কলেজের সবচাইতে উত্তরের ঘরটা।মাঝখানে সিমেন্টে বাঁধানো সাদা টেবিল।ঢুকতেই আগরবাতি ধুপ আর ফিনাইলের মিশ্রনে একটা উৎকট গন্ধ।এই গন্ধটা নাকে এসে লাগতেই ব্রেইনের একটা অংশ যেন আপনা থেকেই সক্রিয় হয়ে উঠে। একটা ভয় যেন ঝুপ করে মনটাকে জেকে বসে। মৃত্যু ভয়। কলেজের লাশকাটা ঘর।
কলেজ জীবনের প্রথম দিন থেকেই এই ঘরটার প্রতি সবার একটা অজানা আকর্ষন থাকে। মৃত্যু আর বিভৎসতার প্রতি মানুষের আকর্ষনটা বোধহয় সহজাত। তাইতো ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্ররা ছুটে যায় লাশকাটা ঘরে। অভিজ্ঞতাটা মোটেও সুখকর নয়। এ দৃশ্য বেশি সময় সহ্য হয় না। স্নায়ুর উপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়। ফার্স্ট ইয়ারের স্নায়ু এতটা শক্ত হয়ে উঠেনি এখোনো। তৈরি হয় ছোট্ট ঘরটার প্রতি একটা প্রবল বিকর্ষন। অবচেতন মন ঘরটাকে এড়িয়ে চলতে চায়। তাইতো থার্ড ইয়ারে কারিকুলামে post mortem থাকলেও তা আর দেখা হয়ে উঠে না।
মেহেদী রাঙা হাতের অভিমানি কিশোরী, ট্রেনে বাড়ি ফিরতে গিয়ে নিখোঁজ ছেলেটা কিংবা নৌকাডুবির তিনদিন পর খুঁজে পাওয়া লোকটা। নিথর দেহ, সাদা সিমেন্টের টেবিলে একা পড়ে থাকা লাশ। মুখ গুলোর দিকে তাকালে মনেই হয়না মানুষ গুলো বেঁচে নেই।একটা নিশ্বাসের এত মূল্য! নিথর দেহগুলোর মুখের দিকে না তাকালে বোঝা যায় না। ঐ যে ছেলেটা, গাছ থেকে পড়ে গিয়েছিল।তাকালেই মনে হয় যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমটা ভাঙলেই আবার দুষ্টামি করে মাতিয়ে রাখবে গ্রামটা। কিংবা মেহেদী রাঙা হাতের মেয়েটা, এক্ষুনি চোখ মেলে অভিমানি গলায় বলতে শুরু করবে তার অভিমানে চলে যাবার না বলা গল্পটা।
মিলন মামা। ডোম। ছোটখাটো মানুষটা। দেখা হলেই হাতের বিড়িটা লুকিয়ে বলে “ভালা নি মামা”। লাশ কাটা ঘরে তার অন্যরূপ। তার চোখগুলো দেখলে শিউরে উঠতে হয় তখন। কতদিন ভেবেছি জিজ্ঞেস করি কেমন করে এ পেশায়। হয়ে উঠেনি। হয়তবা ইচ্ছা করেনি। গত ২০ বছর যিনি দিনের পর দিন একের পর এক লাশ কেটে যাচ্ছেন তার অভিজ্ঞতা নিশ্চয় সুখকর কিছু নয়।
হোস্টেলে যাবার পথে দেখা যায় ঘরটার সামনের দিক। একটা লোক কাঁদছে। আরেকটা লাশ এসেছে। প্রতিদিন আসে। লাশ গুলো ফেরত যায় চাঁটাই মুড়িয়ে ঠেলা গাড়িতে, অথবা টেম্পোতে। যারা বেঁচে থাকে দারিদ্রে আর অবহেলায় তাদের শেষ যাত্রাটাও যে হবে অবহেলার এটাইতো নিয়ম। মাঝে মাঝে দুএকটা গাড়ি আর একদল হোমড়া-চোমড়া মানুষও চোখে পড়ে।কিন্তু ঘরটার ভিতরের দৃশ্য কিন্তু একই।ছোট্ট অন্ধকার ঘর,মাঝখানে একটা সাদা সিমেন্টের টেবিল, আর পড়ে আছে নিঃসঙ্গ, একা একটা নিথর দেহ।
আজও নিশ্চয় সবকিছু আগের মতোই আছে। বাইরে প্রিয় জনদের জটলা, এনাটমি ডিসেকটিং হলের সামনেই হয়তোবা আগের মতো কিছু ছাত্র জটলা বেঁধেছে।তারা সাহস সঞ্চার করছে লাশকাটা ঘরে ঢেকার। কিন্তু আজ আমার খুব নিঃসঙ্গ লাগছে।আজ আমি নিজেই লাশকাটা ঘরে,লাশকাটা টেবিলে শুয়ে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০১২ দুপুর ২:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


