ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে ১৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিতর্কিত টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগুচ্ছে সেদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন এনএইচপিসি লিমিটেড।
এনএইচপিসি'র চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে গার্গ জানান, টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়নে স�প্রতি সরকারি প্রতিষ্ঠানটি মণিপুরের রাজ্য সরকার এবং সাতলুজ জলবিদ্যুৎ নিগম (এসজেভিএন) লিমিটেড এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটি কম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে।
তিনি জানান, এই যৌথ উদ্যোগে এনএইচপিসি'র (যা আগে ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন লিমিটেড নামে পরিচিত ছিল) ৬৯ শতাংশ শেয়ার থাকবে। আর এই কম্পানিতে মণিপুর রাজ্য সরকার এবং এসজেভিএন লিমিটেডের যথাক্রমে ৫ শতাংশ ও ২৬ শতাংশ মালিকানা থাকবে।
যৌথ উদ্যোগে এই কম্পানি প্রতিষ্ঠায় এনএইচপিসি লিমিটেড, এসজেভিএন লিমিটেড এবং মণিপুর রাজ্য সরকার গত ২৮ এপ্রিল একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বলেও জানান এস কে গার্গ।
এ বছরের জানুয়ারিতে প্রধানমনন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়া দিল্লি সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন -'টিপাইমুখ প্রকল্পের ব্যাপারে ভারত এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না যাতে বাংলাদেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।'
ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ ভারত করবে না বলে মনমোহন সিং তাকে সুস্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন।
এনএইচপিসি'র চেয়ারম্যান জানান, নয়া দিল্লি ঢাকাকে বলেছে যে এই প্রকল্প বাংলাদেশে বন্যা প্রশমনে সাহায্য করবে।
নয়া দিল্লিতে এনএইচপিসি লিমিটেডের বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন "আমরা (ঢাকাকে) জানিয়েছি যে তারা (বাংলাদেশ) এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপকৃত হবে। কারণ, এই প্রকল্প ভাটি এলাকায় বন্যা কমিয়ে আনবে।"
ভারতীয় কর্মকর্তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, টিপাইমুখ প্রকল্পের ব্যাপারে এনএইচপিসি লিমিটেডের এই পদক্ষেপ শেখ হাসিনাকে দেওয়া মনমোহন সিংয়ের আশ্বাসের পরিপন্থী নয়।
বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় একজন কর্মকর্তা বলেন, "আমরা মনে করি এই প্রকল্প বাংলাদেশের ক্ষতি করবে না। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্র"তি দিয়েছেন যে, ভারত এমন কিছু করবে না যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হবে। এবং আমরা এখনো সেই অবস্থানেই আছি।"
স�প্রতি ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মাও টিপাইমুখ প্রকল্পকে সেদেশের অনুন্নত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার অবকাঠামো খাতে একটি বড়ো প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন। এ অঞ্চলের আরো দুটি রাজ্য হলো- মণিপুর ও আসাম, যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে।
জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ভাটি এলাকায় বন্যা প্রশমনের লক্ষ্যে ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যের চুরাচাঁদপুর জেলায় বরাক নদীর উপর বাঁধ নির্মাণের জন্য এই টিপাইমুখ বহুমুখী প্রকল্প গ্রহণ করে।
এই প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ৩৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে ধরা হয়। ভারত সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়ক কেবিনেট কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সাড়ে সাত বছর লাগতে পারে।
এনএইচপিসি প্রধান অবশ্য বলেন, টিপাইমুখ প্রকল্প নিয়ে যে উদ্বেগ-আশংকা রয়েছে তা তথ্যভিত্তিক নয়।
এ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, "এই প্রকল্প শুষ্ক মওসুমে পানির প্রাপ্যতাও নিশ্চিত করবে। যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে তা যথার্থ নয়। কারণ, এটি পানি ধরে রাখার প্রকল্প নয়।"
টিপাইমুখ প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমি এ খবরটির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারছিনা, বা তা নাকচও করে দিচ্ছিনা। কারণ, যদ্দুর মনে পড়ে এ সংক্রান্ত কোনো চিঠি আমি পাইনি।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, ভারত বরাবরই টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে বাংলাদেশকে এই আশ্বাসই দিয়ে আসছে। তারা সর্বশেষ মার্চে দিল্লিতে বাংলাদেশ�ভারত যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে একই আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবে এর পরে ভারত শুধু টিপাইমুখ প্রকল্পের ব্যাপারে কোনো পত্র বাংলাদেশকে পাঠায়নি।
ভারতের প্রস্তাবিত এই টিপাইমুখ প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের পরিবেশবাদীদের একটি অংশ টিপাইমুখ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে। তারা বলছে, বরাক নদীর উপর এই বাঁধ নির্মাণ হলে বাংলাদেশের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাবে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠন টিপাইমুখ প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে। তারা প্রকল্প বন্ধে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বানও জানায়।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এই বিষয়কে একটি প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করে।
টিপাইমুখ নিয়ে বিতর্কের মুখে গত বছরের জুলাইয়ে একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল ভারত সফরে যায়।
ওই প্রতিনিধি দলের প্রধান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক দেশে ফিরে জানান, তারা টিপাইমুখ প্রকল্প এলাকায় গিয়েছিলেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে নিচে নামতে না পারলেও হেলিকপ্টার থেকে নিচে বাঁধের কোনো স্থাপনা দেখতে পাননি।
বিডিনিউজ থেকে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

