ভূমিষ্ট হবার সময় মানব সন্তান নিস্পাপ থাকে। ধীরে ধীরে সময় বয়ে যায়। মা-বাবার সদা সর্তক চোখকে ফাঁকি দিয়ে তার স্বত্তায় ধীরে ধীরে প্রবেশ করে ধূসরতা, নষ্ট হতে থাকে তার কোমনীয়তা। শুরুটা হয় ছোট-খাট দুষ্টামি দিয়ে, সময়ের আবর্তে জীবনের প্রথম মিথ্যে কথাটি সে বলে ফেলে নিজের অজান্তেই। প্রথমে তার নিস্পাপ বিবেক কিছুটা অনুতপ্ত হয়, কিন্তু একই সাথে তার প্রখর মস্তিস্ক উপলব্ধি করে ফেলে মিথ্যে বলার উপযোগিতা। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় এক ধূসর জীবনের....
আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর সকল মানুষের জীবনে একটি ধূসর অংশ থাকে। হয়ত কারো বেশী, কারো কম। আমি কোন মহাপুরুষ নই, বিভিন্ন সময়ে করা এই ভুল গুলো আমার জীবনে অনেক গভীর ভাবে প্রভাব ফেলেছে। অনেক কিছুই শিখিয়েছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি হয়ত বা অনুতপ্ত। আপত দৃষ্টিতে নিরীহ মনে হওয়া ছোট ছোট ভুল গুলো যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে এর আগে তা খতিয়ে দেখি নি। একটা প্রাচীন প্রবাদ মনে পরে গেল,
For want of a nail the shoe was lost.
For want of a shoe the horse was lost.
For want of a horse the rider was lost.
For want of a rider the battle was lost.
For want of a battle the kingdom was lost.
And all for the want of a horseshoe nail.
খুব সামান্য একটি ভুল সাম্রাজ্য পতনের কারন হতে পারে.....
খাটের নীচ দিয়ে কমান্ডো স্টাইলে আমি ক্রল করে এগুচ্ছি। হাতে আমার এক ভয়ঙ্কর মারনাস্ত্র-আমার হাতের চাইতেও বড় এক কাঁচি। চোখে মুখে আমার প্রতিশোধের আগুন। আমাকে বকা দিলো কেনো বুড়ি? তবু আবার সেই অন্যায়ের জন্য যা আমি করিই নি। ঘুমন্ত দাদির কোমর সমান ধবধবে সাদা সিল্কি চুলের গোছা ধরে ঘচাং করে কেটে ফেললাম....
এরপর আব্বু আমাকে যতই মারছিল আমার রাগ ততই বাড়ছিল। সবাইকে অবাক করে আমি নির্বাক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে স্কেলের বাড়ি সহ্য করে যাচ্ছিলাম। আমার মনে তখন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। সব লন্ডভন্ড করে দেয়া এক বিদ্রোহ আমাকে অস্থির করে দিচ্ছিল। কিছুক্ষন পর দাদি আমাকে ডেকে পাঠায়। ঘরে ঢুকেই দেখি দাদি কাটা চুল হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। দরজার লুকিয়ে ছিলাম, আমাকে দেখতে পেয়েই দাদি হাত দুটো বাড়িয়ে দিলেন। এক অদৃশ্য টানে আমি দাদির বুকে ঝাঁপিয়ে পরলাম। তার ফ্যাকাসে দৃষ্টিতে অসম্ভব প্রিয় কিছু হারানোর বেদনা তখন টপটপ করে আমার গাল ভিজিয়ে দিচ্ছিলো। সেই মুহুর্তে বুঝে যাই- অনেক খারাপ একটা কাজ করে ফেলেছি, অনেক খারাপ ।
সংস্কৃত এ যুদ্ধ জয়ের চারটি কৌশল পড়েছিলাম কোন এক কালে। সাম-দাম-দ্বন্দ-ভেদ। প্রথমে তোমার প্রতিপক্ষকে বুঝানোর চেষ্টা কর। সমঝোতায় কাজ হলে তো ভালই, তা না হলে দাম দিয়ে তাকে কিনে ফেলো। এরপরেও তোমার শত্রু বশে না আসলে হুকমি ধমকি মারামারি এক কথায় তোমার শক্তি প্রয়োগ কর। তাতেও যদি সফল না হও, ছলে কৌশলে শত্রুর মাঝে প্রবেশ কর বন্ধুর বেশে। সুযোগ বুঝে তার পিঠে ছোরা ঢুকিয়ে দাও। এমন ভাবে স্যাবোট্যাজ কর যেন আর কখনোই তোমার শত্রু মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে।
ঘটনা টি আমার হোস্টেল জীবনের। জয়নুল হাউসে জুনিয়রদের তখন দুটি সেকশন। ওয়ান আর থ্রি। সেকশন থ্রির প্রিফেক্ট হবার পর আমার প্রথম এসাইনমেন্ট। প্রতি সপ্তাহে তখন সেন্ট্রাল জুরি হত। কোন হাউস সবচেয়ে বেশী সাজানো গোছানো, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ক্রিয়েটিভ। হাউস গুলোর সেকশন গুলো নিয়ে ও আবার ইন্টারনাল প্রতিযোগিতা হত। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্য আমি উঠে পড়ে লেগেছিলাম। সারাদিন সারারাত সবাই মিলে সেকশন থ্রির নকশাই পাল্টে ফেললাম। ফ্লোর ঝাড় দিয়ে, মুছে, দেয়ালের ঝুল পরিস্কার করে আমাদের ই আর্ট ওয়ার্ক দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে ফেললাম। প্রতিটি সেকশন এই কাজ গুলো খুব গোপনীয়তার সাথে করত। যেন কারো প্ল্যান কেউ না জানতে পারে। জুরির সময় যতই এগিয়ে আসছিল আমি ততই ভিতরে উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছিলাম। নিজের উপর কনফিডেন্স কমতে কমতে এক সময় শূন্যের কোঠায় পৌছে গেল। তখন একটি কথাই বারবার মনে হচ্ছিল
Everything is fare in love and war and don’t hesitate, this is war.
বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে বাগান থেকে একদলা মাটি নিয়ে সেকশন ওয়ান এ এমনভাবে রেখে আসলাম যাতে ঢুকতেই চোখে পড়ে। বিকালে জুরির সময় হয়ে গেল, আমরা সবাই মাঠে চলে গেলাম। হঠাৎ আমার মনে হল সেকশন ওয়ানে কিছু পেলে তো আমাদের জয়নুল হাউস হেরে যাবে। এটা আমি কি করলাম। অপরাধবোধের চেয়ে বেশি আমার মনকে তখন ভয়ের রাহু গ্রাস করে ফেলছে। হেরে যাবার ভয় আমাকে পাগল করে দিচ্ছিলো। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতেও পারছিলাম না। দুরাত আমি ভয়ে ঘুমাতে পারিনি। শনিবারে মন মত রেজাল্ট দেবার পর মন শান্ত হয়। কিন্তু সেই দু দিনের মনঃকষ্ট আর অস্থিরতা আমাকে জীবনের অনেক বড় একটা শিক্ষা দেয়। এরপর আর কখনোই ভেদ ব্যবহার করিনি। আমি বুঝে গিয়েছিলাম কাজ টা ভুল ছিল। ভুল না পাপ? হবে ও বা...
একবার হোস্টেল থেকে বাসায় এসে ভাইয়ার টেবিলের উপর এর প্যাকেট বেনসন পেলাম। প্যাকেট টা এতটাই আকর্ষনীয় ছিল যে লোভ সামলাতে পারেনি আমার কচি মন। টুক করে পকেটে নিয়েই এক দৌড়ে ছাদের পানির ট্যাঙ্কির উপর। কাশির দমক আর চোখ ফেটে পানির স্রোতে প্রাণ প্রায় যায় যায় অবস্থা। কেউ জানতে ও পারল না, জীবনের প্রথম চুরি আর নেশার স্বাদ আমি নিয়ে নিলাম দশ বছর বয়সে।
Great power comes with great responsibilities.
কৈশরের শুরুতে আমি এই কথাটার অর্থ বুঝতেই পারি নি...
স্কুল জীবনে স্যারদের কাছে আমাদের একটা ভালো ইমেজ ছিল। আমরা ভদ্র ছিলাম, নম্র ছিলাম, খুব একটিভ ছিলাম। রেজাল্ট ও মাশাল্লাহ খারাপ করতাম না। এক কথায় আমরা কয়েক জন ফ্রন্ট বেঞ্চার ছিলাম। স্যাররা পছন্দ করতো আমাদের। তাই স্বাভাবিক কারনেই আমাদের কিছু ক্ষমতা ছিল। ক্ষমতা কি করে ব্যবহার করতে হয় সেটা জানার আগেই ক্ষমতার অপব্যবহার শিখে ফেলেছিলাম। আমাদের ক্লাসের নিয়ম ছিল কেউ একদিন অনুপস্থিত থাকলে ২ টাকা আর স্কুল পালালে ৫ টাকা জরিমানা দিতে হবে। মমিনুল হক স্যার আমাকে কেন এই জরিমানা সংগ্রহ করার দায়িত্ব দিয়েছিল সেটা আমি আজো বুঝে উঠতে পারিনি। প্রতিদিন আমার কাজ ছিল এটেন্ডেন্স খাতা দেখে দেখে জরিমানা সংগ্রহ করা। এই কাজ টায় আমি খুব মজা পেতাম। কিন্তু কয়েকদিন পরেই মজাটার অপর দিক ও ধরে ফেললাম। শুরু করলাম ছল-চাতুরী। সবাই বুঝে গেল আমাকে পটাতে পারলে জরিমানা থেকে পার পাওয়া যাবে। ২ টাকার জায়গায় ১ টাকা, ৫ টাকার জায়গায় ৩ টাকা। এই ধান্দায় আমি কিন্তু একা ছিলাম না। ফ্রন্ট বেঞ্চার, ভালো ছাত্রদের পুরো দল তখন আমার সাথে ছিল। এই অপরাধ কখনো নিজের জন্য করিনি আমরা। আমাদের কারন খুব নিরীহ ছিল- ‘খেলা’। খেলার জন্য বল দরকার, টেপ-ব্যাট-মাঠ দরকার, এসবের জন্য অনেক টাকা দরকার। আমরা কষ্ট করে স্কুল করি, যারা স্কুলে আসে না তাদের জরিমানার টাকা আমরা ব্যবহার করতেই পারি- for a better cause. নিজেরাই একটি যুক্তি বানিয়ে নিয়েছিলাম। স্যার কখনো বুঝতে পারে নি, আমরা তো আর পুকুর চুরি করতাম না। আর এমন অর্গানাইজড ভাবে কাজ টা করতাম কেউ চাইলেও আমাদের ধরতে পারত না।
সাধারন ছাত্রদের জন্য আমাদের আর একটি স্কীম ছিল। এটেন্ডেন্স দিয়ে দেয়া। এর জন্য তাদের একটি নির্দিষ্ট ফি দিতে হত। টীচার্স রুমে তখন আমাদের অবাধ যাতায়াত। স্যারের লকারে চাবি ও আমাদের হাতে। সকাল সকাল স্কুলে এসেই টীচার্স রুমে ঢুকে আগের দিনের এবসেন্ট কয়ে প্রেজেন্ট বানিয়ে দিতাম। কাজ টা করার সময় বেশ থ্রিলিং একটা অনুভূতি কাজ করত।
আমাদের আর একটা স্কীম ছিল স্যারের সিগনেচার দিয়ে দেয়া। ব্যাপারটা ভয়াবহ রকমের বিপদজনক ছিল। বিপদ ছিল দেখে কাজ করেও অনেক মজা পেতাম। “সিগনেচার” স্কীমের আমার আর রিয়াদের এক চেটিয়া সিন্ডিকেট ছিল। ছুটির এপ্লিকেশনের জন্য ২০ টাকা, হাফ পিরিয়ড পর ছুটির জন্য ১০ টাকা। অনেক দিন প্র্যাক্টিস করে স্যার সাইন রপ্ত করেছিলাম, আমার নিজের সিগনেচার ও এত সুন্দর আর নিখুঁত হয় না। প্রতিদিন রিসেস এর সময় আমি আর রিয়াদ দোকান খুলে বসতাম। একজন একজন করে আসত আর আমরা সাইন করে দিতাম। কিন্তু এর জন্যেও আবার কোটা ছিল, স্যারদের সন্দেহ এড়ানোর জন্য একদিন খুব বেশী সাইন দিতাম না। আমাদের মধ্যে সেই বোঝাপোড়া ছিল। হাফ পিরিয়ড পর আসতেন ছাত্র বান্ধব শফিক স্যার। রোল কল করতেন আর রাকিব (ক্যাপ্টেন) বলত-“স্যার এপ্লিকেশন আছে”। স্যার কখনোই এপ্লিকেশন গুলো পড়ে দেখেন নি। একবার মনে হয় উনি আমাদের খুব বেশী বিশ্বাস করেন তাই দেখার দরকার মনে করেন না। আবার পরক্ষনেই মনে হয় উনি সবই বুঝেন, সবই জানেন তবুও কিছু বলেন না। আমাদের খুব বেশী ভালোবাসতেন তাই...?
কারন যাই হোক সেই সময় গুলোতে আমাদের বিবেক অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, এখনো হয়ত আছে। প্রতিটি মুহূর্তে জেনে- না জেনে কত ভুল করে যাচ্ছি। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে অতীতের এই ঘটনা গুলোর জন্য আজ অনুশোচনা জাগছে মনে। জীবন আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হয়। জানিনা নিজেকে আজ কতটুকু সংশোধন করতে পেরেছি। শুধু এতটুকুই জোর গলায় বলতে পারি, আমি এখনো শিখে যাচ্ছি...
দুদিন আগে খুব রাত করে আমরা বাসায় ফিরছিলাম। রাকিব হঠাৎ একটা প্রশ্ন করে-
“আচ্ছা, আমরা ভদ্র-খারাপ নাকি খারাপ-ভদ্র...?”
প্রশ্নটার উত্তর এখনো খুঁজে যাচ্ছি...।
(চলতেই থাকবে......, মৃত্যু পর্যন্ত- কারন আমি মহাপুরুষ নই)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



