আমার বাবার পোস্টিং ছিল নারায়নগঞ্জে। তাই আমার জন্ম আর জন্মের পরে প্রায় ৪টা বছর সেখানেই থাকা হয় আমাদের। ছোটবেলায় সব শিশুই মনে হয় পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সেলিব্রেটির মত একটা খাতির পায়। আমিও পেতাম। এবং শিশুটি নিজের পরিবারের পাশাপাশি অন্য পরিবারেরও একজন সদস্য হয়ে যায়। আমিও ছিলাম এই রকম দুটি পরিবারের সদস্য (এখানে প্রথম পরিবারের কিছু কথা বলব)। জীবনের প্রথম ৩-৪ বছরের স্মৃতিতে গর্ভধারিণী মায়ের কথা কমই মনে পড়ে। তার চেয়ে সেখানে অনেক বেশি উজ্জ্বল কণিকা আপু, মা (কণিকা আপার মাকে আমিও মা ডাকতাম), ভাইয়া (কণিকা আপুর বাবা), কাজল মামা (কণিকা আপুর ভাই, ভারতে থাকতেন)। কণিকা আপুর মাকে মা ডাকলেও কোন হিসেবে যে উনার বাবাকে ভাইয়া আর ভাইদের মামা ডাকতাম, আমি বলতে পারবো না।
‘’ঝড় এলো, এলো ঝড়’’ গানটা আমি কণিকা আপুর কাছেই শিখেছিলাম। মাকে দেখতাম দুপুরে বেঁচে যাওয়া ভাত ছাদে ছিটিয়ে দিতে, কাকের জন্য। আপুদের ছাদের বাগানে অনেক ফুল ফুটত। আমি নিজে সেগুলো ছিঁড়তাম না। আপুরা ছিলেন হিন্দু। আমি দেখতাম, পূজায় ফুল লাগে। কেউ ফুল ছিঁড়তে গেলেই আমি মানা করে দিতাম, ‘’পূজা করতে এই ফুল লাগবে’’ বলে। কণিকা আপুরা খুব নিশ্চিন্তে থাকতেন আমাকে নিয়ে, আমি থাকলে অন্য বাবুরাও কেউ সে ফুল ছিঁড়তে পারবে না তাই। আপুরা আমাকে অনেক অনেক অনেক অনেক আদর করতেন। দিনের বেশির ভাগটা সময় ওঁদের বাসাতে ভালই কাটত। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম সবই ওখানে। তাই বলে নিজের বাসাতেও যে আসতাম না তা নয়।
একদিন দুপুরে আমি নিজের বাসায়। আমাকে আমার আম্মা কিছুতেই ঘুম পাড়াতে পারছে না। এমন সময় আকাশ দিয়ে একটা বিমান চলে গেল। বিমান দেখে আমি আম্মাকে বলেছিলাম, ‘’আম্মা, এই প্লেন দিয়ে কাজল মামা ইন্ডিয়া থেকে বাসায় আসবে।‘’ তারপরে কিছুক্ষণ পরে ঘুমিয়ে গেলাম। বিকেলে আমার আম্মা দেখেন, আপুদের ছাদে কে যেন হাঁটছে। তাকিয়ে দেখেন আমার ‘’কাজল মামা’’ মানে আপুর ভাই। আম্মা ভীষণ অবাক হয়ে উনাকে দুপুরে আমার বলা কথাগুলো বললেন। শুনে তারাও অবাক হয়ে গেল। মামা নাকি সেদিনই হঠাৎ করে দেশে ফিরেছেন, কাউকে কিছু না বলে। আর তারপর থেকেই নাকি আপুদের পরিবার আমাকে দেবীর মত দেখত। পূজাও নাকি করত, আমার আম্মা বলেন। আমার এত কিছু মনে নেই। শুধু আবছা আবছা মনে আছে, একদিন কী যেন নিয়ে আয়োজন চলছিল। এরই মধ্যে মা আমাকে জোর করে ধরে শামুকের চামচে করে দুধ খাইয়ে দিয়েছিলেন। আর সবাই তখন এত উলুধবনি দিচ্ছিল, আমার অস্থির অস্থির লাগছিল।
এই যে হঠাৎ করে কাজল মামা বাড়িতে ফিরে এলেন, আর আমি আগেই ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে দিলাম, এটা ঠিক কীভাবে হল? শুনেছি, এইরকম ঘটনাকেই নাকি টেলিপ্যাথি বলে। টেলিপ্যাথিই যদি হয়ে থাকে, তবে তেমন ঘটনা আমার জীবনে অনেক অনেক বার ঘটেছে। যেমন যতবারই আমার অজানা অচেনা প্রণয়াকাংখীদের কাছ থেকে ডাকযোগে আসা চিঠি দেবার জন্য কেউ বাসার দোরঘণ্টিটা বাজিয়েছে, আমি কীভাবে যেন ঠিক ততবারই টের পেয়ে গেছি, আমার চিঠি এসেছে! দোরঘণ্টি তো কতই বাজে! কই তখন তো আগে থেকে এমন টের পাই নি! এমন কি যেদিন প্রথমবার চিঠি এল তখনো কীভাবে আমার মত হাবলা মেয়ে বুঝে ফেলেছিল, তারই চিঠি এসেছে? আহা, টেলিপ্যাথির জোরটা যদি আরেকটু বেশি হত, তাহলে এসব চিঠি কে বা কারা পাঠিয়েছিল সেটাও ঠিক ধরে ফেলতে পারতাম।
আরো বলা যায়, যেমন হঠাৎ করে কারো কথা মনে হলো, আর ওমনি বা কিছুক্ষণের মধ্যে অনেক দিন পরে সে ফোন করল অথবা কোন না কোনভাবে দেখা হয়ে গেল! এমনটা হয়ত অনেকের জীবনেই ঘটে। কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি, আমার মত এত্ত বেশিবার ঘটেনি। তবে আজকাল বিশ্বাসী লোকের খুব অভাব। কারণ চাপাবাজ লোকের অভাব নেই । আমার কথা বিনা প্রমাণে কারই বা ঠেকা পড়েছে বিশ্বাস করার? কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটে যে টেলিপ্যাথিতে আমার বিশ্বাস না জন্মে যায় না। এগুলোর বর্ণনা দিয়ে আপনাদের আর বিরক্ত করতে চাই না।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, পশুপাখিরাও তো অনেক কিছু আগে থেকে টের পেয়ে যায়। তেমনি মানুষের মধ্যেও তেমন ক্ষমতা নিশ্চয়ই আছে, কম হোক বা বেশি। কিন্তু আমরা আমাদের ক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই। এই ক্ষমতা কিভাবে কাজে লাগানো যায়, চর্চা করতে হয়, সেই জ্ঞান আমাদের নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


