বাঘাইছড়ি নিয়ে রহস্য,
খাগড়াছড়ি নিয়ে পাল্টাপাল্টি
[খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বাঘাইছড়ির ক্ষতিগ্রস্ত দূর্গম এলাকায় সরেজমিন ঘুরে তথ্য সংগ্রহ ও ছবি তুলেছেন- কাফি কামাল]
১৯শে ফেব্র“য়ারি থেকে রাঙামাটি জেলার দূর্গম উপজেলা বাঘাইছড়ির বাঘাইহাট ও গঙ্গারামপুরসহ আশপাশের সহিংসতা নিয়ে এখনও রয়ে গেছে রহস্য। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই শীর্ষ নেতা, ইউপিডিএফ-এর মুখপাত্র এবং বিতাড়িত পাহাড়িরা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। খাগড়াছড়ির সাবেক এমপি আবদুল ওয়াদুদ ভূইয়া বলেছেন, বাঘাইহাটের ঘটনার দুইদিন আগে ১৭ই ফেব্র“য়ারি রাতে বাঘাইছড়ির গঙ্গারামমুখ ও মৈত্রী বিহারে সশস্ত্র গ্র“পের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে ওই তিনটি সিএইচটি কমিশন, ইউএনডিপি এবং ডব্লিউএসপি’র প্রতিনিধিরা। প্রশাসনকে না জানিয়ে যাওয়া কিছু বিদেশীও বৈঠকে অংশ নেয়। একইদিন তারা শহরেও একটি গোপন বৈঠক করে সহিংসতার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ অনুযায়ী সশস্ত্রগ্র“পগুলো ১৯ ফেব্র“য়ারি রাত থেকে পরদিন বিকাল পর্যন্ত বাঘাইহাট, সীমানাছড়া ও গঙ্গারামমুখ এলাকার ১৫টি বাঙালী পাড়ায় অভিযান চালায়। শতশত বাঙালী ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। তারা জানে ঘটনা ঘটলে সেখানে প্রশাসন ছুটে যাবে। ফলে তারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে ইউএনও’র গাড়ি ভাংচুর ও তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। তার গাড়ি ভাংচুর করে। তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় বাঙালীরাও পাহাড়ীদের কিছু বাড়িতে আগুন দেয়। তবে খাগড়াছড়ির বর্তমান এমপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেছেন, সহিংসতার পর আমি দুইবার বাঘাইহাটে গেছি। দুইজন মন্ত্রীও সে ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শন করেছেন। তবে সেখানকার সহিংসতার সূত্রপাত নিয়ে কেউ পরিস্কার কিছু বলছে না। তাই বাঘাইহাট ট্রাজেডি নিয়ে এক ধরনের রহস্য থেকেই গেছে। সেখানে বাঙালী ঘর পোড়ানোর দাবি করা হলেও নির্দিষ্ট করে আমাদের কোন বাঙালী পোড়া ঘর দেখানো হয়নি। এখন কেন এ সহিংসতা সেটা তদন্ত সাপেক্ষ বিষয়। ইউপিডিএফ-এর মুখপাত্র মিঠুন চাকমা বলেন, শান্তিচুক্তির পরও ভূমি দখল বন্ধ না হওয়ায় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে পাহাড়ী পুরুষদের দমন করায় ২৬শে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে ওম্পিকা চাকমার নেতৃত্বে বাঘাইহাটে সাজেক নারী সমাজ গঠন করে বাঘাইছড়ির মেয়েরা আন্দোলনে নামে। তারা ১৮ই জানুয়ারি থেকে বাঘাইহাট বয়কট শুরু করে। নিহত লাদুমনির স্মরণে প্রতিষ্ঠা করে লাদুমনি বাজার। এতে বাঘাইহাট দিয়ে পাহাড়ীদের চলাচল বন্ধ করে দেয় বাঙালী ব্যবসায়ীরা। এদিকে বাঙালী ছাত্র পরিষদের এক সমাবেশ চলাকালে ১৯ ফেব্র“য়ারি সকালে একবাঙালী বন্ধুর সঙ্গে বাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন এক পাহাড়ী তরুন। সমাবেশ থেকে তাদের হামলা করলে পাহাড়ীটি পালিয়ে যেতে পারলেও বাঙালী ছেলেটিকে মারধর করা হয়। ওই রাতে সেনা ও বাঙালীরা গঙ্গারামমুখ পাহাড়ী এলাকায় অভিযান চালায়। পরদিন সকালে পাহাড়িদের রুষের শিকার হন এক সেনা সদস্য। এরপর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পাহাড়ী গ্রামে দ্বিতীয়দফা অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনী ও বাঙালীর গুলিতে মারা যায় দুই লক্ষীবিজয় চাকমা ও বুদ্ধপুদি চাকমা নামে পাহাড়ী নারী-পুরুষ। নিখোঁজ হয় অনেকেই। পুড়িয়ে দেয়া হয় বাঘাইহাট এমএসএফ থেকে বাঘাইহাট বাজার হয় গঙ্গারামমুখ এলাকার রাস্তার দুইপাশের চারশ’র বেশি বাড়িঘর। মৈত্রীপুর বনানী বনবিহার পোড়ানোর পাশাপাশি ভেঙে ফেলা হয় বৌদ্ধমূর্তিগুলো। এদিকে স্থানীয় প্রশাসন জারি করে ১৪৪ধারা। ফলে বহু পাহাড়ি গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। ২১শে ফেব্র“য়ারি রাঙ্গামাটির এমপি দীপংকর তালুকদারসহ জেলা প্রশাসন পরিদর্শনে গেলে শুকনা ছড়া এলাকায় বিক্ষুব্দ পাহাড়ীরা ইউএনও’র গাড়ি ভাংচুর করে। ওদিকে সহিংসতার শিকার ও সাজেক ইউনিয়নের ৪-৫-৬ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত মহিলা মেম্বার স্বপনিকা চাকমা (৩৫) নিজেই এখন বঙ্গলতলীর গহীণ বনে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ইউপিডিএফ মূখপাত্রের সঙ্গে সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনি বলেন, ১৯ থেকে ২০শে ফেব্র“য়ারি সেনাবাহিনী, বাঙালী ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ বাঘাইছড়িতে নৈরাজ্য চালায় সেটেলাররা। এক পর্যায়ে পাহাড়ীদের ওপর গুলি বর্ষন করে সেনাবাহিনী। তাদের গুলিতেই নিহত হয়েছে দুই পাহাড়ী। তবে সেনাবাহিনীর বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে এখন পাহাড়ীদের দায়ী করে নানা অপপ্রচার চলছে। সেদিন গুচ্ছগ্রাম ও গঙ্গারামমুখের পাহাড়ীদের জীবনে বয়ে গেছে একটি ভয়ংকর কালবোশেখী ঝড়। এ সময় কান্নার জন্য তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। ওদিকে ইউপিডিএফ মূখপাত্রের বর্ণনায়, বাঘাইছড়ির ঘটনায় আমরা পূর্ব নির্ধারিত অবরোধ কর্মসূচি পালনের জন্য করতে মিছিল নিয়ে শাপলাচত্ত্বর ছাড়িয়ে যেতেই আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল আলমের নেতৃত্বে আমাদের মিছিলে পেছন থেকে হামলা চালানো হয়। ধাওয়া খেয়ে আমরা চেঙ্গি স্কোয়ারের দিকে যাওয়ার সময় কলেজ গেট থেকে আরেকটি গ্র“প সাবেক গণপরিষদ সদস্য হেলালের নেতৃত্বে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা দুইপক্ষই শহরের মহাজনপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় পাহাড়ীদের দোকান ভাংচুর ও লুঠপাট চালায়। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সরকারি স্কুলের তিন পাহাড়ী শিক্ষকের ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। ওদিকে একইদিন বিকালে সাতভাইয়া পাড়ার পাহাড়ী ঘরে আগুন দেয়া হয়। স্বাভাবিকভাবে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাহাড়ীরাও কয়েকটি বাঙালী ঘরে আগুন দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বাঙালী নেতাদের বেশিরভাগের বক্তব্য সশস্ত্র অবস্থায় উস্কানীমুলক শ্লোগান দিয়ে দোকান ভাংচুর শুরু করলে ব্যবসায়ী ও বাঙালীরা স্বতস্ফুর্তভাবে তাদের প্রতিরোধ করে। ওই সময় দুইপক্ষেই আগুন লাগায়। পরে তার জের ছড়িয়ে পড়ে জমিদারপাড়া, সাতভাইয়াপাড়া, শান্তিনিকেতন, শালবাগান, গোলাবাড়িসহ আশপাশের এলাকায়।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০১০ রাত ৯:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




