ক্লাস সিক্সে উঠে বীজ গণিত শেখার পরেই প্রথম আমার গণিত ভাল লাগতে শুরু করে। কিন্তু সে শুধু বীজ গণিত অংশটুকুই। পাটি গণিত আমাকে অনেক জ্বালিয়েছে। সুদ কষা, চলিত নিয়ম দু চোখের বিষ তখনও ছিল, আর এখন তো আরো বিভীষিকাময়। (কেননা, এখন মাঝে সাঝে আমাকে এগুলোর ক্লাস নিতে হয়, ওফ!) ক্লাস সেভেন উঠে উপপাদ্যের সাথে পরিচয়। না বুঝে মুখস্ত করতে যেয়ে আমাকে কতই না গলদ্ঘর্ম হতে হয়েছে! তারপরেও কপালে জুটত একটা বড়সড় গোল্লা। ভাগ্যিস! বীজ গণিত বলে একটা ব্যাপার ছিল। তা না হলে অঙ্কে আমার ফেল করা কেউ ঠেকাতে পারত না।
ক্লাস এইটের বৃত্তির জন্য বিশেষ কিছু শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হল। সেখানে আমিও ছিলাম।পড়ালেখার চেয়ে পিছনের বেঞ্চে বসে মাথা নিচু করে গল্প করতেই বেশি ভাল লাগত।কিন্তু কপালে সুখ সইল না। স্যার পড়া দিয়ে দিলেন, পরের ক্লাসে জ্যামিতির এই এক্সট্রা গুলো অবশ্যই পড়ে আসতে হবে।একটা ব্যাপার বলে রাখি, ক্লাস নাইনের আগে আমি কখনো কোন টিউটর বা কোচিং-এ পড়িনি।নিজে নিজেই পড়তাম।স্যারের ভয়ে পড়তে শুরু করলাম।আর একটু একটু করে জ্যামিতির জট যেন খুলতে শুরু করল।বীজ গণিত আমার ভাল লাগত।কিন্তু প্রেমে যদি পড়ে থাকি তবে সেটা এই জ্যামিতির।এরপরে আমাকে জ্যামিতির নেশায় পেয়ে গেল। নিজে নিজেই এক্সট্রাগুলো সল্ভ করতাম। নাহ! ক্লাস এইটেও বৃত্তি পাইনি। তাতে কি? জ্যামিতির সাথে প্রেম তো হলো!
সম্পাদ্যের সাথে প্রমাণ দিতে হয় না, এমন কথা শুনে মন খুব খারাপ হয়েছিল। আর পিথাগোরাসের উপপাদ্যটাও খুব ভাল লাগত। আমাদের বইতে এটার দু ধরনের প্রমাণ ছিল। একটা ইউক্লিডিয়, আরেকটা বিকল্প। আমি ইউক্লিডিয় প্রমাণ পড়তে বেশি ভাল বাসতাম। পরীক্ষায় ইউক্লিডিয় প্রমাণটাই দিতাম। তাতে খাতায় পাতা বেশি লাগত, চিত্র আবার আঁকতে হত, সময় বেশি লাগত। আমার এত হাঙ্গামা দেখে এক বান্ধবী সুপরামর্শ দিল, ‘’তুই বিকল্পটা শেখ। এটা সহজ। সময় কম লাগবে।‘’ কিন্তু বিকল্প প্রমাণ আমার মাথায় ঢুকল না।আমি কিছুতেই বুঝতে পারলাম না। (অনেক পরে অবশ্য বাধ্য হয়ে বুঝতে হয়েছিল, এক ছাত্রীকে বুঝাতে গিয়ে। সে আবার ইউক্লিডিয় প্রমাণ বুঝে না!)।
কলেজে উঠে মজার মজার কিছু নতুন জিনিশ শিখলাম। যেমন--ম্যাট্রিক্স, পারমুটেশন, কম্বিনেশন, জটিল সংখ্যা, ক্যাল্কুলাস আরো অনেক কিছু। আপনারা জানেন এইচ এস সির গণিতে কী থাকে। আমার ভাল লাগত সেই অঙ্কগুলো করতে। আজ সেগুলো গুলে খেয়ে বসে আছি!
অনার্সে দুই বছর মাইনর হিসেবে গণিতের দু’চারটা কোর্স পড়েছি। সত্যি কথা বলতে কি, কোর্সগুলোর একটাও আমার ভাল লাগেনি। পাস করার জন্য যতটুকু না করলেই নয়, শুধু ততখানি বা তার চেয়েও কম অনুশীলন করেছি। ভাগ্যগুণে দু’এক নম্বরের জন্য পাস করে গিয়েছি।
অনার্স প্রথম বর্ষে গণিতের একটি কোর্স ছিল ‘’লিনিয়ার এলজেব্রা’’। পড়াতেন মতিন স্যার। ক্লাসে আমার মনোযোগ বরাবরই কম।স্যার ক্লাসে কী রকম হাস্যকরভাবে পড়াচ্ছেন, কয়বার জিরোকে জিরো না বলে জিরু বলছেন, এইগুলা পর্যবেক্ষণ করাই ছিল আমার কাজ। তবে এত দুষ্টামীর মাঝে একটা কাজ আমি ভাল করতাম। সেটা হল পড়ানোর মাঝে শিক্ষকের কোন কথা ভাল লেগে গেলে সেটা খাতায় টুকে রাখতাম। এখনো রাখি। আর তাই আজ ‘’লিনিয়ার এলজেব্রা’ মনে না থাকলেও মতিন স্যারের কথাগুলো মনে আছে। আজ তারই কিছু বলব।
মতিন স্যারের কিছু বাণীঃ
# প্রতিটা দিনই শুভ। অশুভ দিন বলে কিচু নেই।
#দেখতে পাচ্ছো না বলেই কি নেই? (দেখার বাইরেও কিছু আছে)
#যে স্বামীর টাকায় শাড়ি কিনে সে খারাপ। যে স্বামীকে দিয়ে রান্না করায় সে খারাপ না,যে বলে সে খারাপ।
#মৃত্যু ব্যতিক্রমের ব্যতিক্রম।
#ছবি দেখে বিয়ে করবে না।
#গরুর সাথে গরুর দোস্তি হয়।
#সব গরু ছাগল না!
#১০টা লিচু+১টা আম=১টা কাঁঠাল
#প্রত্যেক ছাত্রের বেতন ১০,০০০টাকা হওয়া উচিত। কারণ সে শিখতে আসছে।
#মেয়ে তোমাকে থাপ্পর দিল, আর আমি মেয়েকে থাপ্পর দিলাম, রেজাল্ট এক হবে না।
#revision is better than answer of the last question.
# ১০০টা শাড়ির দরকার নেই। সামর্থ্য থাকলে ১টা শাড়ির দরকার নেই।
#কাগজ যত লাগে নিবে, কিন্তু অপচয় করবে না।
#কোন মেয়েকে/ছেলেকে যদি বিয়ের কথা দাও তবে তাকে অবশ্যই বিয়ে করবে। তবে কথা দেবার আগে এক বছর চিন্তা করবে।
#ক্ষুদা না লাগলে চাপাইনবাবগঞ্জের আমও ভাল লাগবে না। জানার জন্য প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগতে হবে।
শেষ করব স্যারের দেওয়া একটা সমীকরণ দিয়ে। এই সমীকরণের কোন ভুল এখন পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি। আমি সমীকরণটি সব সময় মনে রেখে চলতে চেষ্টা করি।
মনে করি, (+1)= বন্ধু এবং
(-1)= শত্রু
এখন,
সমীকরণ ১. (+1) * (+1) = +1 অর্থাৎ, বন্ধুর বন্ধু= বন্ধু
সমীকরণ ২. (+1) * (-1) = -1 অর্থাৎ, বন্ধুর শত্রু = শত্রু
সমীকরণ ৩. (-1) * (-1) = +1 অর্থাৎ, শত্রুর শত্রু = বন্ধু
সমীকরণ ৪. (-1) * (+1) = -1 অর্থাৎ, শত্রুর বন্ধু = শত্রু
২০ নভেম্বর, ২০১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

