শেলির খুব রাগ হয় নোশিনের উপর। নোশিনের প্রেমিক আরমান সিলেটে থাকে। ফোনেই ওদের পরিচয়। দুজন দুজনকে প্রচণ্ড ভালবাসে, কখনো নাকি ওদের দেখা হয়নি। নোশিনের মুখে তাদের ভালবাসার গল্প শুনে শুনে শেলি বলে রেখেছিল, আরমান ঢাকায় এলে অবশ্যই যেন ওকে জানায়। ওর খুব শখ এমন একজন ব্যক্তির সাথে পরিচিত হবার। কিছু দিন আগেই নাকি আরমান ঢাকায় এসে ঘুরে গেছে, কিন্তু নোশিন শেলিকে কিছুই জানায় নি। শেলি রাগ চেপে রাখতে পারে না, ‘’ভাইয়া ঢাকায় এসেছে তুই আমাকে জানাবি না? খাওয়াটা মিস।‘’
--তুই আছিস খাওয়া নিয়ে। এদিকে কত কাণ্ড হয়ে গেল। ও যেদিন বিদায় নিচ্ছিল, আমি এত কেঁদেছিলাম। আমাদের সাথে ছিল ফয়সাল।ফয়সালের কথা বলেছি না তোকে?
-- শুনেছি তোর কাছে। ঐ যে ঐ ছেলেটা না, যে তোকে বিয়ে করার জন্য পিছে পিছে ঘুরছে?
--হুম, ঐ ছেলেটাই। আরমান চলে যাবার পরে, আমাকে বলে কী বলে শোন। বলে এখন তো আপনার কোন পিছুটান নেই। এবার আমার কথা একটু ভাবুন। চিন্তা করে দেখ, আমি কাঁদছি আরমানকে বিদায় দিচ্ছি বলে, আর এদিকে উনি ভাবছেন, আমাদের সম্পর্ক বুঝি এখানেই শেষ।
শেলি এই রকম ভাবে নোশিনের কাছ থেকে নানাজনের কথা শোনে। কিন্তু ওর বলা ব্যক্তিদের সাথে কখনো দেখা হয় নি শেলির। একদিন আবার রুবার কাছে শুনল, ‘’নোশিনের আরমান টারমান সব ভুয়া। সব ও বানিয়ে বলে। তুই ওর কথা বিশ্বাস করিস নাকি?’’ ভ্যালেন্টাইন’স ডের কয়েকটা দিন আগে নোশিন কাঁদতে কাঁদতে হাজির হল শেলির কাছে। আরমানের সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। আর এতদিন যে কথাগুলো ও বলেছিল সেগুলো মিথ্যা। আরমান ঢাকায় কখনোই আসেনি। বরং নোশিনের নাকি কথা ছিল সিলেটে যাবার। ট্রেনে উঠার পরে আরমান নাকি ওকে ফোন করে বলেছে, ‘’খবরদার, তুমি সিলেটে আসবে না, এক্ষুনি নেমে যাও ট্রেন থেকে।‘’ রাতের ঐ ট্রেনে ফয়সাল ওকে উঠিয়ে দিয়েছিল। অবশেষে আবার ফয়সালকে ফোন করে স্টেশনে থাকতে বলে ও। আরমানের কথা ভেবে নোশিন খুব কাঁদছিল। তখন ফয়সাল নাকি নোশিনকে ওর কথা আবার ভেবে দেখতে বলে। প্রকৃত সত্য নোশিন ওর কাজিন কান্তা ছাড়া আর কাউকেই এতদিন বলে নি। কান্তার পরে আজকে শেলিকে বলল।
নোশিনের কথা শুনে তালগোল লেগে যায় শেলির। কোনটা যে সত্য আর কোনটা যে মিথ্যা ধরতে পারে না। একটু পরেই রুবা এসে ওদের সাথে যোগ দেয়। এরই মধ্যে নোশিন ওর চোখ মুছে নিজেকে ঠিক করে ফেলেছে। ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা সুন্দর পার্স বের করে সবাইকে দেখিয়ে বলল, ‘’এটা আরমান আমার জন্য সিলেটে থেকে পাঠিয়েছে।‘’ বন্ধুদের সামনে হাইলাইটেড হবার জন্য, সহানুভূতি পাবার জন্য নোশিন মিথ্যাবাদী রাখাল ছেলেটার মত একের পর এক বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে যায়। আর এভাবে ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলে বেড়ানো এক ধরনের মানসিক রোগ। চলুন জানা যাক এ রোগের কিছু লক্ষণ সম্পর্কেঃ
• ব্যক্তি বেশ আকর্ষণীয়ভাবে কথা বলতে পারে। নিজের কথাগুলো অল্প কথায় শেষ না করে টেনে লম্বা করে, অতিরঞ্জিত করে বলে থাকে। এরা অকারণেই মিথ্যা কথা বলে থাকে। যেমনঃ আজ সকালে আমি দাঁত ব্রাশ করি নি।
• নিজের সম্পর্কে বেশ একটা উচ্চ ধারণা পোষণ করে থাকে।
• একই ঘটনা একেক সময় বর্ণনা করার সময় তথ্যের গড়মিল দেখা যায়। যেহেতু এগুলো রেকর্ড করে রাখা হয় না, তাই এরা নিজের ইচ্ছেমত ঘটনা বর্ণনা করে যায়। কোন কিছু বিবেচনা না করেই এরা মিথ্যা বলে থাকে। যেমনটা আমরা দেখেছি নোশিনের বেলায়।
• মিথ্যা বলা নিয়ে এদের মধ্যে কোন অনুতাপ থাকে না। একটু আধটু মিথ্যা বলল কিছুই হয় না, এমন মনোভাবও তাদের মধ্যে পোষণ করতে দেখা যায়।
• মিথ্যা বলাটাকে অনেক সময় কৌতুক হিসেবেও এরা নিয়ে থাকে। মিথ্যা বলাটাকে এরা তেমন আমলে নেয় না।
• জবাবদিহিতাকে এরা ভয় পায়। প্রশ্ন করা হলে তা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে।
পরিবার পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীরা এ ধরনের মিথ্যাবাদী ব্যক্তিদের সাথে কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে পারেন। দেখা যায়, বেশি মিথ্যা কথা বলার কারণে ঐ ব্যক্তিকে অন্যরা বিশ্বাস করছে না। অন্যের মনোযোগ পেতে, সবার সামনে নিজেকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে, সমবেদনা বা করুণা পেতে, নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ব্যক্তি হয়ত আরো মিথ্যা বললে পারে। এবং নিজের অজান্তেই এরা মিথ্যা বলে থাকে। এরা অনেক সময় বুঝতেও পারে না, যে তারা মিথ্যা বলছে। এ ধরনের ব্যক্তির আচরণ পরিবর্তনের জন্য বেশ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ব্যক্তির কথা বলার সময়েই ছোট-খাট মিথ্যাগুলো ধরা পড়লে সেটি এড়িয়ে না গিয়ে তা পয়েন্ট আউট করা উচিত। তবে তাই বলে তাদের মিথ্যার জন্য অভিযোগ বা দোষারোপ করা যাবে না। কেননা, আগেই বলা হয়েছে, ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারেনা যে সে মিথ্যা বলছে। প্রয়োজনে থেরাপিস্টের সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে।
সত্য কথা বলতে কী, মিথ্যা বলে নি, ‘’এমন লোকটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! ‘’ আমরা বেশির ভাগ ব্যক্তিই পরিস্থিতির কারণে মিথ্যা বলে থাকি। দেখা যায়, কেউ একজন ফার্মগেটে বসে মোবাইলে আরেকজনকে বলে দিচ্ছে ‘’আমি তো এখন খিলক্ষেতে।‘’ অথচ যে মিথ্যা বলে সেও অন্যের বলা মিথ্যাকে ঘৃণা করে। আমাদের সবারই উচিত কথা বলার সময় একটু সচেতন থাকা। এই বিশ্বে একমাত্র আমাদেরই তো কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করার মত শক্তি আছে। মিথ্যা কথা বলে সে শক্তির অপচয় করা তো মনুষ্যত্বেরই অপমান করা।
৩০ ডিসেম্বর, ২০১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

