Click This Link
আর রাশিয়ার গ্যাজ প্রমের সাথে চুক্তিটি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটিতে তোলা হবে ঈদের পরপরই।(সূত্র: বাঙলা নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম Click This Link)
সাইনোপেকের সাথে বাপেক্সের জয়েন্ট ভেঞ্চার:
অন্যান্য চুক্তির মতোই এই চুক্তির খসড়াও গোপন রাখা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে দেথা যায় নাইকোর সাথে বাপেক্সের জয়েন্ট ভেঞ্চারের আদলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩,৯০০ বর্গকিমি আয়তনের ২২ নং ব্লকে সাইনোপেকের সাথে বাপেক্সের এই জয়েন্ট ভেঞ্চারের পায়তারা করা হচ্ছে। নাইকোর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে নাইকোর অংশীদ্বারিত্ব ৮০% এবং বাপেক্সর ২০% ছিল। সাইনোপেকের সাথে চুক্তির বেলায় বাপেক্সের অংশীদ্বারিত্ব ৩০% এবং সিনোপ্যাকের ৭০%। নাইকোর মতোই সাইনোপেকের চুক্তিতেও বাপেক্স স্লিপিং পার্টনার বা নিস্ক্রিয় সহযোগী অর্থাৎ স্বাক্ষী গোপালই থাকবে। সাইনোপেক মাত্র ১০ কোটি ডলার বা ৭৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কটিয়া, জালদি, কাফালং, শিতাপাড়া এই চারটি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ করবে। বাপেক্স কোন বিনিয়োগ করবে না বা গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলণে সরাসরি অংশগ্রহণ ও করবে না। জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিতে সাধারণত দুই পার্টি তাদের অংশীদ্বারিত্বের সমানুপাতে বিনিয়োগ করে এবং লাভ ও সেই অনুপাতে বিভক্ত হয়। সাইনোপেকের সাথে চুক্তিটিকে জয়েন্ট ভেঞ্চার বলা হলেও কার্যত এটা উৎপাদন অংশীদ্বারি চুক্তি থেকে আলাদা কিছু নয়। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই সমস্ত বিনিয়োগ বিদেশী কোম্পানির, উৎপাদিত গ্যাস থেকে কস্ট রিকভারি বাবদ বিনিয়োগ উঠিয়ে নেয়া ও লাভের গ্যাস বাগানোর বাধ্যমে ৭০-৮০ ভাগ গ্যাস বিদেশী কোম্পানি বাগিয়ে নিতে পারে।
নাইকোর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির উদাহরণ:
পিএসসি চুক্তিগুলোর মধ্যে যেমন মিল ও ধারাবাহিকতা দেখা যায়, জয়েন্ট ভেঞ্চারের চুক্তির বেলাতেও মিল থাকারই কথা, পত্রপত্রিকায় যতটুকু তথ্য এসেছে তাতে সেরকমই বোঝা যাচ্ছে। এ হিসেবে নাইকোর সাথে করা বাপেক্সর পুর্বতন জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিটির বিষয়ে আলোচনা করলে জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে লুটপাটের প্রক্রিয়াটা পরিস্কার হবে। নাইকেরা সাথে করা জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি অনুসারে:
১) আর্টিক্যাল ২.৪ অনুসারে সমস্ত বিনিয়োগ অপারেটর কোম্পানি নাইকো’র, বাপেক্স কোন বিনিয়োগ করবে না। উৎপাদিত গ্যাস ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম দ্রব্য ভাগা ভাগি হবে আর্টিক্যাল ২৩ এ উল্ল্যেখিত ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল বা বিনিয়োগের তুলনায় আয়ের অনুপাত অনুসারে।
২) আর্টিক্যাল ২৩.২ অনুসারে ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল বা বিনিয়োগের তুলনায় আয়ের অনুপাত নির্ধারিত হবে নিম্নোক্ত সুত্র ধরে:
ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল(IM )= ক্রমবর্ধমান মোট আয়/ক্রম বর্ধমান মোট ব্যায়
৩) আর্টিক্যাল ২৩.৩ অনুসারে, ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান যদি ১ এর কম হয় অর্থাৎ বিনিয়োগের তুলনায় আয় কম হয় বা কস্ট রিকভারি না হয়, তাহলে উৎপাদিত গ্যাসের ৮০ ভাগ পাবে নাইকো এবং ২০ ভাগ বাপেক্স। আয় বাড়তে বাড়তে বিনিয়োগের তুলনায় বেশি হলে অর্থাৎ ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১ এর বেশি হলে বাপেক্সের ভাগ বাড়তে থাকবে। যেমন বিনিয়োগের তুলনায় আয় যদি দেড়গুণ হয় অর্থাৎ ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১.৫ হয় তাহলে বাপেক্সের ভাগে জুটবে ২৫% এবং নাইকোর ভাগে ৭৫%। এভাবে বাড়তে বাড়তে বিনিয়োগের তুলনায় আয় ৩ গুণ বা তার বেশি হলে বাপেক্স ফেনী ও ছাতক(পশ্চিম) এর জন্য সর্বোচ্চ ৪২% এবং ছাতক(পূর্ব) এর জন্য সর্বোচ্চ ৫০% গ্যাস পেতে পারে।
৪) আর্টিক্যাল ২৩.৩.৩ অনুসারে কোন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস পাওয়া না গেলে, সেই গ্যাস ক্ষেত্রের বিনিয়োগ অন্য কোন গ্যাস সম্পন্ন গ্যাস ক্ষেত্রের আয় থেকে পুষিয়ে নেয়া যাবে।
৫) জয়েন্ট ভেঞ্চর চুক্তির আর্টিক্যাল ২১.১ এ অপারেটর নাইকোকে পেট্রোলিয়াম অপারেশন্স এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদের ইন্সুরেন্স করার কথা বলা হলেও চুক্তির কোথাও গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস নষ্ট হলে গ্যাস ও পরিবেশের ক্ষতিপূরণের বিধান নাই।
বাংলাদেশ নাইকোর দ্বারা টেংরাটিলা বিস্ফোরণে ২০ হাজার কোটি টাকার গ্যাসের ক্ষতিপূরণ আজও আদায় করতে পারেনি, উল্টো বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির আদালতে নাইকোর দায়ের করা ক্ষতিপূরণ এড়ানোর মামলায় দায়সারা ভাবে অনভিজ্ঞ আইনজীবি নিয়োগ করে এখন মামলার রায়ের অপেক্ষা করছে।
ফলে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি’র মতো ই এই জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিতেও বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেখিয়ে, এক ক্ষেত্রের বিনিয়োগ আরেক ক্ষেত্র থেকে উসুল করে, পুরাতন যন্ত্রপাতি নতুন বলে চালিয়ে দিয়ে ইত্যাদি নানান উপায়ে ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১ এর কম রাখা হয় এবং ৮০ ভাগ গ্যাস বিদেশী কোম্পানি নিজের ভাগে নিয়ে নেয়। সেই ৮০ ভাগ গ্যাস আবার কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রায় বাপেক্সের উৎপাদন খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে বাধ্য হয়। সাইনোপেকের সাথে এ ধরণের জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির ফলে ঠিক কত দামে বাংলাদেশকে এভাবে নিজের গ্যাস বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হবে তা এখনও আমরা জানি না।
গ্যাজ প্রমকে ১০ টি অনুসন্ধান ও উন্নয়ণ কূপ খননের কন্ট্রাক্ট:
অন্যদিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি গ্যাজ প্রম এর সাথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধিন তিতাসের ৪টি ও রশিদপুরে ১ টি উন্নয়ণ কূপ এবং বেগমগঞ্জ, শাহাবাজপুর, শ্রীকাইল, সেমুতাং ও সুন্দলপুর গ্যাসক্ষেত্রের ৫টি -এই মোট ১০টি অনুসন্ধান কূপ খননের চুক্তি হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ি গ্যাজপ্রমকে ৫ টি উন্নয়ণ কূপের জন্য ১০.২৫ কোটি ডলার এবং ৫টি অনুসন্ধান কূপের জন্য ৯.৫ কোটি ডলার অর্থাৎ ১০টি কূপ খননের জন্য মোট ১৯.৭৫ কোটি ডলার বা ১,৫০১ কোটি টাকা দিতে হবে। ফলে গড়ে একেকটি কূপ খননের খরচ পড়বে ১৫০ টাকা করে। অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স একেকটি কূপ খনন করতে গড়ে ৭০/৮০ টাকারও কম খরচ করে। উদাহরণ স্বরুপ: বাপেক্সের নিজস্ব লোকবল ও রীগের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন মোবারকপুর অনুসন্ধান কূপ খননে ৮৯.২৬ কোটি টাকা(গভীরতম কূপ),শ্রীকাইল-২ কূপ খননে ৮১.১২ কোটি টাকা, সুন্দলপুর কূপ খননে ৭৩.৬৫ কোটি টাকা(প্রকৃত ব্যায় ৫৫ কোটি টাকা) এবং কাপাসিয়া কূপ খননের জন্য বাপেক্সের ৭০.১৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ফলে বাপেক্সের বদলে রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রমকে দিয়ে কুপ খননের জন্য বাপেক্সর দ্বিগুণ অর্থ খরচ করতে হবে।
কন্ট্রাক্ট কিংবা জয়েন্ট ভেঞ্চার: লুটপাটের নয়া তরিকা
একদিকে পেট্রোবাংলা বাগাড়াম্বর করে মিডিয়ায় বিবৃতি দিচ্ছে কি ভাবে দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো "বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের প্রশ্ন ওঠে,তা বোধগম্য নয়” বলে অন্যদিকে ছলে-বলে কৌশলে নানান ভাবে গ্যাস সম্পদ লুট-পাটের আয়োজন জারি রাখছে। আসলে স্থলভাগে গ্যাস উত্তোলণে বাপেক্সের যে দক্ষতা ও বিদেশী কোম্পানির চেয়ে কয়েকগুণ কম খরচে কাজ করার যে উদাহরণ রয়েছে এবং জাতীয় সম্পদের মালিকানার প্রশ্নে সারাদেশে পিএসসি চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে উঠেছে, তাতে স্থলভাগের গ্যাস ক্ষেত্র নতুন করে পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়াটাকে দেশবাসির কাছে কোন ভাবেই গ্রহণ যোগ্য করা যাবে না একথা শাসক শ্রেণী ভালো ভাবেই বুঝে গেছে। তাই এখন দক্ষতার অভাবের কথা না বলে বলতে শুরু করেছে ক্যাপাসিটি অর্থাৎ একসাথে অনেক কূপে কাজ করার অক্ষমতার কথা। বাপেক্সকে দিয়ে নাকি একসাথে অনেক কূপে অনুসন্ধান ও উত্তোলণ কাজ করানো যাবে না, কারণ বাপেক্স এর পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও লোক বলের অভাব আছে। কথাগুলো এমন ভাবে বলছে যেন গ্যাস উত্তোলণের প্রয়োজনীয় রিগ মেশিন সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও লোকবলের অভাব একটা চিরস্থায়ি সমস্যা যার কোন সমাধান করা যায় না! অথচ গ্যাসের সংকট তো হঠাৎ করে নাযিল হয় নি, দিনে দিনে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত উত্তোলণ না হওয়ায় সংকট ও বেড়েছে। তাহলে দিনে দিনে বাপেক্সের ক্যাপাসিটি চাহিদা অনুযায়ি বাড়ানো হলো না কেন কিংবা এখনও বা কেন ক্যাপাসিটি আরো বাড়ানোর উদ্যোগ না নিয়ে বিদেশী কোম্পানির পেছনে ছোটা হচ্ছে? ক্যাপাসিটি না বাড়ানো হলে তো চিরকাল-ই পরনির্ভরশীল হয়ে নিজেদের সম্পদ বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক মূল্যে কিনে যেতে হবে। তাই ক্যাপাসিটি আসলে মূল কথা না, মূল কথা হলো কন্ট্রাক্ট, জয়েন্ট ভেঞ্চার ইত্যাদি বিভিন্ন কৌশলে গ্যাস সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার ধান্দা যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে বা খাতাকলমে গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর মালিকানা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাত থাকলেও কার্যত বিদেশী কো্ম্পানির মুনাফার বাড়ানোর কাজেই লাগবে। তাই উৎপাদন অংশীদ্বারিত্ব চুক্তি বা প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) এর মতোই চীন-রাশিয়ার সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার, বিভিন্ন কন্ট্রাক্ট ইত্যাদিকেও রুখে দিতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



