গ্রীক দার্শনীক এরিস্টটলের সরকারের শ্রেণীবিন্যাসে অভিজাততন্ত্র নামে একপ্রকারের শাসনব্যবস্থার উল্লেখ আছে। এরিস্টটলের মতে যে শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দেশের অল্পসংখ্যক ব্যক্তির হাতে ন্যাস্ত থাকে এবং তাঁরা যখন জনকল্যাণে কাজ করেন তখন তাকে অভিজাততন্ত্র হিসেবে অভিহিত করা যায়। কিন্তু যখন ঐ অল্পসংখ্যক ব্যক্তি জনস্বার্থ বাদ দিয়ে নিজের গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত থাকেন তখন তাকে বলা যায় কতিপয়তন্ত্র। গত বিশ বছরের সংসদীয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতায় আমি অবশ্যই বলতে পারি যে, দেশে গণতন্ত্রের নামে কতিপয়তন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পালাক্রমে দুটো পরিবার ও তাদের কিছু ঘনিষ্ঠ চাটুকারেরা দেশ শাসন করছে এবং জনস্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারেই বেশি তৎপর থাকছে। এগুলো সবই সংঘটিত হচ্ছে গণতন্ত্রের নামে, জনরায়ের নামে। গত ২০ বছরে আপনি সরকারগুলোর এমন খুব কম সিদ্ধান্তই পাবেন যা দেশের আপামর জন সাধারণের কল্যাণের স্বার্থে গৃহীত হয়েছে।
সম্প্রতি সরকার সরকারি কর্মচারীদের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৫৯ এ উন্নীতকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বলা যায় খুব তড়িৎ গতিতেই সরকার কাজটি সম্পন্ন করেছেন। জরুরী ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতে যেখানে আইন ও অর্থ বিভাগ মাসের মাসের পর মাস সময় অতিবাহিত করে সেখানে এ বিষয়ে মতামতটি একদিনের মধ্যেই দেয়া হয়েছে। আইনটি সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদের মতামত প্রয়োজন। এ মুহুর্তে সংসদ মুলতবি আছে। সরকার সংসদ অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষ না করে এটিকে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের সার্বিক কর্মকান্ডে বা আচরণে মনে হচ্ছে এটা সম্পন্ন করা জাতির জন্য কতইনা জরুরী।
কিন্তু ভেতরের খবর হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে সরকারের অনুগত বা বিশ্বস্ত প্রায় ডজন খানেক সচিব আগামী মার্চ/২০১২ এর মধ্যে পিআরএলে যাচ্ছেন। সরকারের মেয়াদকালও প্রায় দুই বছর। কাজেই সামনের দু’বছর যাতে নির্বিঘ্নে অনুগত দিয়ে কাজ করানো যায় তাই এ ব্যবস্থা। সরকার ইচ্ছা করলে ওনাদেরকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারতেন। তবে একসাথে এতোজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়াটা দৃষ্টিকটু দেখায়। অপেক্ষাকৃত জুনিয়ররাও এতে অসন্তুষ্ট হতেন। তাছাড়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে আর্থিক বেনিফিটটা ততোটা নয়. যতোটা নিয়মিত চাকরীর বয়স বাড়ালে হয়। কারণ নিয়মিত চাকরীতে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট এবং তৎসূত্রে পেনশনের যে বাড়তি সুবিধা সেটা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে পাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া সরকার যেকোন সময়ে চুক্তি বাতিলও করতে পারে। সে কারণেই হয়তো সরকার ও তাঁর অনুগত আমলারা চাকুরীর বয়স বাড়ানোটাই প্রিফার করেছেন।
কিন্তু এটাতে আদৌতে দেশের আপামর জনগণের লাভটা কি হল? সহজ অংকের হিসাবে এটা পরিস্কার যে, আগামী দু’বৎসর দেশে আর কেউ স্বাভাবিক অবসরে যাচ্ছেন না। কাজেই এক্ষেত্রে পদশূণ্য হওয়ার ফলে নতুন নিয়োগের সম্ভাবনাটি একেবারে তিরোহিত হল। পদসৃষ্টির মাধ্যমে নতুন পদের সৃষ্টি করা যেতে পারে। কিন্তু সেটা নির্ভর করে পদগুলোর প্রয়োজনীয়তা সত্যিকার অর্থে কতটুকু। তাছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে পদসৃষ্টির মাধ্যমে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া অনেক সময়ের ব্যাপার। কাজেই এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, আগামী দুবছরে সরকারের রাজস্ব বাজেটের কর্মচারী নিয়োগে স্থবিরতা আসবে। অথচ এ সরকারের প্রধান নির্বাহী ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি প্রতি ঘরে অন্তত একজনের চাকরীর ব্যবস্থা করবেন। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বেসরকারী খাত এখনো তেমন বিকশিত হয়নি, যেখানে বেশিরভাগ যুবকদের এখনো সরকারী চাকরীর আশায় থাকতে হয়, সেখানে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন একটি স্থবিরতা আনয়নকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বস্তুত তিনি কি তাঁর প্রতিশ্রুতির সম্পুর্ণ বিপরীত একটি সিদ্ধান্ত নিলেন না? এক্ষেত্রে আরেকটি কথা সহজেই বিবেচনায় আসতে পারে যে, পুত্রের চাকরী পাওয়াটা অর্থনৈতিক বিবেচনায় পরিবারের জন্য বেশি নিরাপদ, নাকি বাবার দু’বছর বেশি চাকরী করাটা? প্রশ্নটার উত্তরটা খুবই সহজ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি এ প্রশ্নটি তাঁর বিবেচনায় এনেছিলেন? তাঁর মহান উপদেষ্টাদের কেউ কি এটা নিয়ে ভেবেছিলেন?
আসলে এখানে ভাবার কিছু ছিলোওনা। জনস্বার্থ ভাবাটা কখনই এখানে মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে কতিপয়ের স্বার্থ। সরকার কতিপয় আমলার উপর নির্ভর করে তার পরবর্তী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছে। সেই কতিপয় আমলারাও এই সুযোগে নিজেদের কাজটা করিয়ে নিয়েছে। জনগণকে আমাদের রাজনীতিবিদরা কখনই পরোয়া করেন না। জনগণ তাদের কিছু করতে পারবে না তা সেটা তারা ভাল করেই জানে। গত বিশ বছরের সংসদীয় গণতন্ত্রের নমুনায় আমাদের রাজনীতিবিদরা জনগণের সীমাবদ্ধতা খুব ভালভাবেই বুঝে নিয়েছে। গোষ্ঠীস্বার্থে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা-কে জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে সায় দিয়েছে। পার্থক্য শুধু এই যে, নির্বাচনে তাঁরা বর্তমানের দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, চাঁদাবাজদের বদলে ইমিডিয়েট পূর্বের সমগোত্রীয়দের বেছে নিয়েছে। এমনকি বিগত নির্বাচনে না-ভোটের সুযোগ থাকা স্বত্ত্বেও জনগণ এদেরকেই নির্বাচিত করেছেন। রাজনীতিবিদরা তাই বুঝে গেছেন জনগণের কাছে তাদেঁর কোন বিকল্প নেই, অন্য কোন গন্তব্য নেই। আপামর জনগণের বৃহত্তর কল্যাণ তাই তাদের কাছে মুখ্য নয়। মুখ্য হচ্ছে সেই মুষ্টিমেয়ের কল্যাণ যাদের মাধ্যমে নিজ গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষিত হয়।
দেশে গণতন্ত্রের নামে এভাবে কতিপয়তন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করার সত্যিকারের দায়টা তাহলে কার? রাজনীতিবিদদের? নাকি তাদেঁর-কে যারা চোখ বুঝে নির্বাচিত করছে সেই জনগণের?
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ডিসেম্বর, ২০১১ বিকাল ৪:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



