আজকের পত্রিকাতে একটা ছবি দেখলাম : একটা মেয়ে ভিকারুননিসা স্কুল থেকে তার বড় বোনের কাছে ফোন করছে যে উনার মেয়ে চান্স পেয়েছে l
আমার জীবনের সবচেয়ে সাফল্যমন্ডিত সময় কেটেছে স্কুল এ l এই সাফল্য ভালো ফলাফলের সাফল্য নয় - আমার কাছে এটা হচ্ছে বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালবাসা , শিক্ষকদের অন্তহীন স্নেহ আর কঠোর শাসন , নিষিদ্ধ কাজে দপ্তরিদের প্রশ্রয় , স্কুল এর সব প্রোগ্রাম এ সীমাহীন উত্সাহে অংশগ্রহন আর সর্বপরি, প্রচন্ড নিয়ম্ত্রান্তিকতার মাঝে নিয়ম ভঙ্গের অনাবিল আনন্দ l
স্কুল শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই ছোট বেলার কথা , ক্লাস থ্রী তে ভর্তি পরীক্ষা হত l আব্বা অনেক কিছু গিফট দেবার লোভ দেখিয়ে পড়াতে বসাতো আর অবশেষে যখন চান্স পেলাম , তখন চান্স পাবার আনন্দের চেয়ে বেশি আনন্দ হচ্ছিল যে অনেক গিফট পাব ...কত নন-কারিয়ারিস্ট ছিলাম তখন তাইনা ?
হা, আমার স্কুল এর নাম "বগুড়া জিলা স্কুল" - জানিনা কেন, এই নামটা বলতে সবসময় এ গর্বে আমার বুকটা ভরে উঠে , সবারই কি এমন হয় ?
ক্লাস থ্রী, ক্লাস্সের সবচেয়ে পিচ্চি ছেলেটা হলাম আমি , শুধু ক্লাস থ্রী নয় , ক্লাস থ্রী থেকে টেন পর্যন্ত সবসময় আমি ই ছিলাম সবচেয়ে পিচ্চি, আসেম্বলি তে উচ্চতা অনুযায়ে সামনের জায়গাটা আমার নির্ধারিত ছিল l আবার রোল অনুযায়ী কাপ্টেন এর দায়িত্ব টাও আমার কাধেই ছিল l প্রচন্ড দুষ্টুমিগুলো অবস্য কাপ্টেন এর দায়িত্বের বাইরে ছিল ...
মনে আছে, আমাদের ক্লাস এ একটা ছেলে ছিল তাকে আমরা মানিক ভাই বলে ডাকতাম , সে নাকি ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস থ্রী তে এসে ভর্তি হইছে এবং দেখা গেল সে সত্তি সব পড়া আগে থেকে পারত ..কিন্তু এই পারাই যেন কাল হলো, পরের ক্লাস গুলোতে সে আর কোনো পড়া পারতনা l
তখন আমি ক্লাস থ্রী তে, আমার স্কুলে যাবার সাথী ছিল এক বড় ভাই , উনি ছিলেন ক্লাস ফাইভ এ l একদিন স্কুল এর শেষে পাশের মাঠে ফুটবল খেলতে গেলাম উনাদের সাথে , এই খবর এসিস্টেন্ট হেড্স্যার পেয়ে আমাদের সবাইকে ধরে আনলেন , এরপর কান ধরে স্কুল ভবনের সামনে নীলডাউন করে রাখলেন l কিছক্ষণ পরে দপ্তরী এসে বলল তোমাদের তো খবর আছে ...আমি তো তখন ভয়ে কম্পমান l এত কষ্ট করে স্কুলে চান্স পেলাম , এই বুঝি স্কুল থেকে বের করে দেয় ?
অবশেষে কিছু উত্তম মধ্যম এর পরে , সহিদয় স্যার আমাদের কে ছেড়ে দিলেন l
স্কুল এবং আব্বা , দুটোই যথেষ্ট কড়া শাসনে রাখলেও দুষ্টমি আর চঞ্চলতা থেকে কখনো আমাকে আলাদা করতে পারেনি যেটার প্রমান সরূপ ক্লাস ফাইভে একদিন বৃষ্টির মধ্যে স্কুল ফাকি দিয়ে ফুটবল খেলতে গিয়ে আমার বাম হাত ভেঙ্গে ফেলি l মনে আছে , আমাকে নিয়ে আব্বার সে কি দুশ্চিন্তা ...আমার হাতটা প্লাস্টার করে দিল দশ দিনের জন্য আর ঠিক এগারো তম দিন থেকে পরীক্ষা শুরু l
তখন তো আর মোবাইল ছিলনা , একমাত্র ভরসা আমার বন্ধু পায়েল l যে কিনা এমন বিপদের দিনে আমার বাসায় গিয়ে স্কুল এর পড়ার আপডেট দিয়ে আসত l
পরীক্ষার দিনে সকালে আব্বা আমার হাতের প্লাস্টার কেটে দিলেন , আমি পরীক্ষা দিতে গেলাম ....ক্লাস ফাইভ এ আমার রোল ছিল ৩ আর সিক্স এ উঠে হলো ১ l
একদিন হুমায়ুন আহমেদ আমাদের স্কুল এ বেড়াতে এলেন , একদিন দুইদিনের জন্য নয় - টানা সাতদিনের জন্য , তখন আমি ক্লাস সেভেন এ পড়ি l হা, আমি জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ স্যার এর কথাই বলছি l উনি আমাদের স্কুলের ছাত্র ছিলেন এবং স্কুল চত্তরে উনার সম্মানে সাতদিনবাপি একটা বইমেলার আয়োজন করা হলো , উনি উনার লেখা সব বই স্কুল লায়ব্রিতে দিয়ে এসেছিলেন l
উনার অটোগ্রাফ ওয়ালা "ভুত ভুতং ভুতো" বইটা এখনো আমাকে জীবনের প্রথম অটোগ্রাফ পাওয়ার আনন্দ মনে করিয়ে দেয় l
না, একদিনে সব শেষ হবেনা ...অসংখ স্মৃতি এসে জমা হচ্ছে মনের দরজায় , কোনটাকে রেখে কোনটাকে জায়গা দিব বুঝতে পারছিনা l
অন্য একদিন বসব আবার ...আরো কিছু পুরানো স্মৃতি সঙ্গী করে
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ৯:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



