somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খাপছাড়া কথা [তিন]

২৩ শে জানুয়ারি, ২০১১ রাত ১১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
পর্ব এক
পর্ব দুই

ঘুরে ফিরে আবারো সেই প্রশ্ন, করব কি এই জীবনটা নিয়ে? ছোটবেলায় এই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা বেশ সহজ ছিল।ক্লাস ৮ পর্যন্ত “মাই এইম ইন লাইফ” রচনা টা খুব কমন ছিল বলে পুরা ঠোটের আগায় থাকত। উত্তর টাও বেশ সহজ-সরল ছিল। আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। ইঞ্জিনিয়ার ও হতে পারতাম,কিন্তু কিছু টেকনিক্যাল টার্মস মুখস্ত করতে কষ্ট হত বিধায় আমি সব সময় ডাক্তার হওয়াটাই পছন্দ করতাম। ডাক্তার হওয়ার কন্সেপ্ট টাও বেশ সহজ, আমি ডাক্তার হয়ে সমাজের গরীব-দুখী-চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াব। ব্যাস, কাহিনী এতটুকুই। এর সাথে দু-চার লাইন এড করলেই হয়ে গেল। পাশ করার জন্য এর থেকে বেশী কিছুর দরকার ও নাই।

পিচ্চিকালে খেলনা ভাঙ্গা আমার খুব প্রিয় একটা হবি ছিল (এখনো আছে অবশ্য, কিন্তু কেউ তো আর খেলনা গিফট দেয়না)।ইলেক্ট্রিক গেজেট গুলো কিভাবে কাজ করে, মোটরের গাড়ী কিভাবে চলে, হেলিকপ্টার কিভাবে উড়ে এগুলো ভেঙ্গে দেখতে খুব ভালো লাগত। নতুন গাড়ী ভেঙে মোটর খুলে ফেলতাম। তার সাথে সিগারেটের এলুমিনাম ফয়েল দিয়ে বানানো টারবাইন লাগিয়ে সাব-মেরিন বানাতাম। ভাল একটা টর্চ লাইট ভেঙে নিজের মত করে একটা বানাতাম। আর কত কি যে করতাম [টাইম পাইলে এখনো করি, এই কাজটা আমি অনেক পছন্দ করি]…সব লিখতে বসলে এই পোস্টের বিষয়ই পালটে যাবে। এগুলো হয়ত ইন্ডিকেটর ছিল বড় হয়ে বড় একজন ইঞ্জিনিয়ার হব। কিন্তু কেউ এপ্রিশিয়েট করা দূরে থাক, উলটা মাইর জুটত কপালে। যাই হোক, আমার মতে উপরের এই কাজ গুলো ৯০% বাচ্চাই করে। এটা হয়ত ঐ বয়সের একটা অভ্যাস।

মাঝে কয়েকদিন ক্রিকেট নিয়েও বিজি ছিলাম।

আগের পর্বে লিখেছিলাম, আমাদের জন্মের পরপরই আমাদের আপনজন আমাদের নিয়ে একটি স্বপ্ন দেখে ফেলেন- যেখানে আমাদের চরিত্র থাকলেও কোন ভূমিকা থাকে না। আমিও এর ব্যাতিক্রম নই। আমার জন্ম এমন একটা পরিবারে হয়েছে যেখানে দাদা থেকে শুরু করে বাবা-চাচা এমন কি আমার বোন ও চিকিৎসার সাথে জড়িৎ। পারিবারিক আবহাওয়া এমন থাকায় স্বাভাবিক কারনেই আমার মনে দাগ কাটে। মনে মনে জানতাম এমনই কিছু একটা হতে হবে, করতে হবে আমাকে। তা ছাড়া আমার আব্বাজানের ইমোশনাল আর লিথাল ইনফ্লুয়েন্স তো ছিলই। বুড়ো লোকটাকে দোষ দেয়া টা ঠিক হচ্ছে না। উনার ইনফ্লুয়েন্স করার সিস্টেম টা খুব ইউনিক ছিল। বই!!! ছোটবেলা থেকেই উনি যেই কাজ টি করতেন সেটা হল আমাকে বই কিনে দেয়া।দেশ বিদেশের নানা বিষয়ের উপর বই।কিন্তু বাচ্চা দের উপযোগী চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইয়ের মাত্রা মনে হয় একটু বেশীই থাকত। একটা বইয়ের কথা এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে, পেনিসিলিন আবিস্কারের কাহিনী। আর একটি পক্সের জীবানুর পরাজয়… আরো অনেক…। সেই বই গুলো স্লো পয়জন এর মত আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিড়িয়ে পড়ে নিজের লক্ষ্য ঠিক করে নেয়।

কয়েকদিন আগ পর্যন্ত এই লক্ষ্যেই হাটছিলাম। বড় সায়েন্টিস্ট হব। লিলি/ সিবা গিগি/ সানোফি-এভেন্টিসের মত আন্ডারগ্রাউন্ড হাইটেক রিসার্চ ল্যাবে ক্যান্সার নিয়ে রিসার্চ করব। নবেল পাব…। দেশের নাম উজ্জ্বল করব।

দেশ…?? মাঝখান থেইকা এই দেশ টা আসলো কই থেইকা? ভাবার মত একটা বিষয়। আমি নোবেল পাইলে আমার দেশের লাভ টা কি? দেশ কি আমার নোবেল ধুইয়া পানি খাইব?? বিদেশের কয়েকটা পেপারে আমার নাগরিকত্ব টা উঠে আসবে, কয়েকদিন বেশ মাতামাতি হবে। দেশে এসে সরকার-বিরোধীদল-আর কিছু চুশীলদের সংবর্ধনা নিয়ে আবার চলে যাব বিদেশে- যেখানে আছে আরাম আর আয়েশ। মাঝখান থেকে এই দেশটা কি পাবে? কিসসু না।পাওয়ার মধ্যে কিছু সস্তা নাম কামায় নিতে পারে। ঐ নাম দিয়ে কি আর ২০-২৫ কোটি মানুষের পেট ভরবে? বাংলাদেশ কি মালয়সিয়া হয়ে যাবে? নাহ, মোটেও না।
তবে একটা ব্যাপার অবশ্য হতে পারে। আমার আবিস্কৃত মলিকিউল টা হয়ত বাংলাদেশে মানুফ্যাকচার করার জন্য কোম্পানী কে চাপ দিতে পারি [এটা নির্ভর করবে কোম্পানীর উপর, ওরা যদি আমাকে আরো ১কোটি ডলার বাড়ায় দিয়ে বলে দেশকে ভুলে যাও, তাইলে আমি দেশকে ভুলে যাব। টাকা বহুত খারাপ চিজ ]। প্ল্যান্ট হইল, কিছু গরীব-দুখী মানুষ সেখানে তাদের সস্তা শ্রম বিক্রি করে ধন্য হয়ে আমার শতায়ুর জন্য দোয়া ও করল। আমিও খুশি- দেশের জন্য কিছু করতে পারলাম ভেবে সব সময় বুক টান টান। কিন্তু বাস্তবতা হল, এরপরেও আমার দেশের অবস্থা পাল্টাবে না। দেশের সিস্টেম পাল্টাবে না। আমরা নিজেদের পাল্টাবো না। এরপরেও সরকারের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত দূর্নীতি থাকবে, বিরোধী দল আজাইড়া আন্দোলন করবে,বস্তিতে বস্তিতে নগ্ন-রুগ্ন ছেলেমেয়ে দৌড়ে বেড়াবে,হাত পেতে শীতের/যাকাতের কাপড় নেয়ার সময় পায়ের চাপে পিষ্ট হবে , ডাক্তারেরা রোগী জবাই করবে, ইঞ্জিনিয়ার বিল্ডিং এ সিমেন্ট কম দিবে, শিক্ষক ছাত্রীকে নির্যাতন করবে,ফেবুতে সোসিওলজি প্র্যাক্টিস করব, ব্লগে আমরা আস্তিক-নাস্তিক/ছাগু খেদাও/চুশীল /মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে/ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে পোস্ট দিয়ে যাব। কিছুই পাল্টাবে না। আস্তে আস্তে এই দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে-একসময় হারিয়ে যাবে তার ঐতিহ্য নিয়ে।

তাই আমার নোবেল পাওয়ায় এই হতভাগ্য দেশ কিছুই পাবে না। আমাকে জন্ম দেয়া, থাকা-খাওয়া-পড়ালেখার ব্যবস্থা করে দেয়া আর গর্ব করার মত একটি ইতিহাস ও ভাষার বিনিময়ে আমি তাকে কিছুই দিতে পারব না।

এটা ঠিক হচ্ছে না। কোথাও কোন গন্ডগোল আছে। মাথায় একটা পোকা টিক টিক করতেসে…এটা ঠিক না, এটা ঠিক হচ্ছে না…
৩২টি মন্তব্য ৩১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×