পাকিস্তান আমল বা স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বৃহৎ বলয় জুড়ে আছে ভারত বিরোধীতা। প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রধান অবলম্বনই হচ্ছে ভারতের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং এর সাথে বিভিন্ন প্রগতিশীল দল বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে যুক্ত করা। বিশেষ করে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনামলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই দিকটি বিশেষ মাত্রা পায়। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে সেনাশাসকরা উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে অন্তত বাহ্যিক দৃষ্টিতে প্রতিবেশি দেশটির সাথে একটি শীতল অবস্থার সৃষ্টির করে আ্ওয়ামী লীগ-কে কোণঠাসা করে রাখার প্রয়াস নিত। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের একমাত্র দোষ তারা ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তার এই দেশটি স্বাধীন করেছে। যদি ভারত পাশে না থাকত তবে এদেশবাসীকে কচুকাটা করে স্বাদের পাকিস্তানকে দু’টুকরা হওয়ার হাত থেকে সহজেই রক্ষা করা যেত।
দেশে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর কথায় কথায় ভারত বিরোধীতার সংস্কৃতিটা কমে আসলেও বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত সংঘাত নিয়ে ভারত বিরোধীতা এবং এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পর্যুদস্ত করার পুরনো সংস্কৃতিটা মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে আসে। বলাবাহুল্য এ বিরোধীতাগুলো বরাবরই একপেশে। পারিপার্শ্বিক বিষয় বা এ সংঘাতের মূল বিষয়গুলো নিয়ে কখনই ভাবা হয়না। লক্ষ্য একটাই কিভাবে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে হাবিব নামক এক বাংলাদেশীর বিএসএফ কর্তৃক নির্যাতিত হওয়া একে কেন্দ্র করে ভারত তথা আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করা আমাদের চিরাচরিত অপ-রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই একটি দৃষ্টান্ত। এ বিষয়ে স্থানীয় লোকজনের বরাত দিয়ে এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার কাহারপাড়া সীমান্তের একটি ফাঁড়িতে ওই ঘটনা ঘটে। ওই যুবক বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। গরু চোরাচালানকারী সন্দেহে বিএসএফের সদস্যরা তাঁকে আটক করেন। ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় বিএসএফের সদস্যরা তাঁর হাত-পা বেঁধে শরীরের গোপন অঙ্গে পেট্রল ঢেলে নির্মমভাবে পেটান। নির্যাতনের পর ওই তরুণকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়।
এনডিটিভিতে প্রকাশিত এ খবরের ধারাবাহিকতায় বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ সীমান্তের মহাপরিদর্শক রবি পোনোঠ টেলিফোনে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ঘটনাটি যে অত্যন্ত ভয়াবহ আর লজ্জাজনক, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনাটি মুর্শিদাবাদ জেলার চরমৌরুসি সীমান্তচৌকিতে গত ৯ ডিসেম্বর ঘটে। চৌকিতে প্রহরারত আটজন বিএসএফ সদস্য জড়িত ছিলেন। তাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে। সবাইকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিশদ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেটা একজন কমান্ড্যান্ট র্যাংকের অফিসার পরিচালনা করবেন। অন্যদিকে রাজ্য পুলিশকেও ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বরখাস্ত করা বিএসএফের সদস্যরা হলেন: বিরেন্দর তিওয়ারি, ভিএস ভিক্টোর ধনঞ্জয় কুমার, আনন্দ সিং, অমর জ্যোতি, সঞ্জীব কুমার, সুরেশ চন্দ ও সুনীল কুমার। তাঁরা সবাই কনস্টেবল পদে কর্মরত।
এখানে যেটা লক্ষণীয় এবং আবশ্যিকভাবে বিচার্য তাহল নির্যাতনের এই খবরটি সর্বপ্রথম ভারতীয় টেলিভিশন এনডিটিভিতে প্রচারিত হয়। এনডিটিভি সহ অন্যান্য ভারতীয় গণমাধ্যমের চাপেই হোক বা নীতিগত অবস্থান থেকেই হোক ভারত সরকার দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নিয়েছে।আমাদের গণমাধ্যম বা সরকার বিষয়টি জেনেছে ঘটনার অনেক পরে, ভারত সরকার ব্যবস্থা নেওয়ারও পরে।কাজেই অন্তত এ বিষয়ে ভারতের গণমাধ্যম এবং সরকার অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজ করেছে। ভারতের গণমাধ্যম প্রকৃতঅর্থেই গণতান্ত্রিক একটি মাধ্যমের মতোই আচরণ করেছে। তারা জানত এ সংবাদটি প্রকাশিত হলে বিশ্বে বিএসএফ তথা ভারতের সন্মানহানির সম্ভাবনা আছে। তারপরেও তারা সত্য প্রকাশের তাড়না থেকেই সংবাদটি প্রকাশ করেছে। এক্ষেত্রে ভারত সরকারও প্রশংসার যোগ্যতা রাখেন। কারণ সরকার বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দেয়নি বা তার কর্মচারীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেনি (যেমনটা আমাদের সরকার অহরহ করে)।
অথচ আমাদের দেশের উগ্র জাতীয়তবাদী ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় চিরাচরিতভাবে পুরনো রেওয়াজে ভারত বিরোধীতায় সরগরম হয়েছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তথাকথিত কিছু গণমাধ্যমও।লক্ষ্য একটাই, সরকারকে কোণঠাসা করা।এক্ষেত্রে আমাদের রাজনিতক নেতৃবৃন্দ বা মিডিয়া এটা ভুলে যাচ্ছেন যে, প্রায় দেড়মাস আগে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাটি কোনদিনই আলোর মুখ দেখতনা যদি ভারতীয় গণমাধ্যম তা প্রচার না করত। নির্যাতিত হওয়ার দেড়মাস পরেও আমাদের ডজন খানেকের উপর টিভি চ্যানেল এই নির্যাতিতের কোন খবর পায়নি। অথচ ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো এ সংবাদ প্রচারের পর এবং ভারত সরকার এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও টিভি চ্যানেলগুলো টকশো এর নামে সরকারের বিরোধীতায় সরগরম হয়েছেন, প্রতিক্রিয়াশীলদের জন্য সুযোগ করে দিচ্ছেন। আর এ সুযোগের ধারাবাহিকতায় তারা এখন ভারতীয় দুতাবাস ঘেরাও সহ নানারকম অস্থিতিশীল কর্মকান্ড চালানোর পায়তারা চালাচ্ছে।
সরকার যুদ্ধাপরাধ ইস্যু সহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাহসী ও দৃষ্টান্তমুলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি যে উগ্রজাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটি ভারত বিরোধীতার নামে ভারতীয় দুতাবাস ঘেরাও সহ অন্যান্য কর্মকান্ডের সরকার-কে অস্থিতিশীল করার পায়তারা চালাচ্ছে সরকার তাদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমুলক সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কারণ যুদ্ধাপরাধ, সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সাথে এই উগ্রজাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক দর্শণ একসূত্রে গাথা।
পাদটিকাঃ ভারতীয় দুতাবাস ঘেরাও সংক্রান্ত একটি লেখা গত কয়েকদিন ধরে এ ব্লগসাইটটিতে স্টিকি করা আছে। আমি ঠিক জানিনা এমন একটি পলিটিক্যালি মোটিভেটেড চিন্তা বা কর্মকে ব্লগ কর্তৃপক্ষ কি কারণে প্রণোদনা দিচ্ছেন। অবশ্য গত দুই-আড়াই বছরে সামহোয়ারের যে দর্শণের নমুনা পেয়েছি তাতে এমন আচরণ একেবারে অনাকাংখিত নয়। এখানে যেমন যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্বলিত পোস্ট স্টিকি ঠিক তেমনি জামায়াত ও শিবিরের গুনকীর্তনকারী লেখাগুলো সযতনে টিকে থাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



