ফেসবুকে একটা একাউন্ট আমার আছে। তবে সেটার ব্যবহার কখনোই তেমন করা হয়নি। বন্ধুদের অনেককে ব্যবহার করতে দেখতাম। বলা যেতে পারে তাদের দেখাদেখিই এ জগতে প্রবেশ। তবে সত্যি বলতে রোমাঞ্চিত হওয়ার মতো কোন কিছু আমি সেখানে পাইনি। তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশের মানুষ হিসেবে আমার কাছে সর্বদাই সেটাই গ্রহণযোগ্য যা ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক অবস্থার অন্তত ক্ষুদ্র পরিবর্তন হলেও ঘটায়। সে বিবেচনায় ফেসবুক না থাকলেও চলে। ফেসবুক না থাকলে দেশে আকাশ ভেঙ্গে পড়বেনা।
বলা হয় ফেসবুক সামাজিক বন্ধনের একটি মাধ্যম। কিন্তু কোন সামাজিক বন্ধন আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন? নিঃসন্দেহে আমার বাবা, মা ভাই, বোন, আত্মীয় বা নিকট প্রতিবেশী। পশ্চিমের দেখাদেখি বাবা, মা ভাই, বোন, আত্মীয় বা নিকট প্রতিবেশীদের আমরা ক্রমশ দূরে ঠেলে দিচ্ছি এবং ফেসবুকের মাধ্যমে নতুন বন্ধনের সৃষ্টি করতে চাচ্ছি যা আদৌতে অলীক, একে কখনই ছোয়া যাবেনা। সত্যিকারের সামাজিক বন্ধনকে জোরা লাগাবার মতো অনেক উপলক্ষ্য আমাদের আছে। আমরা বাবা, মা ভাই, বোন, আত্মীয় বা নিকট প্রতিবেশীদের আগের মতোই অর্থাৎ আমাদের পূর্বজদের মতো আপন করে নিতে পারি। এর জন্য প্রয়োজন তাঁদের প্রতি সহানুভূতি, সত্যিকারের ভালবাসা, তাঁদের সাথে মিশা, তাঁদের সুখ বা কষ্ট-কে একান্ত নিজের করে নেয়া। আর এটা কেবল তখনই অর্জিত হতে পারে যখন আমাদের ব্যস্ত সময় থেকে কিছু সময় বের করে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হব। সম্পর্ক বা বন্ধনের মূল হচ্ছে পরস্পরের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা যা নিঃসন্দেহে তথাকথিত ফেসবুকের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
হ্যাঁ, ফেসবুক সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করে এবং তার কিছু নমুনাও আমরা দেখাতে পারি। বেশ কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম এক মহিলা কবি আত্মহত্যা করেছেন। নৈতিকতার স্বার্থে আমি তাঁর নাম উল্লেখ করতে চাইনা। ভদ্রমহিলার স্বামী এবং দু'সন্তান বর্তমান। এতদসত্ত্বেও ফেসবুকের পরিচয়সূত্রে তিনি এক বিবাহিত আবৃতিকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। ভদ্রলোক তাঁকে বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে (যা প্রায়ক্ষেত্রেই ঘটে) তা থেকে পিছু হটেন। এ কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা মহিলা কবির ছিলনা। তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিলেন। ভুলে গেলেন তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর অবুঝ দুৎসন্তানের কি পরিস্থিতি হতে পারে। পরবর্তীতে যথারীতি মানবতাবাদীদের আন্দোলন আর আবৃতিকারের নিজ দোষ অস্বীকার। এ কাহিনী বর্ণনার পিছনে এ ঘটনার জন্য কাউকে দোষী বা নির্দোষ প্রমাণের কোন ইচ্ছা আমার নেই। আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল ফেসবুক কি ধরণের সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি করছে তার একটা ধারণা দেয়া। আপনি যদি হিসাব করেন তাহলে দেখবেন এটা সামাজিক বন্ধনের চেয়ে সামাজিক অস্থিতিশীলতাই বেশি সৃষ্টি করছে। পরকীয়া, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, অসম সম্পর্ক, অলীক সম্পর্কগুলো ফেসবুকেরই অবদান।
ফেসবুক যে সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে প্রভাবকের ভুমিকা পালন করে তা একটু নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝা যায়। প্রায়ই দেখবেন কোন ধর্ম প্রবর্তক-কে নিয়ে ব্যঙ্গ করার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফেসবুকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়। ক্ষেত্রবিশেষে নিষিদ্ধও করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় কোন ধর্মকে ব্যঙ্গ করার জন্য নয় বরং তৃতীয় বিশ্বের ধর্মান্ধ দেশগুলোর মৌলবাদী শক্তিকে চাঙ্গা করে সেসব দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবেই এটা করা হয়।
বলা হয়ে থাকে ফেসবুক নাকি সামাজিক আন্দোলনের একটি মাধ্যম। হ্যাঁ, মাধ্যমই বটে। মার্কসের বিপ্লবী সমাজতন্ত্র যখন সমস্ত ইউরোপে সাড়া ফেলে তখন প্রোলেতারিয়েত বিপ্লবের কাছ থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য আমেরিকান বুদ্ধিজীবীদের প্ররোচনায় বৃটেনে ফেবিয়ান সোসাইটি নামক তথাকথিত একটি সমাজতান্ত্রিক সোসাইটি গড়ে তুলা হয়। তাঁরা তাদেরকে সমাজতন্ত্রী বলেই পরিচয় দিত। তবে পার্থক্য ছিল এই যে, তাঁরা বিপ্লবের পরিবর্তে ধীরগতিতে এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র কায়েমের স্বপ্ন দেখত। চিরস্থায়ী বিপ্লবের প্রবক্তা লিয়ন ট্রটস্কি এদের-কে আখ্যা দিয়েছিলেন ড্রয়িংরুম সমাজতন্ত্রী হিসেবে। তাঁর মতে এদের কাজ ছিল ড্রয়িংরুমে বসে সমাজতন্ত্র কায়েমের নামে প্রোলেতারিয়েত বিপ্লবকে অনুৎসাহিত করার মাধ্যমে বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষা করা। ফেসবুকের সামাজিক আন্দোলনকেও ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ড্রয়িংরুম বিলাস বলেই মনে হয়। এর কোন গন্তব্য নেই।
ফেসবুকের সার্বিক কর্মকান্ডের আলোকে এর কোন সামাজিক গুরুত্ব আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না। একে নিষিদ্ধ করা কোন বড় ধরণের অকর্ম বলেও আমি মনে করিনা। বরং এর নিষিদ্ধের বিষয়টিকে আমি পরিচিত সেই বাংলা প্রবাদ অর্থাৎ "দুষ্ট গুরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভাল" এর সাথেই তুলনা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব। এ কারণে কেউ যদি আমাকে রক্ষণশীল বলে চিহ্নিত করতে চান তাহলে বিনা দ্বিধায় এ অপবাদ মেনে নিতে আমার কোন আপত্তি নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

