ঢাকা শহর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে উত্তপ্ত থাকে ....কখনো রাজনীতি, কখনো খেলা, কখনো সড়ক দুর্ঘটনা আবার কখনো বা শাহরুখ খানের কনসার্ট ।
তবে এখনকার হট টপিক "স্কুল ভর্তি দুর্নীতি" , তাই আবার স্কুলবেলা -২ লিখতে বসলাম তবে সেটা দুর্নীতি নিয়ে নয় ....
মনে হচ্ছে ভুল বললাম, আমার লেখাতেও কিছুটা দুর্নীতির কাহিনী আছে , তবে হয়ত অন্যরকম দুর্নীতি l
"স্কুল পালানো" ব্যাপারটা সবসময় স্কুল এর ছাত্রদের কাছে একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা , সেই রবীদ্রনাথ এর আমল থেকে , এই ব্যাপারে শুধু এখনকার আমলের ছাত্রদের দোষ দিলে চলবেনা l
ক্লাস সেভেন l আন্দোলনের কারনটা ঠিক মনে করতে পারছিনা , একদিন বিভিন্ন স্কুল এর ছাত্ররা ক্লাস বাদ দিয়ে মিছিল এ অংশ নিলাম প্রধানত ক্লাস সিক্স থেকে টেন l
আমাদের স্কুলটা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হবার কারণে বিভিন্ন আন্দোলনের দায়িত্ব আমাদের কাধেই থাকত ...সব জেলাতেই বোধ হয় জেলা স্কুলের দাপট একটু বেশিই থাকে l
যাই হোক স্যারদের নিষেধ অমান্য করে দুর্বিনীত উত্সাহে আন্দোলন করে সুবোধ বালকের মত বাসায় চলে গেলাম কিন্তু বিপত্তি টা ঘটল তারপর দিন স্কুলে আসার পরে , বিপত্তি বলে মহা বিপত্তি l
হেডস্যার সব ক্লাস এ বলে দিলেন যে অভিভাবক ছাড়া আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কোনো ছাত্রকে ক্লাস করতে দেয়া হবেনা l সবাই পড়ল মহা বিপদে কারণ বাসায় জানলে তো খবর আছে l
এইদিকে অভিভাবক ছাড়া ক্লাস এ ঢুকতে দিবেনা ....কি করা যায় ....মাথায় চলে এলো অভিনব বুদ্ধি :-)
আগেই বলেছি যে আমাদের স্কুল ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্রে "সাতমাথায়", স্কুল এর সামনে একটা টেম্পু স্ট্যান্ড ছিল , অনেক দোকানদারদের সাথেও আমাদের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল l আমাদের কিছু বন্ধু গিয়ে কযেকজন টেম্পুচালক আর দোকানদারকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিয়ে এলো যে তারা আমাদের অভিভাবক পরিচয় দিয়ে এবারের মত ক্ষমা চাইবেন l
শুনলে অবাক হবেন যে পদ্ধতি টা বেশ ভালোই কাজে দিয়েছিল ...শুধু দুইজন ছাড়া , একজন টেম্পুচালক স্যার এর সামনে আমার এক বন্ধুর গালে জোরসে একটা চড় দিয়ে বলল "খবরদার কখনো স্কুল ফাকি দিবিনা" আর আমার বন্ধুটি তো রাগে তখন ফুসছে যে ব্যাটা ফাকতালে একটা চড় বসিয়ে দিল l
আরেকজন তো আরো এককাঠি সরেশ ....স্যার এর কাছে থেকে বেত টা নিয়ে দুটো পিটন দিয়ে বলল "স্যার, আমার ভাগনেটা খুবই দুষ্ট , শাসনে রাখবেন" l
আমরা যারা ঘটনাগুলা জানতাম ...তারা ওই মুহুর্তে এত আনন্দ পেয়েছিলাম যে অবর্ণনীয় , যাই হোক অন্তত বাসায় জানা থেকে রক্ষা থেকে পেয়েছিলাম l
ঠিক বুঝতে পারছিনা যে এইসব দুর্নীতির কথা এমন খোলা জায়গায় বলা উচিত হবে কিনা ... আচ্ছা বলেই ফেলি, বিষয়টা হলো "টিফিন নিয়ে দুর্নীতি" ।
এটা একটা বিশাল সিন্ডিকেট , সিন্ডিকেট এর মেম্বার হচ্ছে প্রতিটি ক্লাস এর ক্যাপ্টেনরা , ক্ষমতার সুবাদে দুর্নীতি আর কি l
প্রতিদিন দিনের শুরুতে কতগুলা টিফিন বানানো হবে তার জন্য প্রতিটি ক্লাস থেকে ছাত্র সংখ্যা নেয়া হত ক্যাপ্টেন এর কাছে থেকে , আর এটাই ছিল বিশাল সুযোগ l
ক্যাপ্টেনরা সবসময় ছাত্র সংখ্যা ১-২ টা বেশি লিখে দিত আর টিফিন নিয়ে আসার সময় আগেই সেই এক্সট্রা টিফিন টা গাপ করে দিত l এছাড়া মাঝে মাঝে, টিফিন গুনতে ভুল হয়েছে বলে নিজেরটা আগেই খেয়ে নিয়ে, টিফিন কম ফেলানো হত , তখন স্যার লিখে দিতেন যে টিফিন একটা কম ...উফ কি যে আনন্দ সেই এক্সট্রা টিফিন টা খাওয়া ...বলে বোঝানো যাবেনা l
আর একটা খুব সহজ পদ্ধতি ছিল , টিফিন এর স্যার (নাম উল্লেখ করছিনা) কে গিয়ে বলতাম যে "স্যার, আজকের টিফিন টা খুব ভালো হয়েছে" ...ব্যাস, স্যার বলতেন যা আরেকটা খেয়ে নে l
বোধ হয় সব স্কুলেই এই চক্রটা থাকে, সেটা হচ্ছে "গল্পের বই চক্র" l ক্লাস ফাইভ থেকে যে নেশাটা পেয়ে বসেছিল তার নাম হলো "তিন গোয়েন্দা" - কিশোর পাশা, মুসা আর রবিন এর রহস্যঘেরা গল্পগুলো l
জর্জিস , তোমার নামটাও এসে গেল ...খুব হিংসা হত তোমার গল্পের বই এর বিশাল সংগ্রহ টা দেখে l "তিন গোয়েন্দা" আর "মাসুদ রানা" সিরিজের সেই শুরু থেকে ওই অব্দি সবগুলো ওর কলেক্শন এ ছিল l
খুব যাওয়া হতো বর্তমান ক্রিকেট টিম এর ক্যাপ্টেন মুশফিকুর রহিম এর বাসায় , ওর বড় ভাই "মিজু ভাই" এর কাছে থেকে অনেক বই নিয়ে আসতাম , বিশাল একটা সংগ্রহ ছিল উনার ও l
হ্যা, বিজ্ঞান বইটাই ছিল একদম পারফেক্ট কারণ সাইজ এ বড় বিজ্ঞান বই এর ভিতরে তিন গোয়েন্দার বইগুলো খুব অনায়াসে রেখে পড়া যেত l
উফ কি কঠিন সময় ই না পার করছি ...গোপনে এইসব বই পড়তে নিয়ে l
একটা ঘটনা ...
একদিন বিজ্ঞান বই এর ভিতরে মাসুদ রানা রেখে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পরেছি , রাত তখন দুটো এর মত বাজে l আমার ঘরটা ছিল বাথরুম এর পাশে l আব্বা হঠাত বাথরুম এ যেতে নিয়ে দেখলেন যে আমি টেবিলে বই এর উপরে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছি ....আমি অনুমান করতে পারি যে আব্বা নিশ্চয় খুব খুশি হয়েছিল যে আমি এত রাত জেগে পড়াশোনা করছি আর বেশ খানিকটা আবেগ আপ্লুত হয়ে উনি আমার কাছে এলেন আমাকে ঘুম থেকে তুলে বিছানাতে শুইয়ে দিবেন l বিধি বাম, কাছে এসে দেখলেন বিজ্ঞান বই এর মাঝে মাসুদ রানা ...জাস্ট কানটা ধরে টেনে তুলে বললেন "যাও বিছানাতে গিয়ে ঘুমাও" l
এস.এস.সি পরীক্ষার পরে আমি বিশাল একটা ডুব দিয়েছিলাম গল্পের বইয়ের জগতে , একদিন আম্মা সারা পাড়া খুঁজে আমাকে কোথাও পেলেন না , আম্মার অবস্থা খারাপ ...এমন সময় আমি আবিস্কৃত হলাম ঘরের এক কোনে গল্পের বই এ নিমগ্ন অবস্থায় l
স্কুলে যাওয়ার জন্য রিক্সা ভাড়া যেটা পেতাম সেখান থেকে টাকা জমিয়ে গল্পের বই কিনতাম , প্রতিটা পৃষ্ঠার সাথে একটা অন্তরের টান লুকিয়ে ছিল l আমার বড় বোন তখন ঢাকা ডেন্টাল এ পড়ত - আপু বাসায় যাওয়ার সময় একবার আমার জন্য নীলক্ষেত খেতে অনেকগুলো পুরাতন তিন গোয়েন্দার বই নিয়ে গিয়েছিল - কি যে আনন্দ হয়েছিল বলার মত না l
ইচ্ছা করলেই অনেক বই কিনতে পারি, কিন্তু এখন কেন যেন আর গল্পের বই পড়তে ইচ্ছা করেনা ....নিজের জীবনটাই হয়ত একটা গল্প হয়ে গেছে তাই l
আমার পড়া প্রথম তিন গোয়েন্দা বই "কাকতাড়ুয়া" , শেষটার নাম মনে নেই ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



