিঁখুতভাবে পরিমাপ করা যায়। যেমন ২০ গ্রাম ওজনের একটি বস্তুতে ২ নিউটন বল প্রয়োগ করা হয়, তবে বস্তুটার কতটুকু সরণ হবে, তা স্কুলের ছাত্ররাও হিসেব করে বের করতে পারবে। ঘুর্নিঝড় কবে আঘাত করব, কততূকু জায়গা জুইড়া তান্ডব চালাইবো, সবই এখন আগে ভাগে বইলা দেওয়া যায়। এইবার যে ঘুর্নিঝড় নিউ অরলিন্সে আঘাত করলো সেইটার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া গুলা দেখেন। সবই নিয়ম মতই হইছে। অথচ, মার্ক্সের বিপ্লবের তত্ত্ব তার ভবিষ্যদ্বানী অনুযায়ী কার্যকরী না হওয়ার পরও সেটা 'নিঁখুত বিজ্ঞান'! পৃথিবী নাকি ধনতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্র আর তা থেকে সাম্যবাদে যাইবো। রাশিয়া, পূর্বইউরোপের দেশগুলো, চায়না সবাই এই ভবিষ্যদ্বানীরে কাঁচকলা দেখাইয়া কমিনিজমের মোহ থেইকা ফিরা গেছে পুঁজিবাদের রাস্তায়। সমাজতান্ত্রিক দেশ খুঁজতে গেলে আইজকা বাটি চালান দেওন লাগে। আর তারপরো শান্ত সাথেব 'অনুপম' ভঙ্গিতে মার্ক্সরে বিজ্ঞান বইলা পুজ়া কইরাই যাইতাছেন, আর চোক্ষা বাঁশের আগায় লাল পতাকা বাইন্ধ্যা আকাশে 'বিপ্লবের' লাল ঝান্ডা উঠায়াই রাখছেন।

পুজা করতাছেন করেন, যারা হেইটা অস্বীকার করে তাগো গাইল পাড়লেই যদি মার্ক্সবাদ বিজ্ঞান হইয়া যায়, তা হইলে বলনের কিছু নাই। গালাগালির উৎকর্যতার ভিত্তিতে য়ার অন্ধ পুজার ভিত্তিতে কোন তত্ত্বের বৈজ্ঞানিকতা কোথাও গৃহীত হয় নাই।
১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৫৫

লেখক বলেছেন: এই কমেন্টের জবাব (শান্ত কৃত), যা মডারেশনে আটকে গিয়েছেঃ

অভিজিৎ মহোদয়ের উপরিউক্ত কমেন্টটি অভূতপূর্ব। লেখার ভঙ্গীটি মনোহর, উপস্থাপনের ঢং অনবদ্য, ভাষার ব্যবহার চমকপ্রদ ও ক্যারিশমাটিক- শুধু এ কারণেই এটিকে অভূতপূর্ব বলছি না, অভূতপূর্ব এ কারণে যে, এর রসময়তা- এটি পড়ে এই প্রথম আমরা অভিজিৎ সাহেবের রসবোধ সম্পর্কে ধারণা পেলাম, পাণ্ডিত্য এবং রসময়তার এক বিরল সমন্বয় আমরা তার মধ্যে পেয়ে অভিভূত হলাম, সাথে এতক্ষণের নিরস কঠিন কর্কশ আলোচনায় আমাদের আমোদের অভাবও অনেকাংশে পূরণ হলো (এ যেন তপ্ত মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির ছোঁয়া!)।

আরেকদিক দিয়েও এটি অভূতপূর্ব: এই প্রথম ওনাকে যুক্তি করার চেষ্টা করতে দেখা গেল (যুক্তি যতই দুর্বল হোক না কেন- পূর্বেকার মত এটাকে নিশ্চয় কুযুক্তি বলা যাবে না), এই প্রথম তাকে কোন কোটেশন ছাড়াই বক্তব্য উপস্থাপন করতে দেখা গেল!
তার এই কমেন্ট পড়ে এক বন্ধু বলে বসলো, "আগে বুঝলে- আমার পার্সোনাল ব্লগে তোকে নিয়ে একটি আর্টিকেল লিখতাম- যার কিওয়ার্ড রাখতাম anupam shaikat blind... প্রভৃতি; তাহলে নিশ্চয়ই অভিজিৎ বাবুর এই কমেন্টটিতে অনেকটা এমন কিছু লাইন পাওয়া যেত: ".....উদাহরণ স্বরূপ রহিম বক্সের আলোচনা থেকে উদ্ধৃতি দেই, 'Anupam Shaikat Shanto is such a blind marxist to whom marxism is like a religion, worshiping it as if it's science ..........., ' - তার ব্যাপারে করিম শেখ, মলয় মৃধা প্রমুখের সমালোচনাও পড়া যেতে পারে...., আপনারা অবশ্য বলতে পারেন রহিম বক্স, করিম শেখ, মলয় মৃধা রা কিছুই জানেন না....., তবে কে জানে আর কে জানে না তা আমার আলোচ্য বিষয় নয়..... ইত্যাদি""। কিন্তু আমার সেই বন্ধু নিশ্চয় দুর্জন, দুর্মুখ- না হলে কি পাণ্ডিত্য নিয়ে এমন নির্মম রসিকতা করতে পারে!!

যাহোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরি। অভিজিৎ সাহেবের এই অভিনব, অভূতপূর্ব ও অনবদ্য কমেন্টের জন্য এবং আমাদের আমোদের সংস্থান করার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। সেটাতে কোন কার্পণ্য করছি না, তবে মূল প্রসঙ্গ যেহেতু যুক্তি-তর্ক সেখানেই যাই। এবারে তার অনবদ্য কমেন্টে ভাষার কারুকার্যতার ভিতর দিয়ে যেটুকু যুক্তি উঠে এসেছে সেদিকে দৃষ্টি দেই:
তিনি তার আলোচনার শুরুতেই জাকির নায়েকের প্রসঙ্গকে অনাবশ্যকভাবে আনার কথা তুলেছেন। বাহ বাহ, ভালো ভালো। আমার পিতৃপ্রদত্ত নাম নিয়ে ওনার ভাষার কারুকাজ, ক্যারিশমাটিক আলোচনা আমাদের সকলের আমোদ সংস্থাপনের জন্য যথেস্ট "আবশ্যক" মানছি। তবে মার্ক্সবাদ বিজ্ঞান কি না এ আলোচনায় যিনি ধর্মের আলোচনা, ধর্মগ্রন্থের আলোচনা, ধর্ম প্রচারকের আলোচনা আনেন (সেটাকে তুলনা বললে, আমার জাকির নায়েক প্রসঙ্গও তো তুলনা!!)- তিনি অভিযোগ তুলেন আবশ্যক/অনাবশ্যক নিয়ে- সেটায় একটু অবাকই হই। তিনি অন্যদের মুখ দিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন যে, মার্ক্সের তত্ত্বের সাথে বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্মের সাযুজ্যই বেশী। তার ব্যাখ্যায় জানাচ্ছেন, মারক্সবাদীদের কাছে মার্ক্স পয়গম্বর মহম্মদ যীশু, ক্যাপিটাল কোরাণ এবং কমিউনিস্ট মেনিফেসটো নাকি হাদীস। এহেন "আবশ্যক" কিন্তু অন্তসারশূন্য আলোচনার বিপরীত যুক্তি তুলে ধরার মধ্যে "ব্যক্তি আক্রমণ"-এর প্রাবল্য পেলেও সেই "অনাবশ্যক" যুক্তি করাটাকেই শ্রেয় মনে হচ্ছে। কোরাণ-হাদীসের ঈশ্বরতত্ত, বেহেশত-দোযখ, লোভ-ভয়, পৌরাণিক কল্প কথা, অযৌক্তিক-কাল্পনিক গালগল্প, এসবের সাথে ক্যাপিটাল-কমিউনিস্ট ম্যানিফেসটোর তত্তের সাযুজ্য খুঁজে বের করাকে "আবশ্যক" জ্ঞান করেন যারা- তারাই দেখি বিজ্ঞানের ধ্বজা উড়াতে চান! সত্যের প্রতি, যুক্তির প্রতি প্রচণ্ড শ্রদ্ধা-একাগ্রতা আর অসত্য-অন্ধকার-কুসংস্কারের প্রতি অবনত থাকার মধ্যে যারা পার্থক্য পায় না, তাদের যুক্তিকে জাকির নায়েকের সাথে তুলনা করাটা ওনার কাছে "অনাবশ্যক" হলেও সেটা কি ভুল কিছু? জাকির নায়েকেরাও দেখি যুক্তিতে না পরলে বলতে থাকে- "আপনাদের বিজ্ঞানও তো একটা ধর্ম! নাস্তিকতাও একটা বিশ্বাস!!" মার্ক্সের ক্যাপিটালে যে ভাবে যে পদ্ধতিতে তত্তের ডেভলোপমেন্ট, তত্তের ব্যাখ্যা এবং উদাহরণ সহ প্রায়োগিক নানা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে, আর কোরাণের পৌরাণিক কল্প কথার পেছনে যে যুক্তি, যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে - উভয়ের মধ্যে কি মিল থাকতে পারে? সত্যে অবিচল থাকাটা যদি কারো কাছে অন্ধত্ব হয়, তবে বলতে হয় কোপার্নিকাস-গ্যালিলিও -ও অন্ধ (!!)। মার্ক্সবাদ দিয়ে এখনো আমি যদি এই সমাজ ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করতে পারি, এখানকার দ্বন্দ্বগুলো ধরতে পারি, পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে ব্যাখ্যা করতে পারি, শোষণের প্রকৃতি ও মাত্রা ধরতে পারি- পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংকট সমস্যাগুলো সম্পর্কে বুঝতে পারি- তবে কেন আমাকে মার্ক্সবাদ বর্জন করতে হবে? মার্ক্সের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, থিওরি অব সারপ্লাস ভ্যালু তথা রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ- এসবের মধ্যে যদি কোন ভুল না পাই, কেউ যদি না দেখাতে পারে, তবে কেন মার্ক্সবাদের পক্ষাবলম্বনকে অন্ধত্ব বলা হবে? আর, এই পক্ষাবলম্বন যদি কারো কারো উগ্র ধরণের হয়েই থাকে, তবে সেটার জন্য মার্ক্সবাদকে দোষারোপ কেনই করা হবে????

যাহোক, আবার আগের প্রসঙ্গে আসি। মার্ক্সবাদ বিজ্ঞান কি না এই আলোচনায় ধর্মের সাথে সাজুয্য খোঁজার চেষ্টাকে পোস্ট লেখক খুব আবশ্যক মনে করেছিলেন, কিন্তু জাকির নায়েক গোষ্ঠীর সাথে মিলের কথা বলাটা ওনার কাছে ঠিক ততখানিই অনাবশ্যক। তবে, এটা হয়তো এতক্ষণে সকলেই স্বীকার করবেন যে, ওনার জন্য অত্যাবশ্যক কাজটি প্রমাণে যুক্তি উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছেন। আর উল্টোদিকে ওনার জন্য যতই অনাবশ্যক হোক না কেন- নিশ্চয়ই স্বীকার করতে হবে যে, অভিজিৎ সাহেবের যুক্তি করার ধরণের সাথে জাকির নায়েক, রাশাদ খলীফাদের যথেস্ট মিল আছে (আগের মন্তব্যগুলো দ্রষ্টব্য)। কেউ মিল যদি খুঁজে না পান, তবে আরেকটি উদাহরণ দেখুন। রাশাদ খলীফা কোরাণকে বিজ্ঞানময় দেখানোর জন্য, পৃথিবীর আকৃতি সম্পর্কে কোরাণেই যে বলা হয়েছে সেটা প্রমাণ করার জন্য যে কাজটি করেছিলেন, একটি আয়াতের অর্থই নিজের মত পাল্টিয়ে "পৃথিবীর আকৃতি ডিম্বাকৃতির"করেছিলেন- অতঃপর বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, পৃথিবীর আকৃতি ডিম্বাকৃতির- এটা বলা অধিক বিজ্ঞান সম্মত, কেননা ডিম্বের মত পৃথিবীর অভ্যন্তরেও অনেকগুলো লেয়ার আছে। এবার অভিজিৎ সাহেবের আলোচনা দেখুন, মার্ক্সের কথাগুলো বিকৃত করে, ভুল ভাবে উপস্থাপন করে, খণ্ডিত ভাবে উপস্থাপন করে ("পৃথিবীর আকৃতি ডিম্বাকৃতির" এটার মত), সেটাকে ধরে যুক্তি খণ্ডন করছেন, মার্ক্সবাদকে ভুয়া প্রমাণ করছেন (ডিম্বাকৃতির কথাকে ধরে করা যুক্তির মত)!! রাশাদ খলীফার অন্ধ অনুসারীরা যেমন দেখাতে পারবে না- সেই আয়াতটির অর্থ কিকরে "পৃথিবীর আকৃতি ডিম্বাকৃতির" - তেমনি অভিজিৎ বাবুও এখন পর্যন্ত দেখাননি- মার্ক্সের বরাদ দেয়া বিকৃত-খন্ডিত-ভুল ব্যাখ্যা দেয়া কথাগুলোর উৎস কি? বারবার দেখিয়ে দেয়ার পরেও, সে জায়গাগুলো তিনি দেখেও যেন না দেখার ভান করছেন!! এটাকে কি বলা যেতে পারে তাহলে??

যাহোক এখনো সময় আছে, তিনি হয়তো দেখাবেন, আমরা অপেক্ষায় থাকলাম সূত্রের জন্য। তবে উনি লজিকে 'Argumentum and hominem এর কথা বললেও, ওনার আলোচনায় এখন পর্যন্ত যাকিছু পেয়েছি- তাতে এইসব বস্তু যে ছিল না তা হলফ করে বলা যেতে পারে। অবশ্য দাবী তিনি করতেই পারেন, যেমন করে রাশাদ খলীফা-জাকির নায়েক নিজেদের অনেক যুক্তিবাদী-বিজ্ঞানমনস্ক(!) বলে দাবী করতেন বা করেন!!!

এইবারে আসি ভবিষ্যদ্বানী বিষয়ে। মনে হয়েছে এ সংক্রান্ত আমার আলোচনাটি ভদ্রলোক ধরতে পারেননি, সে আলোচনা নাহয় আবার করা যেতে পারে, তবে প্রথমেই মার্ক্সবাদের ভবিষ্যদ্বানীর সাথ বিজ্ঞানের ভবিষ্যদ্বানীকে মিলিয়ে ফেলায় তিনি আতকে উঠেছেন। আঁতকে ওঠা দেখে তাকে বিজ্ঞান অন্তপ্রাণ মানুষ হিসাবে কেউ কেউ ভাবতে পারেন- তবে পরবর্তী আলোচনায় এহেন বিজ্ঞান অন্তপ্রাণ মানুষের বিজ্ঞানকে বুঝার ক্ষমতা নিয়েই সন্দেহ এসে ভীড় করে। তিনি বলেছেন: "বিজ্ঞান 'দ্বান্দ্বিকতা' নিয়ে কাজ করে না, কাজ করে cause and effect নিয়ে"। অবাক হবো না মজা পাবো ভাবতে হয়নি, কেননা আমাদের পণ্ডিত ব্যক্তির রসময়তার সন্ধান আমরা এর আগেই যে পেয়েছি। "বিজ্ঞান গণিত নিয়ে কাজ করে না, কাজ করে cause and effect নিয়ে", বা "বিজ্ঞান অবরোহ/আরোহ পদ্ধতি নিয়ে কাজ করে না, কাজ করে cause and effect নিয়ে" বা "বিজ্ঞান অমুক সূত্র, তমুক সূত্র নিয়ে কাজ করে না, কাজ করে cause and effect নিয়ে" এমন কথা যদি কেউ বলে, তবে কি তাকে গোপালভাড়ের চেয়েও বড় রসিক মনে হবে না?

বিজ্ঞান অবশ্যই কাজ করে cause and effect নিয়ে, তবে কার্যকরণ বের করারও কিছু পদ্ধতি আছে, সেটাকেও সায়েন্টিফিক পদ্ধতি বলে। সেসব পদ্ধতির মধ্যে আরোহ/অবরোহ, গাণিতিক, পরীক্ষণ, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ এমন অনেক পদ্ধতি আছে। মার্ক্সও কজ এণ্ড ইফেক্টের বাইরে যাননি- বরং অনেক বেশী করেই এটার প্রতি সাবমিটেড ছিলেন বলেই, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার সমস্যা সংকট (ইফেক্ট) গুলো দেখে আগে সেগুলোর কারণ বের করার চেষ্টা করেছেন। আর এক্ষেত্রে ওনার পদ্ধতিটি ছিল দ্বান্দ্বিক।
কিন্তু, পোস্ট লেখকের আলোচনায় দ্বান্দ্বিকতাকে উড়িয়ে দেয়ার যে প্রবণতা দেখলাম (মার্ক্সবাদকে উড়িয়ে দেয়ার জন্য "আবশ্যক" ছিল হয়তো!!), অথচ আগেরই আরেকটি মন্তব্যে দেখেছিলাম অন্য সূর! সেখানে মার্ক্সের একটি কাল্পনিক বক্তব্য (".......সেই ব্যবস্থায় 'dialect will cease to operate"- সেই ব্যবস্থা হচ্ছে সাম্যবাদী সমাজ) তুলে ধরে সেটিকে সমালোচনা করতে গিয়ে জানিয়েছেন : "আজকের সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন মার্ক্সের এ ধারনা অবৈজ্ঞানিক। সমস্ত কনফ্লিক্ট দূর হয়ে গেলে তা হবে 'সায়েন্সদিকশন নাইটমেয়ার'। আসলে সমাজের সব কনফ্লিক্ট কখনোই দূর হয় না, হবে না। এক জায়গার কনফ্লিক্ট রিজল্ভ হইলে আরেক জায়গায় নতুন কনফ্লিক্ট দেখা দেবে"। অর্থাৎ এখানে ডায়ালেক্টকে তো অস্বীকার করেনইনি, বরং জানিয়েছেন এটা ইনএভিটেবল। অথচ, উপরের মন্তব্যটিতে আবার জানাচ্ছেন- বিজ্ঞান দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে কাজ করে না!! যা কিছু সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত - যা কিছু মাস্ট, তাকে ছাড়া বা বাদ দিয়ে বিজ্ঞানের চলে কি করে??
আসলে, সমস্যাটি অন্যখানে- কোন কিছুকে আগে থেকে স্থির করে কিছু প্রমাণ করতে গেলে এমনই হয়, একজায়গার এক কথা দিয়ে যেমন পূর্বে স্থির কৃত বিষয়কে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে দেখা যায়, আবার পরক্ষণেই পূর্বে স্থিরকৃত বিষয়টিকে প্রমাণের জন্য সেই কথার ঠিক বিপরীত কথাকেই ব্যবহার করা হয়। এসব নতুন নয়। এনারা আবার বিজ্ঞানের সোল এজেন্ট খুলে বসে আছেন। কি আর করা - এমন সোল এজেন্ট আমরা আগেও দেখেছি- মরিস বুকাইলিদের কথা আমাদের এখনও স্মরণে আছে।

আবার ভবিষ্যদ্বানীর ব্যাপারে আসি। আমি যেটা বলতে চেয়েছিলাম, সেটা একটি উদাহরণ দিয়ে আবার বলি। ধরুন একজন মিনিটে ১০ মিটার যেতে পারে এমন একটি খেলনা গাড়ি সোজা ১০০ মিটার রাস্তার একমাথা থেকে সকাল ১০ টায় চালু করে (শুরুর বেগও ১০ মি/মিনিট করা অবস্থায়) ভবিষ্যদ্বানী করলো এটা ১০ টা ১০ মিনিটে অপরপ্রান্তে পৌছবে। গতির সূত্র এপ্লাই করে সে বের করেছে যে- এটির সময় লাগবে ১০ মিনিট। প্রতিবারে এটাই ঘটার কথা, কিন্তু ঘটনাক্রমে সেই রাস্তাটি ছিল উপর থেকে নীচের দিকে ঢালু, এবং গাড়িটি পৌছল- ১০ টা ৮ মিনিটে। এই যে, ভবিষ্যদ্বানীটি যে ফললো না- তার কারণ মাধ্যাকর্ষণকে এখানে গণনায় নেয়া হয়নি, ঘর্ষনকেও গণনায় নেয়নি- কিন্তু তার মানে কি এই ঐ গতির সূত্রটি ভুল? আবার সে যদি এমনভাবে ভবিষ্যদ্বানী করে থাকে যে, যদি ১০০ মিটার পথ সরলপথ ও সম্পূর্ণ আনুভূমিক হয় এবং কোন ঘর্ষণ কাজ না করে- তবেই সে গাড়িটি ১০ টা ১০ মিনিটে সেই পথ পাড়ি দিবে- তাহলে উপরোক্ত ঘটনায় ১০ টা ৮ মিনিটে পৌছার কারণে কি বলা যাবে যে ভবিষ্যদ্বানী ভুল হয়েছে?
মার্ক্স তৎকালীন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অভ্যন্তরীন সংকট দেখে চারটি শিল্পোন্নত দেশে অল্প সময়ে বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখেছেন- কেননা একটি অবজেকটিভ কণ্ডিশন (শ্রমিকদের সমস্যা-সংকট) বিরাজ করার মত অবস্থা তিনি টের পাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি তো সাথে বিপ্লবের শর্ত হিসাবে অন্যান্য অবজেকটিভ কণ্ডিশন (পুঁজিবাদী সিস্টেমের ইনহেরেন্ট কণ্ডিশন, বুর্জোয়া শ্রেণীর অবস্থা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিত ইত্যাদি) এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাবজেকটিভ প্রিপারেশন (অর্গানাইজেশন)। অন্যান্য কণ্ডিশন পূরিত না হয়ে বিপ্লব না ঘটলে- তাহলে মার্ক্সের প্রেডিকশন কিভাবে ভুল বলা সম্ভব? আর প্রেডিকশন ভুল বলে মার্ক্সবাদ বিজ্ঞান না- এই পদ্ধতিই বা কতখানি বিজ্ঞানসম্মত?

(কেউ মার্ক্সবাদকে পদার্থবিদ্যা বা ন্যাচারাল সায়েন্সের মত নিখাদ বিজ্ঞান বলে দাবী করছে না, এটা একটা সোসাল সায়েন্স, তার চেয়েও বড় কথা মার্ক্সবাদের থিওরিগুলো এবং থিওরিগুলো ডেভলোপমেন্টের পদ্ধতিগুলো সায়েন্টিফিক কি -না?)

যাহোক অনেক কথা বলে ফেললাম- অভিজিতের এই পোস্টে আসাই আসলে যুক্তি-তর্কের নিমিত্তে, তাই এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে এত কথা এত যুক্তি করলাম; নতুবা পোস্টলেখকের আলোচ্য মন্তব্যটি যথেস্ট রসযুক্ত, সেকারণেই তার প্রতি আমরা খুব কৃতজ্ঞ।
ধন্যবাদ।

৫. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৫৩
comment by: ফারহানা আহমেদ বলেছেন: চালিয়া যান
৬. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:০২
comment by: সৈয়দা তাহমিনা বেগম সীমা বলেছেন: The practical application of the principles will depend.
আপনার লেখাটি চমৎকার হয়েছে।
ভালো লাগলো।
৭. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:১৩
comment by: মনজুরুল হক বলেছেন: শুধু শান্ত বা কল্লোল নয়, আরো কিছু মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া মডারেশনে আটকে গেছে।এটা নিয়ে পি.মুন্সী,ফারুক ওয়াসিফ এবং আরো অনেকের যথাপোযুক্ত মন্তব্য আছে।সব মিলিয়ে টোটাল লেখাটি বিশাল হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে আমার কিছু বলবার ছিল। সচলে আমি 'অনাকাঙ্খীত' বা 'অনাহূত' বলে বলতে পারিনি।আপনি লেখাটা এখানে আলোচিত হওয়ার জন্য তুলে দেওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন।
৮. ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৪৯
comment by: বিগব্যাং বলেছেন: ১। "আধুনিক বিগ্যান" বলে আজকে আমরা যে ধারণাটা দুনিয়াব্যাপী বিগ্যাপিত হতে দেখি, তা আসলে সামগ্রিক অর্থে বিগ্যান না...ভাংতে থাকা সামন্ত সমাজকে যৌক্তিক মোকাবেলা আর অপ্রতিরোধ্য শিল্পবিপ্লবের উপজাত হলো আধুনিক বিগ্যান (খণ্ডবাদী বিগ্যান)...তথাকথিত আধুনিক বিজ্যানের তথাকথিত জনক বেকন একইসাথে গ্যানত্ত্বাত্তিক ফ্যাসীবাদেরও জনক... "গ্যানই শক্তি" বা "বিগ্যান হলো প্রকৃতিকে বশ করে মানুষের জীবনকে আরামদায়ক করা" র ফলই হলো আজকের বিপর্যস্ত পৃথিবী (যেখানে প্রকৃতি আর মানুষ পরষ্পরের বৈরী, আপাতদৃষ্টিতে)...বেকনের বাপ বা দাদাই যে কেবল বদমাশ ছিলো তা নয়, তিনি নিজেও ছিলেন রাণীর উপনিবেশ বিষয়ক পরামর্শক/উপদেষ্টা...
২।সাম্প্রতিক সময়ে বিগ্যানের দর্শনের আলোচনায় সামগ্রিকতাকে সর্বোচ্চ বিবেচনা করা হয়...
৩। বিশ্বযুদ্ধের বাস্তবতায় ফ্রাঙ্কফুট স্কুলের ইতিবাচক প্রভাব ছিলো কি নেই সে তর্কে না গিয়েও বলা যায়, পপার নিয়ে মুগ্ধতা এমনকি পুজিবাদী শিবিরেও ওতটা আর নেই (কারণ এই ইস্যুতে আরো রংচঙ্গে ক্লাউন এখন সুলভ)...
৪। ইউরোপ আর রাশিয়ায় স্কলারশীপ ছিলো বলে পুরো ষাটের দশকে এই ফেনাখেকো মধ্যবিত্তরা চেচিয়েছিলো, মার্ক্সবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা সত্য...এখন বলছে, মার্ক্সবাদ কি বিগ্যান?
আজ সন্ধ্যায় যদি ঢাকার রাস্তায় দশ হাজার লোক লাল পতাকা নিয়ে মিছিল বের করে তাহলে কাল সকালেই এই ফেনাখেকোরা আবার সুর বদলাবে...
মেরুদন্ড না থাকার মেলা সুবিধে...
একেবেকে সবদিকে যাওয়া যায়...
৯. ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:১৪
comment by: বিগব্যাং বলেছেন: কল্লোল কি বুয়েটের কল্লোল নাকি? হাদী'র বন্ধু কল্লোল...
১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১২:১৮

লেখক বলেছেন: হুমম.....

১০. ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৯
comment by: বিগব্যাং বলেছেন:
তাইতো কই...এইরকম সলিড জিনিস নামাইতেছে কারা...এইবার আপনাগোরে চিনছি...ভালো থাইকেন...

 



 


নাইল্যাকাডা ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যার প্রাপ্তিস্থানঃ
আজিজ সুপার মার্কেট
১। বইপত্র/ ২। জনান্তিক/ ৩। শ্রাবণ/ ৪। প্রথমা (একুশে)/ ৫। তক্ষশীলা/ ৬। লিটল...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস