
এই মুহুর্তে দামী রাজনৈতিক খেলোয়াড়। দুই দলেই টানাটানি তাকে নিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে বিএনপি তাকে বগলদাবা করেছে। আওয়ামীলীগ ব্যর্থ। আর এই ব্যর্থতা আওয়ামিলীগের সহ্য হয়নি, স্বভাবতই আওয়ামিলীগ কখনো ব্যর্থ তা মানতে চায় না বা ব্যর্থ হতে চায় না। মুনতাসীর মামুন আমরা নামেই চিনি, নানান কারনে। আওয়ামিলীগের প্রতি তাঁর একটা অনুভুতিও জানো। তিনিও এই ব্যর্থতা সহ্য করতে পারেন নাই তাই তিনি প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে শুরু করলেন কর্নেল অলির চরিত্র বিশ্লেষন।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
দুই খণ্ডে 'রাজাকারের মন' লেখার পর লিখলাম 'পাকিস্তানী জেনারেলদের মন।' আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, দু'পৰের মনের গড়ন একই রকম। এখন লিখছি, 'বাঙালী সৈনিকের মন।' বাঙালী সৈনিকরা (মেজর থেকে জেনারেল) যেসব বই লিখেছেন সেগুলো যোগাড় করেছি এবং যতই পড়ছি ততই বিস্মিত হচ্ছি। বাঙালী সৈনিকদের মনও কেন ওদের মতো?
এ প্রশ্নটির সদুত্তর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বাঙালী সৈনিকরা কি বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন? নাকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে? যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গিয়ে থাকেন তা হলে মেজর জিয়াকে কেন তাদের শুধু সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা নয় স্বাধীনতার আহ্বায়ক মনে হয়? কেন তাদের এত ভারতবিদ্বেষ ও পাকিস্তানের প্রতি ঝোঁক? কেন, জামায়াতকে তারা মনে করেন পরিশুদ্ধ দল, যুদ্ধাপরাধী নয়?
এসব প্রশ্ন আবার ফিরে এলো সম্প্রতি কর্নেল অলি আহমদের ডিগবাজি খাওয়া দেখে। আমি কর্নেল অলির দু'টি বই পড়েছি। বই দুটি পড়ে তার মনের গড়ন যা মনে হয়েছিল, বিএনপিকে তিনি হঠাৎ গালিগালাজ করায় তাই বিস্মিত হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, তার বই পড়ে কি আমি বুঝিনি। এখন আবার তার ডিগবাজি খাওয়া দেখে মনে হলো, না ভুল হয়নি। কর্নেল সাহেবের আবার গোস্সা হয়েছে। ফিরভি কর্নেল সাবকো গোস্সা আয়া হ্যায়। হিন্দী উর্দু ইংরেজী না বললে আবার কর্নেলরা ঠিক অপরপৰকে শিৰিত মনে করেন না। সেজন্য একটু হিন্দীর চেষ্টা করলাম আর কি! আর এই কর্নেল, আওয়ামী লীগ আশা করেছিল তাদের দলে থাকবে। কর্নেলকে বোঝার জন্য কর্নেলের বই দু'টো আগে পড়া দরকার।
দুই.
অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন। জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, বীরবিক্রম উপধি লাভ করেন। ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনী থেকে কর্নেল হিসাবে পদত্যাগ করেন এবং বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই বিএনপি করেছেন এর একটি কারণ তিনি ছিলেন জিয়াউর রহমানের প্রতি অনুগত ও তাঁর একানত্ম বিশ্বাসী। বেগম জিয়া যে কারণেই হোক তাঁকে মন্ত্রী করেননি। সেই ৰোভে তিনি এলডিপি নামে নতুন দল করেন। দীর্ঘদিন তিনি মন্ত্রী ছিলেন, বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এরই ফাঁকে পিএইচডি লাভ করেছেন। তাঁর থিসিসটিও প্রকাশিত হয়েছে। ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম গ্রন্থ "আমার সংগ্রাম আমার রাজনীতি।" ৩৪১ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ঢাকার এশিয়া পাবলিকেশন।
গ্রন্থটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। নিজের লেখা শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তিনটি রচনা, মোট ২৮ পৃষ্ঠার। সাৰাতকার আছে অজস্র [পৃ. ৩১-১৩৯], সংসদে প্রদত্ত ভাষণ, অভিভাষণ, বিভিন্ন ফোরামে বক্তব্য আছে সিংহভাগ জুড়ে [পৃ. ১৪১-২৪৯], বাকি সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন/সাৰাতকার ইত্যাদি। আমি এখানে গুরুত্ব দেব তার নিজের লেখা ও বক্তব্যের প্রতি।
আগেই উলেস্নখ করেছি ড./কর্নেল অলি বিএনপির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। জিয়াউর রহমান তাঁকে জনসমৰে প্রতিষ্ঠা করেছেন; মন্ত্রিত্ব প্রদান করেছেন। একজন জিয়াভক্ত যিনি বিএনপি করেন এবং প্রাক্তন সৈনিকের মন পরিষ্কার বোঝা যাবে একমাত্র কর্নেল অলির লেখায়। সব বক্তব্যেরই মূল বিষয় জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের কেন্দ্রে। শেখ মুজিব তেমন কিছু নয়; আওয়ামী লীগের মতো খারাপ দল নেই [মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবার কারণে? যাদের বিরম্নদ্ধে অলি যুদ্ধ করে বীরবিক্রম হয়েছেন তারা ধোয়া তুলসী পাতা]। বাংলাদেশকে সব বিপদ থেকে একমাত্র উদ্ধার করতে পারে বিএনপি।
তাঁর প্রথম রচনার নাম 'জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আমি তার পাশেই ছিলাম।'
প্রথম বাক্যেই তিনি জানাচ্ছেন_ '১৯৬৯ সালে সর্বপ্রথম মরহুম মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং মরহুম মশিউর রহমান ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে তৎকালীন সামরিক সরকারের বিরম্নদ্ধে প্রতিবাদ জানান [পৃ.২১] পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেন। রাজনীতির ছাত্ররা অবাক হবেন ভেবে যে, ১৯৫৮-১৯৬৮ সাল পর্যনত্ম যে এত সামরিকবিরোধী আন্দোলন হলো সেগুলো তা হলে করল কারা?
তারপরের ইতিহাস তাঁর মতে, মুজিব ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে ২৪ মার্চ পর্যনত্ম গোপনে আলোচনায় লিপ্ত ছিলেন। আমরা যারা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ঢাকায় থাকি তারা তো জানি প্রকাশ্যেই আলোচনা হয়েছিল এবং প্রতিদিন প্রেসব্রিফিং হতো। "শেখ মুজিব এবং তার সহকমর্ীদের দূরদর্শিতার অভাবে ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে নির্মমভাবে নিহত হলো এ দেশের অগণিত সাধারণ মানুষ।" [পৃ. ২২] তারা খবর পেলেন শেখ মুজিব বন্দী হয়েছেন এবং তাঁর সহকমর্ীরা পালিয়ে গেছেন। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে কোন দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছিল না। জাতির সেই চরম বিপদের সময় মেজর জিয়া এবং তিনি ৩০০ সৈন্য নিয়ে রম্নখে দাঁড়ালেন। ২৫ মার্চ সকালবেলা মেজর রফিক চট্টগ্রাম ত্যাগ করেছেন। তিনি এবং মেজর জিয়া সব বিষয়ে খুঁটিনাটি আলাপ করে সিদ্ধানত্ম নিলেন। "এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, সঠিক নির্দেশনা এবং ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া। এ পরিস্থিতিতে একমাত্র রেডিওর মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। নচেৎ পাকসেনারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে।" সবকিছু চিনত্মাভাবনা এবং পর্যালোচনার পর আমরা সুপরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল করলাম। মেজর জিয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২৭ মার্চ বিকালবেলা দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। আমি তাঁর পাশেই বসা ছিলাম। এ ঘোষণার ফলে দলে দলে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এভাবে আমরা স্বাধীনতা পেলাম।
বিষয়টি যত সরলভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন সেভাবে স্বাধীনতা পেলে তো কথাই ছিল না। তার এই বিবরণ পড়ে কিছু প্রশ্ন জাগবে।
২৫ মার্চ সকালেই যদি জানতেন পাকিসত্মানীরা আক্রমণ করবে তা হলে সন্ধ্যার পর তার নেতা জিয়াউর রহমান পাকিসত্মানীদের জন্য 'সোয়াত' জাহাজ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করতে গেলেন কেন? তারা যদি জানতেনই তাহলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মেজর রফিকের মতো সরে গেলেন না কেন? এই প্রথম জানলাম তারা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখলের পরিকল্পনা করেছিলেন। সবাই জানে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কমর্ীরাই এই বেতার যন্ত্রটি চালু করেছিল। তারা সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা খুঁজছিলেন যুদ্ধ চলছে এমন একটা ঘোষণা দিতে পারেন যিনি। খোঁজাখুঁজি করার সময় পশ্চাদপসরণরত মেজর জিয়াকে তারা পেয়ে যান। মেজর জিয়া প্রথমে একটি ঘোষণা দেন, তারপর তা বাতিল করে আরেকটি ঘোষণা দেন। তার অবগতির জন্য আরও জানানো দরকার, ২৫ মার্চ বিকাল থেকেই সারাদেশে এক ধরনের যুদ্ধ শুরম্ন হয়। ২৬ মার্চ তো অনেক এলাকা সাধারণ মানুষই দখল করে নেয়। তাহলে কেন তারা ২৬ মার্চ পাকিসত্মানের জন্য অস্ত্র খালাসে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, "সশস্ত্র বিপস্নব এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার যুদ্ধ কোনটাই সম্ভব নয়। [ঐ] এটিও ঠিক নয়। সাধারণ মানুষের সমর্থন ও যোগদান ছাড়া এ ধরনের কোন যুদ্ধেই জয় সম্ভব নয়। বাংলাদেশ তার নয়। তার মূল বক্তব্য যেটি বিএনপি বা অধিকাংশ সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য "স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়া।"
অলি লিখেছেন, "সামরিক বাহিনীর সদস্যরাই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বে দিয়েছিল, আওয়ামী লীগাররা নয়।... আমরা যারা বিএনপি করি তারা একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে বলি 'আসসালামু আলাইকুম।'একজন আওয়ামী লীগার অন্য একজন আওয়ামী লীগারের সঙ্গে দেখা হলে বলে 'জয় বাংলা।' [পৃ.২৩]
বাংলাদেশ সরকার তো আওয়ামী লীগের দ্বারাই গঠিত হয়েছিল এবং জেনারেল ওসমানী থেকে জেনারেল জিয়া সবাই তো নিযুক্তি পেয়েছিলেন সরকার দ্বারা। সুতরাং তারা নেতৃত্ব দিলেন কোথায়? তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, "পরবতর্ী পর্যায়ে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আদেশে চট্টগ্রামের সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন।" [পৃ. ২৪] কিন্তু আওয়ামী লীগার ও মেজর রফিকের 'ষড়যন্ত্রে' তাকে আবার সরানো হয়। সবাই জানে, জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে মেজর জিয়ার সম্পর্ক মসৃণ ছিল না। কারণ জিয়া নিজেকে সবার থেকে বড় করে দেখতেন। আওয়ামী লীগাররা কখনও পরস্পরের দেখা হলে সালাম না দিয়ে জয় বাংলা বলে। এটি তো ছিল জয়োলস্নাস অথবা রণধ্বনি। এর সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক কী?
তিনি একটি অভিনব তথ্য দিয়েছেন। মেজর জিয়া চিঠি দিয়েছিলেন জেনারেল নিয়াজীকে। লিখেছিলেন_ "যুদ্ধ আমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। মা-বোন এবং স্ত্রীদের এতে জড়ানো ঠিক নয়। যদি কোন কারণে বেগম জিয়া এবং তার ছেলেদের প্রতি অসম্মান দেখানো হয়, তবে যুদ্ধ এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিয়ালকোট এবং লাহোর সেক্টরে যুদ্ধ নতুনভাবে বিসত্মৃতি লাভ করবে। অবশ্য যুদ্ধ শেষে জানতে পারলাম জেনারেল নিয়াজী সত্য সত্যই বেগম জিয়া এবং তার সনত্মানদের যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন, যা একজন জাতীয় বীরের স্ত্রী-পুত্রদের দেয়া প্রয়োজন।" [পৃ.২৮]
পুরনো ঘটনা উলেস্নখ করতে চাই না। কিন্তু কর্নেল অলিরা বল্গাহীন ফ্যান্টাসিপ্রসূত যেসব কথাবার্তা বলেন বা লেখেন তাতে পুরনো কথার ঝাঁপি খুলতে হয়, যা তাদের জন্য মধুর হবে না।
বিভিন্ন বিবরণে আছে, বেগম জিয়া স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে চিনত্মিত ছিলেন, যা অস্বাভাবিক। গেরিলাদের সাহায্যে খালেদ মোশাররফ ও অন্যান্য অনেক সেনা অফিসার তাদের পরিবারকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। মেজর জিয়ার চিঠি নিয়ে দু'বার গেরিলারা যোগাযোগ করে। তিনি আসতে চাননি। কর্নেল অলির কি মনে পড়ে বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় পাকিসত্মানের এক সেনাপ্রধান মারা যাওয়াতে শোক প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছিলেন, যা কোন প্রধানমন্ত্রী দেননি। বেগম জিয়া না আসাতে মেজর জিয়া খুবই ৰুব্ধ হন। বিজয়ের দিন বেগম জিয়াকে এক পাকি ক্যাপ্টেন তার ভাইয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। ফেরার পথে সেই ক্যাপ্টেনকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করে। মেজর জিয়া ফেরত এসে স্ত্রীকে গ্রহণ করতে চাননি। শেখ হাসিনার অনুরোধে, বঙ্গবন্ধুর হসত্মৰেপে মেজর জিয়া তাকে গ্রহণ করেন। আর নিয়াজী সম্মান প্রদর্শন করবেন তার বিরম্নদ্ধে যুদ্ধরত একজন মেজরের স্ত্রীকে? সেই নিয়াজী যিনি হত্যা ও ধর্ষণে তখন ব্যসত্ম।
জিয়া সম্পর্কে শেষে তিনি লিখেছেন, "যুদ্ধ শেষে তিনি সেনাবাহিনীতেই থেকে গেলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এবং এর সদস্যদের প্রতি তার ভালবাসা ছিল অনত্মরিক।" [পৃ.২৫] যারা পাকিসত্মানী বাহিনী থেকে যুদ্ধে গিয়েছিলেন তারা প্রায় সবাই সেনাবাহিনীতেই থেকে গিয়েছিলেন। কারণ এটি ছিল পেশা। ঐ বয়সে আর কেউ পেশা বদলাতে চাননি। এটিই হচ্ছে মূল সত্য।
এরপর জিয়া কি কি করেছেন সে সম্পর্কে ১৮টি পয়েন্ট দিয়েছেন, যা নিয়ে আলোচনার দরকার নেই।
তার এক পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধ "৭ নবেম্বরের ফলে দেশ দুনর্ীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হাত থেকে মুক্তি পেল।" এর মূল বিষয় হলো ৭ নবেম্বর না হলে দেশ রসাতলে যেত। মূলত আক্রমণটা বঙ্গবন্ধুর আমল নিয়েই। কিন্তুু সে আমল তো ১৫ আগস্ট শেষ হয়ে গিয়েছিল। ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নবেম্বর পর্যনত্ম ঘটনাবলী সম্পর্কে তারা প্রধানত নিশ্চুপ থাকেন। তার ফ্যান্টাসির আরেকটি নমুনা। "১৯৭৫-এর আগে অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও স্বাধীনভাবে দুর্গাপূজা পালন করতে পারত না।
আওয়ামী লীগের পা-ারা দুর্গাপূজার ম-প থেকে তাদের মা-বোনদের ধরে নিয়ে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করত।" [পৃ.২৭] এ ধরনের ঘটনার কিছু নির্দিষ্ট বিবরণ দিতে পারলে আমরা মনত্মব্যটি মেনে নিতাম। সমস্যা হচ্ছে জোট শাসনামলেই (২০০১-২০০৬) এ ধরনের ঘটনা নিয়ত ঘটেছে সেগুলোর শুধু ডকুমেন্টশনই নয়, চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে।
নিবন্ধ ছাড়া বাকি সব তার সাৰাতকার, ভাষণ ইত্যাদি। লৰণীয় যে, এ সমসত্ম অধিকাংশ ছাপা হয়েছে যু্দ্ধাপরাধীদের পত্রিকা দৈনিক ইনকিলাবে।
এ সমসত্ম বক্তব্যে একটি বিষয়ই ফিরে এসেছে তা হলো_ জিয়াউর রহমান শুধু স্বাধীনতা ঘোষকই নন, গণতন্ত্রের প্রবক্তা, 'একাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা চাননি' [পৃ. ২৯৪], ৭ই নবেম্বর ছিল মুক্তির পথ, আওয়ামী লীগের চেয়ে ফ্যাসিবাদী, খারাপ রাজনৈতিক দল আগে হয়নি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শানত্মি চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ইত্যাদি। এ কথাগুলো বিএনপিরই স্ট্যান্ডার্ড বক্তব্য। এর কিছু উদাহরণ দিই-
১. "আমরা একই ধর্মে বিশ্বাসী নিজেদের ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, অন্যদের হাতে দেশটাকে তুলে দেয়ার জন্য নয়। অতীতে অনেক চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের জনগণকে বিদেশীদের কাছে বিক্রি করে দেয়ার জন্য।" [পৃ.৩৭] পাকিসত্মানীদের বিরম্নদ্ধে মনে হয় যুদ্ধ করাটা খুব একটা ভাল মনে হয়নি কর্নেল অলির কাছে। এখানে দেশ বিক্রির চেষ্টার মানে আওয়ামী লীগ দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে।
২. বিএনপির মুখপাত্র দিনকাল তাকে প্রশ্ন করেছিল_ "আ'লীগদলীয় এমপি মি. বীর বাহাদুর বলেছেন, 'পার্বত্য এলাকায় সশস্ত্র বিদ্রোহ না থাকলে সেনাক্যাম্প থাকারও কোন যুক্তি দেখি না'_ এ ব্যাপারে আপনার মনত্মব্য কি? উত্তরে তিনি বলেন, বীর বাহাদুর তো বাংলাদেশের লোক নয়। বীর বাহাদুরের পূর্বপুরম্নষ এসেছেন নেপাল থেকে। উনি তো আসলে গুর্খা। এ দেশের জন্য আমরা যারা বাংলাদেশী তাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। যারা বাইরে থেকে এসে সেটেল হয়েছে তাদের কথায় আর্মি কোথায় থাকবে না থাকবে এটা সেটেল হয়, তাহলে আমি মনে করি না এ সরকার দেশ পরিচালনা করার উপযুক্ত।' [পৃ. ৫৩] বাংলাদেশী প্রত্যয়টা ছিল বাঙালীরা ছাড়া অন্য জাতিসত্তার মানুষজনও এর অনত্মভর্ুক্ত। নেপালীরা গুর্খা নয়। নেপালের একটি ছোট এলাকার নাম গুর্খা। বেগম জিয়া নিজেও কর্নেল অলির অর্থে, সেটেলার।
৩. সেকু্যলারমনা বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে মনত্মব্য_ "এসব বুদ্ধিজীবী আসলে ভারতের সৃষ্টি। ভারতের কিসে সুবিধা হয়, কিভাবে তাদের কথায় সংঘাত, নৈরাজ্য, সৃষ্টি করা যায়।" [পৃ. ৫৪]
৪. এক সাৰাতকারে "একাত্তরের রাজাকারদের বিরম্নদ্ধে তীব্র ধিক্কার জানিয়ে বিএনপি নেতা কর্নেল (অব) অলি আহমদ বলেছেন, একবার যে বেঈমানী করে বা দালালী করে সে সারাজীবনই বেঈমানী ও দালালী করতে অভ্যসত্ম হয়ে যায়।" আরেকটি সাৰাতকারে বলেন, "জাতি ধর্ম ও দলমত নির্বিশেষে ঐক্যের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধী খুনীদের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় সময় ও সুযোগ পেলে তারা এ দেশের দেশপ্রেমিক জনতার ওপর গোখরো সাপের মতো বিষাক্ত ছোবল মারতে পারে।" [পৃ. ২৮৪] জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে কর্নেল অলি জিয়ার সময় থেকে রাজনীতি করছেন। এর আগের সাৰাতকারগুলোতে সমন্বয়ের রাজনীতির প্রশংসা করেছেন এবং ইনকিলাব ছিল তাঁর পৃষ্ঠপোষক। কোন একটি প্রতিবেদনে তার সমালোচনা করায় তখন তিনি এই উক্তি করেন।
৫. ১৯৯৯ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তার মনত্মব্য "তারা দুজনই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। নিজ নিজ জায়গায় তাদের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। আমিও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। ইতিহাস তাদের সঠিক মূল্যায়ন করবে। তবে মৃত ব্যক্তিদের নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করা উচিত।" [পৃ. ৮২] হঠাৎ এ রকম ঝবহংরনষব মনত্মব্য করার কারণ? বিএনপিতে ক্রমেই তাকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছিল।
একটি বিষয় সুস্পষ্ট যে, নিজ স্বার্থের জন্য অলি আহমদ ছাড় দিতে কার্পণ্য করেন না। ২০০৬ সালের মধ্যে তিনি বিএনপি ত্যাগ করেন। ২০০৭-এর নির্বাচন [যা ভ-ুল হয়ে যায়] আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির বিরুদ্ধে নিজের দল এলডিপিকে নিয়ে ইনফর্মাল জোট করেন।
----------------------------
কি আর কইতাম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

