এপ্রিল ২৬, ২০১১
প্রতি: বিশ্ব নেতৃবৃন্দ
প্রেরক: শান্তিতে নোবেল বিজয়ীগণ
পারমাণবিক শক্তির বদলে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করুন: বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতি শান্তিতে নোবেল বিজয়ীগণ
চেরনোবিলের পারমাণবিক বিস্ফোরণের ২৫ বছর পূর্তিতে এবং জাপানে প্রলয়ঙ্করি ভূমিকম্প ও সুনামির প্রায় ২ মাস পরে আমরা নিম্ন স্বাক্ষরকারী শান্তিতে নোবেল বিজেতারা আপনাদের প্রতি নিরাপদ ও অধিকতর শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়তে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগের আহবান জানাই। পারমাণবিক শক্তি যে পরিস্কার, নিরাপদ ও সুলভ নয়- সেই ঘোষণা দেয়ার এটাই উৎকৃষ্ট সময়।
আমরা গভীরভাবে উৎকন্ঠিত যে, ফুকুশিমা পারমাণবিক চুল্লী বিস্ফোরণের ফলে বাতাসে-পানিতে-খাদ্যে তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণে জাপানের জনগণের জীবন ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখীন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বিশ্ব যদি তার বর্তমান পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বন্ধ করে দেয় তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সর্বত্র এবং এই জাপানী জনগণ যারা ইতোমধ্যেই অনেক ভুগেছে, শান্তিতে ও নিরাপদে বাঁচতে পারবে।
চেরনোবিলের লিকুইডেটর (যিনি সাইট ক্লিন করার কাজে সহায়তা করেন) মাইকোলা ইসায়েভ বলেছেন, "কিছু লোক দাবী করছে- চেরনোবিলের ২৫ বছর পরে অনেক কিছুই আগের তুলনায় উন্নততর হয়েছে। কিন্তু আমি এর সাথে একমত নই। আমাদের শিশুরা কন্টামিনেটেড খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে।" ইসায়েভ বলেন- জাপানে বর্তমানে কর্মরত লিকুইডেটরদের অবস্থাও তারই মত। সম্ভবত তারা এখনও তার মত নিউক্লিয়ার শক্তির নিরাপত্তা নিয়া খুব বেশী প্রশ্ন করেন নি।
জাপানের উত্তর-পূর্ব সমুদ্র দিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী সুনামির আঘাত হানা শহর কেসেনুমা'র একজন দোকানদারের কথা গোচরে আনুন: "ঐ তেজস্ক্রিয়তা জিনিসটা চরম বীভিষিকাময়। এটা সুনামির চাইতেও ভয়ঙ্কর। সুনামি তুমি চোখে দেখতে পারবে। কিন্তু এটা তুমি দেখতেও পারবে না।"
নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে ফুকুশিমার মতো এহেন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা আবার আরেকটি দেশে হানা দিতে পারে- যেমন করে হানা দিয়েছিল ইউক্রেনের (সাবেক ইউএসএসআর) চেরনোবিলে (১৯৮৬), যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ডে (১৯৭৯) এবং যুক্তরাজ্যের উইন্ডস্কেল/ সেলফিল্ডে (১৯৫৭)। কেবল ভূমিকম্প বা সুনামির মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেই নয় মানুষের ভুলে বা অবহেলায়ও পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটতে এবং এমন ফল বয়ে আনতে পারে। নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে সন্ত্রাসী হামলাও ভয়ঙ্কর ফল বয়ে আনতে পারে, এহেন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না এবং আমরা আতঙ্কিত।
কিন্তু এই তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণ কেবল পারমাণবিক দুর্ঘটনারই বিষয় বা ফল নয়। পারমাণবিক জ্বালানির প্রতিটি ধাপই তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণ করে, ইউরেনিয়াম খনন থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত, এমনকি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তা চলতে থাকে- কেননা পারমাণবিক বর্জ্যে থাকে প্লুটোনিয়াম যা হাজার বছর ধরে টক্সিক হিসাবে বিরাজ করে। পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকারী দেশগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র সহ) বছরের পর বছর গবেষণার পরেও আজো নিঃশেষিত পারমাণবিক জ্বালানি তথা পারমাণবিক বর্জ্যের নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন মজুদ করার উপায় আবিস্কার করা সম্ভব হয় নি। বরঞ্চ দুনিয়ার বুকে প্রতিদিন আরো নিঃশেষিত জ্বালানি জমা হচ্ছে।
পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি যে পারমাণবিক অস্ত্রের কাঁচামাল যোগায়- এই ঘটনাটা পারমাণবিক শক্তির অনুসারীরা অস্বীকার করেন। আসলে- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীর ব্যাপারে এটাই প্রকৃত বিষয়। পারমাণবিক শিল্প পারমাণবিক শক্তির বিস্তার ঘটানোর সময় যতই এই হুমকিকে অস্বীকার করুক না কেন, বিষয়টা না-ই হয়ে যায় না- কেননা এটা দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়।
পারমাণবিক বাণিজ্যের নির্মম অর্থনৈতিক সত্যটাও আমাদের অবশ্যই মুখোমুখি হতে হবে। পারমাণবিক শক্তি উন্মুক্ত বাজারে অন্যান্য শক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করে না- কেননা এটা করা যায় না। পারমাণবিক শক্তি প্রচণ্ড ব্যয়বহুল যা সাধারণভাবে করদাতাদের অর্থ থেকেই ব্যয়িত হয়। পারমাণবিক শিল্পকে চলতে হয় ব্যাপক সরকারী ভর্তুকিতে তথা জনগণের ট্যাক্সের পয়সায়। আমরা জনগণের এই অর্থ শক্তির নতুন উৎসের পেছনে দায়িত্বশীলভাবে লাগাতে পারি।
বর্তমানে দুনিয়ায় ৪০০ এরও বেশী পারমাণবিক শক্তি প্ল্যান্ট আছে- যার অনেকগুলিরই অবস্থান প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা আছে এমন এলাকায় অথবা রাজনৈতিকভাবে প্রচণ্ড অস্থিতিশীল দেশে। এই প্ল্যান্টগুলো দুনিয়ার মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ৭% এরও কম শক্তি উৎপাদন করে। বিশ্বনেতা হিসাবে আপনারা একত্রে কাজ করতে পারেন যাতে অন্য খুব নিরাপদ, সাশ্রয়ী শক্তি উৎস দিয়ে এই সামান্য পারমাণবিক শক্তিকে প্রতিস্থাপন করা যায় এবং এভাবে সকলের জন্য একটি কার্বন-মুক্ত ও পারমাণবিক শক্তি মুক্ত সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া যায়।
আমরা জাপানের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থামিয়ে দিতে পারবো না, কিন্তু আমরা একত্রে আমাদের শক্তির উৎসের জন্য আরো ভালো, নিরাপদ প্রক্রিয়া বাছাই করতে পারি।
আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি ও পারমাণবিক জ্বালানি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে পরিস্কার-শক্তি-বিপ্লবের (clean energy revolution) জন্য বিনিয়োগ করতে পারি। এটা ইতোমধ্যেই অগ্রসরমান। গোটা বিশ্বে গত ৫ বছরে বায়ু ও সৌর শক্তি থেকে পারমাণবিক শক্তির তুলনায় অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। ২০১০ সালে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তি উৎস থেকে গোটা দুনিয়ায় আয় বেড়েছে ৩৫%। এসব নবায়নযোগ্য শক্তিখাতে বিনিয়োগে কর্মসংস্থানও বাড়বে।
নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসসমূহ একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য অন্যতম নিয়ামক। আর সে কারণেই গোটা দুনিয়ার অসংখ্য মানুষ- বিশেষ করে তরুনেরা - সরকারের জন্য অপেক্ষা না করেই নিজ উদ্যোগে কাজ করে যাচ্ছে।
স্বল্প-কার্বন, পারমাণবিক শক্তি মুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার প্রচেষ্টা রাষ্ট্রসমূহকে বিশ্ব-নাগরিকের এক আন্দোলনের অংশীদার বানাবে ও আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত করবে- যে আন্দোলনের প্রভাব ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এই আন্দোলনের মূলমন্ত্রই হচ্ছে পারমাণবিক শক্তির উৎপাদন ও ব্যবহারকে বর্জন এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উৎস সমূহকে সমর্থন করা। আমরা আপনাদের তাদের সাথে যুক্ত হয়ে কেবল আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই নয়- আমাদের পৃথিবীটাকেও রক্ষার আহবান জানাই।
বিনীত,
বেটি উইলিয়ামস, আয়ারল্যাণ্ড (১৯৭৬)
মাইরীড ম্যাগুই, আয়ারল্যাণ্ড (১৯৭৬)
রিগোবের্তা মেঞ্চু তুম, গুয়েতেমালা (১৯৯২)
জোডি উইলিয়ামস, ইউএসএ (১৯৯৭)
শিরিন এবাদি, ইরান (২০০৩)
ওয়াঙ্গারি মা'থাই, কেনিয়া (২০০৪)
আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৮৪)
অ্যাডোল্ফো পেরেজ এসকুইভেল, আর্জেন্টিনা (১৯৮০)
প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস হোর্তা, পূর্ব তিমুর (১৯৯৬)
পরিশিষ্ট:
১। নোবেল উইমেন'স ইনিশিয়েটিভ ওয়েবসাইট মূল খোলা চিঠিটি পাওয়া যাবে; Click This Link
২। এই খোলা চিঠি ৩১ টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



