somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মৃতির ড্রেজার

০২ রা আগস্ট, ২০১১ রাত ১০:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খুব ছোটবেলায় শুনেছিলাম ড্রেজার দিয়ে নদী কাঁটা হয়। তখন অবাক হয়ে ভাবতাম নদী আবার কাটে কি করে? নিশ্চয়ই অনেক বিশাল বিশাল মেশিন হবে সেটা।কোন রকম ধারনাই ছিলনা জায়গা টা সম্পর্কে। ড্রেজিং ব্যাপার টা যে আসলে কি সেটা বুঝে উঠতেই কৈশোরকাল চলে আসে।তখন আমরা উঠতি বয়সের দূর্দান্ত কিশোর। সারাদিন খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত। ফজরের নামাজ পড়েই ফুটবল আবার দুপুরের তপ্ত রোদে ক্রিকেট। আমাদের ঘাটি ছিল ঈদগাহ মাঠ আর চর আকসির। একদিন কোন এক কারনে মাঠে আসতে আমাদের একটু দেরী হয়ে গেল। যথারীতি মাঠ দখল। খেলার জায়গা নাই। কি করি কি করি চিন্তা করতে করতে কে যেন প্রস্তাব দিল চল ড্রেজারের মাঠে যাই। ওটা খালি পড়ে থাকে। মাঠ টাও চমৎকার। সেবারই প্রথম নিজেদের টেরিটরির বাইরে কোন জায়গায় পা রাখলাম। গায়ে গতরে তখন ছোট ছিলাম, বল নিয়ে দারোয়ানের সামনে দিয়েই ঢুকে যেতাম নারায়নগঞ্জ ড্রেজার অধিদপ্তরের সুবিশাল কম্পাউন্ডে। কেউ বাঁধা দিত না। গেট দিয়ে ঢুকতেই অফিস বিল্ডিং, দুটা পাশাপাশি বিল্ডিং আবার ব্রীজ দিয়ে জোড়া লাগানো। প্রথমবার দেখে খুব মজা পেয়ে ছিলাম । অফিস বিল্ডিং এর সামনে এক চিলতে অযত্নে রাখা বাগান। অফিস বিল্ডিং এর ব্রীজের ঠিক নীচ দিয়েই চলে গেছে ইট বিছানো রাস্তা। একটু গেলেই আনসার ক্যাম্প আর মসজিদ। আর একটু সামনে গেলেই মাঠ। গুটুর গুটুর করে আমরা লাইন বেঁধে লাল ইট বিঁছানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যেতে যেতাম মাঠে। তখন সেই বয়সে ড্রেজার বলতেই ছিল মাঠ, শুধুই মাঠ। সবুজ নরম ঘাসে ঢাকা বিরাট মাঠ। মাঝখানে আবার পিচ ও কাটা আছে। আর ঠিক পাশেই টলটলে শীতলক্ষা। একদম সোনায় সোহাগা । আমাদের আর পায়, কত বড় একটা আবিস্কার করে ফেলেছিলাম সেটা এখন হাজার বলেও বোঝানো যাবে না। কলম্বাস ও মনে হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিস্কার করে এতটা খুশি হয় নাই। বছর দুয়েক চুটিয়ে খেলাধুলা করলাম ড্রেজারের মাঠে। বৃষ্টিতে কাদামাটিতে হুটোপুটি। নিশ্চিত গোল বাঁচাতে অভিকে করা আমার এক্সট্রিম ফাউল, তারপর মারামারি আর গড়াগড়ি। একটা বলের পিছনে ৬-৭ জন দৌড়ানো, কেউ পাস না দিলেই গন ধোলাই, খেলার পর মাঠেই শুয়ে পরা।শুয়ে শুয়ে গল্প করা, গল্পে গল্পেই ঘুমিয়ে যাওয়া। কত নিশ্চিন্ত ছিল জীবন তখন...। হায়, আজ মনে হচ্ছে কেন বড় হলাম??



স্কুল পেড়িয়ে আমরা তখন কলেজে।বয়সের সাথে সাথে মনের ভাব ও পাল্টে গেছে নিজের অজান্তেই। ড্রেজারের মাঠ এখন আর টানে না। এখন আকর্ষন করে আমাদের নদী। আমাদের শীতলক্ষা। বিনা পয়সায় তোমাকে একদম নদীর বুকে নিয়ে যাবে আমাদের ড্রেজার।আমাদের ড্রেজার- হামজা, রুস্তম আর অনেষ্বার ঘর। মেঘনার মোহনা অথবা পদ্মার ডুবো চরে লঞ্চ দূর্ঘটনা ঘটলেই ডাক পরে হামজা-রুস্তমের। বুড়ো শরীর নিয়েই তারা ছুটে যায় উদ্ধার কাজে। বাকী সময়ে তারা বুড়ো ঘোড়ার মত ঝিঁমোয় ড্রেজার জেটিতে। কলেজে উঠেই আমরা একেকজন ব্যস্ত হয়ে গেলাম। প্রতিদিন ঢাকায় আসা যাওয়া করেই আমাদের সময় চলে যায়। ভাব উঠার ও সময় পায় না। তবুও হাজার কাগের ফাঁকে আমরা কিছুটা সময় বের করেই ফেলি, চুপ করে গিয়ে বসে থাকি অনেষ্বার লম্বাআআআআ জেটিতে। জেটি থেকে নেমে যাই নদীর বুকে ভেসে থাকা ড্রেজিং এর পাইপের চেইনে। অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে সেই পাইপের লাইন। মাঝে মাঝে পাইপের উপর দিয়ে দৌড় প্রতিযোগীতা হত। এক দৌড়ে চলে যেতাম একদম মাঝ নদীতে। তখন একবার ও মনে হত না, যদি পরে যাই তাহলে কি হবে??? সাঁতার তো পারি না। নদীর ঢেউয়ে দুলতে থাকা পাইপে শুয়ে থাকতাম চুপচাপ। তখন ভাব উঠত। আকাশের চাঁদ দেখতাম, জোনাকীর মিটিমিটি আলো, দূরের হ্যারিকেনের আলো, কুপ্পির আলো, জাহাজ ঝালাই দেয়ার বিদ্যুৎ এর চমক। বিশাল বিশাল জাহাজ গুলোর ভেঁপু, ছোট খেয়া নৌকার মাঝির গালাগালি। বালু ভর্তি বার্জ গুলোর লাইন বেঁধে চলে যাওয়া...। এসব আমাদের বিমোহিত করে রাখত। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে আসত। আমরা চুপচাপ বসে থাকতাম।



ধীরে ধীরে আমরা বড় হয়ে গেলাম। আগের সেই ছোট্ট টি আর নেই। দাঁড়ি গোঁফ গজিয়ে গেছে। এখন আর দাড়োয়ান রা ঢুকতে দিতে চায় না। বড় হয়ে গেছি তো। তবুও আমাদের প্রিয় জায়গায় যেতে তো হবেই। কিভাবে যাব? আইডিয়া...। আমরা কোয়ার্টারে যাব। আমাদের বন্ধুর বাসায়। ৪-৫দিন কোন ঝামেলা ছাড়াই ঢুকে গেলাম কম্পাউন্ডে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। তারপর একদিন দারোয়ানের বুঝি সন্দেহ হয়। আমার সাথে সাথে সে কোয়ার্টার পর্যন্ত আসে। আসলেই কারো বাসায় যাই কিনা সেটা দেখতে। আমার বুকে তো তখন ড্রামের বাড়ি মারছে। কি করব এখন? কাউকে তো চিনি না। কার বাসায় যাব?? ইশশশ এখনই ধরা পরব...।কি বেইজ্জতি। এসব ভাবতে ভাবতেই কোয়ার্তারের চত্বরে চলে আসলাম। সাহস করে একটা বিল্ডিং এ ঢুকে গেলাম। দারোয়ান দেখি হা করে আমাকেই দেখছে। দুরুদুরু বুকে কলিং বেল বাজানোর অভিনয় করলাম। দারোয়ান দেখি চলে গেল। আহহহ...কি যে শান্তি পেয়েছিলাম সেদিন। অবাক করা ব্যাপার হল কয়েকদিন প এই কোয়ার্টারেই আমাদের একজন খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায়। রনির বাবা ছিলেন ড্রেজারের সহকারী প্রকৌশলী। একটা সময় ছিল যখন সারাদিন রনির বাসায় পরে থাকতাম।রনির বড় বোনের ছিল আমার মতই বই পড়ার নেশা। তাই আমার আর লিমা আপুর খুব জমত।



অনেক অনেক দিন পর আজকে আবার ও গেলাম আমাদের প্রিয় ড্রেজারে। প্রায় ৩ বছর পর। একটুও পালটায় নি। সেই বুনো ঝোপঝাড়, বিশাল মাঠ, বিশাল গাছ...সবই আছে। মাঠে মনে হয় এখন আর কেউ খেলে না। আজ়কে ঢুকতেও কেউ বাধা দেই নাই।মনে হয় ছাত্রলীগের ক্যাডারদের মত লাগছিল। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে দাঁড়াই অনেষ্বার জেটিতে। কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে রেখেছে কোন এক অদ্ভুত কারনে। কতদিন পর আসলাম, এখন এই কাঁটাতার আমাকে আঁটকে রাখতে পারবে?? কখনো না। সাইড দিয়ে কাঁটাতার গুলো টপকালাম। শরীর বড় হয়ে গেছে অনেক। ঝুকে টুকে অনেক কসরত করতে হল আজকে। আমাদের মত এই পুরানো জেটী টাও আজ বয়সের ভারে ন্যুজ। জায়গায় জায়গায় ফাটল। সাবধানে পা ফেলছিলাম। পা দিলেই মচ মচ করে গুঙিয়ে উঠছিল। হেঁটে হেঁটে জেটীর শেষ মাথায় চলে আসলাম। নদীর পানি অনেক বেড়ে গেছে। জেটি প্রায় ছুইছুই। তীব্র বাতাস আর বৃষ্টিতে সব ঝাপসা হয়ে আসে...অনেক বড় হয়ে গেছি।
১২টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×