সময়ের দায় স্বীকার করে এক এক করে যারা আপন তাঁরা সবাই চলে যাচ্ছে। এক একটা মৃত্যু এক একটা বন্ধনের অবসান, স্মৃতিগুলোর চিরতরে থেমে যাওয়া। একদিন যে মানুষটা অস্তিত্বের অংশ ছিল, অনেক স্মৃতির উৎস ছিল, সে আর কোনদিন নতুন স্মৃতি নিয়ে হাজির হবেনা। নিজেকে চির নিঃসঙ্গতার পথের যাত্রী করার পাশাপাশি নিশ্চিতভাবেই আমার পৃথিবীর একটা অংশকে চিরতরেই করে যায় নিঃসঙ্গ। জানি ফিরবেনা, তবুও তাঁকে খুঁজি। অতঃপর চলমান নিয়মকে মেনে নিয়ে তাঁর শুণ্যস্থানে নতুনকে খুঁজি। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নতুন সম্পর্ক বা মুখগুলো পুরাতনের মতো স্বার্থহীন হয়না। স্বার্থের দোলায় সম্পর্কের মানদন্ডটিও দোলিত হয়।
ছেলেবেলার বন্ধুদের কথা মনে পড়ে। কি নিষ্পাপ ছিল মুখগুলো! কি স্বার্থহীন ছিল সম্পর্কগুলো! সময়ের দায় স্বীকার করে এক একজন পর্যায়ক্রমে ভিন্ন পথের পথিক হয়েছে। আজ তারা কোথায় আছে? ক্যামন আছে? প্রশ্নগুলো নিজেকেই করি। যদিও নিজের কাছ থেকে কোন উত্তর আসেনা। বরাবরের মতোই ব্যর্থ হয়ে স্মৃতি হাতড়ে তাঁদের ছোট মুখগুলো মনে করার চেষ্টা করি। নিজেকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টায় সেলফোনের কন্টাক্ট লিস্টে তাঁদের নামগুলো খুঁজি। যদিও নিশ্চিতভাবেই এটা জানি যে, সেলফোনটা হাতে আসার অনেক আগেই তাঁরা হারিয়ে গেছে আমার পৃথিবী থেকে।
বেঁচে থাকা, টিকে থাকা বা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় দেখা মিলে কিছু পেশাদার সম্পর্কের। সম্পর্কগুলো বাহ্যিক বিবেচনায় খুবই অমায়িক, হৃষ্টপুষ্ট, প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু পুরো বিষয়টা আদৌতে বাহ্যিক। অমায়িক, হৃষ্টপুষ্টতার আড়ালে চলে পরস্পর বিরোধীতা আর প্রতিযোগিতা। কঠিন সময়ে অমায়িক, হৃষ্টপুষ্টতার অভিনয়টা ঠিকই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
অন্তর্জালের প্রসারে আজ বিশ্ব্যব্যাপী অন্তর্জালিক সম্পর্কের জয়জয়কার। শুনেছি এবং দেখেছি এসব সম্পর্কের জোরে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক পরিবর্তন, বিপ্লবও নাকি হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে এই সম্পর্কগুলো পেশাদারী সম্পর্কের চাইতেও অবিশ্বস্ত। এ সম্পর্কের মানুষগুলোর সাথে আমি হাসি, একাত্ম হই; কিন্তু চূড়ান্ত অর্থে বিশ্বাস করিনা। সত্যিকার অর্থে এ সম্পর্কগুলোকে যাচাইয়ের কোন পরিস্থিতি নেই; তাই চূড়ান্তঅর্থে বিশ্বাসের কোন সুযোগ নেই।
ছেলেবেলার বন্ধুরা হারিয়ে যায়। রক্তের সম্পর্কগুলো স্বার্থ আর সময়ের দায় মেনে নিয়ে নিঃশেষ হয়। পেশাদারি সম্পর্কগুলো প্রতিযোগিতার আবর্তে মলিন হয়। অন্তর্জালের সম্পর্কগুলো চূড়ান্তঅর্থেই অবিশ্বস্ত। এসব হারিয়ে যাওয়া আর নিঃশেষ হওয়ার মাঝেও দুটো সম্পর্ক ঠিকই টিকে থাকে; একটি ঈশ্বরের (যদি সত্যিই তিনি থেকে থাকেন) সাথে সৃষ্টির, অপরটি মায়ের সাথে সন্তানের। তবে এক্ষেত্রে ঈশ্বর চির রহস্যময়; তাঁকে সর্বদাই আপনাকে খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু মা সবসময় নিজে থেকেই আপনাকে খুঁজে নিবেন, কবরের বাসিন্দা হলেও নিশ্চিতভাবেই কোন না কোন রূপে আপনার কাছে আবার ঠিকই ফিরে আসবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



