somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা, ক্ষমা করবেন...

২৭ শে জানুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৪:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[লেখাটি অনেক দিন আগে লেখা। লেখার পরে আমি এটিকে লুকিয়ে রেখেছিলাম, কাউকে দেখানোর ইচ্ছে হয় নি। হয়ত তেমন বন্ধু আমার ছিল না তাই। পত্রিকায় দিতে ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু সেখানে দেবার সাহস হয় নি। ব্লগের ধারণা ছিল না। থাকলেই বা কী, তখন নেট সহজলভ্য ছিল না। ছিল না নিজের মনের কথা নির্দ্বিধায় বলার মত মানসিকতাও। পরে অবশ্য আমার দুজন বন্ধুকে দেখিয়েছিলাম লেখাটা, সেও লেখাটা লেখার প্রায় বছর খানেক পরে। ওরা আমাকে উৎসাহ দিয়েছিল। তবু লেখাটা/আমার ভাবনাগুলো সবার আড়ালে রাখতে আমার ভাল লাগত। আজকাল ব্লগে, পত্র-পত্রিকায় যখন এ সংক্রান্ত কোন লেখা দেখি, পড়ি, আমার মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো লেখাটার কথা। অনেক দিন পরে এটা আজ খুঁজে পেলাম। আজ হয়ত সময় এসেছে এটা সবার সামনে তুলে ধরার। কিন্তু আমার কথাগুলো কারো কাছে নতুন বলে মনে হবে না। কেন না, এ নিয়ে অনেকে অনেক কথা আগেই বলে ফেলেছেন।

আমার লেখাটি লিখেছিলাম একজন শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভংগি থেকে। বেশ অপরিপক্কতা আছে ভাবনাতে, লেখনিতে। লেখাটিতে আমি বারবার ‘’ছাত্র’’ শব্দটি ব্যবহার করেছি, যদিও সে সময় এটা করার আমার ইচ্ছে ছিল না। এখন অবশ্য ছাত্র বা ছাত্রী শব্দগুলো ব্যবহার করা হয় না। ‘’শিক্ষার্থী’’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। লেখাটি পরিবর্তন না করে হুবহুই প্রকাশ করছি, তাই ‘’ছাত্র’’ শব্দগুলো পাঠককে নিজ দায়িত্বে ‘’শিক্ষার্থী’’ পড়ে নেবার অনুরোধ রইল। এছাড়াও লেখাটিতে তৃতীয় বন্ধনীর [ ] ভেতরে আমি আমার বর্তমান সময়ের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।]

‘’আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা যখন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের পাই, তারা তখন অনেক বড় হয়ে গেছে, তাদের চরিত্রর মূল কাঠামোটি দাঁড়িয়ে গেছে। তারা আমাদের দেখে খানিকটা ভয় খানিকটা সন্দেহের চোখে। যদি আমরা ঠিকভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করি তখন হয়তো খানিকটা শ্রদ্ধা করে কিন্তু তাদের ভালবাসাটুকু আমরা কখনো পাই না।‘’

কথাগুলো আমার নয়, লেখক ও অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের। আমার এ লেখাটি হয়ত আমি কখনোই লিখতাম না। পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে অনেকে চিঠি লেখেন। তাদের লেখা দেখেও কখনো কিছু লেখার তাড়না অনুভব করি নি। এমন কি কাউকে এ সম্পর্কে বলারও তাড়নার অনুভব করি না আজকাল। মুহাম্মদ জাফর ইকবাল আমার প্রিয় একজন মানুষ। আমার দুর্ভাগ্য, তাঁকে শিক্ষক হিসেবে আমি পাই নি। তাঁর সব লেখা আমি মনোযোগ দিয়ে পড়ি। তাঁর লেখা পড়েও কখনো এমন হয়নি। কিন্তু ‘’প্রথম আলো’’তে গত ১২ জুলাই, ০৫, তাঁর লেখা পড়ে, এই প্রথম আমি কিছু লেখার, কিছু বলার তাড়না অনুভব করলাম।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিক্ষকদের সন্দেহের চোখে দেখি, শ্রদ্ধা যদিও বা করি, ভালবাসতে পারি না। আমরা জানি এবং মানি, শিক্ষক (তিনি স্কুলেরই হোন আর বিশ্ববিদ্যালয়েরই হোন) মাত্রই মহান একজন মানুষ। কিন্তু চোখের সামনে যখন সেই মহান শিক্ষকের নিচু মনের সাথে আমাদের পরিচয় হয়ে যায়, তখন তো তাঁদের শ্রদ্ধা করতে চাইলেও, শ্রদ্ধা করতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কিছু শিক্ষক আছেন, যাদের ভাবভংগি দেখে মনে হয় তাঁদের দয়ায় আমরা লেখাপড়া করছি এবং আমারদের পড়ালেখা করাটাও যেন অপরাধ। হ্যাঁ, আমরা যারা সাধারণ ছাত্র, শিক্ষকদের তোষামোদ করতে পারি না, তাদের লেখাপড়া করাটা তো এক ধরনের অপরাধই। শিক্ষকরা যে দয়া করে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেন এটাই তো অনেক বড় পাওয়া। যখন ক্লাসে শিক্ষক উঁচু গলায় বলেন, ‘’তোমরা কেউ আমার চাকরি খেতে পারবে না’’ তখন আমরা কাপুরুষ ছাত্ররা চুপ করে থাকি। পাছে পরীক্ষায় কম নম্বর পাই। [বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জবাবদিহিতা না থাকায় এমন মানসিকতা তৈরি হয়েছে। অবশ্য কিছুদিন আগে আমি একটি ক্লাসে একজন শিক্ষককে বিনয়ের সাথেই জানিয়েছিলাম, কেউ কেউ ক্লাসে প্রস্তুতি ছাড়া এসে নিজের পিএইচডির গল্প, নিজের ব্যক্তিগত গল্প করে সময় কাটান। কারণ জবাবদিহিতা নেই। স্বভাবতই আমার কথা তাঁর ভাল লাগে নি।]

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হবার অনেক আগে থেকেই শুনতাম তরুণ শিক্ষকরা পরীক্ষার হলে সুন্দরী ছাত্রীদের উত্তর বলে দেন। তখন ভাবতাম ছাত্ররা এসব ঈর্ষা থেকে বলে। কিন্তু নিজে যখন চাক্ষুষ দেখলাম, তখন বিশ্বাস না করে উপায় রইল না। অবশ্য এজন্য আমি একচেটিয়াভাবে শিক্ষকদের দোষ দেব না। অনেক ছাত্রীই এমন ফ্লেভার পেতে পছন্দ করেন যে, অমুক শিক্ষক আমাকে পছন্দ করেন। পরীক্ষার হলে শিক্ষক যখন কোন ছাত্রকে উত্তর বলে দেন, তখন আমারও কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারি না। আমি দেখেছি, স্কুল বা কলেজেও কোন ছাত্র পরীক্ষার হলে শিক্ষককে কোন কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায় না—এমন কি প্রথম সারির ছাত্রও না। [এখন সময় পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার সময়ে স্কুল কলেজে পড়ার সময়ে শিক্ষকদের পরীক্ষার সময়ে কিছু জিজ্ঞেস করাকে গর্হিত কাজ বলে মনে করতাম। এখনকার শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই শিক্ষকদের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে থাকে। আমি বলব এ কালচার তৈরি হবার পেছনে কিছু শিক্ষকই দায়ী। এর কারণ সম্পর্কে আমার নতুন করে বলার কিছু নেই।]


অনেক দিন আগে ‘’প্রথম আলো’’ তেই লেখক আতাউর রহমানের একটি রম্য রচনাতে পড়েছিলাম, স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পার্থক্য হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাঁদের অজ্ঞানতাগুলো ছাত্রদের কাছ থেকে খুব সুন্দর করে লুকিয়ে রাখতে পারেন। এ পার্থক্যটাও কিন্তু দিন দিন কমে আসছে। কিছু শিক্ষক আছেন, যাঁরা নিজেরা জানেন অনেক। কিন্তু ছাত্রদের বোঝাতে পারেন না। শিক্ষক হিসেবে তাঁরা সফল নন। আমার মনে হয়, তাঁরা অন্য কোন পেশায় বেশি সফলতা অর্জন করতে পারতেন। ভালো রেজাল্ট থাকলে যে তাকে শিক্ষকই হতে হবে, এমন ধারণা পালটানো উচিৎ। বরং এমন অনেকেই আছেন, যাঁদের রেজাল্ট তুলনামূলকভাবে কিছুটা খারাপ, কিন্তু ভালো শিক্ষক হবার সব যোগ্যতা ও গুণ তাঁদের রয়েছে। [এম.এডের একটি এসাইনমেন্ট লিখতে যেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কথা মনে হয়েছিল।অন্য অনেকের সাথে আমার ভাবনাটি হয়ত মিলে যেতে পারে।]


আবার, কিছু শিক্ষক মনে করেন যে, তাঁদের বেতন খুবই নগন্য। কিন্তু তাঁরা তো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ভাংগিয়ে পার্ট টাইম শিক্ষকতা করছেন, নীল দল, সাদা দল করছেন এবং আরো অনেক সুবিধা ভোগ করছেন। অন্য যে কোন সৎ সরকারী চাকুরিজীবীর চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কোনভাবেই খারাপ অবস্থানে নেই। কেউ কেউ একাধিক গাড়ি ও মোবাইল [তখনও মোবাইল মধ্যবিত্তের হাতের নাগালে এসে সেভাবে পৌঁছোয় নি] নিয়ে চলাফেরা করছেন। তবু ক্লাসে ছাত্রদের সময় দিতে পারছেন না। [বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক শিক্ষক বিদেশে পাড়ি জমান। তারপরে তাঁদের কেউ ফেরেন, কেউ ফেরেন না।]

এত কিছুর পরেও আমি বলব, শিক্ষকরা আসলে তাঁদের ছাত্রদের ভালবাসেন। এমন অনেক শিক্ষক আছেন—যাঁর কাছে সব ছাত্র সমান, কে যে তাঁর প্রিয় ছাত্র সেটা স্বয়ং প্রিয় ছাত্রটিও জানে না। অথচ, সেই শিক্ষক সবার মনে প্রিয় হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছেন। এমন শিক্ষকও আছেন, যাঁরা দরিদ্র ছাত্রটিকে বই কেনার, ফরম ফিলাপের টাকা দিয়েছেন, নিজের সাময়িক আর্থিক ক্ষতি হলেও। আন্দোলনরত ছাত্রকে পুলিশের লাঠির আঘাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে আহত হয়েছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমাদের দায়িত্ব অনেক। চারপাশের এত অস্থির পরিবেশে আপনারা মনোবল হারাবেন না। নিজেকে দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলুন। দয়া করে আপনারা শিক্ষকদের অশ্রদ্ধা করবেন না। তাঁরা আমাদের পিতামাতার মত শ্রদ্ধেয়। বরং নৈতিকতাবিহীন শিক্ষকদের সাথে নম্র ব্যবহার করুন, তাঁদের বেশি করে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। এটা এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। [এখন মনে হয় এমন প্রতিবাদ অচল]

তবে ছাত্ররা যে শুধু প্রতিবাদ স্বরূপ শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করে তা নয়। সত্যিকারের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাও তারা প্রকাশ করতে জানে। একজন হুমায়ূন আজাদ স্যার অথবা একজন সিতারা পারভীন ম্যাডাম [অথবা কবীর চৌধুরী] যখন চলে যান, তখন শুধু ছাত্ররাই না, সারা দেশের মানুষ তাঁদের শ্রদ্ধা ও হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা জানায়।


জুলাই, ২০০৫
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৪০




সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×