রাষ্ট্র ও সরকারের মতো রাজনীতি বিষয়টিও একটি চলমান ধারা এবং এর উৎপত্তি একেবারেই সভ্যতা বিকাশের প্রথমদিকে। ঠিক কবে বা কখন এর উৎপত্তি হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস আজও সভ্যজনেরা উদ্ধার করতে না পারলেও এর চর্চা যে রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের পর তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কারণ রাষ্ট্র ও সরকারকে ঘিরেই তা আবর্তিত। সভ্যতার ক্রমবিকাশে এই রাষ্ট্র ও সরকারের মতো এরও বিবর্তন ঘটেছে।
প্রথমদিককার রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনীতি ছিল মূলত এককেন্দ্রিক। আজকাল সভ্য সমাজব্যবস্থায় আমরা যেমন সরব বিরোধী দলের উপস্থিতি লক্ষ্য করি অতীতে কিন্তু মোটেও তা ছিলনা। সরকারের অর্থাৎ শাসকের বিরোধীতা করা তখন ছিল তখন রাষ্ট্রদ্রোহীতা এবং তার শাস্তি ছিল নির্মম মৃত্যু। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণও ছিল গুটিকয়েক অভিজাত ব্যক্তি অথবা পরিবারের মাঝে সীমাবদ্ধ। সাধারণ মানুষ রাজনীতি নিয়ে তেমনটা উৎসাহ দেখাত তার তেমন কোন উল্লেখযোগ্য নজির পাওয়া যায়না। শাসনক্ষমতায় জনগণের কোন অংশগ্রহণ না থাকায় কে ক্ষমতায় আসল বা কে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হল তা নিয়ে জনগণ তেমন মাথা ঘামিয়েছে বা কোন শাসকের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন বিরাট ভূমিকা পালন করেছে সেরকম নজিরও তেমন নেই। রাজার পক্ষে যুদ্ধ করত তার পোষ্য সৈন্যদল। রাজা তাদেরকেই গুরুত্ব দিতেন এবং ভরণপোষণ করতেন। রাজনীতির প্রতি জনগণের চরম উদাসীনতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে আমাদের এই ভারতবর্ষ। রাজনীতির প্রতি সাধারণ জনগণের এই বিমুখতা অথবা শাসন ক্ষমতায় কে আছে তা নিয়ে মাথা না ঘামানোর কারণেই কয়েক হাজার তুর্কী বা আফগানী কিংবা কয়েক লক্ষ ইংরেজ কোটি কোটি ভারতীয়কে কয়েকশত বৎসরের বেশি সময় ধরে প্রায় নির্বিবাদে শাসন করতে পেরেছে। তবে সতের শতকের মাঝমাঝি বা আঠার শতকের পরে জনগণের মাঝে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। তারা যে শুধু শাসিত হবার বস্তু নয় এবং শাসনক্ষমতায় যে তাদেরও সম্পৃক্ততার সুযোগ আছে বা দরকার এই বোধটি ক্রমশ তাদের মাঝে জাগ্রত হয়। পৃথিবীর বড় বড় সংস্কার বা পুনর্জাগরণ অথবা পরিবর্তণগুলো ঠিক এই সময়েই ঘটে।
রেনেসা, পরবর্তীতে ফরাসী বিপ্লব এবং আমেরিকায় সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ এবং এর মাধ্যমে স্বাধীনতালাভের ঘটনা পৃথিবীতে আমূল পরিবর্তন আনে। শাসনক্ষমতায় যেই অধিষ্ঠিত থাকুক না কেন সেও জবাবদিহি করতে বাধ্য এ অভিপ্রায় থেকেই এসব বিপ্লবের শুরু। শুধু তাই নয়, রাজ-রাজারা বা পোপই নন সাধারণ জনগণও শাসনক্ষমতার অংশীদার হওয়ার যোগ্যতা রাখেন এবোধও এসব বিপ্লবেরই ফসল। শাসকের জবাবদিহিতা ও শাসনকার্যে জনসাধারণের অংশগ্রহণের ধারণা থেকেই ইউরোপ এবং আমেরিকার সরকারব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। রাজা এবং রাজতন্ত্রকে অপসারিত করে সেখানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উম্মেষ ঘটে। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা মানে জবাবদিহিতা। আর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক দল, চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী যেমন: সুশীল সমাজ, সংবাদপত্র।
মূলত জবাবদিহিতা আর শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণের কারণেই গণতন্ত্র এখন সর্বজনগৃহীত একটি সরকার ব্যবস্থা। তবে গণতন্ত্রের বিকল্প যে খোঁজা হয়নি তাও নয়। মার্কসের সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ধারণাকে ভিত্তি করে উনিশ শতকের প্রথমদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক সরকার গড়ে ওঠে। ক্রমে তা পূর্ব ইউরোপে, চীন, উত্তর কোরিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এ সরকার ব্যবস্থা ৬০ কি ৭০ দশকের বেশি সময় টিকতে পারেনি। এর একটাই কারণ জনগণকে অবদমিত করার প্রচেষ্টা। মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে চায়, স্বাধীনভাবে জীবনধারণ করতে চায়। সে কারণেই সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিপুল সম্ভাবনা জাগালেও টিকেনি।
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রে বিশ্বাসী অনেকেই জনগণের রায় নিয়েই অর্থাৎ গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমে ব্রতী হন। গণতন্ত্র সহনশীল। তাই আপনি যে মতাবদেই বিশ্বাসী হোননা কেন সে আপনাকে গ্রহণ করবে। চূড়ান্ত রায় দিবে জনগণ।
গণতন্ত্র মতগ্রহণ ও মতখন্ডনেও বিশ্বাসী। এটা অবশ্যই সহনশীলতা এবং যুক্তির মধ্যে থেকে। আমি (যে কেউ) সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। যারা পুজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বিশ্বাস করেন তারা আমার সমালোচনা করবেন এটা স্বাভাবিক। আমার উচিত হবে যতদূর সম্ভব যৌক্তিকভাবে তাদের সমালোচনার জবাব দেয়া। তেমনি স্বাভাবিকভাবেই যারা (যে কেউ)পুজিঁবাদে বিশ্বাস করেন তারাও তাদের পক্ষ্যে যুক্তি দিয়ে তাদের বিপক্ষের মতকে ভুল প্রতিপন্ন করবেন। এটাই ভাষা, এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক পথ। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতে গেলে প্রথমত অন্যের সমালোচনা সহ্য করতে হবে। দ্বিতীয়ত তার সমালোচনার যৌক্তিক জবাব দিয়ে নিজেকে শুদ্ধ প্রমাণ করতে হবে। এক্ষেত্রেও আমার বাস্তব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবে জনগণ।
গণতন্ত্রের সহনশীলতাকে পুজিঁ করে পুজিবাদী, সাম্যবাদী, জাতীয়তাবাদী মতবাদের বাইরে ইদানিং অনেকে ধর্মীয় মতবাদকে আধার করে রাজনীতি করেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা যাবে কি যাবেনা এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি সংশ্ষ্টিরা যদি তাদের রাজনৈতিক অবলম্বনকে একটি মতবাদ হিসেবে মেনে নিয়ে রাজনীতির মাঠে নামেন তবে এ নিয়ে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেকেরই নিজের মতবাদ প্রচারের অধিকার আছে। তেমনি মতবাদের সমালোচনা করারও সুযোগ আছে। কাজেই যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করবেন তাদের অবশ্যই এটা মেনে নিতে হবে যে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করলে এ মতবাদের স্রষ্টা ও প্রচারকদের সমালোচনা হবে এবং এ সমালোচনাকে মেনে নিতে হবে। আপনি যেমন অহরহ রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব, মার্কসের অর্থনৈতিক দর্শন, মেকিয়াভেলির জাতীয়তাবাদের চিন্তা, মাওয়ের কৃষি বিপ্লব ইত্যাদি মতবাদ বা কর্মকান্ডের সমালোচনা করেন তেমনি যারা এসব মতবাদের পক্ষালম্বন করেন তারাও আপনার মতবাদের প্রচারক নবীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত জীবনাচারণ নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনার করার অধিকার রাখেন। এটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, এটাই প্রগতিশীল রাজনীতি। আর আপনি যদি মনে করেন শুধু আপনারই সমালোচনা করার অধিকার কিন্তু অন্যদের এ অধিকার নেই তাহলে আমি বিনয়ের সাথে বলব আপনার অন্তত চলমান ও সভ্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। আপনি যদি মনে করেন আপনার মতবাদ ঐশ্বরীক, তাতে কোন ভুল নেই এবং কেউ এর সমালোচনা করার অধিকার রাখেননা তবে আপনারও কারো সমালোচনা করার অধিকথা নেই। অতএব, আপনার সর্বাত্ববাদী মতবাদকে একান্ত নিজের মনে করে শুধুমাত্র আপনার নিজের বলয়ে এর চর্চা করাটাই আপনার ও জগতের অন্যদের জন্য মঙ্গলকর।
রাজনীতি একটি মহান পেশাও বটে। এ পেশার ব্যক্তিই সমাজের সকল পেশাজীবীদের সংগঠিত করেন এবং নেতৃত্ব দেন। তার ভূমিকা অনেকটা ফুটবল টিমের কোচের মত। একজন ফুটবল কোচ যেমন তার দলের খোলেযারদের কাছ থেকে সেরা পারফর্মেন্স আদায়ে সচেষ্ট থাকেন তেমনি রাজনীতিবিদও দেশের সকল পেশাজীবীদের কাছ থেকে সর্বোত্তম দায়িত্ববোধ ও সেবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একইসাথে নিজের ব্যর্থতার জবাবদিহিতা বা কারণ ব্যাখ্যা করেন। অবশ্য তৃতীয় বিশ্বের দূর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের কারণেই অনেকে প্রায়শই রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের বিকল্প খুজেন। কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমাদের দেশেও সেরকম একটি প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। অনিবার্য গন্তব্য হিসেবে পূর্বের অনেক প্রচেষ্টার মতো সে প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। রাজনীতি ও রাজনীতিবিদের বাইরের তথাকথিত বিকল্প শাসনব্যবস্থা আপনাকে কেবল সৈরাচারই উপহার দিতে পেরেছে। গত দু’বছর আমরা সেরকম নমুনাই দেখেছি। পৃথিবীর কোন ব্যবস্থাই নিষ্কলুষ নয়। রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদরাও আলোচনার উর্ধ্বে নন। তবে মাথা ব্যাথা হলেই যেমন মাথা কেটে ফেলা যায়না। তেমনি রাজনীতি বা রাজনীতিবিদদের মাঝে কোনরূপ নেতিবাচক কার্যক্রম লক্ষ্য করলে রাজনীতিকেই উপড়ে ফেলার চিন্তা করা উচিত নয়। বরং দেশের সমাজ ও সচেতন গোষ্ঠিকে সবসময়ই রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের কঠিন দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে, তাদের কর্মকান্ডের ব্যাখ্যা ও জবাবদিহিতা আদায় করতে হবে। তাহলেই রাজনীতি তার নেতিবাচক বিষয়সমূহকে বর্জন করতে সক্ষম হবে এবং কাংখিত গন্তব্যে পৌছতে সক্ষম হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ১০:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





