মুহম্মদ বিন তুঘলক (১৩০০-১৩৫১ খ্রিঃ) নামে মধ্যযুগে ভারতে একজন তুর্কী বংশোদ্ভূত মুসলিম শাসক ছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদই তাঁকে "পাগলা তুঘলক" নামে অবহিত করেন। কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের অসংলগ্ন কর্মকান্ডের বিবরণ তুলে ধরতে গিয়ে আমরা যখন বলি "যত সব তুঘলকী কান্ড" তখন মূলত আমরা তাঁকেই স্মরণ করি। মুহম্মদ বিন তুঘলকের তথাকথিত তুঘলকী কর্মকান্ডের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটো কান্ড ছিল, ১. সোনা বা রুপার পরিবর্তে তাম্র মুদ্রা প্রচলন এবং ২. রাজধানী দিল্লী থেকে দেবগিরিতে (বর্তমান দৌলতাবাদ, মহারাষ্ট্র) স্থাপন। আজকের লেখার বক্তব্যের প্রেক্ষিত বিবেচনায়, তাম্র মুদ্রা প্রবর্তনের আলোচনাটি এক্ষেত্রে বাদ দেয়া যেতে পারে। সে আলোকে ঠিক কি কারণে তিনি রাজধানী দিল্লী থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর করেছিলেন তা নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মাঝে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে বারবার মুঘল আক্রমণের হাত থেকে রাজধানীকে রক্ষার তাগিদে তিনি দূরবর্তী দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। দিল্লী সীমান্তের খুব কাছাকাছি হওয়ার কারণে সহজেই তা আক্রণকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হত। অবশ্য অনেক ঐতিহাসিকের মতে দিল্লীবাসীর প্রতি আক্রোশ থেকেই তিনি রাজধানী দিল্লী থেকে সরিয়ে ছিলেন। আর এই রাজধানী বদলের প্রক্রিয়ার দিল্লীর ভবনগুলো বাদে বাকি সব অর্থাৎ মানুষ, আসবাবপত্র, প্রশাসনিক নথিসমূহ দেবগিরিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সেটা করা হয়েছিল মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। মরক্কোর বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার মতে দিল্লী জনশূন্য একটি নগরীতে পরিনত হয়েছিল এবং বিড়াল আর ইঁদুরের মতো কিছু প্রাণী ব্যতিত সেখানে আর কোন কিছু অবশিষ্ট ছিলনা। অবশ্য পরবর্তীতে তিনি পুনরায় রাজধানী দিল্লীতে ফিরিয়ে আনেন। তেমনি তাম্রমুদ্রা সহ অন্যান্য তুঘলকী কান্ডেও তিনি শেষ পর্যন্ত ইউটার্ণ নেন।
আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত এমন তুঘলকী কান্ডের/কথার/আচরণের অভাব নেই। নির্বাচন এলে আমাদের মহান নেতারা এ কান্ডগুলো একটু বেশি ঘটান। বলা যায়, এক রকমের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। অবশ্য নির্বাচন শেষ হলে ইউটার্ণ নিয়ে ওনারা আবার আগের অবস্থানে ফিরে যান। ফিরে যান, কারণ কোন কান্ডেরই এখানে কোন জবাবদিহিতা নেই।
বরাবরের মতো নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে আমাদের মহান নেতাদের মাঝে তুঘলকী কান্ডের/কথার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এমনই এক তুঘলকী কথার শ্রেষ্ঠতম চিত্রায়ন দেখলাম নাসিক মেয়র পদপ্রার্থী তথা নারায়ণগঞ্জের সিংহপুরুষ নামে পরিচিত এক মহান নেতার ভাষ্যে। বেসরকারী একটি টিভি চ্যানেলের সাথে গতকাল এক সাক্ষাৎকারে এই মহান নেতা বলেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে নারায়ণগঞ্জ হবে শহর আর ঢাকা হবে গ্রাম। নারায়ণগঞ্জের মেয়র হিসাবে তিনি সে শহরের উন্নয়নের সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে আমি ঠিক বুঝলাম না যে, নারায়ণগঞ্জকে শহর বানাতে গিয়ে ঢাকাকে গ্রামে পরিনত করার এই ভাবনাটা কেন? কিছু না বুঝলেও আমি এ ভেবে শংকিত যে, তিনি আবার মুহম্মদ বিন তুঘলকের মতো কিছু একটা করে বসবেননাতো!!!! কারণ ওনার আর ওনার পরিবারের অনেক ক্ষমতা। ওনি ইচ্ছা করলে চাঁদকেও মাটিতে নামিয়ে আনতে পারেন। এই ক্ষমতার ব্যবহারের মাধ্যমে নারায়নগঞ্জকে শহর আর ঢাকাকে গ্রাম বানানোর প্রচেষ্টায় তিনি আবার তুঘলকী কায়দায় ঢাকাকে জনশূন্য করে ঢাকার সব স্থাবর, অস্থাবর বিষয়াদি নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাবেননাতো? যদি তিনি সেটা করেনও তবে ঢাকার প্রায় এককোটি মানুষ আর প্রশাসনিক ভবনগুলোর সংকুলান নারায়ণগঞ্জের মতো ছোট্র শহরে কিভাবে করবেন? অবশ্য এসব নিয়ে ভাবার কোন সুযোগ আমাদের আমজনতার নেই, সেটা নিয়ে বলারও কিছু নেই। আমজনতাকে সব সময়ই মেনে নিতে হয়।
অবশ্য বারংবার আশাহত হ্ওয়ার পরেও এদেশের বেশিরভাগ মানুষের মতো আমিও হতাশা আর মন্দের মাঝে আশা খুঁজি। কুড়ি বছর আগে বাবার হাত ধরে এই শহরে আসার পরে গ্রামে তেমন একটা আর যাওয়া হয়নি। সবুজ ধানক্ষেতে বাতাসের আগ্রাসন আর পুকুরের ঘোলা পানির স্রোত কতকাল দেখিনা। সিংপুরুষের ইচ্ছানুযায়ী যদি ঢাকা আবার গ্রামে পরিনত হয় তবে হয়তো আবার সবুজ ধানক্ষেত দেখব, আবার পুকুরের জলে উদাম সাতার কাটব।
সিংহপুরুষ, আপনাকে অগ্রিম অভিনন্দন।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০১১ বিকাল ৪:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



