আফছার আহমদ রূপক: রোববার দুপুরে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের ১১ তলার প্রধান কার্যালয়ের যৌথবীমা শাখার দরজায় পা রাখতেই এ প্রতিবেদকের দিকে এগিয়ে আসেন একজন কর্মচারী। মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফ । মাথায় লম্বা চুল। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। প্রশ্ন করলেন, ‘কী চাই?’ পরিচয় গোপন রেখে প্রতিবেদক জানতে চান ময়মনসিংহের সরকারি কর্মচারীদের যৌথবীমার টাকার আবেদনপত্র এখানে জমা নেয়া হয় কিনা। প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রতিবেদককে হাত ধরে টেনে একটু আড়ালে নিয়ে যান ওই কর্মচারী। বলেন, ১১ তলায় কেবল ঢাকা শহরের সরকারি কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিল ও যৌথবীমার টাকার আবেদন জমা নেয়া হয়। ময়মনসিংহসহ ঢাকা বিভাগের সরকারি কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিল ও যৌথবীমার কাজ হয় তিনতলায় । তবে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কমিশনারের কাছ থেকে ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে প্রত্যয়নপত্র আনা হলে এখানেই কাজ হবে। ঘুষ দিতে হবে তিন হাজার টাকা। সময় লাগবে দুই মাস।
এত টাকা ঘুষ লাগবে কেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে তো তিন হাজার, তিনতলায় ঘুষ দশ হাজার, সময় লাগবে দেড় বছর। আমি একা ঘুষ নিই না। টেবিলে-টেবিলে দিতে হয়। ঠিক এসময়ই কক্ষে ঢুকছিলেন একজন পর্দানশীন নারী কর্মচারী। তাকে দেখিয়ে এ প্রতিবেদক প্রশ্ন করেন, উনিও কি ঘুষ নেন? জবাব আসে, নেন না মানে, হজ করে এসেছেন; কিন্তু ভাগের বেলায় ‘আমারটা কই’ বলতে দেরি হয় না? একথা বলেই পকেট থেকে একটি ছোট নোটবই বের করেন ওই কর্মচারী। বলেন, এই দেখেন কে কত ঘুষ দিয়েছে এবং বকেয়া কতÑ সব লেখা আছে। আপনাদের ময়মনসিংহের মোহাম্মদ আলী নামের এক যুবকের নামও আছে এখানে। চুক্তি হয়েছে দশ হাজার টাকার; কিন্তু পরিশোধ করেছে পাঁচ হাজার। যুবকের মৃত বাবার যৌথবীমার কাজটি তিনতলার ঢাকা বিভাগীয় অফিস থেকে করাচ্ছি। ওই বেটারা রেট একটু বেশিই চায়। ঘুষ ও জ্বেনা সমান অপরাধ জেনেও এ কাজ করি।
আপনার নাম, পদবি ও মুঠোফোন নম্বরটি দয়া করে বলবেন? প্রথমে নাম ও মুঠোফোন নম্বর দিলেও পদবি দিতে বিব্রতবোধ করছিলেন ওই কর্মচারী। পরে পিয়ন হিসেবে পরিচয় দিলেন।
কেবল ওই পিয়নই নন, বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডে ঘুষ ছাড়া ফাইল ছাড়েন না প্রায় বেশিরভাগ কর্মকর্তা ও কর্মচারী। ফলে জীবত কর্মচারী ও মৃত কর্মচারীদের স্বজনরা চরম ভোগান্তি পোয়াচ্ছেন। বেশিরভাগই ধার-কর্জ করে ঘুষের টাকা সংগ্রহ করেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারকেই ধার করতে বেশি দেখা যায়।
ঢাকার আশপাশে চাকরি করতেন, এমন একজন মরহুম সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী জানান, দুইমাস আগে তিনতলার ঢাকা বিভাগীয় অফিসে তার স্বামীর কল্যাণ তহবিল ও যৌথবীমার টাকার জন্য আবেদন করেছিলেন। এখনো কাজ শেষ হয়নি। সেখান থেকে ফোন করে বলা হচ্ছে, ‘আপনি আসেন না, কিছু দেনও না। এভাবে কি কাজ হয়?’ ঘুষের টাকা জোগাড় না হওয়ায় কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডে যেতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মো. আলী মোস্তাফা চৌধুরী বলেন, কে ঘুষ নিচ্ছে নির্দিষ্ট করে বলুন, অবশ্যই অ্যাকশন নেব। তিনি বলেন, ‘সবার জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা। আমার কক্ষে ঢুকতে অনুমতি নিতে হয় না। যে কেউ যে কোনো সময় ঢুকতে পারে।’
তিনি জানান, শুধু ঘুষ নেয়া নয়, ঘুষ দেয়াও মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একজন মৃত পিয়নের স্ত্রী তাকেও নাকি ৫০ টাকা ঘুষ দিতে চেয়েছিলেন। পরে ওই নারীকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে চা খাইয়ে বিদায় করেছিলেন তিনি।
সূ্ত্রঃ এখানে পড়ুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


