
দেশের অন্যতম প্রধান নদী যমুনা এখন পানির কাঙাল। পানি নেই, তাই শুকিয়ে জেগে উঠেছে বালুচর হয়ে। মাইলের পর মাইল শুধুই এই চর। পানির অভাবে নদী পরিণত হয়েছে জলজ্যান্ত মরুভূমিতে। আর রুক্ষ প্রকৃতি এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এনে দিয়েছে অনাকাক্সিক্ষত মরুময়তা।
খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে, যমুনা এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ অনবরত রুক্ষ থেকে রুক্ষ হয়ে উঠছে। শুকনো মৌসুম পুরোপুরি শুরু হতে না হতেই সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য চরের। বিস্তার ঘটেছে মাইলের পর মাইল। পানি বলতে কিছুই নেই। কিছু কিছু জায়গায় অবশ্য ডোবার মতো হয়ে আছে। বর্ষা মৌসুম না আসা পর্যন্ত এগুলোর পরিবর্তন হবে না। দেখা গেল, যেখানে প্রমত্ত নদীর পানিতে উথাল-পাতাল অবস্থা থাকার কথা, সেখানে কিছু মানুষ বসতি গড়ে তোলা শুরু করেছেন। বানাচ্ছেন ঘরবাড়ি। কেউ কেউ ধানের আবাদও করছেন। সব মিলিয়ে উত্তরাঞ্চলের সিরাজগঞ্জসহ ৪টি জেলার চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। প্রাকৃতিক বিরূপ প্রভাবে এলাকার পরিবেশও রুক্ষ হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, নিয়মিত ড্রেজিং না করার কারণে এ অবস্থা হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামীতে যমুনা নদী দিয়ে খুব সহজেই পারাপার হওয়া যাবে। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে দেশের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও মূল নদীর অস্তিত্বই আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ এ নদীকে সেতুর স্বার্থে গাইড বাঁধ দিয়ে আটকানোর ফলে স্বচ্ছন্দ গতি হারিয়েছে যমুনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ১২১টি পাইলের ওপর ৫০টি পিলার থাকায় এগুলো নদীর স্রোতকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে যমুনা হারিয়েছে তার যৌবন। সেসঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এর বহু শাখা নদী। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এ কারণে দেশের এক বৃহদাংশে পরিবেশ বিপর্যয়ের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৯৮ সাল থেকেই যমুনা নদীতে ব্যাপক চর পড়া শুরু হয়। সময়ের ধারাবাহিকতায় আজ সেই চরের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু ব্রিজের উভয় দিকে ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বালুচর। এ বালুচরে অস্থায়ীভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করছে মানুষ। বন্যা এলেই তারা আশ্রয় নেয় নদীর পাড়ে অথবা কোনো উঁচু জায়গায়। আর পানি সরে যাওয়ার পর নতুন করে চরের সৃষ্টি হলে আবারো বাঁধে ঘর। সিরাজগঞ্জ জেলার সায়েদাবাদ এলাকা থেকে এ ঘরবাঁধা বা বসত গড়ে তোলার শুরু। এছাড়া নদীর মধ্যেও বসতি গড়া হয়েছে ম্যাচড়াপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, নাটুয়ারপাড়ায়। অনেকে মনে করছেন, বছর বছর যেভাবে পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে তাতে পায়ে হেঁটে অথবা সাইকেলে চড়ে নদী পার হয়ে সিরাজগঞ্জ শহরে আসা-যাওয়া আর বেশি দূরে নয়। নদী শুকিয়ে এই যাতায়াত পথ করে দিতে পারে। জানা যায়, নদী এলাকার শ্রমজীবী মানুষকে প্রতিদিন শহরে আসতে হয়। বিশেষ করে জ্বালানি কাজে ব্যবহারের জন্য গোবরের তৈরি ঘুঁটে বিক্রির জন্য আসতে হয়। তারা এখন শুকনো নদী দিয়ে চলে এসে কিছু জায়গা পারি দেয়ার জন্য কেবল নৌকা ব্যবহার করে। তবে এদের কেউ কেউ জানান, নদীতে পানি না থাকায় তাদের মতো শ্রমজীবীরা পড়েছেন নানা বেকাদায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিমত, এক সময় যমুনা নদীর নীল পানি আর প্রবল ঢেউ দেখে ভয় লাগতো। আজ থেকে ২০/২৫ বছর আগেও গভীর পানি থাকতো নদীতে। কখনো কখনো বালির চর দেখা যেত বটে, তবে তার মধ্য দিয়েই থাকতো নদীর পানির স্রোতধারা। কিন্তু এখন বর্ষা মৌসুম না এলে এমনটি আর দেখা যায় না। অনেকের মন্তব্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একদিন যমুনা নদী হবে রূপকথার গল্পের মতো। ধারণা পাওয়া যায়, বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙনের তা-ব থাকলেও বালির চরের প্রত্যাশা কখনই করে না বসতির মানুষ। কারণ নদীতে পানি না থাকলে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপে ঠিকমতো পানি না ওঠায় এলাকায় দেখা দেয় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। তখন তাদের অনেক দূর পাড়ি দিয়ে খাবার পানি আনতে হয়। শুধু তাই নয়, ভয়াবহ সেচ সংকটের সম্মুখীন হতে হয় তাদের। যমুনার বুকে বালির চর জেগে ওঠায় সিরাজগঞ্জবাসীকেও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তাছাড়া ফিবছর সরকারকেও এদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য গ্রহণ করতে হয় বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প। আর তাতেও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ, ভারতের আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী থানার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। এরপর তা যমুনা নাম ধারণ করে আরিচার কাছে পদ্মা নদীতে মিলেছে। বাংলাদেশে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২শ কিলোমিটার। এছাড়া এ নদীর শাখা ও উপনদীর দৈর্ঘ্য দেড় হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া, আত্রাই, বারনই, শিব, ছোটযমুনা, তিস্তা, ধরলা, তুলসিগঙ্গা, বাঙ্গালীনগর, যমুনেশ্বরী প্রভৃতি। কিন্তু গেল এক দশক থেকে যমুনা নদীর স্রোতধারা হ্রাস ও চরের সৃষ্টি হওয়ায় সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম জেলার কুড়িগ্রাম, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিপুর, গাইবান্ধা জেলার গাইবান্ধা, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, দেওয়ানগঞ্জ, সাঘাটা, ইসলামপুর, বগুড়ার সোনাতলা, মাদারগঞ্জ, সারিয়াকান্দি, ধুনট, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ, কামারখন্দ, ভুয়াপুর, কালীহাতি, বেলকুচি, শাহজাদপুর, নাগপুর, দৌলতপুরসহ নওগাঁ, রংপুর, জয়পুরহাট জেলার ২৭টি উপজেলা। এসব এলাকার মানুষ পরিবশগতভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, নদীকেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থাও এ অঞ্চলে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আরিচা-নটাখোলা, বাহাদুরাবাদ-ফুলছড়িঘাট, সিরাজগঞ্জ-জগন্নাথগঞ্জ রুটসহ বিভিন্ন নদীর যাতায়াতেও সংকট দেখা দিয়েছে। চর পড়ে বন্ধ হওয়ার কারণে ঘনঘন ঘাট স্থানান্তর আরো মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। কিভাবে যমুনাকে প্রবহমান করা যায় এবং পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় রোধ করা যায় সেদিকে জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি দেয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরাও অভিমত পোষণ করছেন। তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন সংশ্লিষ্টদের প্রতি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু বলেন, যমুনা নদী শুকিয়ে মরুভূমি হওয়ার অন্যতম কারণ, উজানে বিভিন্ন ক্যানেল তৈরি করে পানি প্রত্যাহার করা। তাই যমুনা নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চাইলে প্রথমেই পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু ব্রিজ যখন তৈরি করা হয় এবং যে প্রতিষ্ঠানকে এর দেখাশোনার ভার দেয়া হয়েছে তাদেরও বলা আছে পানির স্রোতধারা ঠিক রাখার জন্য ড্রেজিং করতে হবে। কিন্তু সেটি করা হচ্ছে না। ফলে আজ যমুনা নদীতে মরুময়তার সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এটি তৈরি করার সময় বলেছিল, কোনো এক সময় ব্রিজটির আর প্রয়োজন হবে না। তার প্রমাণ যেন এখন আমরা পেতে শুরু করেছি। তাছাড়া প্রতি বছর নদীর গতি পথ পরিবর্তন হওয়ার কারণেও যমুনা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
ফরিদপুর নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট হাইড্রোলিক অধিদফতরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সাময়িকভাবে যমুনা নদী শাসন করতে হলে ড্রেজিং করতে হবে। আর নদীটি আগের অবস্থায় আনার জন্য এর মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তাছাড়া যমুনা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলোর সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করতে হবে, এগুলো কী অবস্থায় আছে। এরপর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, মূলত নদীর পানি প্রবাহ ধীর হওয়ার কারণে বিশাল চরের সৃষ্টি হয়েছে। সিরাজগঞ্জের হার্ড পয়েন্ট থেকে পানি বাড়ি খেয়ে মাঝে মধ্যে ধীর হয়ে যায়। তাছাড়া ব্রিজের দুই পাশে রিভার ট্রেকিং ওয়ার্ক আছে, সেখানেও পানির গতি প্রবাহ ধাক্কা খেয়ে সাইড দিয়ে চিকন ক্যানেলের মতো পানি চলে যায়। ফলে চরের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত ব্রিজ নির্মিত হলে পানির গতি প্রবাহ কমে যায়। যার জন্য টাইম টু টাইম ড্রেজিং করা প্রয়োজন। এতে করে নদীর বুক উঁচু হওয়ার সুযোগ পায় না। কিন্তু সেটি না হওয়ায় আজ যমুনা নদীতে পানি নেই, সৃষ্টি হয়েছে বিশাল চর।
খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, যমুনা নদীর বুকে মরুময়তার কারণে সিরাজগঞ্জের চরবিয়ারি, চরসাতনি, চর কাতেঙ্গা, কাওয়াখোলা, রূপসা, মেসরা এলাকার সাধারণ মানুষ নিদারুণ কষ্টে রয়েছেন। তাদের কোথাও কোথাও কিছুটা নৌকায় আবার কখনো পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ার গাড়িতে করে শহরে আসতে হয় মালামাল বিক্রি করতে। বিশেষ করে গোবর থেকে তৈরি নোনদা বা ঘুঁটা ব্যবসায়ীদের বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। কারণ নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে তারা কর্মহীন হয়ে পড়েন। জানা যায়, এক সময় চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল এই যমুনা নদী। কিন্তু গত এক দশক থেকে সেই আয়ের পথ হারিয়ে গেছে প্রায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

