আমি বাঁচতে চাই। যে কোন ভাবে বাঁচতে চাই। বাঁচার জন্য আমাকে কিছু না কিছু করতে হবে।কিন্তু কি করবো? কোন কাজটা বেছে নেব? কোন কাজটা আমার পক্ষে সম্ভব? সরাদিন ছুটতে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বুঝি সবাই কিছু না কিছু করছে কেবল আমিই কাজহীন বেকার। হাতে কোন টাকা নেই। থাকার মতো কোন আশ্রয় নেই। লবিং করার মতো কোন আত্নীয় নেই। হাতে আছে কেবল একটা গ্রাজুয়েট সেকেন্ট ক্লাস সার্টিফিকেট সেটাও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। আমি ভাল করেই জানি এটা সার্টিফিকেট নামের শান্তনা। আমি শান্তই আছি। হৈ চৈ করছিনা, ছিনতাই করছিনা, ডাকাতি করছিনা, চাঁদাবাজী করছিনা। যদিও তখন আমার তাই করার উচিৎ ছিল। এটা ২০০৭ সালের কথা।
তার পর..............। আমি একটা কাজ পেয়ে যাই। একটা সম্মানজনক এনজিওর মাঠ কর্মী।মাঠে ঘাটে রাস্তায় কাটে সব সময়। মানুষকে বই পড়াই। স্লোগান দেই "আলোকিত মানুষ চাই"। প্রচার চালাই সবাইকে সচেনতার জন্য। আলোর নিচেই যেমন অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই আমার বাস। এই কুপমন্ডুকতা থেকেই আমি ভালবাসি আমার কাজকে। কাজ আমি উপভোগ করতে জানি, কাজের মাঝে সুখ পেতে জানি। জানি কি করে কাজের মাঝেই বাঁচতে হয় এবং কাজ করেই বাঁচতে হয়। কাউকে নিরাশায় তলিয়ে যেতে দেই না। আশাটাকে বাঁচিয়ে রাখি, বাঁচাতে হয় বলে।
সময়ের সাথে আমিও যাচ্ছিলাম। সময়ের গন্তব্যের মতো আমার গন্তব্যও লক্ষ্যবিহীন। ভেবে ছিলাম,সময়টা ভালই যাবে, আসলে ভালই যাচ্ছিল। কেবল নিজের জন্য বাঁচি, নিজের এক পেট খেয়ে হৈহুল্লোর করে বাঁচা এসব তো মন্দ যাবার কথা নয়? মন্দ যায়নি।সময়টা পাখিদের উড়াউড়ির মতোই কাটছিল।
কিন্তু এই আমি যতই অসামাজীক বলি নিজেকে, আমি তো সমাজের বাইরে নই। সমাজের নিয়মেই দারিদ্র ক্লিষ্ট বাবা রুগ্ন মা, তাদের আশা আকাঙ্খা তো আমার উপর থাকতেই পারে? সমাজে সব বাবা মায়েরই আছে সন্তানের উপর কিছু চাওয়া পাওয়ার অধিকার। আমি আবেগের সবটুকো অস্তিত্বই বুঝতে পারি। কিন্তু আমি..........
এভাবে ঘনিয়ে আসে একের পর এক সমস্যার জাল। আমি কিছু ছাড়ানোর চেষ্টা করি, কিন্তু কতক্ষন? আমি আমার বাবা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারিনা। অন্য দিকে তাকিয়ে দ্রুত কথা শেষ করি। সে তো আমার বাবা সে তো আমার মা।
প্রেমিকা আক্ষেপ করে "দেশে কি আর কোন চাকরি নেই?"। আমি তার আবেগ টুকোও বুঝি। মাস শেষ হতে না হতেই ব্যাংকে খুঁজ নেই , আমার নামে কোন টিটি এল কিনা? তার পর একে ওকে ধরে, ধার দেনা করে চলে কিছু দিন। এভাবেই পাঁচটি বছর পার করে দিলাম। আর কত?
সবই যে আমি বুঝি এই কথাটা কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারি না। সবারই ধারনা আমি কিছুই বুঝিনা। এত সীমাবদ্ধতার পরও একে ভাল বলতে পারে? এত দৈন্যতার পরেও কেও পেশা আঁকরে থাকতে পারে? যদি সত্যি সত্যি বুঝতো তাহলে......। আমি নিরবে চলে আসি। চলে আসা ছাড়া আর কিই-বা করার আছে? প্রতিবাদ করতে আমি জানি। প্রতিবাদের ভাষা জানি কিন্তু কাউকে বুঝানোর ভাষা তো জানি না। আমার চোখ অশ্রুসজলের পরিবর্তে আরো রুক্ষ হয়ে উঠে। নিবৃত্তে আরো দূরে সরে যেতে থাকি। "কাছ" কেই আমার "পর" মনে হয়। 'দূর' কেই মনে হয় আপন।
আমি থাকি আমার কাজ নিয়ে। আসল কথা কাজটি আমার ভালই লাগে। হাজারও তারুন্যের চোখ, শিশুদের মুখ দেখলে আমার ভাল লাগে। আমি কিশোরের চকচকে ভ্রুতে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখতে পাই। আমি ভেবে ভেবে উচ্ছাসিত হই। মনে মনে বলি " দিন এমন থাকবে না"।
পরিচয়ের পরেই যে প্রশ্নটার প্রায়শই উত্তর দিতে হয়। আর কোথাও ট্রাই করেন না? আমি স্মিত হাস্যে " না " বলি। চাকরি প্রত্যাশিরা জানতে চান-বয়স কত আছে? আমি উত্তর করি জানিনা আর কতদিন বাঁচবো, বেশি দিন না বাঁচাই ভাল। মৃত্যুর প্রস্তুতিও হয়তো ভেতরে ভেতরে চলছে।। তারপর তারা আবার শুধরে দেন।
আমি তাদের দিকেও বেশিক্ষন তাকাতে পারিনা। তাদের চোখগুলো দেখে ভয় পেয়ে যাই। ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে ভাল লাগতো না তখনও এবং এখনও। আমি বুঝতে পারি অনিশ্চয়তার দিকে আমার যাত্রা , হতে পারে গন্তব্যও।
বহুবার ভেবেছি- সব ছেড়ে চলে যাই,তারপর যা হবার হবে। ইট ভাঙ্গা থেকে মাটি কাটা সবই তো পারবো।তবে এত ভয় কেন? কাছের বন্ধু বুঝিয়ে বলে পাগলামো করোনা। একটা চাকরি না পেয়ে চাকরি ছাড়া যাবে না। আমিও পাগলামি বাদ দিয়ে সবার মতোই থাকতে চাই।তার কথা মেনে নেই।এভাবেই চলছে....

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


